Home খেলার চমক জুটির গল্প । আবু আবদুল্লাহ

জুটির গল্প । আবু আবদুল্লাহ

ক্রিকেট জুটির খেলা। উইকেটের দুই প্রান্তে দুই ব্যাটসম্যান জুটি বেঁধে ব্যাটিং করেন। এক সাথে দুই ব্যাটসম্যান অবিচ্ছিন্ন থেকে যতক্ষণ ব্যাটিং করতে পারেন সেটিই তাদের জুটি, ইংরেজিতে যাকে বলে পার্টনারশিপ। যে জুটি যতবেশি সময় ক্রিজে টিকতে পারে, তাদের রানও বেশি হয়। জুটির হিসাব-নিকাশও ক্রিকেট পরিসংখ্যানের বড় একটি জায়গাজুড়ে আছে। আজ তোমাদের জানাব ক্রিকেটের বড় কিছু জুটির গল্প।

হযরতুল্লাহ জাজাই-ওসমান গনি জুটি
হযরতুল্লাহ জাজাই-ওসমান গনি জুটি

হযরতুল্লাহ জাজাই-ওসমান গনি
গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে আয়ারল্যান্ডের সাথে হোম সিরিজ ছিলো আফগানিস্তানের। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার মতো পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি, যে কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই ভারতের দেরাদুনকে নিজেদের হোম ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করছে আফগানরা। ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় উত্তরাখন্ড রাজ্যের শহর দেরাদুন। সেই শহরের রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামেই ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল টেস্ট পরিবারের দুই নতুন সদস্য আয়ারল্যান্ড ও আফগানিস্তানের টি-টোয়েন্টি সিরিজ।
২৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে আফগানিস্তানের দুই ওপেনার হযরতুল্লাহ জাজাই আর ওসমান গনি মিলে সৃষ্টি করেন নতুন ইতিহাস। দু’জনে গড়েন ২৩৬ রানের জুটি। উদ্বোধনী জুটি তো বটেই, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের যে কোন জুটিতেই এটি সর্বোচ্চ রান। ১৮তম ওভারের তৃতীয় বলে আউট হয়েছেন ওসমান গনি। অবশ্য তার আগেই হয়ে গেছে বিশ্বরেকর্ড। এদিন রীতিমতো টর্নেডো বইয়ে দেন তারা আইরিশ বোলারদের ওপর দিয়ে। দু’জনে মিলে খেলেছেন ১০৫টি বল। বিশেষ করে জাজাই ছিলেন বিধ্বংসী রূপে। ২৩৬ রানের মধ্যে ১৪৫ করেছেন একাই, সেটিও ৫৭ বলে। আর গনি ৪৮ বল থেকে করেছেন ৭৩ রান। জাজাইকে এদিন আউটই করতে পারেনি আইরিশ বোলাররা। ইনিংসের শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে সব মিলে করেছেন ৬২ বলে ১৬২ রান। জাজাই কেমন ব্যাটিং করেছেন তা স্কোর কার্ডে চোখ বুলালেই বোঝা যাবে। ১৬টি ছক্কা হাঁকিয়েছেন তিনি, যেটি টি-টোয়েন্টির এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার বিশ্বরেকর্ড। চার ছিলো ১১টি। অর্থাৎ ১৬২ রানের মধ্যে ১৪০ রানই এসেছে চার-ছক্কা থেকে।
রান বন্যা থামাতে আয়ারল্যান্ডের অধিনায়ক ৮ জন বোলার ব্যবহার করেছেন; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ২০ ওভারে ২৭৮ রান তোলে আফগানিস্তান। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এটি দলীয় সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ড। অর্থাৎ এক ইনিংসেই হয়েছে বেশ কয়েকটি রেকর্ড।
এর আগে সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ড ছিলো অস্ট্রেলিয়ার অ্যারন ফিঞ্চ ও ডি’আর্চি শর্টের। তারা ওই ম্যাচের মাত্র ৭ মাস আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারারেতে তুলেছিলেন ২২৩ রান। তারা খেলেছিলেন ১৯ দশমিক ২ ওভার। শর্ট মোটেই বিধ্বংসী ছিলেন না, খেলেছিলেন বলতে গেলে ফিঞ্চ একাই। শর্ট আউট হওয়ার আগে করেন ৪২ বলে ৪৬ রান। কিন্তু অ্যারন ফিঞ্চ শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে করেন ৭৬ বলে ১৭২ রান।

স্যামুয়েলস-গেইল, ওয়ানডে ইতিহাসে এটিই যে কোন জুটির ৩৭২ রানের বিশ্বরেকর্ড
স্যামুয়েলস-গেইল, ওয়ানডে ইতিহাসে এটিই যে কোন জুটির ৩৭২ রানের বিশ্বরেকর্ড

ক্রিস গেইল-মারলন স্যামুয়েলস
রানের রেকর্ড নিয়ে কথা হবে আর সেখানে ক্রিস গেইলের নাম থাকবে না তাই কি আর হয়! ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বোচ্চ জুটির সাথে জড়িয়ে আছে এই ক্যারিবীয় ব্যাটিং দানবের নাম। ২০১৫ বিশ্বকাপের কথা সেটি। অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় মুখোমুখি হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জিম্বাবুয়ে। আগে ব্যাট করতে নেমে শূন্য রানে ওপেনার ডোয়াইন স্মিথকে হারায় উইন্ডিজরা। জিম্বাবুয়ের পেসার পানিয়াঙ্গারা ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই তাকে বোল্ড করেন; কিন্তু এরপর যে তাদের জন্য কী বিভীষিকা অপেক্ষা করছিলো তা ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করেনি জিম্বাবুয়ের কেউ। স্মিথের বিদায়ের পর গেইলের সাথে জুটি বাঁধেন মারলন স্যামুয়েলস। দু’জনে ক্রিজে এমনভাবে দাঁড়িয়ে যান যে ইনিংসের শেষ পর্যন্ত খেলেন। একেবারে ইনিংসের শেষ বলে আউট হন ক্রিস গেইল। ততক্ষণে রান হয়েছে ৩৭২, যার পুরোটাই এই জুটির। অর্থাৎ ৩৭২ রানের জুটি গড়েছেন দু’জনে। ওয়ানডে ইতিহাসে এটিই যে কোন জুটিতে বিশ্বরেকর্ড। গেইল এদিন করেছেন তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের একমাত্র ডাবল সেঞ্চুরিটি। ১৪৭ বল থেকে গেইল করে ২১৫ রান, তার ইনিংসে ছিলো ১৬টি ছক্কা আর ১০টি চার। অন্যপ্রান্তে অপরাজিত থাকা স্যামুয়েলস করেন ১৫৬ বলে ১৩৩ রান।
এদিন তারা ভেঙেছিলেন ১৫ বছর আগের রেকর্ড। ১৫ বছর ধরে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ পার্টনারশিপের রেকর্ডটি ছিলো শচীন টেন্ডুলকার ও রাহুল দ্রাবিড়ের। ভারতের হায়দরাবাদে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তারা গড়েছিলেন ৩৩১ রানের জুটি। সেটিও ছিলো দ্বিতীয় উইকেট জুটি। সেদিন ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে ওপেনার সৌরভ গাঙ্গুলি আউট হয়ে গেলে শচীনের সাথে জুটি বাঁধেন দ্রাবিড়। দু’জনে খেলেন ৪৮ ওভার পর্যন্ত। ১৫৩ রান করে দ্রাবিড় আউট হয়ে গেলেও শচীন অপরাজিত ছিলেন ১৮৬ রানে। আর ভারতের সংগ্রহ ছিলো ২ উইকেটে ৩৭৬ রান।

কুমার সাঙ্গাকারা-মাহেলা জয়াবর্ধনে
কুমার সাঙ্গাকারা-মাহেলা জয়াবর্ধনে

কুমার সাঙ্গাকারা-মাহেলা জয়াবর্ধনে
টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ডটি দুই লঙ্কানের দখলে। কুমার সাঙ্গাকারা আর মাহেলা জয়াবর্ধনে যে রেকর্ড গড়েছিলেন ২০০৬ সালে, তা আজো অক্ষুন্ন। সে বছর জুলাইতে দক্ষিণ আফ্রিকা দল যায় শ্রীলঙ্কা সফরে। কলম্বোতে সিরিজের প্রথম টেস্টে আগে ব্যাট করে সফরকারীরা। তবে মুত্তিয়া মুরালিধরন আর দিলহারা ফার্নান্ডোর দারুণ বোলিংয়ে হার্শেল গিবসরা প্রথম ইনিংসে গুটিয়ে যায় ১৬৯ রানে। এর জবাব দিতে নেমে স্বাগতিকদের শুরুটাও ভালো হয়নি। মাত্র ১৪ রানে তারা হারায় দুই ওপেনারের উইকেট। এরপর জুটি বাঁধেন দুই বন্ধু সাঙ্গা আর মাহেলা। প্রথম দিন দ্বিতীয় সেশনে ব্যাটিং শুরু করে তৃতীয় দিন লাঞ্চের পর যখন এই জুটি ভাঙে ততক্ষণে জুটির সংগ্রহ দাঁড়ায় ৬২৪ রান। দু’জনে ব্যাটিং করেছেন ১৫৭ ওভার। মিনিটের হিসেবে যা ৬২৮ মিনিট। দলীয় ৬৩৮ রানে সাঙ্গাকারা আউট হন ব্যক্তিগত ২৮৭ রান করে। তবে জয়াবর্ধনে পেয়ে যান ট্রিপল সেঞ্চুরি।
সেই ইনিংসে শ্রীলঙ্কা ৫ উইকেটে ৭৫৬ রান সংগ্রহ করে ইনিংস ঘোষণা করেছিল। কুমার সাঙ্গাকারা আর মাহেলা জয়াবর্ধনে সেদিন ভেঙেছিলেন তাদের স্বদেশীদেরই রেকর্ড। টেস্টে সর্বোচ্চ জুটির আগের রেকর্ডটি ছিলো সনথ জয়সুরিয়া আর রোশন মাহানামার দখলে। ১৯৯৭ সালে তারা ভারতের বিপক্ষে দ্বিতীয় উইকেটে গড়েছিলেন ৫৭৬ রানের জুটি। যে ম্যাচে রেকর্ডটি হাতছাড়া হয়েছে সেই ম্যাচেও দলে ছিলেন জয়সুরিয়া। ড্রেসিংরুমে বসেই দেখেছেন কিভাবে দুই সতীর্থ তার রেকর্ড কেড়ে নিচ্ছেন।

শচীন সৌরভ গাঙ্গুলির সাথে ১৭৬ ইনিংসে জুটি বেঁধে মোট সংগ্রহ করেছেন ৮ হাজার ২২৭ রান
শচীন সৌরভ গাঙ্গুলির সাথে ১৭৬ ইনিংসে জুটি বেঁধে মোট সংগ্রহ করেছেন ৮ হাজার ২২৭ রান

জুটিতে সবচেয়ে বেশি রান
এতক্ষণ যা জানলে সেটি নির্দিষ্ট এক ইনিংসে বড় জুটির গল্প। এবার জানাব ভিন্ন কিছু তথ্য। দুই ব্যাটসম্যান ক্যারিয়ারের সব ম্যাচ মিলে জুটি বেঁধে যত রান করেছেন সেই হিসাব বলি। টেস্টে ভারতের শচীন টেন্ডুলকার ও রাহুল দ্রাবিড় পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে ১৪৬ ইনিংসে জুটি বেঁধেছেন। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এক সাথে ভারতীয় দলে ছিলেন তারা। এ সময় টেস্টে জুটি বেঁধে তারা মোট করেছেন ৬ হাজার ৯২০ রান। এর মধ্যে একশ বা তার বেশি রানের পার্টনারশিপ ছিল ২০টি। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনে। ১২০ বার জুটি বেঁধে তাদের সংগ্রহ ৬ হাজার ৫৫৪ রান।
ওয়ানডেতেও এই রেকর্ড শচীনের দখলে। সৌরভ গাঙ্গুলির সাথে ১৭৬ ইনিংসে জুটি বেঁধে মোট সংগ্রহ করেছেন ৮ হাজার ২২৭ রান। শতরানের জুটি ২২টি। এখানেও দ্বিতীয় স্থানে সাঙ্গাকারা ও জয়াবর্ধনে। ১৫১ বার জুটি বেঁধে তারা মোট রান করেছেন ৫ হাজার ৯৯২ রান।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও রেকর্ডটি দুই ভারতীয় ব্যাটসম্যানের দখলে। রোহিত শর্মা ও শেখর ধাওয়ান ৪৫ ইনিংসে জুটি বেঁধে মোট সংগ্রহ করেছেন ১৪৮৬ রান (১ মার্চ ২০১৯ পর্যন্ত)।

SHARE

Leave a Reply