Home গল্প বাদলের হাসি । মিরাছ ইযহার

বাদলের হাসি । মিরাছ ইযহার

বাদলের হাসি । মিরাছ ইযহারমেঘেরা খেলছে। আকাশ মেঘে ছেয়ে গেছে। শাঁ শাঁ বাতাস বইছে। গাছের ডালপালা নুয়ে পড়ছে। পুরো শহর ধুলোবালিতে হাহাকার। চোখে হাত দিয়ে হাঁটছে পথিক। বিজলি চমকাচ্ছে ভীষণ। পুরো বিল্ডিং যেন মাটিতে লুটে পড়বে। তেমন ভয়ঙ্কর অবস্থা। বেলকনির রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইমন। শরীরের ভার সইছে রেলিংটি। আকাশে মেঘ জমাট হলেই ইমন বেলকনিতে এসে দাঁড়ায়। সেটা তার জীবনের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের যেটা ভালোলাগে সেটা মানুষ বেশি করতে চায়। সেটা মানুষের স্বভাব। ইমনের মেঘ বৃষ্টি ভাললাগে। ভালোলাগে ধুলো মলিন শহর। ধূসর পৃথিবী। বাতাস বইলে নাকি পাখিরা গাছের ডালে বসে থাকে না। মনের আনন্দে আকাশে উড়ে। সেটা বলেছিলো ইমনের মামা। মামা চিটাগাংয়ের একটা পাবলিক কলেজে পড়ে। মামাকে খুব ভালোলাগে ইমনের। ইমনের মন বুঝে তার মামা। যেদিন থেকে ইমনকে বলেছিলো মেঘলা আকাশ সুন্দর দেখায়। পাখির কিচিরমিচির বেড়ে যায়। কাকরা উড়ে বেড়ায়। সেদিন থেকে ইমন বেলকনিতে দাঁড়ায়। যদি আবহাওয়া তেমন হয়। আজও ইমন দাঁড়িয়ে আছে। অকপটে চেয়ে আছে। পর্যবেক্ষণ করছে পরিবেশ। আনমনে দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার আরেকটা কারণও আছে। রাকিবের অপেক্ষায় আছে ইমন। রাকিব তার ক্লাসমেট। বেঞ্চের সাথী। বেস্ট ফ্রেন্ড। টিউশনের টিচারের মতো রাকিব ঠিক আসরের পর এসে উপস্থিত হয় ইমনের বাসায়। দু’জন মিলে গল্প করে। আড্ডা দেয়। মাঝে মাঝে ঘুরতে বের হয়। রাকিব ছেলেটা খারাপ না। খুব ভালো। সরল। ঠোঁটে সবসময় হাসি ঝুলে রাখে। ভদ্রতার সীমা নেই। ইমন ভাবছে রাকিব এতক্ষণে আসছে না কেন!
ভাবতে ভাবতেই রাকিবের দেখা। কলিং বেল বেজে উঠার আগে দরজা খুলে দিলো ইমন।
: কি রে কেমন আছিস?
: ভালো। তুই?
: ভালো। এত দেরি করলি যে!?
: আরে রাস্তার যে অবস্থা। বাতাসে ঘরবাড়ি মুচড়ে ফেলছে।
: হুম। তা তো দেখছি। চা খাবি?
: না। আচ্ছা আয় আমরা আজকে বাইরে থেকে ঘুরে আসি।
: চল।
দু’জনে গল্প করে হাঁটছে। বাতাস কখনো তাদের ধাওয়া করছে। আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় মেঘগুলো তাদের দিকে পাথরের ন্যায় ছুটে আসবে। হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়াল এক প্রান্তে। রাকিব দেখলো একটা ছেলে খুব ব্যস্ত। দু’জনে গেল। স্বপ্নের কুটির। দুটো লাঠি দিয়ে রাস্তার পাশের রেলিংয়ের সাথে মিলিয়ে উপরে কাপড় দিয়ে নির্মাণ করা। ছেলেটির ঘর বাতাসে উড়ে যাচ্ছে। চোখে মুখে বিষণœতার ছাপ। কাঁদো কাঁদো ভাব। দাঁত ব্যথা হলে মানুষের যেমন একটা অস্থির ভাব থাকে তেমন।
: এই তোমার নাম কী?
: বাদল।
: এ ঘরটা কার?
: আমার। আমি বেঁধেছি এটা। (এমন াবে বলছে যেন ওরা নিয়ে যাওয়ার ভয় ঢুকছে ওর মনে) তাই একটু জোর দিয়ে বলা।
ছেলেটার মাতা-পিতা আছে কিনা সে জানে না। এমন ছেলের অভাব নেই বাংলাদেশে। ফুটপাথে অনেকের দেখা মেলে এরকম।
: নাস্তা করেছো?
: না। (চেহারায় ক্লান্তির ছাপ নিয়ে।)
ইমন রাকিবকে বলল। চল বাসায় যাই তাকে সাথে নিয়ে। আমরাও তো কিছু খাইনি। বাসায় গেল। ইমনের কিছু জামা ছিলো ওগুলো পরিধান করালো বাদলকে।
আম্মুকে বলল মেহমান এসেছে। মেহমান দেখে তো আম্মু অবাক। কখনো দেখেনি মেহমানকে। ইমন মাকে বলল সব। তাদের জন্য বিরানি রান্না করলো। বাদলের চেহারায় আনন্দের ছাপ। খশবু। তাও আবার হলুদ ভাতের। এই ভাতের জন্য কতটা রাস্তা পার করে সে। কত ক্লান্তি। দু’মুঠো ভাতের আশায়। আজ তা হাতের নাগালে। খাবার এসেছে। ডাগর ডাগর চোখ দুটো খুশিতে নাচানাচি করছে। ইমন রাকিব বাদলের অবস্থা দেখছে। ইমন বলল, খাওয়া শুরু করি তাহলে। রাকিব বলল, শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়ে নাও। বাদল বিসমিল্লাহ শব্দ শুনে অবাক হলো। বাদল বিসমিল্লাহ জানে না। সে তো রাস্তার পাশে মাথা গুঁজে থাকে। জানবে বা কেমনে? হয়তো সে রাসূলের হাদিসটাও শুনেনি। যে আল্লাহ এবং শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।
যে হাদিসের আমল ইমন করছে। কাজটা ইমনের জন্য নতুন নয়। ইমনও দেখতে চায় অন্য কারো মুখে তার মতো হাসি। বাদল স্বাচ্ছন্দ্যে মায়াবী হাসি দিয়ে মনের আনন্দে খেয়ে যাচ্ছে। তার হয়তো খুব ভালো লাগছে। হৃদয় থেকে দোয়া আসছে। পর্দার আড়াল হতে ইমনের মা এসব দেখছে। তার চোখে খুশির কান্না। মুখে হাসি। দোয়া করলেন ইমন রাকিবের জন্য।

SHARE

Leave a Reply