Home গল্প ছুটির দিনে । তৌহিদুর রহমান

ছুটির দিনে । তৌহিদুর রহমান

ছুটির দিনে । তৌহিদুর রহমানরবিবারে স্কুল ছুটি। মানে সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সবাই হয়তো মনে মনে ভাবছো, দূর রবিবারে আবার স্কুল ছুটি থাকে নাকি, স্কুল তো ছুটি থাকে শুক্রবারে। সবার কথাই ঠিক। স্কুল তো ছুটি থাকে শুক্রবারে। তাহলে শোন, গল্পটা হচ্ছে আমাদের দাদাদের আমলের। তখন স্কুল রবিবারে ছুটি থাকতো। তখন হিন্দু-মুসলমান সবাই একসাথে থাকতো। একসাথে খেলতো। মানুষে মানুষে খুব মিল ছিল। কোনো বিভেদ ছিল না। মানুষ ছিল মানুষের জন্য। এটা সেই সময়কার গল্প।
সেদিন ছিল রবিবার। আর রবিবারে তো সবার স্কুল বন্ধ। সকাল বেলায় গাজিপাড়ার ছেলেদের সরদার ইউনুসের নেতৃত্বে একদল ছেলে টিয়ে পাখির বাচ্চার সন্ধানে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো। এ মাঠ সে মাঠ ঘুরে শেষে একটা বনে গিয়ে তারা পৌঁছল। সেই বনে ছিল অনেক বড় বড় গাছ। গাছে ছিল অনেক টিয়ে পাখির বাসা।
কিন্তু অতো বড় বড় গাছে ওঠা সহজ ছিল না। ইউনুস ছাড়া বাকিরা বেশ ছোট। গাছে চড়তে পারতো শুধুমাত্র ইউনুস। অতএব ইউনুসকে সবাই তোয়াজ-তোশামোদ করতো। জিয়াদ প্রথমেই ইউনুসকে পাঁচ পয়সা দিল। পাঁচ পয়সায় তখন অনেক কিছু কেনা যেতো। কামাল আগেই তাকে দু’পয়সার চিনাবাদাম কিনে দিয়েছিল। প্রশান্ত ও মান্নান ওয়াদা করেছিল যদি তাদেরকে টিয়ে পাখির বাচ্চা দেয়া হয় তবে আগামীকাল তারা তাদের বাড়ি থেকে ইউনুসের জন্য খেজুরের পাটালি গুড় এনে দেবে। এর বদলে ইউনুস তাদেরকে একটা করে টিয়ে পাখির বাচ্চা দেবে বলেছে। নাসিরের কাছে সে কোনো মূল্য চায়নি। তবুও নাসির তাকে কবুতরের একটি বাচ্চা দেয়ার লোভ দেখিয়েছে এবং এই কবুতরের বাচ্চার বিনিময়ে ইউনুসের পরেই সবচেয়ে সুন্দর টিয়ে পাখির বাচ্চাটা নাসিরকেই দেবে বলেছে। ইউনুসের নিজের পাড়ার ছেলে ছিল দু’জন। তাদের সাথে সব শর্ত সে আগেই পাকা করে নিয়েছিল। টিয়ে পাখির বাচ্চা কম-বেশি যাই পাওয়া যাক তা নিয়ে যেন আবার নিজেদের মধ্যে ঝামেলা না হয়।
পথে নাসির ইউনুসকে জিজ্ঞেস করলো, বাচ্চার সংখ্যা যদি কম হয় তাহলে?
না, এমন হবে না। ঐ বাগানের গাছে গাছে অনেক টিয়ে পাখির বাসা আছে। কেবল গাছে ওঠাই হলো একটা শক্ত কাজ। যদি কষ্ট-শিষ্ট করে একবার গাছে উঠতে পারি তবে টিয়ে পাখির বাচ্চার আর অভাব হবে না। ভাগ্যে থাকলে দু’একটা ধাড়িও ধরে ফেলতে পারি।
প্রশান্ত বলল, ওই গাছে ওঠা শুধু কঠিন নয়, মহাকঠিন একটা কাজ।
নাসির বলল, ইউনুস তুমি কিন্তু বলেছিলে কথা বলতে পারবে এমন টিয়ে পাখির বাচ্চাটি তুমি আমাকে দেবে।
হ্যাঁ, যদি দুটো পাওয়া যায়, তাহলেই একটা তোমাকে দেবো।
জিয়াদ বললো, তাহলে আমাকে দেবে না?
বাচ্চা যদি আরো বেশি পাওয়া যায় তাহলে তোমাকেও দেবো।
জিয়াদ বললো, ইউনুস! গাছে উঠে সমস্ত বাসা ভালো করে দেখবে কিন্তু। বাসার মধ্যে হাত দিয়ে দেখবে।
দেখবো, কিন্তু যে টিয়ে পাখির গলায় লাল ডোরা কাটা থাকে তা বেশি একটা জন্ম হয় না।
কামাল বলল, বাসার মধ্যে হাত দেয়া কিন্তু খুবই বিপজ্জনক! কারণ শুনেছি টিয়ে পাখির বাসার মধ্যে সাপ থাকে। টিয়ে পাখির বাচ্চা খাওয়ার জন্য সাপ গাছে ওঠে। তারপর বাচ্চা বা ডিম যা পায় তাই খেয়ে বাসার মধ্যে চুপ করে বসে থাকে ধাড়ি এলে তা ধরার জন্য।
মান্নান বলল, তা ঠিক, তবে অতো বড় গাছে সাপ উঠতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।
প্রশান্ত বলল, দেখো ইউনুস! আমার কিন্তু একটা গলায় লাল ডোরা কাটা টিয়ের বাচ্চা চাই। এর বদলে আমি তোমাকে কালকে আরো দু’আনা দেবো এবং সাথে একটা বায়লাও উপহার দেবো।
নাসিরের উপস্থিতিতে জিয়াদ অন্য কাউকে খোশামোদ করবে এবং তোয়াজও করবে এটা তার কাছে মোটেই ভালো লাগছিল না। সে বললো, জিয়াদ! সে যদি তোমাকে গলায় লাল ডোরা কাটা টিয়ে পাখিটা না দেয় তাহলে আমি নিজে গাছে উঠে তোমাকে তা এনে দেবো।
ইউনুস বললো, আমি চ্যালেঞ্জ করছি, তুমি ঐ গাছে উঠতেই পারবে না। তার গোড়া অনেক অনেক মোটা। যা ধরে গাছে ওঠা তোমার কম্ম নয়। কেবলমাত্র একটা ডাল আছে, লাফ দিয়ে ধরে যার গা বেয়ে ওপরে ওঠা যায়। কিন্তু তোমাদের কারোর হাত সেখান পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবে না। সেই ডালে ওঠার জন্য আমারও তোমাদের সহযোগিতার দরকার হবে। দু’জনের ঘাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে তবেই আমি ডালটা ধরতে পারবো।
নাসির জিয়াদকে বললো, জিয়াদ! যদি তুমি লাল ডোরা কাটা টিয়ে পাখির বাচ্চা একটাও না পাও তাহলে আমি তোমাকে আমারটা দিয়ে দেবো। আমি না হয় সাধারণ একটা টিয়ে পাখির বাচ্চাই নেবো।
বনের মধ্যে চটকা গাছের নিচেই গিয়ে সবাই যার যার ব্যাগ মাটির ওপর রেখে দিল। নাসির ও কামাল ইউনুসকে সহায়তা করার জন্য পরস্পরের ঘাড়ে হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলো। অন্য একজন তাদের পাশে মাটিতে দু’হাত লাগিয়ে ঘোড়া হয়ে বসে পড়লো। ইউনুস তার পিঠে একটা পা রেখে অন্য পা কামালের কাঁধের ওপর রাখলো। তারপর আর একটা পা সে নাসিরের কাঁধের ওপর রেখে দিল। ইউনুসের ওজনের ভারে কামালের কোমর একদম বেঁকে যাচ্ছিল। কিন্তু নাসির তার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিল। তাই কোনো মতে সে রক্ষা পেল। না হলে কামালের কোমরটা হয়তো ভেঙেই যেতো।
কামাল ইউনুসের ভর একদম সহ্য করতে পারছিল না। সে বলছিল, ইউনুস, তুমি জলদি করে ডাল ধরো। আমি আর পারছিনে ভাই। আমি মরে যাচ্ছিরে বাবা! বড্ড চাপ পড়ছে। ওরে মারে কোমরটা বুঝি ভেঙেই গেল। আমি সরে গেলে তোমার বিপদ হতে পারে ইউনুস। সাবধান!
নাসির ও কামালের মাথায় হাত রেখে ইউনুস দাঁড়াবার চেষ্টা করলো। সবেমাত্র সে গাছের ডালে হাত লাগাতে যাচ্ছিল এমন সময় কামালের পা পিছলে গেলো। কামাল নিজের জায়গা থেকে ছিটকে পড়ে গেলো। আর যায় কোথায়Ñ ইউনুস পড়ে গেল ধপাস করে।
‘ওরে বাবারে, মরে গেছিরে! কামালের বাচ্চা, কামাল! তুই….’ ইউনুস নিজের কথা শেষ করার আগেই চিৎপটাং হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। কিন্তু পড়ে গিয়েই সে উঠে বসলো। অন্যরা অনেক কষ্টে নিজেদের হাসি চেপে রেখেছিল। ইউনুসের পরনের লুঙ্গি খুলে গিয়েছিল। এবার সেটাকে সে কষে পরে মালকোচা দিয়ে গিঁট বাঁধলো এবং দৌড়ে গিয়ে দু’হাতে কামালের কান ধরে টেনে মারলো একটা চড়।
নাসির দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে কামালকে ইউনুসের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বললো, ইউনুস! এটা তোমার ভুল। তোমার ডাল ধরতে এত দেরি করা ঠিক হয়নি। যাকগে, এখন আমরা আবার তোমাকে কাঁধে তুলে নিচ্ছি এবং তুমি বেশি ভর আমার ওপর দেবে। কামালের ওপর কম ভর দেবে।
ইউনুস দ্বিতীয় বার সাহস করে এগিয়ে এলো। তবুও সে বললো, কামালের বাচ্চা, কামাল! এবার যদি তুমি আমাকে ফেলে দাও, তাহলে তোমাকে টিয়ে পাখির বাচ্চা তো দেবোই না এবং তোমাকে বিলের পানির মধ্যে নিয়ে চুবাবো, কথাটা মনে থাকে যেন।
এবার অবশ্য কামাল আগের বারের তুলনায় কোমরটা বেশ শক্ত করে দাঁড়ালো। এবার কোনো প্রকার বিড়ম্বনা ছাড়াই ইউনুস গাছের ডাল ধরে ফেললো এবং তড়াক করে গাছে উঠে পড়লো।
গাছের মাঝখানের ডালটি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি মোটা ছিল। কিন্তু ইউনুসের ধারণা অনুযায়ী ঐ ডালের মাঝখানে অনেকগুলো টিয়ে পাখির বাসা ছিল। এর শাখা ডালগুলো চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এলোমেলোভাবে ছিল। ইউনুস ঐ ডালগুলোকে মই হিসাবে ব্যবহার করে মূল ডালের চারপাশে ঘুরপাক মেরে ওপরের দিকে উঠতে লাগলো।
মানুষের সাড়া-শব্দ পেয়ে একটা বাসা থেকে দুটো টিয়ে পাখি উড়ে চলে গেলো। ইউনুস খুশি হয়ে ভিতরে হাত ঢুকিয়ে দিল। কিছুক্ষণ তালাশ করার পর বললো এর ভেতর কিছুই নেই। মনে হয় বাচ্চা বড় হয়ে উড়ে গেছে। আরো ওপরে উঠতে হবে দেখছি।
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেরা হতাশ হলো। জিয়াদ বললো, ইউনুস! ওপরে অনেকগুলো গর্ত আছে। ওগুলিতে নিশ্চয়ই গলায় লাল ডোরা কাটা টিয়ে পাখির বাচ্চা থাকবে। ভালো করে দেখো। গর্তে হাত দিয়ে দেখ। চেষ্টা করো।
পাশ থেকে নাসির জবাব দিল, জিয়াদ, তুমি চিন্তা করো না। টিয়ে পাখির বাচ্চা পাওয়া যাবেই যাবে। আর তা কম করে হলেও দশটা বারোটা তো হবেই।
হঠাৎ ইউনুছের পাশের একটা গর্ত থেকে দুটো টিয়ে পাখি উড়ে গেলো এবং এটা দেখে ইউনুস গর্তের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠলো, ইউরেকা! হুররে! পেয়েছি, পেয়েছি! এই একটা, এই দুটো, এই তিনটে বাচ্চা পেয়েছি। ইউনুছ একের পর এক তিনটে বাচ্চা বের করে গাছের বড় ডালের ওপর রেখে দিল। তারপর বাচ্চাগুলোকে গভীরভাবে দেখে নিয়ে বললো, এদের মধ্যে কারোর গলায়ই ডোরা কাটা নেই। তা ছাড়া এই বাচ্চাগুলো এখনো অনেক ছোট। এদের পাখা এখনো ভালোভাবে গজায়নি। এখনো ডানা ঝাপটাতেও শেখেনি।
কয়েকজন ছেলে এগুলো নিয়েই ক্ষান্ত হতে চাচ্ছিল। কিন্তু জিয়াদ নিচে থেকে বললো, দেখো ইউনুস! ওই বাচ্চাগুলোকে ওখানেই রেখে দাও। আসলেই ওরা এখনো অনেক ছোট। এখন নিয়ে গেলে আমরা ওদের বাঁচাতে পারবো না।
জিয়াদের কথার পরে ইউনুস তিনটি বাচ্চাকে আবার বাসার মধ্যে রেখে দিল এবং বললো, আমি আরো ওপরের দিকে উঠে দেখছি। ওপরে অনেক বাসা আছে।
একটু ওপরে উঠে আরো একটা খোঁড়ল থেকে ইউনুস আরো দুটো টিয়ে পাখির বাচ্চা পেলো। কিন্তু দেখলো এদের কারোরই গলায় ডোরাকাটা হার নেই। তবুও এই বাচ্চাগুলো বেশ বড় ছিল। অনেকটা উড়োখোল হওয়ার পর্যায়ে। গাছের নিচে সবাই চৌকোনা করে চাদর মেলে ধরে দাঁড়িয়েছিল। নিচ থেকে সবাই চিৎকার করছিল, ইউনুছ, ওদেরকে এই চাদরের ওপরে ফেল।
ইউনুস কারো কথায় কোনো কান দিল না। সে বললো, এগুলোকে আমি আমার ঝোলার মধ্যে রেখে দিচ্ছি। এতো ওপর থেকে ফেললে মরে যেতে পারে। আমি ফেরার সময় এদেরকে নিয়ে যাবো। ওপরে আরো বাসা আছে। আমি আরো ওপরে উঠছি। ওগুলো দেখবো। তারপর পাশের ডালটাও দেখবো।
অনেক ওপরে গাছের চিকন একটা ডালে পৌঁছে ইউনুস আরো একটা টিয়ে পাখির বাসা দেখতে পেলো। সে ওপর থেকে চিৎকার করলো, নাসির! ওপরে ভালো করে তাকিয়ে দেখো, আমি যে ডালটায় বসে আছি এর মাথায় কোনো একটা বড় পাখির বাসা আছে বলে মনে হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছিনে ওটা কিসের বাসা!
নাসির কিছুক্ষণ মনোযোগ সহকারে দেখার পর বললো, আরে ভাই! ওটা তো অনেক বড় একটা বাসা দেখছি। আমার কাছে মনে হচ্ছে ওটা হেড়েবাজের বাসা!
নিচ থেকে কামাল বললো, ইউনুস! আমার দাদী বলতেন, হেড়েবাজের বাসায় সোনা পাওয়া যায়।
পাশ থেকে নাসির বললো, আরে বাজে কথা, বাজ পাখি সোনা পাবে কোথায়? ওসব ফালতু কথা।
আমি সত্যিই বলছি নাসির! দাদী বলতেন, হেড়েবাজের বাসায় সোনা থাকে মানে সোনার হার থাকে।
নাসির বললো, যদি না থাকে তাহলে? তাহলে কিন্তু তোকে…। কথা শেষ করতে পারলো না নাসির।
কামালের কাছে এই কথার কোনো উত্তর ছিল না।
এবার জিয়াদ বললো, হ্যাঁ নাসির! কামাল ঠিকই বলেছে। বাজ পাখির বাসায় মাঝে মাঝে সোনা পাওয়া যায়। তুমি কি এই গল্প শোননি, ওই তো নীলকান্ত জমিদারের মেয়ে ছাদের ওপর গলার হার খুলে রেখে গোসল করছিল এবং বাসা বানানোর জন্য একটি বাজ পাখি তা ছোঁ মেরে নিয়ে চলে গিয়েছিল? এরপর একজন লোক বনে কাঠ কাটতে গিয়ে হেড়েবাজের বাসা থেকে ওই সোনার হারটা পেয়েছিল। এ কথা জানাজানি হলে লোকটা হারটা নিয়ে জমিদারের কাছে গেলে জমিদার তাকে অনেক টাকা বখশিশ দিয়েছিলেন। তারপর তো লোকটা ধনী হয়ে গিয়েছিল। এ গল্প তো এই গ্রামের সবাই জানে।
এবার কামাল বললো, দেখলে তো আমি সঠিক বলেছি। আসলেই বাজপাখির বাসায় সোনার হার, সোনার চুড়ি এসব পাওয়া যায়। ভাগ্যে থাকলে আমরাও পেতে পারি।
নিচ থেকে জোরে চেঁচিয়ে নাসির ইউনুসকে বললো, দেখো ইউনুস! একবার ভাগ্য পরীক্ষা করে দেখো। হার বা চুড়ি পেয়েও যেতে পারো ইউনুস।
ইউনুস জিয়াদের বলা গল্পটা আগেই শুনেছিল। তার আর কোনো পরামর্শের প্রয়োজন ছিল না। ইউনুস তাড়াতাড়ি গাছের ওপরের দিকে উঠছিল। তার কাছে এখন গলায় লাল ডোরা কাটা টিয়ে পাখির চেয়ে সোনার হারের গুরুত্ব বেশি হয়ে উঠেছিল। সে ভাবছিল, যদি সোনা পাওয়া যায় তাহলে খুব বাহাদুরির একটা কাজ হবে। এখন সোনার হার পাওয়ার জন্য ইউনুস সব ধরনের বিপদের ঝুঁকি নিতে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। অনেক কষ্ট করে সে বাজপাখির বাসার কাছে গিয়েছিল। সে খুব সাবধানে বাজপাখির বাসায় হাত দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগে সে একেবারে বাসার কাছে গিয়ে হাত উঁচু করলো। আর যায় কোথায় অমনি বাসার ভেতরে ঘড়ঘড় একটা আওয়াজ হলো এবং মুহূর্তেই একটি বাজপাখি ইউনুসের মাথায় ঠোকর মেরে উড়ে পাশের ডালে গিয়ে বসলো। ইউনুসের মাথাটা বেশ জ্বালা করে উঠলো। সে কেবলমাত্র তার মাথায় হাত দিতে যাচ্ছিল এমন সময় হেড়েবাজটা আরেকবার শূন্যে উঠে গিয়ে আকাশে দু’একবার চক্কর মেরে উড়ে এসে এবার ইউনুসের মাথায় পাখিটার পাঁচ আঙুলের নখ বসিয়ে দিল। ইউনুস খুব জোরে জোরে হায়-হৈ করে পাখিটাকে হাত দিয়ে তাড়িয়ে দিতে চেষ্টা করতে লাগলো এবং দ্রুত নিচে নামতে লাগলো। কিন্তু পাখিটা উড়ে এসে তাকে বারবার ঠোকর দিয়ে চলে যাচ্ছিল। পড়িমরি করে ইউনুস গাছের আগার চিকন বিপজ্জনক ডাল থেকে নেমে নিচের দিকে কিছুটা মোটা ডালে এসে পা রেখেছিল। কিন্তু এতক্ষণে মেয়ে পাখিটির ডাকাডাকি শুনে পুরুষ পাখিটিও কোথা থেকে ছুটে এলো। এখন দু’টি পাখি একযোগে বার বার ইউনুসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগলো। তাদের ধারালো ঠোঁট ও পায়ের নখের আঘাতে ইউনুসের সদ্য নেড়া করা চকচকে মাথা ক্ষত-বিক্ষত হতে লাগল। এই কাণ্ড দেখে নিচে ইউনুসের সাথের ছেলেরা হেসে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছিল। ইউনুস গাছের একটা ডাল ভেঙে হাতে নিয়ে যতদূর সম্ভব পাখিদের তাড়াতে চেষ্টা করছিল। আর নিচের সবার হাসি দেখে সে রাগে ফেটে পড়ছিল। সে গাছে বসে চিৎকার করে বলছিল, ওই কামালের বাচ্চা, কামাল! তোর দাদী বাজপাখির বাসায় সোনা রেখে গিয়েছিল, তাই না? দাঁড়াও আগে নিচে নামি তারপর… সে তার কথা শেষ করতে পারলো না, আবার দুটো বাজপাখি একসাথে উড়ে এসে তার মাথায় ঠোকর মারলো। গাছের ডালে বসে মারে বাবারে বলে চিল্লাছিল ইউনুস।
নাসির ওপরের দিকে তাকিয়ে বারবার চিল্লাচ্ছিল, ইউনুস! হেড়েবাজ, হেড়েবাজ, হেড়েবাজ! এলো, এলো, এলোরে, তোর মাথায় ঠোকর মারলোরে। নিচে কেউ হাসছিল, কেউ চিৎকার করছিল আবার কেউ ঝোপের আড়ালে গিয়ে চুপ করে বসেছিল।
আর গাছের ওপরে ইউনুস এক হাত দিয়ে ডাল ধরে নিচের দিকে নামছিল আর অন্য হাতে পাতাসহ ভাঙা ডাল ধরে রেখে তা দিয়ে পাখির নখ থেকে নিজের মাথা ও চোখ বাঁচানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। পাতাসহ গাছের ভাঙা ডাল সে ঢাল বানিয়ে নিয়েছিল। বাজপাখি যখন তার থেকে কিছুটা দূরে চলে যাচ্ছিল তখন সে দ্রুত কয়েক ধাপ নিচে নেমে আসছিল।
বাজপাখির গতিবিধি দেখে নিচে থেকে নাসির আবার চিল্লাচ্ছিল, ইউনুস সাবধান! বাজপাখি নামছে, আবার তোর মাথায় ঠোকর মারলোরে। সাবধান!
ইউনুস আল্লাহর দোহাই দিতে দিতে, চিৎকার করতে করতে বাজপাখির আঁচড়ে-ঠোকরে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়িমরি করে গাছের নিচের একটা ডালে এসে ঝুলে পড়ে মাটির ওপর দিল একটা লাফ। তার মাথা থেকে তখন রক্ত ঝরছিল। এটা দেখে সবার হাসি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ইউনুস কিছুক্ষণ নীরব হয়ে মাটিতে শুয়ে থাকলো। একটু পরে উঠে বসে সবাইকে দেখতে লাগলো। মনে মনে সে কামালকে খুঁজছিল।
প্রশান্ত কালকেসন্দি গাছের পাতা হাতে ডলে তার রস ইউনুসের মাথার ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিচ্ছিল।
এদিক ওদিক তাকিয়ে ইউনুস বললো, কামালের বাচ্চা, কামাল। তুইও হাসছিলি?
কামালের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ইউনুস চারপাশে তাকিয়ে একবার দেখে নিল। কামাল আগেই বিপদের আঁচ করতে পেরেছিল। তাই কামাল চুপিসারে সেখানে থেকে কেটে পড়েছিল।
প্রশান্ত রাস্তার দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে দেখিয়ে বললো, আরে ওই তো কামাল গ্রামের দিকে চলে যাচ্ছে। সবাই উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো, ওই তো ওই দিকে।
ইউনুস উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো, কোথায়? কোন দিকে?
সবাই সমস্বরে চিৎকার করতে লাগলো, ওই যে ওই দিকে। তাকিয়ে দেখো! ধরো ওকে।
ইউনুস চিৎকার করলো, দাঁড়া, ওই কামালের বাচ্চা, দাঁড়া।
কিন্তু কামাল পড়ি কি মরি প্রচণ্ড বেগে দৌড়াচ্ছিল। এমনিতেই ইউনুসের একটা চড় খেয়ে তার কানটা তখনো গরম হয়েছিল। পেছনে সকলের ধর ধর, কামালকে ধর! চিৎকার শুনে কামালের বুক ধড়ফড়ানি খুব বেড়ে গিয়েছিল। ফলে দৌড়ানোর গতি আরো অনেক গুণ সে বাড়িয়ে দিয়েছিল। তার দৌড়ানোর গতি দেখে বোঝা যাচ্ছিল নিজের বাড়িতে পৌঁছানোর আগে আর সে পেছন ফিরে তাকাবে না।
সবাই হৈ হৈ, রৈ রৈ! কামালের বাচ্চা গেল কই? বলতে বলতে গ্রামের দিকে দিল দৌড়।

SHARE

Leave a Reply