Home গল্প সুরের মূর্ছনা । রফিক মুহাম্মদ

সুরের মূর্ছনা । রফিক মুহাম্মদ

সুরের মূর্ছনা । রফিক মুহাম্মদএমন মিষ্টি সুর, এমন মধুর সুর কিসের? কোথা থেকে এ সুর ভেসে আসছে? এর আগেতো কোন দিন কোথাও এমন সুর সে শুনেনি। রিজোয়ান লেপের নিচ থেকে মুখটা বের করে কান খাড়া করে সুরের উৎস বুঝার চেষ্টা করে। হ্যাঁ..হ্যাঁ…এইতো..এইতো.. মনে হচ্ছে পাশের ঘর থেকে এই মিষ্টি সুর ভেসে আসছে। রিজোয়ান এই সুরে বিভোর হয়ে যায়। বেশ কিছু সময় সে তন্ময় হয়ে তা উপভোগ করে। কি এক মায়াময় মধু মাখা এই সুর। এই সুরের মূর্ছনা হৃদয়-মনে শান্তির পরশ ছড়িয়ে দেয়। এক অন্যরকম ভালোলাগা, অন্যরকম প্রশান্তিতে মন-প্রাণ ভরে যায়। এই শীতের ভোরে এমন মায়াময় সুর রিজোয়ানকে মুগ্ধ করে। রিজোয়ান এবার বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে সুরের টানে সে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে।
রিজোয়ান বাবা মায়ের সাথে তাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। এর আগে ওর বয়স যখন মাত্র এক বছর ছিল তখন গ্রামে এসেছিল। সেটা সে তার বাবা মায়ের কাছে শুনেছে। এর পর ঢাকায় কেটেছে দুই বছর। এর মধ্যে আর গ্রামে দাদার বাড়িতে যাওয়া হয়নি। পাঁচ বছর বয়সের সময় বাবা-মায়ের সাথে চলে যায় আমেরিকা। রিজোয়ানের বাবা রায়হানুল ইসলাম একজন ইঞ্জিনিয়ার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দুই বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পর স্কলারশিপ নিয়ে সপরিবারে আমেরিকা চলে যান। সেখানে পাঁচ বছর থেকে গত জানুয়ারিতে দেশে ফিরেছেন। দেশে এসে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করেছেন। আমেরিকা থেকে আসার পর থেকে গ্রামে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে রিজোয়ান। প্রতিদিনই মোবাইল ফোনে দাদাকে বলে আমরা বাড়ি আসছি দাদা ভাইয়া। ফোনে দাদুকে পিঠা বানিয়ে রাখতে বলে। রিজোয়ানরা বাড়ি আসবে এ অপেক্ষাতেতো ওর দাদা-দাদিও পথ চেয়ে বসে আছেন। আমেরিকা থেকে আসার পর রিজোয়ানের দাদা রাশেদ মাস্টার ঢাকায় গিয়েছিলেন। সঙ্গে রিজোয়ানের দাদিও ছিলেন। তবে দু’দিনের বেশি থাকতে পারেননি। রায়হান ঢাকায় রিজোয়ানের বড় খালার বাসায় উঠেছে। আগামী মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোয়ার্টার পাবে। তাই এ মাসের বাকি ক’টা দিন রিজোয়ানের খালার বাসায়ই ওরা থাকবে। ছেলে পাঁচ বছর পর বিদেশ থেকে দেশে এসেছে তাই তাকে দেখার জন্য রায়হানের বাবা-মা গ্রাম থেকে ছুটে এসেছেন। তবে শত ইচ্ছা থাকার পরও দু’দিনের বেশি থাকতে পারেননি। ঢাকা শহরে আত্মীয়ের বাসায় এত জন থাকাটা যে সবার জন্য কষ্টের এটা রাশেদ মাস্টার ঠিকই বুঝতে পারেন। তাইতো দু’দিন থেকেই চলে গেছেন। রায়হান বলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে উঠেই সবাইকে নিয়ে বাড়ি যাবে। রিজোয়ানতো দাদা-দাদিকে কিছুতেই যেতে দেবে না। রাশেদ মাস্টার তাকে অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে রেখে এসেছেন। রাশেদুল ইসলাম প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। এলাকায় রাশেদ মাস্টার হিসাবে তিনি পরিচিত। এতদিন বিদেশ থাকলেও দাদা-দাদুর সাথে রিজোয়ানের প্রাণের সম্পর্ক। সুদূর আমেরিকা থেকেও প্রতিদিন একবার স্কাইপিতে দাদা-দাদুর সাথে কথা বলেছে রিজোয়ান। এ জন্য দূরে থেকেও দাদা-দাদুর জন্য রিজোয়ান অনেকটাই পাগল। ঢাকায় আসার পর থেকেই গ্রামে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে রিজোয়ান। প্রায় প্রতিদিনই রায়হানকে বলে, বাবা কবে দাদার বাড়ি যাবো? ছেলের পীড়াপীড়িতে রায়হান কোন রকমে কোয়ার্টারে উঠে পরদিনই গ্রামের বাড়ি চলে যায়।
গ্রামে এসে রিজোয়ানতো আনন্দে আত্মহারা। বাড়ির সামনে বিশাল পুকুর। পুকুরের পর বিশাল খোলা মাঠ। সে মাঠে সবুজ ধানক্ষেত। এখন ফেব্রুয়ারি মাস। পুকুরের পূর্ব পাড়ের শিমুল গাছে টকটকে লাল ফুল ফোটে আছে। রিজোয়ানতো এসেই দাদার হাত ধরে পুকুরপাড়ে চলে গেছে। শিমুল গাছে টকটকে লাল ফুল দেখে সে তো আনন্দে চিৎকার দিয়ে বলে উঠে, ওয়াও! কী সুন্দর লাল ফুল। দাদা ভাইয়া এটা কী ফুল? রাশেদ মাস্টার মুচকি হেসে রিজোয়ানের দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, আচ্ছা দাদু ভাই তুমি কী কী ফুলের নাম জান? রিজোয়ান ঝটপট উত্তর দেয়, অনেক ফুলের নাম জানি। এই যেমন গোলাপ, বেলি, জুঁই, রজনীগন্ধ্যা, শাপলা এসব।
: এর মধ্যে কোন কোন ফুল তুমি দেখেছো?
: গোলাপ আর রজনীগন্ধ্যা ফুল দেখেছি। এ ছাড়া বইয়ে আমাদের জাতীয় ফুল শাপলার ছবি দেখেছি। শাপলা ফুলতো পানিতে ফোটে তাই না?
: হ্যাঁ, শাপলা ফুল বর্ষাকালে খালে, বিলে, পুকুরে ফোটে। দাদু ভাই তুমি কি পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া এসব ফুলের নাম জান না? এসব লাল ফুলের কথা শোননি কোনদিন?
: হ্যাঁ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া এসব ফুলে নাম বইয়ে পড়েছি, কিন্তু মনে নেই।
: ও আচ্ছা, শোন দাদু ভাই এটা হলো শিমুল ফুল।
: ওয়াও! কী বিউটিফুল, তাই না?
: হ্যাঁ দাদু ভাই এ ফুলটা দেখতে সুন্দর ঠিকই তবে এ ফুলের কোনো ঘ্রাণ নেই।
: বল কি? অনেকটা অবাক হয় রিজোয়ান। দাদাকে আবার প্রশ্ন করে, এত সুন্দর ফুলের গন্ধ নেই কেন?
: সেটা কি করে বলবো দাদু ভাই। এটাতো আল্লাতালার সৃষ্টির অপার রহস্য।
রিজোয়ান অবাক হয়ে শিমুল গাছের দিকে তাকায়। গাছের প্রতিটি ডালে থোকা থোকা লাল ফুল ফুটে আছে। গাছে অনেক পাখি কিচির মিচির করছে। এ ফুল থেকে ও ফুলে উড়ে যাচ্ছে। রিজোয়ান মুগ্ধ হয়ে পাখিদের ওড়াউড়ি দেখে। কিছুক্ষণ দেখার পর বলে, দাদাভাই তুমি একটু দাঁড়াও আমি আব্বুর মোবাইলটা নিয়ে আসি। এমন সুন্দর দৃশ্যের অবশ্যই ছবি তুলতে হবে। রিজোয়ান পুকুরপাড় থেকে দৌড়ে বাড়ি গিয়ে বাবার মোবাইল ফোন নিয়ে আসে। এরপর শিমুল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে, ভিডিও করে।
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়। শীতকাল শেষ হয়ে বসন্ত ঋতু শুরু হলেও গ্রামে এখনো বেশ শীত। মাঘের শীতের রেশ এখনো রয়েছে। বিকাল হলেই চারদিক কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে রিজোয়ান সামনের খোলা মাঠের দিকে তাকায়। দৃষ্টিসীমায় শুধু সবুজ আর সবুজ। রিজোয়ান মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মাঠের প্রান্তে ধোঁয়ার মতো কুয়াশা ঝরে পড়ার দৃশ্য কী মনোমুগ্ধকর। রিজোয়ান মনের আনন্দে মোবাইলে এসব দৃশ্যধারণ করে।
নাতির এমন আনন্দ দেখে রাশেদ মাস্টারের হৃদয় আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। বাম হাতে রিজোয়ানের হাত ধরে বলেন, চলো দাদুভাই আমরা ওই মাঠে যাই। সবুজ ধানক্ষেতের আল ধরে হাঁটলে আরো ভালো লাগবে। দাদার কথায় রিজোয়ান আনন্দে লাফিয়ে ওঠে। চল দাদাভাইয়া, চল।
রাতে খাওয়া-ধাওয়া শেষে রিজোয়ান বলে সে দাদাভাইয়ার সাথে ঘুমাবে। দাদাভাইয়া অনেক গল্প জানে। রাতে শুয়ে শুয়ে সে দুঃখী রাজকন্যার গল্প শুনবে। তাইতো বাবা-মায়ের বারণ করার পরও দাদার সাথেই ঘুমাতে গেল। বিছানায় শুয়েই রিজোয়ান বায়না ধরে, দাদাভাইয়া দুঃখী রাজকন্যার গল্পটা বলো।
রিজোয়ানের কথায় রাশেদ মাস্টারতো অবাক! একি বলছো দাদু ভাই, আমিতো কোন দুঃখী রাজকন্যার গল্প জানি না।
: না তুমি জানো। তোমাকে বলতেই হবে।
: ঠিক আছে, ঠিক আছে, বলছি। এক ছিল রাজা। তার ছিল দুই রানী। ছোট রানী ও বড় রানী। দুই রানীকে নিয়ে রাজার দিন খুব সুখেই কাটছিল। রাজ্যজুড়ে প্রজারাও ছিল খুব সুখে। কোথাও কোনো অভাব ছিল না। সারা রাজ্যে কারো কোন দুঃখ ছিল না। বুঝেছ? রিজোয়ানের কোন জবাব নেই। রাশেদ মাস্টর বুঝতে পারেন যে রিজোয়ান ঘুমিয়ে পড়েছে। মনে মনে একটু হেসে তিনি নিজেও পাশ ফিরে শুয়ে পড়েন।
খুব সকালে রিজোয়ানের ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভাঙতেই একটা মিষ্টি মধুর সুর ওর কানে ভেসে আসে। লেপের নিচে মুখ রেখে প্রথমে সুরটা শুনে। কী মিষ্টি সুর। রিজোয়ান যত শুনছে ততই মুগ্ধ হচ্ছে। কিন্তু এটা কিসের সুর? কোথা থেকে এ সুর ভেসে আসছে? সুরের মূর্ছনায় ওর হৃদয় মন জুড়িয়ে যাচ্ছে। রিজোয়ান লেপের নিচ থেকে মুখটা বের করে এবার গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনে। বুঝতে চেষ্টা করে কোথা থেকে এমন সুর ভেসে আসছে। হ্যাঁ…এবার কিছুটা অনুমান করতে পারে। মনে হচ্ছে পাশের ঘর থেকে এই মিষ্টি সুর ভেসে আসছে। রিজোয়ান এবার লেপের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে। খাট থেকে নেমে জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ঘরের বাইরে এসে তো রিজোয়ান অবাক হয়। একি চারদিক ঘন কুয়াশায় ছেয়ে আছে। ধোঁয়ার মত কুয়াশা উড়ছে। সামান্য দূরের জিনিসও কুয়াশার জন্য দেখা যাচ্ছে না। আমেরিকায় সে তুষারপাতের দৃশ্য দেখেছে। তবে এ দৃশ্য তার চেয়ে অন্যরকম, তার চেয়ে অনেক সুন্দর। ঘন কুয়াশার এই অপূর্ব সৌন্দর্যকে অতিক্রম করে মোহময় সুরের টানে রিজোয়ান এগিয়ে যায়। হ্যাঁ এইতো ওই ঘর থেকেইতো সুরটা ভেসে আসছে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো রিজোয়ান এগিয়ে যায়। ঘরের দরজা খোলা। হ্যাঁ.. এইতো …এইতো সেই সুরের উৎস। রিজোয়ান দেখে ওর মতো বয়সের একটি ছেলে সুর করে একটি বই পড়ছে। পাশেই ওর দাদা বসে আছেন। তিনিও দু’চোখ বন্ধ করে তন্ময় হয়ে এ সুর উপভোগ করছেন। দাদাকে দেখে রিজোয়ান সাহস করে ঘরের ভেতর ঢুকে। ছোট্ট ছেলেটি সুর করে পড়ছে..আর-রহমান। আল্লামাল কুরআন। খালাক্বাল ইনসানা আল্লামাহুল বাইয়ান….। সুরের মোহময় মূর্ছনা রিজোয়ানের হৃদয় মনকে জুড়িয়ে দেয়। রিজোয়ান এবার ওর দাদার পাশে বসে পড়ে। রাশেদ মাস্টার এবার চোখ খুলে তাকিয়ে পাশে রিজোয়ানকে দেখে বলেন, একি দাদু ভাই এত সকালে তোমার ঘুম ভেঙে গেছে?
: হ্যাঁ দাদাভাইয়া। এমন মিষ্টি সুর শুনে আর শুয়ে থাকতে পারলাম না। এটা কি বই এমন সুন্দর মিষ্টি সুর করে পড়ছে?
: রিজোয়ানের প্রশ্ন শুনে লজ্জায় রাশেদ মাস্টারের মাথা নিচু হয়ে যায়। মুসলমানের ছেলে অথচ কোরআন শরিফ চেনে না। ইংরেজি-বাংলা পড়ার জন্য কত প্রতিযোগিতা। এ জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ করছে, অথচ যে শিক্ষা মুসলমানদের জন্য আসল সে শিক্ষাই দেয়া হচ্ছে না। রাশেদ মাস্টার এবার রিজোয়ানকে কাছে টেনে নিয়ে বলেন, এটা হলো আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআন। তুমি কি এর আগে কখনো কোরআন শরিফের কথা শুননি?
: হ্যাঁ আব্বু-আম্মু বলেছেন। তবে ওখানেতো কোরআন শিক্ষার কোনো সুযোগ ছিল না।
: ওহ আচ্ছ। তুমি কি কোরআন শিখতে চাও?
: হ্যাঁ দাদাভাই। কী সুন্দর, কী মোহময় এই সুর। ওই যে পড়ছিল.. আর-রহমান, আল্লামাল কোরআন…।
: বাহ! একটু শুনেই তা মনে রেখেছো? এর অর্থ যদি জান, তাহলে আরও ভালো লাগবে। যেমন… আর-রহমান মানে হলো করুণাময় বা দয়াময় আল্লাহ। আল্লামাল কোরআন অর্থাৎ শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন।
: দাদাভাই আমিও কি ওর মতো সুন্দর সুর করে পড়তে পারবো?
: হ্যাঁ হ্যাঁ.. অবশ্যই পারবে। কাল থেকে তুমি এখানে কোরআন শরিফ শিখবে এবং সুন্দর করে তা পড়বে।
রিজোয়ানের হৃদয়-মন আনন্দে নেচে ওঠে। বাইরে তখন কুয়াশার চাদর ভেদ করে টকটকে লাল সূর্যটা উঁকি দিচ্ছে। পূর্বদিকের জানালা দিয়ে সূর্যের আলোক রশ্মি এ ঘরেও এসে প্রবেশ করছে।

SHARE

Leave a Reply