Home বিজ্ঞান ও বিশ্ব পৃথিবীর মঙ্গল গ্রহ নামিব মরুভূমি । আল জাবির

পৃথিবীর মঙ্গল গ্রহ নামিব মরুভূমি । আল জাবির

পৃথিবীর মঙ্গল গ্রহ নামিব মরুভূমি । আল জাবিরবিশ্বের প্রাচীনতম মরুভূমির লাল বালি আর কঙ্কাল আকৃতির গাছ যেন নামিবকে পরিণত করেছে পৃথিবীর মাঝেই এক টুকরো মঙ্গল গ্রহে। লালচে বালি, কঙ্কাল গাছ, অদ্ভুত ভূ-প্রকৃতি সব মিলে নামিবিয়ার নামিব মরুভূমি যেন পৃথিবীর বুকে মঙ্গল গ্রহের একটি ছবি। মঙ্গলগ্রহের সাথে কোন কোন এলাকার মাটি এবং ভূ-প্রকৃতির সাথে কিছুটা মিল থাকায় এরকম নাম।
নামিব দক্ষিণ আফ্রিকার একটি উপকূলবর্তী মরুভূমি। স্থানীয় নামা ভাষাতে নামিব মানে এমন একটি এলাকা যেখানে কিছুই নেই। নামিব অ্যাঙ্গোলা, নামিবিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার আটলান্টিক উপকূল বরাবর ২০০০ কিলোমিটার বা ১২০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। অ্যাঙ্গোলার কারুনজাম্বা নদী থেকে নামিবিয়া ও পশ্চিম কেপিতে ওলিফ্যান্টস নদী পর্যন্ত দক্ষিণে বিস্তৃত। নামিবের উত্তর-পশ্চিম অংশ, যা অ্যাঙ্গোলা-নামিবিয়া সীমান্ত থেকে ৪৫০ কিলোমিটার বা ২৮০ মাইল প্রসারিত। এটি ম্যাকাডিস ডেসার্ট নামে পরিচিত। এর দক্ষিণাংশের পার্শ্ববর্তী মরুভূমি হলো কালাহারি। আটলান্টিক উপকূলের পূর্বদিকে, নামিবের উচ্চতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়, যা গ্রেট এসকর্পমেন্টের পাদদেশ থেকে ২০০ কিলোমিটার বা ১২০ মাইল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
নামিব মরুভূমিতে প্রায় ২ মিলিমিটার বা ০.০৭৯ ইঞ্চি পর্যন্ত বার্ষিক বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। তবে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বৃষ্টি হয় ২০০ মিলিমিটার বা ৭.৯ ইঞ্চি। প্রায় ৫৫-৮০ মিলিয়ন বছর ধরে শুষ্ক নামিবকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন মরুভূমি বলা যেতে পারে।
মরুভূমিটি উপকূলের কাছে বালি সাগর নিয়ে গঠিত। এর নুড়িপাথর, মৃত্তিকা ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাহাড়ের তৃণ বা বৃক্ষ আচ্ছাদনগুলো নামিবকে এক স্বতন্ত্র রূপদান করেছে। বালিয়াড়িগুলি ৩০০ মিটার বা ৯৮০ ফুটের মতো উচ্চ এবং ৩২ কিলোমিটার বা ২০ মাইল দীর্ঘ। এটি চীনের বাদাইন জারান মরুভূমির পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম মরুভূমি। এর সমুদ্র উপকূলের তাপমাত্রা স্থিতিশীল এবং সাধারণত ৯ থেকে ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা ৪৮ থেকে ৬৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে থাকে।পৃথিবীর মঙ্গল গ্রহ নামিব মরুভূমি । আল জাবিরউত্তরাঞ্চলের ওভায়িমবা ও ওবাজিমবা হেরেরো এবং কেন্দ্রীয় অঞ্চলে টপনার নামাসহ বেশ কয়েকটি ছোট বসতি এবং আদিবাসী পশুচারী গোষ্ঠী ছাড়া নামিব প্রায় মানব বসতিহীন মরুভূমি। তবে প্রাচীনত্বের কারণে নামিব বিশ্বের অন্যান্য মরুভূমির তুলনায় আরো প্রাণিসম্পদ সম্পন্ন হতে পারে।
এই মরুভূমিতে উদ্ভিদ ও প্রাণীদের বেশ কয়েকটি অস্বাভাবিক প্রজাতি পাওয়া যায়, যা বেশির ভাগ স্থানীয় এলাকার নির্দিষ্ট জলবায়ুতে উপযোজিত। নামিব-নউক্লুফট জাতীয় উদ্যান, আফ্রিকার বৃহত্তম ক্রীড়া পার্ক, আফ্রিকান বুশ এলিফ্যান্টস, মাউন্টেন জেব্রাস এবং অন্যান্য বড় স্তন্যপায়ীদের জনবসতি রয়েছে এখানে। নামিবের সবচেয়ে সুপরিচিত দেশীয় উদ্ভিদগুলির মধ্যে একটি উদ্ভট ওয়েলভিচচিয়া মিরবিলি, যার দীর্ঘ আকারের পাতা থাকে। এই পাতা কয়েক মিটার দীর্ঘ। অন্যান্য মরুভূমির মতই নামিব মরুভূমির প্রাণীগুলির মধ্যে বেশির ভাগ আর্থ্রপোডা এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণী রয়েছে যা সামুদ্রিক পানিতে বসবাস করতে পারে। এর বৃহত্তর প্রাণী উত্তর অঞ্চলে বাস করে। নামিব-এর বেশির ভাগ গাছপালা অত্যন্ত শুষ্ক জলবায়ুতে বেঁচে থাকতে সক্ষম।ভারতীয় মহাসাগর থেকে আসা বায়ুগুলো ড্রাকেন্সবার্গ পর্বতমালার উত্তরণের ফলে তাদের আর্দ্রতার অংশ হারায় এবং মরুভূমির পূর্বদিকে নামিব এসার্পমেন্টে পৌঁছানোর সময় তারা শুকিয়ে যায়।
অন্য দিকে, আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আসা বাতাস পূর্ব থেকে গরম বাতাসে চাপা পড়ে। তাদের আর্দ্রতার দ্বারা এইভাবে মেঘ এবং কুয়াশা গঠন হয়। মহাসাগরের কাছ থেকে আসা এবং মরুভূমিতে ভাসমান সকালে কুয়াশার উপকূল বরাবর এটি নিয়মিত ঘটনা এবং নামিবের প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবনচক্রের অধিকাংশেরই পানির উৎস হিসেবে কাজ করে এই কুয়াশা।পৃথিবীর মঙ্গল গ্রহ নামিব মরুভূমি । আল জাবিরঅদ্ভুত হলেও সত্যি নামিব মরুভূমিতে ৯০ থেকে ১৫০টি বন্য ঘোড়া আছে। জনশূন্য ভূমিতে চরে বেড়ানো এই ঘোড়াগুলো যেন বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপের বাসিন্দা। কিভাবে তারা এই জনবিরল জায়গায় এসে পড়েছিল, তা নিয়ে বহু মতবাদ আছে। তবে বেশির ভাগ লোকের ধারণা ঘোড়াগুলো নিয়ে এসেছিল জার্মান সেনাবাহিনী।
বিরান এই জায়গায় ঘোড়াগুলোর নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারার প্রধান কারণ স্পারগেবিয়েট এলাকার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা। ১৯০৮ সালে এখানে হীরা আবিষ্কৃত হয়। এর পরই জার্মান কলোনির বাসিন্দারা যে ৩৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জনসাধারণের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তার মধ্যে ঘোড়াদের আবাসস্থল গারুবও অন্তর্ভুক্ত। নিষেধাজ্ঞার কারণে এখানে শিকারি ও ঘোড়া ব্যবসায়ীরা আসতে পারতেন না। এ কারণেই গত ১০০ বছরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। গরমের সময় নামিব মরুভূমির ঘোড়াগুলো পানি পান না করে ৩০ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে। শীতকালে এটা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৭২ ঘণ্টায়।
১৯৭৭ সালে এই এলাকায় পানির প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হয়ে তখন অনেক ঘোড়া মারা যায়। সে সময় এক খনিশ্রমিক ঘোড়াগুলোকে পানি সরবরাহের জন্য এখানকার খনি কো¤পানির কাছে আবেদন করেন। তাঁর আবেদন মঞ্জুর হলে সেখানে কয়েকটি পানির ট্যাংক ও সরু ঢাকনাবিহীন পাত্র বসানো হয়। বর্তমানে শুধু ঘোড়ার খাবার পানির চাহিদা মেটাতেই মরুভূমিতে কয়েকটি অগভীর চৌবাচ্চা আছে। বন্য এই ঘোড়াগুলো দেখতেই নামিব মরুভূমির গারুবে সারা বছর ধরে চলতে থাকে পর্যটকদের আনাগোনা।

SHARE

Leave a Reply