Home নিয়মিত আমার কৈশোরে বৈশাখ – কে জি মোস্তফা

আমার কৈশোরে বৈশাখ – কে জি মোস্তফা

ঋতুবৈচিত্র্যে ঘুরে ফিরে আসে বাংলা নববর্ষ। প্রথম মাস বৈশাখ। বাঙালির প্রিয় পহেলা বৈশাখ। জনে-জনে সুরেলা শুভেচ্ছা।
গ্রাম-গঞ্জের মতো বর্ষবরণের চমকপ্রদ আয়োজন ঘটে রাজধানী ঢাকায়। এখানে দিনটির শুরু পান্তাভাত ও ইলিশমাছ ভাজা দিয়ে। উৎসবের অনুষ্ঠানমালা সৃষ্টি করে এক অপূর্ব মিলনমেলা। শিশুরা খেলছে। বড়রা বেড়াচ্ছে। খুশিতে, লাবণ্যে-মাধুর্যে সমস্ত পরিবেশ ঝলমল করে ওঠে। ওরা না থাকলে যেন মিথ্যে হতো আকাশের তারা ফোটা, মিথ্যে হতো জীবনের মানে।
সুকণ্ঠী প্রতিমা ব্যানার্জীর উদাস করা সেই গানটি- ‘আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি। বাঁশি কই আগের মতো বাজে না, মন আমার তেমন কেন সাজে না, তবে কি ছেলেবেলা অ-নে-ক দূরে ফেলে এসেছি’!
সত্যি তো কোথায় সেই ছেলেবেলা, কোথায় কৈশোরকাল! আবহমানকাল থেকে তুলে আনা সেইসব টুকরো-টুকরো ছবি ভেসে ওঠে যখন, প্রবল কষ্ট পাই। ঐ আকাশ বাউরি বাতাস নদী জল আমায় কি ফিরিয়ে দেবে স্মৃতিবিদ্ধ আঁতুড়ঘর!
গ্রাম ছেড়ে একসময় চলে আসি রাজধানী ঢাকায়। পেছনে রয়ে গেলো প্রিয়বন্ধু গাছ মাটি ঘাস। অনন্ত অনিশ্চয়তার মাঝে ফেলে আসা জীবন। জীবন মানে তো এভাবেই খুঁজে যাওয়া। স্মৃতি-বিস্মৃতির কুয়াশাজাল ছিঁড়ে ছেলেবেলার কত জলছবি, বড়বেলায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনে পড়ে গ্রামের সেই উদাসকরা নকশিকাঁথার মাঠ। মাঠজুড়ে রকমারি বৈশাখী মেলা। দৃষ্টিনন্দিত হরেকরকম হস্তশিল্প। ছোটদের জন্য মনকাড়া পুতুল, বাঁশি। কত রকমের মিষ্টিজাত দ্রব্য। নিত্যদিনের গৃহসামগ্রী। মনের থেকে আজ সেইসব ছবি হারিয়ে ফেলেছি।
গ্রামও এখন অনেক পাল্টে গেছে। দোতলা, তিনতলা, চারতলা পাকা বাড়ি। সবকিছু অচেনা অজানা অবিশ্বাস্য।
যাইহোক, রক্তের ভেতর গুপ্ত প্রাণ। স্মৃতিকে ফিরে ফিরে দেখি। শৈশব-কৈশোরের কত স্বপ্ন, কত উত্তেজনা, কত উন্মোচন থেকে গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ জীবন। কিন্তু এখন জীবন আর সময় হেলেদুলে হাত ধরে হাঁটছে, ছুটে পালাচ্ছে না।
মাঝে মাঝে শহরের রাজপথে জেগে ওঠে বনজ বাহার। পালিয়ে যাওয়ার মতো স্মৃতি এসে দরজায় দাঁড়ায়। শ্রীমতী বাতাসে মন উড়ু উড়ু। ঐ তো দূরে সবুজ চত্বরে কয়েকটা গাছ, পুরনো একটা বেঞ্চ, আমি আর আমার চেনা সহচর কৈশোর কী সুন্দর মুখোমুখি বসে আছি। অনাদিকালের হৃদয়-উৎস হতে সহসা আমরা যেন ভেসে এলাম যুগল আনন্দস্রোতে!
শৈশব থেকে রন্ধ্রে-রন্ধ্রে মিশে যাওয়া গূঢ় এক অনিশ্চয়তাবোধ বুঝি পিছু ছাড়ে না। জীর্ণ শাখায় গজায় প্রাণ। এ শহর ছেড়ে যেতেই হবে বহুদূর, এমন দূর যেখানে বাড়ি আছে, ঘর আছে, মানুষ আছে, প্রাণী আছে, খেত আছে, পুকুর আছে, নদী আছে। নেই শুধু বাল্যবন্ধু, দীঘি আর কুঞ্জবন।

SHARE

Leave a Reply