Home চিত্র-বিচিত্র মজার প্রাণী গ্লাস ফ্রগ । রিয়াজুল ইসলাম

মজার প্রাণী গ্লাস ফ্রগ । রিয়াজুল ইসলাম

মজার প্রাণী গ্লাস ফ্রগ । রিয়াজুল ইসলামব্যাঙ আমাদের অতি পরিচিত প্রাণী। গ্রামাঞ্চলে পুকুর-ডোবায় তো বটেই, সন্ধ্যার পর বাড়ির উঠোনেও নিশ্চিন্তে লাফিয়ে বেড়ায় ব্যাঙ। আমরা সচরাচর যে ব্যাঙ দেখি, তার বাইরেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে নানা ধরনের ব্যাঙ। তাদের মধ্যে কিছু আবার খুব বিস্ময়কর।
অনেক প্রাণী আছে যাদের দেহ হয় স্বচ্ছ কাচের মত। একটি প্রাণীর শরীরের সব কিছু বাহির থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তার শরীরের ভেতরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এমনকি সে কি খেয়েছে সব খাবার।
তার হৃৎপিণ্ড যে পাম্প করছে সেই হৃৎপিণ্ডের প্রতিটি কম্পন বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে। এই বিষয়গুলো যেমন মজাদার তেমনি অদ্ভুত। এমনই এক অদ্ভুত ব্যাঙ পাওয়া যায় আমাজান জঙ্গলে। যাকে কাচ ব্যাঙ বলা হয়। অনেকটা স্বচ্ছ চামড়ার এ ব্যাঙকে ইংরেজিতে ডাকা হয় গ্লাস ফ্রগ নামে।
প্রথমদিকে সাধারণ গেছো ব্যাঙের সঙ্গে একই পরিবারে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও ১৯৪৫ সালে গ্লাস ফ্রগের জন্য আলাদা পরিবার প্রস্তাব করেন এডওয়ার্ড এইচ টেইলর। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ প্রজাতির স্বচ্ছ ব্যাঙের সন্ধান পাওয়া গেছে।

মজার প্রাণী গ্লাস ফ্রগ । রিয়াজুল ইসলামগ্লাস ফ্রগ এক অনিন্দ্য সুন্দর সৃষ্টি। একটা ব্যাঙও যে কতটা আকর্ষণীয় হতে পারে, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই ছোট্ট প্রাণীটি।
গ্লাস ফ্রগ সচরাচর দেখা যায় না। এই প্রাণীটা আমাদের কাছে অপরিচিত। আমাদের দেশে এই প্রাণীটি নেই। গ্লাস ফ্রগ পাওয়া যায় মেক্সিকো থেকে পানামা, ভেনিজুয়েলা, টোবাগো দ্বীপ, বলিভিয়া, অ্যামাজন জঙ্গল, দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিল এবং উত্তর আর্জেন্টিনায়। অবশ্য বিশ্বের আরও কিছু প্রান্তে নানা প্রজাতির গ্লাস ফ্রগ দেখা যায়। গ্লাস ফ্রগ বায়ো-ইন্ডিকেটর হিসেবে কাজ করে। বায়ো-ইন্ডিকেটর হচ্ছে সেসব প্রাণী যারা নিজেদের বাসস্থানের পরিবেশের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। গ্লাস ফ্রগ মূলত ক্লাউড এবং রেইন ফরেস্টের বাসিন্দা।
বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙের সঙ্গে গ্লাস ফ্রগের অনেক সামঞ্জস্য পাওয়া গেলেও তাদের স্বচ্ছ শরীর তাদেরকে সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। পেটের কাছে স্বচ্ছ হওয়া ছাড়াও সাধারণ ব্যাঙের সঙ্গে এই ব্যাঙগুলোর আরও কিছু পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ ব্যাঙের চোখ দুই পাশে থাকলেও গ্লাস ফ্রগের চোখ থাকে সাধারণত সামনের দিকে। ইনফ্রারেড কালার ফটোগ্রাফি দিয়ে পরীক্ষা করা হলে দেখা যায় গ্লাস ফ্রগপরিবারের দুটি প্রজাতির ব্যাঙ ইনফ্রারেডের কাছাকাছি আলো প্রতিফলন করতে পারে।
গ্লাস ফ্রগ আমাদের দেশের গেছো ব্যাঙের মতো এবং এরা খুব ছোট হয়ে থাকে। এই ধরনের ব্যাঙগুলো লম্বায় ৩ থেকে ৭.৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। একটি গ্লাস ফ্রগ ১০ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত বাঁচে।

মজার প্রাণী গ্লাস ফ্রগ । রিয়াজুল ইসলাম
গ্লাস ফ্রগ ডিম পাড়ে গাছের পাতায় কিংবা হ্রদ বা নদীর ওপর ভাসমান লতাপাতায়

গ্লাস ফ্রগের শরীরের উপরের অংশ উজ্জ্বল সবুজ, তবে তাদের পেটের অংশ স্বচ্ছ। ফলে তাদের হৃৎপিণ্ডটি বাইরে থেকেই দেখা যায়। এই ব্যাঙগুলোর শরীর সবুজ হওয়ায় তারা বনের সবুজ গাছপালার সঙ্গে মিশে থাকতে পারে, আলাদা করে তাদেরকে চোখে পড়ে না। তবে ঠিক কী কারণে তাদের শরীরের নিচের অংশ স্বচ্ছ, তা গবেষকদের কাছে এখনও অজানা। ধারণা করা হয়, অন্যান্য শিকারি প্রাণীর কবল থেকে বাঁচতে এ ধরনের স্বচ্ছ চামড়া ছদ্মবেশ ধরতে বেশ কার্যকর। গ্লাস ফ্রগের বিভিন্ন প্রজাতি রয়েছে। কিছু ব্যাঙের হৃৎপিণ্ড ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হালকা সাদা প্রলেপ দিয়ে ঢাকা থাকলেও বেশির ভাগ ব্যাঙের শরীরের নিচের অংশ স্বচ্ছ। ফলে হৃৎপিণ্ডের মাধ্যমে ছোট্ট প্রাণীটির রক্ত সঞ্চালন দেখা যায় বাইরে থেকেই। সম্প্রতি গবেষকরা ইকুয়েডরের রেইনফরেস্টে এক ধরনের নতুন গ্লাস ফ্রগের সন্ধান পেয়েছেন, যা বিলুপ্তির পথে রয়েছে।
গ্লাস ফ্রগ নিশাচর প্রাণী। নিশাচর গ্লাস ফ্রগ বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় এবং মাকড়সা ধরে খায়। এদের প্রখর দৃষ্টিশক্তি রয়েছে। শিকার খুঁজতে এরা বেশ পারদর্শী। গ্লাস ফ্রগের মূল শত্রু সাপ, পাখি এবং কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণী। তবে সাধারণত এরা রাতের বেলায় বাইরে বের হয়। তাই তারা শিকারি প্রাণীর কাছে ধরা পড়ে না। দিনের বেলায় বেরোলেও তারা তাদের সবুজ শরীর গাছের পাতার সঙ্গে মিশিয়ে নিজেদের আলাদা করতে পারে।
গ্লাস ফ্রগ সাধারণত গাছেই থাকে। তবে প্রজননের সময়ে তারা নদী-নালা বা হ্রদের পাশে বসবাস করে।
গ্লাস ফ্রগ ডিম পাড়ে গাছের পাতায় কিংবা হ্রদ বা নদীর ওপর ভাসমান লতাপাতায়। তবে একটা প্রজাতি ডিম পাড়ে হ্রদের কাছাকাছি পাথরের ওপরে। গ্লাস ফ্রগ সাধারণত বর্ষাকালের পর ডিম পাড়ে।

মজার প্রাণী গ্লাস ফ্রগ । রিয়াজুল ইসলাম
গ্লাস ফ্রগ আমাদের দেশের গেছো ব্যাঙের মতো এবং এরা খুব ছোট হয়ে থাকে

এরা একসঙ্গে ২০-৩০টি ডিম পাড়ে। মেয়ে ব্যাঙ ডিম পাড়ার পর চলে যায় এবং সমস্ত দায়িত্ব গিয়ে পড়ে পুরুষ ব্যাঙের ওপর। পুরুষ ব্যাঙ ডিম পাহারা দেয়। তারা ডিম ফোটার আগ পর্যন্ত দিন-রাত সেগুলো পাহারা দেয়। কোন পোকামাকড় ডিমের খুব কাছাকাছি এলে সেগুলোকে তাড়িয়ে দেয়। ডিম ফুটতে সাধারণত দুই সপ্তাহ সময় লাগে। ডিম ফুটে ব্যাঙ্গাচি বেরুলে সেগুলো পানিতে গিয়ে পড়ে।
পশু পাখি পোষা মানুষের সৌখিনতার একটি অংশ। বর্ণিল এ ব্যাঙকেও অনেকে শখের বশে পুষে থাকেন।
গ্লাস ফ্রগদের পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা তাদের বাসস্থান বিভিন্ন বনের ওপর বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব সম্পর্কে জানতে পারেন। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে এ ধরনের বনগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে গ্লাস ফ্রগের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। এই বিচিত্র প্রাণীকে রক্ষার জন্য আমাদের সচেষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

SHARE

Leave a Reply