Home নিয়মিত বাংলাদেশে ক্রিকেটের শুরু যেভাবে । আবু আবদুল্লাহ

বাংলাদেশে ক্রিকেটের শুরু যেভাবে । আবু আবদুল্লাহ

বাংলাদেশে ক্রিকেটের শুরু যেভাবেনয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নিয়েছে নতুন দেশ বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশে ক্রিকেটের সূচনাপর্ব সম্পর্কে তুলে ধরবো এবারের লেখায়।

শুরু যেভাবে
এই অঞ্চলে ক্রিকেট এসেছিল ব্রিটিশদের হাত ধরে। বাংলাদেশসহ গোটা ভারতবর্ষ তখন ব্রিটিশ শাসনের অধীন। ধীরে ধীরে খেলাটি ছড়িয়ে পড়ে সাধারণের মাঝে। কিছুদিন পর সাংগঠনিক কাঠামো লাভ করতে শুরু করে ক্রিকেট। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে রঞ্জি ট্রফিতে অংশ নিতে শুরু করে ‘বাংলা’ দল। ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর আসে পাকিস্তান অধ্যায়। গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। সে সময়ই ঢাকার মাঠে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫৫ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তান দল দেশের মাটিতে প্রথমত টেস্ট ম্যাচটি খেলেছিল ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে (তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়াম)।

বাংলাদেশে ক্রিকেটের শুরু যেভাবে স্বাধীন দেশে ক্রিকেট
স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালে গঠিত হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন ইউসুফ আলী। ক্রিকেট বোর্ড প্রতিষ্ঠার পরই ঘরোয়া ক্রিকেট আয়োজন শুরু করে। ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা মেট্রোপলিস নক আউট টুর্নামেন্ট। ঢাকার কয়েকটি ক্লাব অংশ নেয় সেই টুর্নামেন্টে। ১৯৭৪-৭৫ মৌসুমে প্রথমবারের মত জাতীয় পর্যায়ে ন্যাশনাল ক্লাব চ্যাম্পিয়শিপ অনুষ্ঠিত হয়।
এর কিছুদিন পর বাংলাদেশে আসেন বিখ্যাত ব্রিটিশ ক্রীড়া সাংবাদিক রবিন মারলার। পাকিস্তান আমলে টেস্ট ম্যাচ কাভার করতে অনেকবার ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। তাই ঢাকার দর্শকদের ক্রিকেটপ্রীতি নিয়ে তার ধারণা ছিলো; কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে দূরে থাকার ফলে নতুন জন্ম নেয়া একটি দেশে ক্রিকেট সেভাবে বিস্তার লাভ করতে পারছে না দেখে তিনি কষ্ট অনুভব করেন। দেশে ফিরে লন্ডনের পত্রিকায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের সম্ভাবনা নিয়ে লেখালেখি করেন মারলার।
এর মাঝে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ আবেদন করে আইসিসির সহযোগী সদস্য হওয়ার; কিন্তু বাংলাদেশকে সহযোগী সদস্যপদ দিতে বাদ সাধেন ব্রিটিশ কর্মকর্তারা। ব্রিটিশদের সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি ও সাবেক অধিনায়ক আবদুল হাফিজ কারদার আইসিসির সভা থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন বলে জানা যায়।
বাংলাদেশে ক্রিকেটের শুরু যেভাবে ওদিকে শুধু লিখেই থেমে থাকেননি সাংবাদিক মারলার, ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে তার একান্ত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে খেলতে আসে লন্ডনের বিখ্যাত মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি)। এমসিসির বিপক্ষেই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নামে বাংলাদেশ দল। ৭ জানুয়ারি ছিল সেই ঐতিহাসিক দিন। তিন দিনের সেই ম্যাচে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেন শামীম কবির। তিনিই বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথমত অধিনায়ক।
এমসিসির সফরের ফলে ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশের নাম ছড়িয়ে পড়ে। সবাই জানতে শুরু করে এখানকার ক্রিকেট সম্পর্কে। সে বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা আইসিসির সহযোগী সদস্য পদ লাভ করে বাংলাদেশ। এরপর শুধুই সামনে এগিয়ে চলা। ১৯৭৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সফরে আসে শ্রীলঙ্কা। স্বাধীন দেশে সেটিই প্রথম কোন জাতীয় দলের সফর। ওই সফরে কয়েকটি ম্যাচ খেলে লঙ্কানরা। পরের মাসেই একটি ম্যাচ খেলতে ঢাকায় আসে ভারতীয় আঞ্চলিক দল হায়দ্রাবাদ ব্লুজ। ডিসেম্বরে আবার আসে এমসিসি ক্লাব। ১৯৭৯-৮০ মৌসুমে প্রথমবারেরত মত আসে পাকিস্তান জাতীয় দল। বিভিন্ন দলের সফরের পাশাপাশি ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোও ক্রমশ জোরদার হতে থাকে।

বাংলাদেশে ক্রিকেটের শুরু যেভাবেআন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে লাল-সবুজ
১৯৭৯ সালে প্রথমবারের মতো আইসিসি ট্রফিতে অংশ নেয় বাংলাদেশ। ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টে রকিবুল হাসানের নেতৃত্বে প্রথম ম্যাচেই ফিজির বিপক্ষে আসে ২২ রানের জয়। এরপর মালয়েশিয়ার বিপক্ষে জিতলেও ডেনমার্ক ও কানাডার বিপক্ষে হেরে বিদায় নেয় টুর্নামেন্ট থেকে। ১৯৮২ সালে আইসিসি ট্রফির পরের আসরে সেমিফাইনালে ওঠে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। সেমিফাইনালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ও তৃতীয় স্থাননির্ধারণী ম্যাচে পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে পরাজিত হয় বাংলাদেশ। পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথম সেঞ্চুরিটি করেছিলেন ইউসুফ রহমান বাবু (১১৫)। পরের বছর প্রথমবারের মত আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ, হংকং ও সিঙ্গাপুরের জাতীয় দল ছাড়াও বিসিবি অনূর্ধ্ব-২৫ দল অংশ নেয় টুর্নামেন্টে। ফাইনালে হংকংকে ৩ উইকেটে হারিয়ে প্রথম কোনো শিরোপা জেতে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে ক্রিকেটের শুরু যেভাবে১৯৮৬ সালে প্রথম এশিয়া কাপে খেলার সুযোগ আসে। ৩১ মার্চ ১৯৮৬, শ্রীলঙ্কার তাইরনে ফার্নান্দো স্টেডিয়ামে প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ (ওডিআই) খেলতে নামে বাংলাদেশ। শুরু হয় নতুন অধ্যায়ের। গাজী আশরাফত হোসেন লিপুর নেতৃত্বে ইমরান খানের পাকিস্তানের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। পূর্ণ শক্তির পাকিস্তানের বিপক্ষে ৯৪ রানে অলআউট হয়ে ৭ উইকেটে ম্যাচ হারে লিপু বাহিনী। ১৯৮৮ সালে ঢাকায় এশিয়া কাপের পরবর্তী আসর বসে। বাংলাদেশে আয়োজিত প্রথম কোন ওডিআই টুর্নামেন্ট।
১৯৯০ নেদারল্যান্ডস আইসিসি ট্রফিতে সেমিফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ। ১৯৯২ সালে আইসিসি ঘোষণা দেয়- ১৯৯৪ আইসিসি ট্রফির সেরা তিনটি দল ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাবে। আগের দু’টি টুর্নামেন্টে ভালো করায় বিশ্বকাপে অংশ নেয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে বাংলাদেশ।
পারফরম্যান্সে উন্নতি করতে কোচ আনা হয় বিদেশ থেকে। ১৯৯৩ সালে কোচ হয়ে আসেন ভারতের ১৯৮৩ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক মহিন্দর অমরনাথ। এদেশের ক্রিকেটে প্রথম হাই প্রোফাইল কোচ তিনি। অবশ্য সেবার বিশ্বকাপ স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কেনিয়ার কাছে ১৩ রানে হেরে বিদায় নিতে হয় দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই। তবে দমে যায়নি বাংলাদেশ। প্রস্তুতি চলে পরবর্তী আইসিসি ট্রফিতে ভালো করার। অমরনাথের বিদায়ের পর কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান গর্ডন গ্রিনিজকে।


প্রথম ওডিআইত ম্যাচের একাদশ
(ব্যাটিং অর্ডার অনুযায়ী)

রকিবুল হাসান
নুরুল আবেদীন নোবেল
গাজী আশরাফ হোসেন লিপু
(অধিনায়ক)
শাহীদুর রহমান
মিনহাজুল আবেদীন নান্নু
রফিকুল আলম
গোলাম ফারুক
জাহাঙ্গীর শাহ
হাফিজুর রহমান
গোলাম নওশের প্রিন্স ও
সামিউর রহমান


দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে আকরাম খানের নেতৃত্বে ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি খেলতে মালয়েশিয়া যায় দল। টুর্নামেন্টটা মোটেই সহজ ছিল না। প্রায় প্রতিটি ম্যাচে বৃষ্টির বাধা আর রান রেটের জটিল হিসাব নিকাশ খেলোয়াড়দের মনোসংযোগে চিড় ধরানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। তবু গ্রুপ পর্বে সবগুলো ম্যাচে জয় পেয়ে দ্বিতীয় পর্বে যায় বাংলাদেশ। সেখানে হংকংয়ের বিপক্ষে জয় ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হওয়ায় নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটি হয়ে ওঠে ‘বাঁচামরার’ লড়াই। সেই ম্যাচেও হানা দেয় বৃষ্টি। রান রেটে পিছিয়ে থাকায়- বৃষ্টিতে ম্যাচ পরিত্যক্ত হলে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়বে বাংলাদেশ; কিন্তু শেষ পর্যন্ত কবুল হয় কোটি সমর্থকের প্রার্থনা- শুরু হয় খেলা। তবে ভেজা পিচে ১৪১ রানের টার্গেট তাড়া করতে নেমে ১৫ রানে চার উইকেট হারায় বাংলাদেশ। ওই অবস্থা থেকে অধিনায়ক আকরাম খানের ৯২ বলে অপরাজিত ৬৮ রানের ইনিংসে জয় পায় বাংলাদেশ। বিপর্যয়ের মুহূর্তে ঐতিহাসিক এক ইনিংস খেলে ৩ উইকেটে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়েন আকরাম খান।
সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ডকে সহজে হারিয়ে বাংলাদেশ পেয়ে যায় বহু আকাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপের টিকিট। এরপর ফাইনালে কেনিয়ার বিপক্ষে ‘এক বলে এক রানের’ সেই জয়। আইসিসি ট্রফির শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। আইসিসি ট্রফিতে সাফল্য এনে দেয়ার স্বীকৃতি স্বরূপ গর্ডন গ্রিনিজকে দেয়া হয় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব।
এই একটি শিরোপা বাংলাদেশে রীতিমতো ক্রিকেট বিপ্লব ঘটায়। সাড়া দেশে হু হু করে বাড়তে থাকে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে ক্রিকেট। এরপরের ইতিহাস তোমাদের অনেকেরই জানা। তবুও সংক্ষেপে বলি- ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৯৯ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিলেও বাংলাদেশ দু’টি জয় পায়। স্কটল্যান্ড ও টপ ফেবারিট পাকিস্তানকে হারায় আমিনুল ইসলাম বুলবুলের দল। সেই দু’টি জয়ের কারণেই দ্রুত (২০০০ সালে) টেস্ট স্ট্যাটাস পায় বাংলাদেশ। হয়ে যায় আইসিসির স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র।

SHARE

Leave a Reply