Home গল্প জীবন ফিরে পেল । ফয়সাল আহমেদ

জীবন ফিরে পেল । ফয়সাল আহমেদ

জীবন ফিরে পেলপ্রত্যেক দিন কাজ শেষ করে সাইদ বটতলা আসে। এশার নামাজ পড়ে তারপর বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। পাশেই মসজিদ। আজান চলছে মাগরিবের। আজ আসতে একটু দেরি হয়ে গেছে। বর্তমানে কাজের চাপ একটু বেশি। মাঠে কম সময় দিলে মালিক বকাবকি করে। অনেক সময় টাকাও কম দেয়। সাইদ গরিব বলে ধনী মালিকের বিরুদ্ধে কিছু বলতেও সাহস পায় না। সাইদের আশা একদিন এর সঠিক হিসাব হবে। সেদিন সে তার সব পাওনা পেয়ে যাবে। কারণ সেই মহান রাব্বুল আলামিন কারো সাথে বে-ইনসাফি করেন না।
ওর বয়সী ছেলেদের সাধারণত এমন সময় পড়ার টেবিলেই থাকার কথা। কিন্তু ওর সারাদিন কাটে কাজের মাঠে আর সন্ধ্যা কাটে বটতলা চায়ের দোকানে। চা খেতে খেতে মাঝে মাঝে হারিয়ে যায় ওর হারানো সেই স্মৃতির গভীরে। কত সুন্দর ছিল সেই জীবন। স্কুলমাঠে খেলাধুলা করা আর স্কুল ছুটি দিলে সবাই মিলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বাড়িতে ফেরা। বাড়ি ফিরে দেখতো মা ওর অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছে কখন আসবে তার সোনার টুকরো সন্তান। বাড়িতে ফেরার পর মা গোসল সেরে নামাজ পড়ে আসতে বলতেন। নামাজ পড়ে এসে দেখতো ওর মা ওর জন্য খাবার নিয়ে চাটাইতে বসে আছেন।
মা পাশে বসে খাইয়ে দিতেন। এখন মা অসুস্থ। এখন মাকেই খাইয়ে দিতে হয়। বাবা আগের চেয়েও অসচ্ছল হয়ে পড়েছেন, যার কারণে ওকে কাজে আসতে হলো। কাজে আসার পর হঠাৎই যেন জীবন পরিবর্তন হয়ে গেলো। যেই নরম হাতে থাকতো সবসময় কলম সে হাতে এখন থাকে কোদাল বা অন্য কোন কাজের সরঞ্জামাদি। যদি লেখার সময় কোনো ভুল হতো স্যারেরা সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন। আর এখন যদি ভুল হয় তবে আঘাতে আঘাতে পিঠের চামড়া লাল হয়ে যায়। আসবে কি সেই জীবন কখনো ফিরে! আনচান কোনো শব্দে আবার বাস্তব জীবনে ফিরে আসে।
ও এখন যেমন কাজের মাঠে পরিশ্রমী। যখন পড়াশোনা করতো তখনত পড়াশোনার ক্ষেত্রেও এমন পরিশ্রমী ছিল। ক্লাসে প্রথম না হতে পারলেও ওর কাছ থেকে ২য় স্থান কেউ নিতে পারতো না। কিন্তু সেটা আর দীর্ঘ করতে পারেনি। অভাবের সংসারে ওর বাবা যা আয় করেন তাতে সংসার চালানোই কঠিন। ওর পড়াশোনা তো অনেক দূরের কথা। তবুও অনেক কষ্টে ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিল। ৮ম শ্রেণীতে ওঠার পর হঠাৎই ওর মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। তাই বাধ্য হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে কাজে নেমে যায়।
জীবন ফিরে পেলএই গ্রামের এক বড় ভাই আছেন, নাম তার হাসান। গ্রামে সবাই তাকে ভালোবাসে। যেমন ভালো ছাত্র তেমনই আদর্শবান। এসএসসি পাস করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য শহরে চলে যান। ছুটি পেলেই নিজের গ্রামে ছুটে আসেন। এবারও শীতের ছুটিটা গ্রামের বাড়িতে কাটানোর ইচ্ছে হলো। তাই তো গ্রামে ছুটে চলা।
সেই সকাল ৭টার গাড়িতে রওয়ানা দিয়ে এখন এসে পৌঁছালো। একটু পরেই মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ শোনা গেলো। জোহরের আজান হচ্ছে। হাসান তাড়াতাড়ি অজু-গোসল সেরে মসজিদে চলে গেলো। দুপুরের খাবারের পর একটু বিশ্রাম নিলো।
কখন যে ঘুমিয়ে পড়ছে তা মনে নেই। হঠাৎ আজান শুনে ঘুম ভেঙে গেলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ৪টা ১৫ মিনিট বাজে। এতক্ষণ বিশ্রাম করার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে শরীটা নিস্তেজ হয়ে গেছিল। দীর্ঘদিন পর গ্রামে এসেছে একটু ঘুরতে যাবে। তাই তাড়াহুড়ো করে ওজু সেরে আসরের নামাজ আদায় করতে মসজিদে চলে গেলো।
গ্রামের আবহাওয়া কতটা স্বচ্ছ-সুন্দর, মনোরম পরিবেশ। আল্লাহর সৃষ্টির যে নিপুণতা, সৌন্দর্য তা প্রায় সবটাই গ্রামে আসলে অনুভব করা যায়। হাঁটতে হাঁটতে এমন কত কথাই মনে পড়ে যায় হাসানের। রাস্তায় সাইদের সাথে দেখা।
হাসান সাইদকে খুব ভালোভাবেই জানে। সাইদকে হাসানের খুব ভালো লাগে। কারণ হাসান জানে সাইদের বাবার অসচ্ছলতা সাইদকে থামাতে পারেনি। অসচ্ছলর মধ্যেও সাইদ তার পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। তাই যখনই দেখা হয় ও সাইদকে উৎসাহিত করে। হাসান জানে না সাইদ পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে।
– এই সাইদ! কেমন আছো?
– আলহামদুল্লিলাহ, ভালো। আপনি?
– আমিও ভালো আছি। তোমার বাড়িতে সবাই কেমন আছে?
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে।
– তোমার পড়াশোনা কেমন চলে?
– সাইদ মাথাটা একটু নিচু করে বলল, আমি এখন আর পড়াশোনা করি না।
– কেন?
– সাইদ তার বাবার অসচ্ছলতা এবং মায়ের অসুস্থতার কথা বলল।
– তাহলে কী কর এখন?
– মাঠে কাজ করি।
– তাতে কি তোমাদের সচ্ছলতা ফিরে এসেছে।
– না, তবে কিছুটা লাঘব হয়েছে।
– ওহ! তো তোমার টাকায় কতটা উপকৃত হচ্ছেন তোমার বাবা?
– তেমনটা নয়, কারণ আমি বয়সে ছোট বলে মজুরি কম পাই।
– আচ্ছা! তুমি যদি কাজ না করো,তবে কি তোমার আব্বা যা আয় করেন তাতে একদমই চলবে না?
– চলবে। তবে অনেক কষ্ট হবে।
– দেখ, তুমি যদি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে কাজ কর, তাহলে সারাজীবন তোমাকে এভাবেই কাজ করতে হবে। আর এই কষ্টও পিছু ছাড়বে না। এখন যেমন কষ্ট করছ, তোমার বাবা-মা কষ্ট করছেন। ঠিক এভাবেই সারাজীবন কষ্ট করে যেতে হবে। আর যদি এখন কষ্ট করে হলেও পড়াশোনা চালিয়ে যাও। তবে হয়তো, সাময়িক অনেক কষ্ট করতে হবে। তবে সেটা বেশি দিনের জন্য নয়। কারণ, পড়াশোনা করলে তুমি যে পরিশ্রমী তাতে অনেক ভালো রেজাল্ট করবে ও ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল হবে। হাসানের কথা শুনে সাইদ প্রতিজ্ঞা করে ভালোভাবে পড়াশোনা করার।
সাইদের জেএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে আজ। সাইদ জিপিএ ৫ পেয়েছে। সাইদ মনে মনে চিন্তা করে আজ সন্ধ্যায় ঢাকায় হাসান ভাইয়ের কাছে ফোন করে ওর রেজাল্টের খবর জানাবে। হাসান ভাই ওর রেজাল্ট শুনলে অনেক খুশি হবে। এ ভাবেই সাইদ তার হারানো জীবন ফিরে পেল।

SHARE

Leave a Reply