Home গল্প জীবন বদলের গল্প । ইমাম সাজিদ

জীবন বদলের গল্প । ইমাম সাজিদ

জীবন বদলের গল্পআরাফ স্কুল ছুটির পর বাসায় এসে কাঁধ থেকে ব্যাগটা রেখেই মুখটা গোমড়া ভাব করে খাটের এক কোণে বসে আছে। এবার আরাফ ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে উঠেছে।
অভিমান ওর একটু বেশিই। একটু পরই আরাফ ওর মায়ের কাছে বায়না ধরে ওর বাবাকে কয়েক দিনের ভেতরই ঢাকা থেকে বাড়িতে ফিরতেই হবে। আরাফের বাবা ঢাকায় সরকারি চাকরি করে।
আরাফের মা বলেন, হঠাৎ বাবার জন্য এতো পাগল হওয়ার কারণ কী? তারপর আরাফ বলে, সেই এক মাস আগে বাবা বাড়িতে এসেছিলেন। কতটা দিন যাবৎ বাবার মুখে গল্প শোনা হয় না। যেভাবেই হোক কয়েক দিনের ভেতরই বাবাকে বাড়িতে আসতেই হবে। ওকে থামানোই যাচ্ছিলো না। মুখে শুধু একটাই কথা বাবাকে আসতেই হবে। তারপর ওর মা দিশা না পেয়ে এক পর্যায়ে ওর বাবাকে ফোন দেন। ওর বাবা জানান, পরের সপ্তাহের বৃহস্পতিবার বাড়িতে ফিরবে।
এটি শোনার পর ওর মন আনন্দে ভরে ওঠে, অনেক খুশি হয়। আনন্দে আত্মহারা হয়ে আহ্লাদে মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। তারপর দুপুরে খেয়ে দেয়ে মায়ের সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। আস্তে আস্তে দিন কেটে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত দিন চলে আসে। পরের সপ্তাহে বৃহস্পতিবারে আরাফ খুব আনন্দের সাথে স্কুলে যায়। কারণ ওর বাবা সেদিন দীর্ঘ এক মাস পর বাড়িতে আসবে। বৃহস্পতিবার মানেই স্কুলের হাফ ক্লাস। স্কুল ছুটি দিলে বাসায় ফেরার পর থেকেই খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়ে উঠোনে ওর বাবার অপেক্ষায় বসে থাকে আরাফ। বিকেলে বন্ধুদের সাথে মাঠে খেলতেও যায়নি। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা এসে যায় অথচ ওর বাবার এখন পর্যন্ত কোন খোঁজ খবর নেই। তারপর ওর মন খারাপ হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে রাত হয়ে যাওয়াতে ওর মা ওকে খুব জোর জবরদস্তি করে উঠোন থেকে ঘরে নিয়ে যায়। রাতের আঁধার আস্তে আস্তে ঘন কালো হতে থাকে। এর কিছুক্ষণ পরই আরাফ বাহিরে ওর বাবার গলার আওয়াজ শুনতে পায়। তারপর এক দৌড় দিয়ে সোজা দরজাটা খুলেই সাথে সাথে বাবাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। তারপর বাবার সাথে বসে রাতের খাবার খায়। খাওয়া দাওয়া শেষে আরাফ ওর বাবাকে গল্প শোনানোর বায়না করে। ওর বাবা ওকে বলে, অনেক রাত হয়েছে এখন ঘুমিয়ে পড়ো সকালে তোমার স্কুল আছে। কাল তোমার স্কুল ছুটির পর বিকেলে গল্প শোনাবো। তারপর আরাফ বাবার কথা অনুযায়ী ঘুমিয়ে পড়ে।
পরদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে পাশের বাড়ির ওর দুই বন্ধু আরিয়ান এবং তারাজকে বিকেলে গল্প শোনার জন্য ওর বাসায় আসার আমন্ত্রণ জানায়। অতঃপর, বিকেলে ওর মা উঠোনে একটি পাটি বিছিয়ে দেয়। তারপর আরাফ, আরিয়ান এবং তারাজ খুব আগ্রহের সাথে ফিটফাট হয়ে পাটিতে বসে পড়ে গল্প শোনার জন্য। তারপর আরাফের বাবা ওদেরকে বলেন, তোমাদের আমি আমাদের প্রিয় নবী ও রাসূল (সা:) অর্থাৎ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব হযরত মোহাম্মদ (সা:) এর গল্প শোনাবো। তখন ওদের মাঝে এক প্রকার আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছিলো। তারপর ওর বাবা বলেন, সারা জাহানের মালিক মহান আল্লাহতায়ালা মহাগ্রন্থ আল-কোরআন নাজিল করেন এই শ্রেষ্ঠ মানবের ওপর। রাসূল (সা) ছোটবেলা থেকেই ছিলেন খুব ন্যায়পরায়ণ, সত্যবাদী, নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল প্রকৃতির একজন মানুষ। সবাই তাকে অনেক বিশ্বাস করতেন। তাই সবাই তাকে আল-আমিন অর্থাৎ সত্যবাদী নামে ডাকতেন। তিনি প্রতিদিন যেকোনো অবস্থাতেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। তিনি নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করতেন।
সবসময়ই বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতেন, কেননা পবিত্রতা হলো ঈমানের অঙ্গ। তিনি ছিলেন বহু গুণের অধিকারী। তিনি দেখতে খুবই সুন্দর ছিলেন। তাকে দেখে সবাই বলতো আল্লাহ যেন তার চেহারায় নূর ঢেলে দিয়েছেন। তিনি ছিলেন একজন শিশুপ্রেমী মানুষ। শিশুদের খুবই পছন্দ করতেন এবং ভালোবাসতেন। শিশুরাও তাকে খুব পছন্দ করতো এবং ভালোবাসতো। শিশুদের সাথে খোলা মাঠে খেলা করতেন। এককথায় শিশুরা তার জন্য দিওয়ানা ছিলো। তখন আরাফ ওর ঐ দুই বন্ধুকে ফিসফিস করে বলে, ইশ! আমরা যদি এমন একজনকে পেতাম কতই না ভালো হতো। তারপর আরাফের বাবা বললেন, রাসূল (সা) কখনোই গিবত করতেন না ও মিথ্যা কথা বলতেন না। বরং যারা এসব করতো তাদের নিষেধ করতো। কেননা এসব হলো পাপ কাজ। আর পাপ কাজ করলে পরকালে আল্লাহর কাছে শাস্তি ভোগ করতে হবে এবং জাহান্নামে যেতে হবে।
আরাফের বাবা এরপর বললেন, রাসূল (সা) সবসময় সকলের সাথে ভালো আচরণ করতেন। কারো মনে কষ্ট দিয়ে কখনো কোনো প্রকার কটুকথা বলতেন না। তিনি ধনী-গরিব সকলকে এক চোখে দেখতেন। তিনি হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতারণা, পরনিন্দা, ব্যভিচার, মিথ্যাসহ যতো প্রকার খারাপ দিক ও কাজ আছে এসব কখনোই পছন্দ করতেন না।
তারপর আরাফের বাবা ওদেরকে বলেন, রাসূল (সা) এর মতো করে জীবন-যাপন করার জন্য। আরাফ এ কথার পর ওর বাবাকে প্রশ্ন করে, রাসূল (সা)-এর মতো করে চললে আমরা পরকালে জান্নাতে যেতে পারবো? তখন প্রশ্নের জবাবে ওর বাবা বললেন, অবশ্যই যেতে পারবে। কেননা পৃথিবীতে যারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং খারাপ কাজ বর্জন করে ভালো কাজ করবে তাদের জন্যইতো জান্নাত। আর আমাদের রাসূল (সা) জান্নাতে যাওয়ার মতো কাজগুলোই সর্বদা করতেন। অতএব, তার মতো করে চললে জান্নাতে অবশ্যই যেতে পারবে। এ কথা শোনার পর আরাফ, আরিয়ান ও তারাজের মুখে প্রশান্তির ছাপ লক্ষ করা যায়। এরপর ওরা ৩ বন্ধু তখনই ওয়াদা করে এখন থেকে ওরা রাসূল (সা)-এর মতো করেই চলার চেষ্টা করবে এবং জীবন যাপন করবে। এ কথা শোনার পর আরাফের বাবা ওদের প্রতি অত্যন্ত খুশি হন। এদিকে হঠাৎ করে আরাফের মা ওদের সামনে গরম গরম পিঠা বানিয়ে হাজির হন। তারপর সকলে মিলে একসাথে বসে পিঠা খায়। কিছুক্ষণ পরই মসজিদের মাইক থেকে মোয়াজ্জিনের কণ্ঠে মাগরিবের আজানের আওয়াজ ভেসে আসে।

SHARE

Leave a Reply