Home গল্প অনুবাদ গল্প এক যে ছিলো ইঁদুরছানা । মূল : পল চয়ে । ভাষান্তর :...

এক যে ছিলো ইঁদুরছানা । মূল : পল চয়ে । ভাষান্তর : আল ফাতাহ মামুন

এক যে ছিলো ইঁদুরছানাএক দেশে এক ইঁদুর ছিলো। ঠিক ইঁদুর নয়। ছোট্ট ইঁদুর। একটি গাছ। গাছের নিচে ছোট্ট একটি গর্ত। এ গর্তেই ইঁদুরছানার জন্ম। শৈশবের দিনগুলো হেসে-খেলে নেচে- গেয়ে এ গর্তেই কাটিয়ে দেয় সে।
একদিন হঠাৎ ইঁদুরছানার মনে প্রশ্ন জাগে, আমি কে? আমি কী? কেন আমি এ পৃথিবীতে এসেছি? এই ছোট্ট গর্তে ধুঁকে ধুঁকে মরার জন্যই কি আমার জন্ম হয়েছে?
না। না। এভাবে তো জীবন চলে না। আমাকে বড় হতে হবে। বড়দের সঙ্গে মিশতে হবে। ঘুরে দেখতে হবে বিশাল এই পৃথিবী।
যেই ভাবা সেই কাজ। সঙ্গে সঙ্গে একটি ছোট্ট ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রওনা হয়েছে পৃথিবী ভ্রমণে। মিশন বড় হওয়া।
এর আগে কখনো গর্ত থেকে বেরোয়নি ইঁদুরছানা। এই প্রথম খোলাত আকাশের নিচে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার পর মনে হলো- বাহ! পৃথিবী তো দারুণ সুন্দর। ইশ! কেন যে আরো আগে বেরোলাম না। তাহলে তো আরো আগেই পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখতে পেতাম।
সকাল থেকে সন্ধ্যা।
সন্ধ্যা থেকে আবার সকাল।
টুক টুক করে হেঁটে চলছে ইঁদুরছানা। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ইঁদুরছানার হেঁটে চলার দৃশ্য যদি তুমি দেখতে, হাঁ করে তাকিয়েই থাকতে। কী যে ভালো দেখাচ্ছিল না ইঁদুর বাবুটিকে- বলে বোঝাতে পারব না।
আরো দু’দিন বিরতিহীন হাঁটার পর
একটি চিড়িয়াখানার সামনে এসে থামল ইঁদুরছানা। সুড়ুৎ করে চিড়িয়াখানার বাগানে ঢুকে পড়ল। কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে হালকা নাস্তা করে নেয়। এবার শুরু হলো মিশন চিড়িয়াখানা দেখা। এ বাবা! এত বড় চিড়িয়াখানা? ইয়া বড় বড় পশু-পাখি। আমি তো ওদের মতই হতে চাই। ওই যে দাড়িঅলা পশুটি, কেমন ঘো ঘো করছে; তার কাছেই যাই।
হ্যালো মিস্টার…
আই এম লায়ন। দ্য কিং অব ফরেস্ট। বনের রাজা সিংহ আমি।
ইঁদুরছানা একটু ভয় পেয়ে যায়। মনে মনে বলে, যা ব্বাবাহ! প্রথমেই রাজা মশাইয়ের সামনে এসে পড়লাম! তাতেত কী? আমি তো বড় হতে চাই। না হয় রাজা মশাইয়ের মতই বড় হলাম। মহারাজা! আমার একটি ইচ্ছা আছে।
কী ইচ্ছে বলো বৎস।
দূর থেকে দেখছিলাম কী গর্জনই না আপনি দিচ্ছেন। ভয়ে আপনার আশপাশেও ভিড়তে সাহস পায় না কেউ। হ্যাঁ! তুমি ঠিকই দেখেছে। বনে থাকার সময় আমার গর্জন শুনে থর থর করে কাঁপেনি এমন একটি প্রাণীও খুঁজে পাওয়া কঠিন।
আমি আপনার মত বড় হতে চাই। ঘো ঘো করে গর্জন করে কাঁপন ধরিয়ে দিতে চাই সবার মনে। এক দমে বলে ফেলে ছোট্ট ইঁদুর।
হা হা হা। হো হো হো। তুমি আমার মত বড় হতে চাও। আমার মতো আকাশ ফাটানো গর্জন তুলতে চাও? তোমার গলা থেকে তো চিঁ চিঁ ছাড়া কোন আওয়াজই বেরোয় না। আর আমার মত ভয়ঙ্কর চেহারা ও মাসল বডি কোথায় পাবে তুমি? বৎস! তুমি বোধ হয় পাগল হয়ে গেছো? জানে বাঁচতে চাইলে এখনই পালাও। নয়ত জলখাবারটা তোমাকে দিয়েই সারব।
এবার সত্যি ভয় পেয়ে যায় ইঁদুরছানা। কোন মতে পালিয়ে বাঁচে। ছোট্ট ইঁদুর শুনতে পায়, সিংহ রাজা এখনো হাসছে। নিজেকে নিজেই শাসাল। বলল, কী বোকামিটাই না করে ফেললাম। সিংহের মত বড় হতে চেয়েছি। এটা কি সম্ভব? কোথায় রাজামশায় আর কোথায় আমি।

এক যে ছিলো ইঁদুরছানা২.
ঘুরতে ঘুরতে চলে এলো জিরাফের কাছে। ইয়া লম্বা গলা। যেন গলা দিয়েই আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে। হ্যাঁ! আমি জিরাফের মত বড় হতে চাই। বলল ইঁদুরছানা।
হ্যালো জিরাফ আংকেল!
হায় ইঁদুরছানা! কেমন আছো খোকা!
বেশ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো আংকেল।
আমিও খুব ভালো আছি। আংকেল! তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে?
কী বিষয়ে বলতো?
আমি তোমার মত বড় হতে চাই। ইয়া লম্বা গলা দিয়ে আকাশের মেঘ ছোঁব।
ইঁদুরছানার কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্য থমকে যায় জিরাফ। ছোকরাটা বলে কী? আমার মত গলা চায়? বড় হতে চায়? কিন্তু খোকা! তুমি তো অতি ক্ষুদ্র একটা প্রাণী। আমার মত বড় হবে কী করে- বলল জিরাফ।
এই যে দেখুন না আমার গলাটাও কত্ত বড়- বলেই যতটা সম্ভব ঘাড় থেকে টেনে গলাকে লম্বা করা চেষ্টা করল। এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না জিরাফ। হো হো হো করে হেসে ফেলল। কী ভয়ঙ্কর হাসি। হাসি শুনেই ইঁদুরছানা বুঝে ফেলল- এটাও সম্ভব নয়।
দারুণ মন খারাপ নিয়ে ইঁদুরছানা এলো ঈগলের কাছে।
হায় ঈগল আন্টি!
হায় বাবুটি।
আন্টি আমি তোমার মত উড়তে চাই। সিংহ রাজা আর জিরাফ আংকেল বলেছে আমি নাকি তাদের মত বড় হতে পারব না। তুমি কিন্তু ওদের মত আমাকে না করতে পারবে না।
তুমি উড়তে চাও বাবু!
হ্যাঁ! এই দেখ না আমি উড়তে পারি বলেই দু হাত দুদিকে মেলে একবার ডানে একবার বামে লাফাতে শুরু করল ইঁদুরছানা।
এবার সত্যিই অসম্ভব হাসি পেল ঈগলের। ঈগলের হাসি দেখে ইঁদুরছানা বুঝে গেল, নাহ, সে ঈগলের মতও বড় হতে পারবে না। পারবে না বিশাল আকাশে ডানা মেলে ভেসে থাকতে। চরম কষ্ট নিয়ে পরম অপমান হয়ে ইঁদুরছানা ফিরে এলো চিড়িয়াখানার বাগানে। নিজের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখনও সিংহ রাজা, জিরাফ আংকেল আর ঈগল আন্টি আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে হেসেই যাচ্ছে।
এমন সময় চিড়িয়াখানায় ঢুকল একদল মানুষ। তারা ইয়া বড় বড় যন্ত্র দিয়ে গপাগপ করে সিংহ, জিরাফ আর ঈগল পাখিকে বন্দি করে ফেলল। খাঁচায় ঢুকিয়ে বড় বড় তালা ঝুলিয়ে দিল গেটে। ইঁদুরছানা একজনকে জিজ্ঞেস করল- ওদেরকে খাঁচায় পুরলে কেন?
লোকটি বলল, এখন চিড়িয়াখানা বন্ধ করে দেবো। একটু পরই সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমে আসবে। আর রাতে পশুদের বাইরে রাখার নিয়ম নেই।
ইঁদুরছানা দেখল, সবার চোখে-মুখে দারুণ বিরক্তির ছাপ। যেন খাঁচায় বন্দি হয়ে খুশি নয় পশু-পাখিরা।
তাহলে আমাকেও খাঁচায় ঢোকাও- লোকটিকে বলল ইঁদুরছানা।
আমাদের খাঁচা শুধু বড়দের জন্য। তোমার মত ছোট প্রাণীদের জন্য নয়। বলেই লোকটি চলে গেল।
ইঁদুরও যাওয়ার জন্য টুক টুক পায়ে এগিয়ে চলল। ইঁদুরের মন খারাপ চেহারা দেখে খাঁচার ভেতর থেকে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সবাই। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়া অবস্থা। এ ওর গায়ে পড়ে। ও এর গায়ে পড়ে।
কী হচ্ছে ভালো করে দেখার জন্য থমকে দাঁড়ায় ইঁদুরছানা। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা নিচে নামিয়ে রাখে। তখনো হেসেই চলছে সব প্রাণী।
এবার ইঁদুরছানা হো হো হো করে হেসে তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে শুরু করল। একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে সুড়ুৎ করে দৌড় দেয়। সিংহের খাঁচায় ঢুকে আবার পড়িমড়ি করে জিরাফের খাঁচায় দৌড়। চোখের পলকেই ঢুকে যায় ঈগলের খাঁচায়।
ইঁদুরছানার হঠাৎ দৌড়খেলা দেখে সবাই তো অবাক। হাসি বন্ধ করে হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে ইঁদুরছানার দিকে।অনেকক্ষণ পর ইঁদুরছানা কাঁধে ব্যাগ ঝোলাতে ঝোলাতে বলল- শুনে রাখো! আমি ছোট বলে তোমরা সবাই হাসাহাসি করছিলে। দেখলে তো, ছোট বলেই আজ আমাকে তোমাদের মত খাঁচায় বন্দী থাকতে হয়নি। যখন-তখন যেখানে খুশি চলে যেতে পারি। তাই আমার এই ছোট্ট দেহখানি নিয়েই আমি মহা সুখী।
বলেই বাড়ির পথে হাঁটা ধরল ইঁদুরছানা।

SHARE

Leave a Reply