Home গল্প নানুর যুদ্ধ জয়ের গল্প । আবদুল ওহাব আজাদ

নানুর যুদ্ধ জয়ের গল্প । আবদুল ওহাব আজাদ

নানুর যুদ্ধ জয়ের গল্পনেহাল স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে এসে দেখলো, তার জুলিয়েট চুপচাপ, কেবল ঝিমুচ্ছে, অন্যদিন হলে তার মুখে নেহাল নেহাল খই ফুটতো। জুলিয়েট তার টিয়া পাখির নাম। নেহালের আরো একটি শালিক ছানা আছে। তার নাম রোমিও। ছোট মামার ইচ্ছাতেই প্রেমের উপাখ্যানকে মূল্য দিতে এ রকম নামকরণের ব্যবস্থ করা হয়েছে। রোমিও জুলিয়েটের বিভিন্ন ধরনের ডাকাডাকিতে সারা বাড়ি সারাক্ষণ সরগরম থাকে।
ধীর পায়ে নেহাল জুলিয়েটের খাঁচার পাশে গিয়ে বলল, ‘জুলিয়েট, কথা বলছো না কেন? কী হয়েছে তোমার?’ জুলিয়েট ভাঙা গলায় কী যেন বলতে চেয়েও পারলো না। স্বরটা ভাঙা ভাঙা, আম্মা এসে দেখলেন, নেহালের মন খারাপ। রোমিও-জুলিয়েটের কিছু হলে নেহালের অবস্থাও স্বাভাবিক থাকে না। নেহাল আম্মাকে বলল, ‘জুলিয়েটের কী হয়েছে আম্মা, জুলিয়েট কথা বলছে না কেন?
আম্মা বললেন, ‘হঠাৎ ঠাণ্ডা পড়েছে তো, হয়তা শরীর খারাপ করেছে। যাও স্কুলড্রেস ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে খেতে এসো।’
নেহাল জুলেয়েটের পাশ থেকে নড়লো না। আম্মা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘সামনে তোমার ফাইনাল পরীক্ষা, এভাবে জুলিয়েটের জন্য চিন্তা ভাবনা করলে তুমিও অসুস্থ হয়ে পড়বে।’
নেহাল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘আমার কিছু ভালো লাগছে না মা, আমার খেতেও ইচ্ছে করছে না।’
আম্মা একটু ম্লান হেসে বললেন, অত 
চিন্তা করো না নেহাল, তোমার জুলিয়েটের চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে, আর তা ছাড়া তোমার মন ভালো করার লোকটি কিন্তু এখন আমাদের বাড়িতে।
নেহাল অনেকটা সহাস্যে বলল, ‘কে এসেছে আম্মা, নানু ভাই বুঝি?’
আম্মা অনেকখানি হেসে বললেন, ‘এই তো ঠিক ধরেছ, যাও আর দেরি না করে খেতে এসো, তারপর নানু ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করবে।
নেহাল অনেকখানি স্বাভাবিক হলো, নানু ভাইয়ের সঙ্গে নেহালের অনেক ভাব, নানু ভাই অনেক মজার মজার গল্প বলতে পারে। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে নানু ভাইয়ের বিছানার পাশে গেল নেহাল, নানু তখন কিছুটা বিশ্রামে ছিলেন, নানুর গায়ে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে নেহাল বলল, ‘কখন এসেছ নানু ভাই।’
নানু নেহালকে ছোট্ট করে আদর করে বলল, এইতো কিছুক্ষণ আগে নানুভাই।
নেহাল কথার রেশ না কেটেই বলল, ‘তুমি আসবে তো আমাকে আগে জানাওনি তো নানু ভাই?’
নানু ভাই বলল, ‘তোমাকে একেবারে চমকে দেবো বলে বিষয়টি জানানো হয়নি বুঝলে?’
নেহাল নানুর হাত ধরে টেনে তুলে বলল, ‘ভালো হয়েছে এখন নদীর ধারে বেড়াতে যাবো চলো। আজ কিন্তু আমাকে অনেক মজার মজার গল্প বলতে হবে।
নানু নেহালের পিঠ চাপড়ে বলল, ‘হ্যাঁ নানু ভাই, আজ আমি তোমাকে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ গল্পটি শোনাবো।’
নানু ধড়ফড় করে উঠে বসলো, আম্মা চা-নাস্তা নিয়ে ঘরে ঢুকে বললেন, তোমরা বের হচ্ছো, আর কখন ফিরবে তার ঠিক নেই, চা নাস্তা করে যাও।
চা নাস্তা সেরে নানু পাঞ্জাবিটা গায়ে ঢুকিয়ে নিলো। গলায় মাফলার জড়িয়ে নিতেও ভুল করলো না নানু ভাই। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আম্মা এসে বললেন, ‘হঠাৎ কিন্তু খুব ঠাণ্ডা পড়ছে, তোমরা যেন বেশি দেরি করো না, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসবে, নেহাল নানু ভাইয়ের হাত ধরে বাড়ি থেকে বের হলো।
একটা বিল পার হলেই বেতনার নদী। নদীর দুই পাশ দিয়ে বাবলা গাছের সারি, মাঝে মাঝে দু-একটি বটের চারা শাখা প্রশাখা বিস্তার করেছে, কখনো বা দুই একটি বকের সারি নীল আকাশ সাদা করে উড়ে যাচ্ছে।
নেহাল বেতনার বেড়ি বেয়ে নানুর হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘নানু ভাই তুমি তো ডাক্তার, দাও না আমার জুলিয়েটের রোগটা ভালো করে?’
নানু নেহালের মুখ চেপে ধরে বলল, ছি: নানু ভাই ওভাবে বলতে নেই, রোগ ভালো করার কোনো ক্ষমতা মানুষের নেই, সব ক্ষমতা আল্লাহর হাতে। তবে হ্যাঁ হোমিওপ্যাথিতে পশু পাখির ভালো চিকিৎসা আছে।
নেহাল বলল, ‘তবে সেই চিকিৎসার ব্যবস্থাটি করো নানু ভাই।’ নানু নেহালের পিঠ চাপড়ে বলল, ‘তুমি কোন চিন্তা করো না, নানু ভাই, যাওয়ার পথে বাজার থেকে সেই ঔষধটি কিনে নিয়ে যাবো।’
নেহাল এবং নানু ভাই বটের চারার নিচে গিয়ে বসলো। গোড়াটা পাকা করা, তাই বসতে অসুবিধা হলো না ওদের।
নেহাল নানুর গলা জড়িয়ে ধরে বলল, এবার সেই গল্পটি বলো নানু ভাই,
– নানু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, গল্পটি শুনবে তাহলে? শোন তবে, এটি আমার জীবনের গল্প, আমার যুদ্ধজয়ের গল্প। নানুভাই ফিরে যায় উনিশ শত একাত্তর সালে। নানুর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, স্মৃতিতে ভেসে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাগুলো। যা নানু ভাইয়ের জীবনে ঘটেছিল। নানু ভাই বলতে শুরু করলো, ‘আমি তখন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল, আমি যুদ্ধে যাবো, আমার আব্বা যুদ্ধে যেতে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন, আমি তার কথা অগ্রাহ্য করে যুদ্ধে গেলাম।
নেহাল বলল, ‘তখন তোমার বয়স কত হবে নানু ভাই?’
নানু ভাই জবাবে বলল-‘কত আর হবে; ষোলো না হয় সতেরো; গল্পটা মন দিয়ে শুনবে কেমন? নেহাল মাথা নাড়লো।
নানু ভাই আবার বলতে শুরু করলো, ‘তখন শ্রাবণ মাস, বর্ষার মৌসুম, মাঠ ঘাট পানিতে থই থই করছে, বিলের মধ্য দিয়ে কাঁচা-পাকা রাস্তাটি জেলা শহরের সঙ্গে মিশেছে।
আমরা সংবাদ পেলাম, এ পথ দিয়েই পাক সেনারা আসবে। আমরা চল্লিশজনের একটি টিম নিয়ে ফটকের বিলে অবস্থান করতে লাগলাম। ভয়ও করছিল প্রচুর। পাক সেনারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে সামনে এগিয়ে আসছে। আমাদের কমান্ডার আরিফ হাসান বললেন, কোন রকমে পিছপা হওয়া যাবে না। আমাদেরকে বিলের মধ্যে গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে থাকতেই হবে এবং পাক সেনাদের ফলো করতে হবে। ব্যস যেই কথা সেই কাজ, আমরা তাই করলাম, কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অনেক…। নেহাল বলল, কী সমস্যা নানু ভাই। নানু ভাই বলল, সমস্যার কি শেষ আছে নানু ভাই। পানিতে পচা লাশের গন্ধ, সাপ- পোকের ভয়, মাঝে মাঝে গুলির শব্দ, চারিপাশ থেকে আর্তচিৎকার ভেসে আসছে গ্রামে গঞ্জে পাক সেনাদের অত্যাচার।
আমরা তখন শাহবাজপুর গ্রামের একটা বিলে অবস্থান করছি। মিলিটারিরা গ্রামে পৌঁছেছে এই মেসেজ পেয়ে আমরা একটু উঁচু জায়গায় ঝোপের ভেতর অবস্থান নিলাম; কিছুক্ষণের মধ্যে তিনখানা মিলেটারির গাড়ি শাহবাজপুর গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়লো। আমরাও পজিশন নিয়ে থাকলাম। ওরা ঝোপঝাড় দেখলে নির্বিচারে গুলি চালাতো। আমরা যেখানে ছিলাম, সেখানে ওরা গুলি চালাতে শুরু করলো। আমার সহকর্মী মিজানের পায়ে একটি গুলি লাগলো। মিজান চিৎকার করে উঠলো। কমান্ডার বললেন, ওর মুখ চেপে ধরো, যেন চিৎকার করতে না পারে। কমান্ডার আমাদের গুলি চালাতে দিলেন না। হয়তো তার কোন নতুন মতলব ছিল। ওরা আজ গ্রামে আসবে এবং এই পথ দিয়ে জেলা শহরে প্রবেশ করবে এ সংবাদও কমান্ডার জানতেন। শাহবাজপুর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে হায়াতপুর ব্রিজ। কমান্ডারের নির্দেশে একটি দল সেই ব্রিজ মাইন মেরে উড়িয়ে দিল। পাক সেনারা আর এগোতে পারলো না। সেখানেই ওদের গাড়ি থেমে গেল। পেছন থেকে আমরা এগোলাম, চারিপাশ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা জড়ো হলো, এবার আমরা এক সঙ্গে অ্যাটাক করলাম পাক সেনাদের ওপর। ওরাও গুলি ছুড়লো কিন্তু পারলো না। আমাদের বিভিন্ন রকম যুদ্ধকৌশলের কাছে ওরা হার মানলো। কয়েকজন পাক সেনা আমাদের গুলিতে নিহত হলো। আর শেষে ওরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো। আরো যে কত ঘটনা ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তা বলে শেষ করা যাবে না নানু ভাই।
নেহাল বলল, ‘এই জন্যই তো তোমরা দেশের শ্রেষ্ঠসন্তান নানুভাই।’
নানুভাই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, ঐ টুকুই আমাদের পরম পাওয়া, ঐ টুকুই আমাদের সান্ত্বনা।’
নেহাল নানু ভাইকে নিয়ে যখন বাড়ি ফিরলো তখন অনেক রাত। তারপরও নেহাল জুলিয়েটের ক্ষীণ স্বরে ডাক শুনতে পেল- নেহাল নেহাল। 

SHARE

Leave a Reply