Home সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস নাবিলের কান্না । জুবায়ের হুসাইন

নাবিলের কান্না । জুবায়ের হুসাইন

নাবিলের কান্না

গত সংখ্যার পর

বাড়িটার সামনে আসতে আসতে রাতের আঁধার নেমে গেলো। দূর থেকে কেমন ভুতুড়ে মনে হচ্ছে বাড়িটাকে। গা ছমছম করে ওঠে এমনিতেই। তারেক একেবারে বিপ্লবের গায়ের সাথে সেঁটে গেছে। তাতে হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে বিপ্লবের। তারপরও কিছু বলল না বিপ্লব। এতে যদি ওর ভয় কিছুটা কমে তাতে ক্ষতি কী?
ডিটু ভাইয়া ফিসফিস করে বলল, ‘কেঁচো খুঁড়তে কেমন সাপ বেরিয়ে গেল, তাই না?’
বিপ্লব বলল, ‘আমার কাছে বিষয়টা এখনও কেমন ঘোলাটে লাগছে। তবে আশা করছি নাহিদ ও নাদেরের সাথে কথা বললে রহস্যটা পরিষ্কার হবে।’
কথা বলতে বলতে ওরা বাড়িটার সামনে চলে এলো। বিপ্লব বলল, ‘আমার মনে হয় সামনে দিয়ে না ঢুকে পেছন দিয়ে ঢোকাই শ্রেয় হবে।’
কথা না বাড়িয়ে ওর কথাই মেনে নিলো অন্যরা। জানে, বিপ্লব এমনি এমনি কিছু বলে না।
বিপ্লব আসলে বাড়িটাকে একটু ঘুরে দেখতে চায়। ভেতরে যদি কিছু ঘটে থাকে তাহলে আড়ালে থেকে সেটা জেনে নিতে চায় ও। আর ওর মন বলছে এখানে কিছু একটা ঘটছে। তাই আরও বেশি উত্তেজনা অনুভব করছে।
পাঁচিলের ভেতরটা বেশ অন্ধকার। বাড়ির ভেতরের একটা বাতি থেকে চুইয়ে এক চিলতে আলো এসে পড়েছে বাইরে। তাতেই কিছুটা দেখা যাচ্ছে। আর এটা বরং অন্ধকারকে আরও বেশি গাঢ় করে তুলেছে। যাকে বলে ‘আলোর নিচে অন্ধকার!’
পাঁচিল ধরে হাতের ওপর ভর দিয়ে তাতে উঠে বসল বিপ্লব। উঠে এলো ডিটু ভাইয়াও। তারেককে উঠতে সহযোগিতা করল বিপ্লব। তারপর এক এক করে ভেতরে নামল। চেষ্টা করল শব্দ না করার।
একটাই জানালা দিয়ে বাইরে আলো আসছে। তবে জানালাটা ওপরে থাকায় ভেতরের কিছু দেখা যায় না। বাড়ির চারপাশটা একবার ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিলো বিপ্লব।
ছোটখাটো গাছগাছালিতে ঘেরা বাড়ির চারপাশটা। নানা রকমের ফুলের গাছও আছে। কিন্তু কোন্টা কী গাছ তা এই অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না। বোঝার চেষ্টাও করল না ওরা।
একটা জানালার নিচে যেতেই ভেতর থেকে গোঙানির একটা শব্দ পেল ওরা। কাউকে বুঝি প্রহার করা হচ্ছে। এবং সেটা বাচ্চা ছেলের কণ্ঠ বলেই মনে হচ্ছে। কিছুটা থমকে দাঁড়ালো সবাই। তারপর ঘুরে মেইন দরোজার কাছে চলে এলো।
কলিংবেলে চাপ দিল বিপ্লব। মিষ্টি একটা আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ল ভেতরে। কিন্তু দরোজা খুলল না। আবার চাপ দিল। কিছুটা বিরক্ত হয়েই যেন কেউ এগিয়ে এলো। ঝট করে খুলে গেল দরোজা। বয়স্ক এক লোক মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে? কাকে চাই?’

নাবিলের কান্নাছয়.
থতমত খেয়ে গেল ছেলেরা। এমনটি আশা করেনি।
দ্রুত নিজেকে সামলে নিলো বিপ্লব। বলল, ‘নাহিদ ও নাদের ভাইয়া আমাদের আসতে বলেছিলেন।’
‘কী যেন…’ মাঝপথে থেমে গেল তারেক পেটে বিপ্লবের গুঁতো খেয়ে।
বিপ্লব আবার বলল, ‘ক্লাসের একটা বিষয়ে নাহিদ ভাইয়ার সহযোগিতা দরকার। তাই আমাদের আসতে বলেছেন।’ সত্যি কথাই বলল ও। নাহিদের কাছ থেকে একটা বিষয় সত্যিই জানার আছে তার।
লোকটা বললেন, ‘কিন্তু রাতে কেন? তোমরা বরং…’
‘ও তোমরা এসে গেছ?’ লোকটার পাশ থেকে বলে উঠল নাহিদ। ‘আব্বু, ও ডিটেকটিভ স্যরি ডিটু ভাইয়া, ও বিপ্লব আর ও তারেক। ওরা খুবই ভালো ছেলে। আর বিপ্লব তো ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটা জটিল রহস্যের সমাধানও করে ফেলেছে। কেন, টিভিতেই তো নিউজ করেছে, কিশোর গোয়েন্দা বিপু ভাইয়া ভেদ করল কালো ব্রিফকেস রহস্য।’
‘ও হ্যাঁ, দেখেছিলাম নিউজটা!’ বলে সরে দাঁড়ালেন নাহিদের আব্বু। চলে যেতে যেতে বললেন, ‘বেশি সময় নষ্ট করো না। তাড়াতাড়ি কাজ সেরে পড়তে বসবে।’ বিপ্লব খেয়াল করল এই সময় নাহিদের আব্বুর সাথে আরও একটা লোক যোগ দিলেন। নাহিদের আব্বুকে আগে থেকেই চিনলেও এই লোকটাকে আগে কোথাও দেখেছে বলে মনে করতে পারল না।
ওদেরকে নিজের রুমে নিয়ে গেল নাহিদ। সেখানে নাদের ওদেরই অপেক্ষা করছে। বসল ওরা। নাহিদ বলল, ‘আমাদের আব্বুটা অমনই। এই কারণে আমরা দু’ভাই খুবই সমস্যায় আছি। আমাদের কোনো বন্ধুকেই তিনি সহ্য করতে পারেন না। বাড়িতে কোনো মেহমান আসুক তাও চান না। অথচ তিনি আগে এমন ছিলেন না। ছোট চাচা মারা যাওয়ার মাসখানেক আগে থেকেই এই ব্যাপারটা ঘটছে।’
‘ওই লোকটা কে?’ সরাসরি প্রশ্ন করল বিপ্লব।
‘খেয়াল করেছ তাহলে?’ বলল নাহিদ। ‘নাহ্, মানতেই হচ্ছে তুমি জিনিয়াস। উনি আব্বুর বন্ধু। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন। অবশ্য সেটা তিনি দাবি করেন। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা বলতে নাদের, আমি ও আম্মু। লোকটাকে কেমন সন্দেহ সন্দেহ লাগে।’
‘মানে?’ ভ্রূজোড়া কুঁচকে উঠল বিপু ভাইয়ার। ‘কিসের সন্দেহ?’
‘না তেমন কিছু না।’ একটু দ্বিধা করলেও পরে বলল, ‘আমাদের পরিবারের সব কিছুতেই ইদানীং নাক গলাতে শুরু করেছেন তিনি।’
‘আমি খেয়াল করেছি লোকটা আমাদের বাড়িতে পা রাখার পর থেকেই আব্বু বদলে যেতে শুরু করেছেন।’ এতক্ষণ পর মুখ খুলল নাদের।
ডিটু ভাইয়া বলল, ‘একটু খুলে বলবে?’
নাহিদ বলল, ‘তার আগে চলো নাবিলকে দেখে আসি।’
একটা বন্ধ দরোজার সামনে এসে থামল ওরা। ভেতর থেকে নিচু স্বরে গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে নাহিদ ও নাদেরের দিকে তাকাল ওরা। নাহিদ বলল, ‘এসো ভেতরে ঢুকি।’
দরোজা খুলে লাইট জ্বেলে ভেতরে ঢুকল ওরা। অন্ধকার কোনায় জবুবু হয়ে পড়ে আছে একটা ছেলে। মিষ্টি চেহারায় ছড়িয়ে পড়েছে বেদনার ছাপ। কেমন যেন শুকানো একটা ভাব সে চেহারায়। দেখলেই মায়া লাগে। তখনও ডুকরে ডুকরে কাঁদছে ও।
নাবিলের এই চেহারাটা বড্ড খারাপ লাগছে বিপ্লবের চোখে। সেই সতেজ, সুন্দর, ছটফটে ভাবটা নেই ওর চেহারায়। বুদ্ধিদীপ্ত ভাবটাও উধাও হয়ে গেছে। তার জায়গা দখল করে নিয়েছে ভয়, বেদনা ও কোনো কিছু হারানো শঙ্কা!
‘ওই হচ্ছে নাবিল।’ বলল নাদের। ‘ছোট চাচার ছেলে।’
বিপ্লবের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল নাবিল। চোখে মুখে অনেক জিজ্ঞাসা ওর, বুঝল বিপ্লব।
‘ওর এই অবস্থা কেন?’ জিজ্ঞেস করল তারেক।
ওর কথার কোনো জবাব দিল না কেউ। নাহিদ নাবিলকে বুকে জড়িয়ে ধরল। নাবিল কেমন গুটিয়ে রইল নিজের মধ্যে। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, না ঘুমানোর জের।
‘পানি খাব!’ কাতর কণ্ঠে বলল নাবিল।
নাদের গ্লাসে পানি ঢেলে ওর মুখে ধরল। ঢকঢক করে পানিটুকু খেয়ে ফেলল নাবিল। নাদের যতেড়বর সাথে ওর মুখ মুছিয়ে দিল।
‘চলো আমার রুমে গিয়ে বসি।’ বলল নাদের। নাবিল আবার নিজের জায়গায় ফিরে গেল।
বিপ্লব কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। আড়চোখে দেখল নাবিল ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। কিছু যেন বলতে চায় ওকে।
ওরা আবার নাহিদদের রুমে ফিরে এলো। তবে কথা বেশি দূর এগোলো না। আব্বু পাশের ঘর থেকে ডেকে বললেন, ‘নাহিদ নাদের, দ্রুত কথা শেষ করে পড়তে বসো। সময় নষ্ট করা আমি একদম সহ্য করতে পারি না।’
অগত্যা বিপ্লবদের বিদায় নিতে হলো। তবে নাহিদ বলল ওরা যেন কাল স্কুল ছুটি হলেই চলে আসে। তখন আব্বু বাসায় থাকবেন না। মন খুলে কথা বলা যাবে।

সাত.
স্কুল ছুটি হতেই ড্রেস চেঞ্জ করে কোনমতে কিছু মুখে দিয়েই ছুটল নাহিদদের বাড়ির উদ্দেশে।
নাবিল যেতে চাইল না। তবুও ওকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো দু’ভাই- নাহিদ ও নাদের।
বাগানে বসার জন্য একটা জায়গা করা আছে এক জায়গায়। ওখানে বসল সবাই। বিপ্লব জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছো নাবিল ভাইয়া? এখন একটু ভালো লাগছে?’ নাবিল কিছু বলল না। কেবল ওপর-নিচ মাথা নাড়ল বার দুয়েক- অর্থাৎ হ্যাঁ, এখন একটু ভালো আছে ও।
‘কিন্তু বললে না তো ওর এই অবস্থা কিভাবে হলো?’ গত রাতের প্রশ্নটা আবার করল তারেক।
‘বলছি, সব বলছি তোমাদের।’ জবাব দিল নাহিদ। তারপর ও যে বর্ণনা দিল তা এ রকম :
নাহিদদের আব্বুরা দুই ভাই- ওদের আব্বু নাসরুল্লাহ ও নাবিলের আব্বু নাইমুল্লাহ। সুখের সংসার ছিল ওদের। দুই ভাইয়ের মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে চলছিল দিন। বিশাল সম্পত্তির সমান দুই অংশ দুই ভাইকে দিয়ে গেছেন তাদের বাবা। নাবিলের মা মারা গিয়েছেন নাবিল জন্ম নেয়ার সময়। তখন থেকে নাহিদদের আম্মুই নাবিলকে দেখাশুনা করে আসছেন। ওকে তিনি তার ছোট সন্তানের মতোই মনে করেন এবং সেভাবেই দেখভাল করেন। মাসখানেক আগে নাইমুল্লাহ মারা যান ব্লাড ক্যান্সারে। এর কিছুদিন আগে নাসরুল্লাহর এক বন্ধু জোটে। নাম- মিজানুর। মূলত তিনি এ বাড়িতে আসার পর থেকেই নাসরুল্লাহর মধ্যে কেমন একটা পরিবর্তন সূচিত হয়। নাইমুল্লাহকে বিভিনড়বভাবে চাপ দিতে থাকেন তার অংশের জমির অর্ধেকটা নাসরুল্লাহর নামে লিখে দিতে। তিনি রাজি হন না। মাসখানেক আগে তিনি মারা যাওয়ার পর নাবিলের ওপর শুরু হয় অত্যাচার। বিভিন্নভাবে তাকে টর্চার করা হয়। প্রায় প্রতি রাতেই তার ওপর নির্যাতন করা হয়। জমির দলিলটা হাত করার জন্যই নাসরুল্লাহর এই অত্যাচার। কিন্তু নাবিল ছোট মানুষ, সে কিভাবে জানবে তার বাবা জমির দলিল কোথায় রেখে গেছেন? নাসরুল্লাহ যখন নাবিলের ওপর অত্যাচার করেন তখন মিজানুর পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দেন। নাহিদদের আম্মু এটা মেনে নিতে পারেন না। তাই নাবিলের আম্মুর কিছু গহনা আর আব্বুর ছোট্ট ডায়েরিটা নাহিদদেরকে দিয়ে বলেন কোথাও রেখে আসতে। পুলিশকে জানায়নি পরিবারের কথা চিন্তা করে। নাহিদরা সেই মুহূর্তে জিনিসগুলো রাখার কোনো জায়গা খুঁজে না পাওয়ায় ওই জঙ্গলে রাখতে গিয়েছিল তাৎক্ষণিকভাবে। আর তখনই সেটা নজরে পড়ে ওদের।
সব কথা শোনার পর কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না কেউ। ঘরের মধ্যে তখন পিনপতন নীরবতা।
তবে নীরবতা ভেঙে ডিটু ভাইয়াই বলল প্রথমে, ‘তোমাদের আম্মু পারেননি তোমাদের আব্বুকে থামাতে?’
নাদের বলল, ‘আম্মু অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পারেননি। এখন আর কিছুই বলেন না।’
নাহিদ যোগ করল, ‘বলেই বা কী লাভ? আব্বুর মধ্যে যে লোভ দানা বেঁধেছে তা ছাড়াতে হলে বড় একটা ধাক্কার দরকার। জানি না শেষ পর্যন্ত কী হবে!’
নাদের বলল, ‘জানো, নাবিলের জন্য বেশ মায়া হয়। অতটুকু একটা ছেলে। অত অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে শেষে যদি…’ কথা না বলে থেমে যায়। পরিণতি ভেবে যেন শিউরে ওঠে।

[চলবে]

SHARE

Leave a Reply