Home প্রচ্ছদ রচনা কবি আল মাহমুদ স্মৃতির সাগরে ঢেউ । মোশাররফ হোসেন খান

কবি আল মাহমুদ স্মৃতির সাগরে ঢেউ । মোশাররফ হোসেন খান

বিশ্বময় আল মাহমুদ
সবুজের ছবি
স্মরণে-মননে জাগ্রত
জীবন-জয়ী কবি।
কবি আল মাহমুদ!

আল মাহমুদ
জন্ম : ১১ জুলাই ১৯৩৬
মৃত্যু : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর তুলনারহিত কবিতা, গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, ভ্রমণ, শিশুসাহিত্যসহ বাংলা সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় কবি আল মাহমুদের বিচরণ। এ এক বিস্ময়কর ব্যাপার বটে!
বিশ্বসাহিত্যের নিবিড় পাঠক ছিলেন তিনি। এই ব্যাপক পাঠের ফলে আমি মনে করি তিনিও বিশ্বসাহিত্যের একজন অন্যতম কবি হিসাবে দ্বীপ্তিমান ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে তাঁকে এই জাতি সেইভাবে মূল্যায়ন করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতা আমাদের জন্য এবং এই জাতির জন্য খুবই লজ্জার বিষয়।
এটা আমাদের মনে রাখতে হবে যে কবি আল মাহমুদের মত এত বড় বিস্ময়কর কবি চল্লিশ দশকের পর আর বাংলাদেশে এমনভাবে উদিত হননি। তাঁর সাহিত্যের সক্ষমতা বুঝতে এই জাতি ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়। জাতি অর্থ তার পাঠকের কথা আমি বলছি না। বরং জাতির কর্ণধার যারা, যারা ক্ষমতার অধিকারী তাদেরকেই আমি বোঝাতে চাচ্ছি। রাষ্ট্রযন্ত্র যাদের হাতে তাদেরকেই আমি উদ্দেশ্য করে কথাটি বললাম। খুব বেদনার সাথে লক্ষ করলাম কবির ইন্তেকালের আগে এবং পরে, এত বড় একজন কবি হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোন প্রকার সুবিচার করা হয়নি। অথচ সামান্য কোন লেখক মারা গেলে, আর সেই লেখক যদি ক্ষমতাসীন দলের হয় তাহলে সেই দল এবং রাষ্ট্রীয় শোক বাণী পত্রিকায় আসে। সকল প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত হয়। কিন্তু আফসোসের বিষয়, কবি আল মাহমুদের মত একজন বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি মারা গেলেন অথচ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোন একটি শোক বাণীও এল না! জাতি হিসেবে তাহলে আমাদের আস্থা এবং অবস্থান কোথায়? বিষয়টি ভাববার বিষয় বটে!

সাহিত্য সন্ধ্যায় প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান
সাহিত্য সন্ধ্যায় প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান

কবি আল মাহমুদের বিষয়ে এই মুহূর্তে আমার বুকে, আমার হৃদয় ও মননে এক স্মৃতির তুফান কেবলই দোল খাচ্ছে। সেই দোল এখন টাইফুনে রূপ নিয়েছে। বলা যায় এ এক মহা সাইক্লোন! কবি আল মাহমুদের সাথে আমার পরিচয় দীর্ঘকালের। সেই ১৯৮৫ সালের নভেম্বরে। ঢাকায় এসে প্রথম দেখা হয়েছিল তাঁর সাথে। আর শেষ সাক্ষাৎ কিংবা বিদায় হল ১৫ ফেব্রুয়ারি। সুতরাং মাঝখানে যে বিশাল একটা সময় বয়ে গেছে কবি আল মাহমুদ ভাই এবং আমার মধ্যে সেটা ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ এক সময়। আমরা একসাথে সাহিত্যের পথে হেঁটেছি অনবরত। কখনো থামিনি। তিনি আমার চেয়ে অনেক অগ্রজ ছিলেন। কিন্তু সম্পর্কটা ছিল সম্পূর্ণ ভাইয়ের মত। বন্ধুর মত। আমরা একসাথে হলেই সেই দিকটি ফুটে উঠত। হয়তো আমি কখনো আনমনাভাবে হাঁটছি। হঠাৎ পেছন থেকে ডাক এলো, এই যে কবি! ব্যাস! পেছনে তাকিয়ে দেখি আল মাহমুদ ভাই হাসছেন। তিনি খুবই আদর করতেন আমাকে। বলতেন, প্রকৃত একজন কবির স্বভাব তোমার ভেতরে আছে। তুমি কবিতার পথেই হাঁটছো, এটাই তোমার সঠিক পথ। চলতে থাকো। কবিদের পথ কখনো শেষ হয় না। কবিদের পথের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। আমি আজ, এই ৬১ বছর বয়সে এসে মাহমুদ ভাইয়ের সেই কথাগুলি বারবার স্মরণ করি। এখন তো বেশি করে স্মরণে আসছে। তাঁর সাথে কত সাহিত্য সভায় গিয়েছি। আলোচনা করেছি। কত সাহিত্য-আলোচনা, কত স্মরণ সভা ও সেমিনার, কত বিশাল বিশাল সাহিত্য আয়োজনে আমরা একসাথে আলোচনায় অংশ নিয়েছি। ঢাকার বাইরেও অনেক সময় মাহমুদ ভাইয়ের সাথে আমাকে যেতে হয়েছে। আমিও অতিথি হিসেবে তাঁর সাথে গিয়েছি। সে এক অন্যরকম অনুভূতি!
তিনি সবসময়ই সাহিত্যের পথে হেঁটেছেন এবং তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে সর্বক্ষণ মাতিয়ে রাখতেন সেইসব কথা বলে যে কথায় আমি বা আমরা তরুণ কবিরা জেগে উঠতে পারি, স্বপ্ন দেখতে পারি। হ্যাঁ, কবি আল মাহমুদ ভাই অনেক বেশি ভালোবাসতেন আমাকে। শুধু কবিতার জন্য, শুধু সাহিত্যের জন্য। আজ এটা আরো বেশি করে উপলব্ধি করতে পারছি। এটাও বুঝতে পেরে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠছে যে, এদেশে বাংলা সাহিত্যের যিনি প্রাজ্ঞ ও প্রবীণ অভিভাবক ছিলেন- সর্বশেষ আমাদের সেই অভিভাবকও চলে গেলেন। আমরা এখন অভিভাবকহীন হয়ে পড়লাম। শুধু আমরা নই, আমি মনে করি গোটা বাংলা সাহিত্যই এখন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। কবি আল মাহমুদের অবস্থানে পৌঁছানো কিংবা তার সমকক্ষ হয়ে কাউকে উঠে আসা খুব সহজ ব্যাপার নয়। এই শূন্যতা পূরণ হতে কত সময় লাগবে সেটা আমার জানা নেই।
যাক খুব সামান্য কথার মধ্য দিয়ে বললাম তাঁর সাথে আমার সম্পর্কের বিষয়টি। আরো অনেক কিছু বলার আছে। সময় সাপেক্ষে ইনশাল্লাহ সে সব বলা যাবে।

কিশোরকণ্ঠের নতুন অফিস উদ্বোধন ও দোয়া অনুষ্ঠানে কবি আল মাহমুদ
কিশোরকণ্ঠের নতুন অফিস উদ্বোধন ও দোয়া অনুষ্ঠানে কবি আল মাহমুদ

আমি এখন কিশোরকণ্ঠ কেন্দ্রিক তাঁর যে সম্পৃক্ততা এবং তাঁর যে অবদান সে সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই। না বললে কিশোরকণ্ঠ পরিবারের ঋণটা অপরিশোধ্য হয়ে থাকবে বলে মনে করি। কিশোরকণ্ঠ পত্রিকাটি বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত এবং প্রসারিত একটি পত্রিকা। যে পত্রিকার ব্যাপ্তি এখন বাংলাদেশ ছাড়িয়েও গোটা বিশ্বের আকাশ স্পর্শ করেছে। এটা আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী। কিশোরকণ্ঠের সাথে আমি প্রায় ৩০ বছর যাবত কোন না কোনভাবে বা পর্যায়ে যুক্ত আছি। এই ৩০ বছরের কিশোরকণ্ঠের বহু কিছুই আমাকে করতে হয়েছে, দেখতে হয়েছে, করাতে হয়েছে এবং কিশোরকণ্ঠের সাথেই চলতে হয়েছে। সুতরাং এ সম্পর্কিত আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিটা নেহায়েত কম নয়। সে সম্পর্কেও বিস্তারিত আরও অনেক কিছু বলা যাবে যদি সময় পাওয়া যায়। এখন বলছি কবি আল মাহমুদ ভাইয়ের কথা। কিশোরকণ্ঠ সম্পাদনা করতে গিয়ে যখনই কবি আল মাহমুদ ভাইয়ের কাছে আমি লেখা চেয়েছি, তিনি অকুণ্ঠচিত্তে শত ব্যস্ততার মধ্যেও আমার দাবি মেনে নিয়েছেন। তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিশোরকণ্ঠে লিখেছেন এবং সকল সময় কিশোরকণ্ঠকে নিজের পত্রিকা হিসাবেই মনে করতেন। মনে পড়ছে ২০০২ সালের কথা। কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার সে বছরই প্রথমবারের মতো দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মাত্র তিন জনকে পুরস্কার দেওয়া হবে। সেইত তিনজনের ভেতর প্রথমেই কবি আলত মাহমুদ ভাইয়ের নামটি উঠে এলো।ত তিনি কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার পেলেন প্রথমবারেই।

২০০২ সালে কবি আল মাহমুদকে পুরস্কার প্রদানের মধ্য দিয়ে কিশোরকণ্ঠের সাহিত্য পুরস্কার প্রদানের সূচনা হয়
২০০২ সালে কবি আল মাহমুদকে পুরস্কার প্রদানের মধ্য দিয়ে
কিশোরকণ্ঠের সাহিত্য পুরস্কার প্রদানের সূচনা হয়

প্রতি মাসে একবার কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত হতো। মাঝে মাঝে কিছুটা গ্যাপ গেলও এর ধারাবাহিকতা প্রায় অক্ষুণ্ণ ছিল। মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম, যে ছিল কিশোরকণ্ঠ পত্রিকার সহকারি সম্পাদক সে-ই সাহিত্য সভার ব্যবস্থাপনায় ছিল। এখন সে বিদেশে অবস্থান করছে। কিশোরকণ্ঠের জন্য সেও অনেক কিছু করেছে। তার অবদান অনস্বীকার্য। যাই হোক, কিশোরকণ্ঠের একটি সাহিত্য সভা একবার অনুষ্ঠিত হলো ৬০/সি পুরানা পল্টনে। অফিসের ফ্লোরে। সেখানে মেহমান হিসেবে ছিলেন সাংবাদিক-লেখক সানাউল্লাহ নূরী, ভাষা সৈনিক ও কথাশিল্পী অধ্যাপক শাহেদ আলী, ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ, অধ্যাপিকা চেমন আরা ও কবি আল মাহমুদ। আর আমি তো পত্রিকাটি সম্পাদনার সূত্রে সেই সাহিত্য সভায় ছিলামই। আমরা সবাই ফ্লোরে বসে আছি। কেবলমাত্র অসুস্থতার জন্য শাহেদ ভাই লাঠি হাতে একটা চেয়ারে বসে ছিলেন। সেদিন ছিল যেন ঝলমলে তারার মেলা! পুরো রুমটি এক অন্যরকম আবহে রূপান্তরিত হল। প্রায় সমবয়সী এক ঝাঁক উজ্জ্বল তারা- যারা প্রত্যেকেই বাংলা সাহিত্যের কর্ণধার। নিজেদের মধ্যে তাঁরা স্মৃতিচারণ করছেন। তারপর কত শত রকমের খুনসুটি! সে এক ভীষণ মজাদার বিষয় ছিল! সামনে বসেছিল নবীন-তরুণ লেখক কবি- যারা লেখা পড়তে এসেছিল, তারা সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল তাদের সেই মিলন মেলা দেখে। আমি আজও মনে করি ওই মিলনমেলাটি ছিল আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরতম মিলন মেলা। এ ধরনের বড় বড় কবি সাহিত্যিক একসাথে খুব বেশি আর বসার সুযোগ হয়নি ঠিক তেমনভাবে। পরবর্তীতে অবস্থা খারাপের দিকে চলে গেছে। একজন আরেকজনের সাথে প্রায় দেখাই হতো না। সেটাও একটি অধ্যায় বটে!
যাই হোক ১৯৯২ সালে প্রথমবার চালু হওয়া কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার কবি আল মাহমুদ ভাই পেলেন। এতে করে তিনি যে কী পরিমাণ খুশি হলেন সে কথা ভাষায় প্রকাশ করে বোঝানো যাবে না। একজন কবি যখন খুশি হন তখন তিনি শিশুদের মত হয়ে যান। কবি আল মাহমুদ ভাই একজন আপাদমস্তক কবি। সুতরাং তাঁর খুশির বহিঃপ্রকাশটাও ছিল তেমনি। পরদিন আমি তাঁর বাসায় গেলে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোমরা আমাকে পুরস্কার দিয়েছো, আমি খুবই খুশি হয়েছি। এত সুন্দর সম্মাননা তোমরা দিতে পারো? আমি ধারণাও করতে পারিনি। তবে জেনে রেখো, যারা কবিদের সম্মান করতে জানেনা, বুঝতে পারে না তারা বড় দুর্ভাগা।
আমি হেসে বল্লাম, আল্লাহ কবিদের খুবই পছন্দ করেন। আল্লাহর রাসূল (সা) কবিদের পছন্দ করতেন। সাহাবীদের অনেকেই কবি ছিলেন। কবি যে কেউ হতে পারে না। চেষ্টা করলেই কবি হওয়া যায় না। কবি হয়ে ওঠা কারোর চেষ্টার ওপর নির্ভর করে না। এর পেছনে আল্লাহর বিশেষ রহমত লাগে। সবাই কি কবি হতে পারে? চেষ্টা তো সবাই করে। কৈশোর বয়স থেকে লেখাপড়ার বয়স পর্যন্ত এবং চাকরির আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় সবাই কিছু না কিছু লেখালিখি করেছে এবং করে। কিন্তু তারপর কি হয়? ছিটকে পড়ে যায় অধিকাংশই। তাদের আর সম্ভব হয় না কবি হয়ে ওঠা। কবি হওয়া এত সহজ ব্যাপার নয়। একটা জীবন সম্পূর্ণভাবে কবিতার পেছনে, সাহিত্যের পথে বিলিয়ে দিতে হয়। তারপর একজন কবি হয় উঠতে পারে। নিজের অনেক কিছুই, অনেক স্বপ্ন, অনেক ইচ্ছা- সবকিছু পাশে ফেলে কবিকে একা, নিঃসঙ্গভাবে চলতে হয় কবিতার জন্য, সাহিত্যের জন্য। তাকে এই নিঃসঙ্গতার আশ্রয় নিতে হয় কেবল কবিতার জন্য। তা না হলে তিনি কবি হয়ে উঠতে পারেন না। সর্বোপরি আল্লাহর বিশেষ সাহায্য ছাড়া তো কবি হওয়া কোন প্রকারেই সম্ভব নয়। এই কথাগুলো এতটাই বাস্তব যে, যারা কবিতার পথে, সাহিত্যের পথে হাঁটছেন তাঁরা নিজেরাই উপলব্ধি করতে পারবেন।
কবি আল মাহমুদ ভাইয়ের বাসায় প্রতি মাসে কিশোরকণ্ঠ যায়। নিয়মিত তিনি মন দিয়ে পড়েন। আমার সাথে যখনই দেখা হতো তখনই তিনি পত্রিকার ভালো-মন্দ সকল দিক নিয়ে কথা বলতেন। কিশোরকণ্ঠের সাহিত্য সভা যখন হত তখনো তিনি কিশোরকণ্ঠের ভূয়সী প্রশংসা করতেন। আবার কখনো বা ছোটখাটো ভুল ত্রুটিগুলো দেখিয়ে দিতেন। এভাবে তিনি একজন অভিভাবকের মতো পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। আগেই বলেছি, প্রায় ৩০ বছর যাবত ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছি কিশোরকণ্ঠের সাথে। কিন্তু, প্রথম দিকে আমার নাম আমি ব্যবহার করতে দিতাম না বিশেষ কারণে। তবে যখন সিদ্ধান্ত হল আমার নাম যাবে উপদেষ্টা সম্পাদক হিসাবে তখন আমি আর অন্যদিকে চিন্তা না করে সম্মত হলাম। ওই সময় সম্পাদক হিসাবে নাম যেত মতিউর রহমান আকন্দ ভাইয়ের আর প্রকাশক হিসেবে নাম যেত আমার বন্ধু কবি মতিউর রহমান মল্লিকের। কয়েক বছর পর আবার সিদ্ধান্ত হল, বিশেষ করে রেজিস্ট্রেশনের ব্যাপারে সমস্যা হওয়ার কারণে সম্পাদকের নাম পরিবর্তন করতে হবে। তখন সিদ্ধান্ত হল কিশোরকণ্ঠের উপদেষ্টা হিসাবে কবি আল মাহমুদ ভাইয়ের নাম যাবে আর পত্রিকাটি রেজিস্ট্রেশন নেওয়া হবে আমার নামে। সম্পাদক হিসাবে। প্রকাশক হিসাবে মতিউর রহমান আকন্দ ভাইয়ের নাম যাবে। এটা ২০১০ সালের কথা। সেই ২০১০ সাল থেকে এই ফেব্রুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত কবি আল মাহমুদ ভাইয়ের নাম মাসিক নতুন কিশোরকণ্ঠে উপদেষ্টা হিসাবে গেছে। কিন্তু আমার কাছে বড় বিস্ময়কর মনে হয় এটাই যে, এই দীর্ঘ সময় ধরে তিনি একটি দিনের জন্য কিংবা একবারের জন্য কখনো বলেন নি যে, আমি কিশোরকণ্ঠের উপদেষ্টা। সুতরাং তোমরা কী করছ এগুলো আমাকে প্রতি মাসে জানাও না কেন? এ ধরনের প্রশ্ন তিনি কখনোই করেননি। বরং যখনই দেখা হয়েছে তখনই তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে বলেছেন আমি তোমাকে প্রকৃত অর্থেই একজন কবি ও সম্পাদক হিসাবে জানি তুমি কতটা শক্তিশালী। আমি সে কারণেই তোমার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পারি এবং রেখে আসছি। মাহমুদ ভাইয়ের কথা শুনে আমার চোখদুটো ছল ছল করে উঠত। তিনি এতটা আস্থা আমার ওপর কিভাবে রাখতে পারেন? আমি ভেবে অবাক হতাম।

২০০৬ সালে কিশোরকণ্ঠ লেখক সম্মেলন ও সাহিত্য পুরস্কার অনুষ্ঠানে সভাপতি ছিলেন কবি
২০০৬ সালে কিশোরকণ্ঠ লেখক সম্মেলন ও সাহিত্য পুরস্কার অনুষ্ঠানে সভাপতি ছিলেন কবি

আল মাহমুদ ভাই কিশোরকণ্ঠ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন। অনেক স্বপ্নের কথা শোনাতেন। তিনি কিশোরকণ্ঠের সাহিত্য সভায় ও অন্যত্র বড় বড় সাহিত্য আয়োজনে কিশোরকণ্ঠের কথা উচ্চারণ করতেন। তাঁকে বলতে শুনেছি যে, কেউ কি দেখাতে পারে বাংলাদেশে কিশোরকণ্ঠের মত এত বহুল প্রচারিত এবং মার্জিত পত্রিকা আরেকটি আছে? এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেও কি এ ধরনের পত্রিকা বের হয়? যে পত্রিকার ওপর তরুণরা ঝুঁকে পড়ে? আমি যেখানেই যাই সেখানেই দেখি কিশোর- তরুণদের হাতে, ছাত্রদের হাতে কিশোরকণ্ঠ শোভা পাচ্ছে। তারা মনোযোগ দিয়ে কিশোরকণ্ঠ পড়ে দেখে আমার মনটা আনন্দে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। দেশের বাইরেও আমি পত্রিকাট দেখেছি।
কিশোরকণ্ঠ নিয়ে আল মাহমুদ ভাই এ ধরনের কত যে কথা বলতেন, স্বপ্ন দেখতেন সেটা বলে প্রকাশ করার মতো নয়। সেই সুযোগও এখানে নেই। যদি আবার কখনো সুযোগ হয় তাহলে আরো কিছু কথা তখন বলা যাবে ইনশাআল্লাহ। ২০১২ সালে কবির ৭৭তম জন্মবার্ষিকীতে কিশোরকন্ঠ পরিবার থেকে আমার সম্পাদনায় একটি সুন্দর স্যুভেনির প্রকাশ করে পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক নিযামুল হক নাঈমসহ আমরা গিয়েছিলাম মগবাজারস্থ কবির বাসভবনে। তাঁর হাতে স্যুভেনিরটি তুলে দিতেই তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন।
কবি আল মাহমুদ ভাই ৮৪ বছর পর্যন্ত সাহিত্যের পথে হেঁটেছেন আমগ্নভাবে। আপাদমস্তক কবি বলতে যা বোঝায় তিনি তাই ছিলেন। কবি হতে হলে জাগতিক অনেক কিছুই একজন কবিকে ত্যাগ করতে হয়। তিনি সেই কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন। অবশেষে আমাদের প্রাণপ্রিয় এই কবি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সর্বশেষ অভিভাবক- যিনি বেঁচে ছিলেন, তিনিও চলে গেলেন। তাঁর এই যাওয়াটা আমাদের জন্য কত বড় কষ্টের, কত বড় বেদনার সে কথা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাঁর চলে যাওয়ার কারণে বাংলা সাহিত্য এখন অভিভাবকহীন হয়ে পড়ল। আমরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়লাম। তাঁর এই শূন্যতা কে পূরণ করবেন সেটা একমাত্র মহান রাব্বুল আলামিন ছাড়া আর কেউই বলতে পারে না। কারোরই বোধগম্য নয়।
মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে ফরিয়াদ- তাঁর কাছে দুহাত তুলে আমরা দোয়া করি, হে রাব্বুল আলামিন তুমি আমাদের প্রাণের কবিকে, আলোর কবিকে, জ্যোতির কবিকে, আমাদের এই অভিভাবককে সম্মানের সাথে আশ্রয় দাও। হে মহান রাব্বুল আলামিন তুমি কবিকে উত্তম পুরস্কার দান করো। আজ এটুকু ছাড়া আর কিছুই চাইবার নেই।
কবি আল মাহমুদ ভাই কবিতাকে ভালোবাসতেন। সাহিত্যকে ভালোবাসতেন। এই দেশকে ভালবাসতেন। এই জাতিকে ভালোবাসতেন। এই ভালোবাসার টানেই তো তিনি এক সময় জাতির মুক্তির জন্য ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আবার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য তিনি গোটা জীবনই বিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর এই যে ত্যাগ, সেটা গোটা জাতির জন্য এক বিশাল ঋণ। আমি জাতির পক্ষে একজন নগণ্য কবি হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে দাবি রাখবো যে, তাঁকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হোক। কবি আজ বেঁচে না থাকলেও তাঁর লেখা তো বেঁচে আছে। তাঁর কাজ তো তিনি করে গেছেন। সুতরাং তার যথাযথ মূল্য দিতে না পারলেও ঋণ স্বীকারের জন্য হলেও তাঁকে স্মরণে রাখা প্রয়োজন।
এর জন্য এই মুহূর্তে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া জরুরি বলে মনে করি, সেগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে ধরছি:
১. কবির সকল রচনা ‘সমগ্র’ আকারে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশের ব্যবস্থা করা।
২. ঢাকায় একটি অডিটোরিয়াম তার নামকরণে করা।
৩. ‘কবি আল মাহমুদ একাডেমি’ বা ‘ইনস্টিটিউট’ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তোলা।
৪. মগবাজারস্থ কবির বাসা থেকে পরিবাগ পর্যন্ত সড়কটি ‘কবি আল মাহমুদ সড়ক’ হিসাবে নামকরণ করা।
৫. প্রতিবছর কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী সরকারি ও বেসরকারিভাবে দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচিসহ পালন করা।
৬. স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে কবির লেখা অন্তর্ভুক্ত করা।
৭. কবির জন্মস্থানে তাঁর নামে একটি সমৃদ্ধ স্মৃতি পাঠাগার বা স্মৃতি জাদুঘর তৈরি করা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের যেকোন একটি সড়ক তাঁর নামকরণে করা।
৮. কবির নির্বাচিত কবিতাসহ অন্যান্য গ্রন্থ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে সমগ্র বিশ্বে প্রচারের ব্যবস্থা করা।
৯. কবির নামে একটি শিশু-কিশোর ফাউন্ডেশন গড়ে তোলা।
১০.দেশব্যাপী কবির রচনা সহজলভ্যে ছড়িয়ে দেবার ব্যবস্থা করা।
১১.ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কবির নামে একটি ‘আল মাহমুদ চেয়ার’ প্রতিষ্ঠা করা।
১২.কবির নামে প্রতিবছর একটি স্মৃতি পুরস্কার চালু করা।
১৩.কবির পূর্ণাঙ্গ জীবনী গ্রন্থ প্রকাশের ব্যবস্থা করা।
যে কবি তাঁর সমগ্র জীবনের কষ্টার্জিত সাহিত্যের মাধ্যমে দেশ ও জাতির জন্য সকল কিছু উৎসর্গ করে গেছেন তাঁর জন্য এতোটুকু করা একান্ত জরুরি বলে মনে করি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে মনে করি।
কবি আল মাহমুদ ইন্তিকাল করলেও তিনি তো বেঁচে আছেন, জেগে আছেন তাঁর সাহিত্যের মাধ্যমে আমাদের মননে ও স্মরণে। এভাবেই কবি বেঁচে থাকুন কাল থেকে কালান্তরে। এটাই একান্ত কামনা।

SHARE

Leave a Reply