Home গল্প অঙ্ক । ছায়েম মোহাম্মদ ছামির

অঙ্ক । ছায়েম মোহাম্মদ ছামির

আজ থেকে পরীক্ষা শুরু হলো। অঙ্ক পরীক্ষার দিন মনে হলো যেন স্যাররা ইচ্ছে করে আমার জন্য প্রশ্নটা কঠিন করেছেন

তখন আমি পঞ্চম শ্রেণীতে। মানে সমাপনী পরীক্ষার্থী। আমাদের রীতিমতো কোচিং ক্লাস হতো। ক্লাস শুরু হতো খুব সকাল সকাল, আর জোহরের আজান শেষে কোচিংসহ আমাদের ক্লাস শেষ হতো। কিন্তু হাস্যকর ব্যাপার হলো সেইবার আমরা পরীক্ষার্থী ছিলাম মাত্র তিনজন। মিজান, মুশফিক এবং আমি। ক্লাসে আমার ক্রমিক ছিল দুই। কিন্তু অঙ্কে এতো কাঁচা ছিলাম তা বলার মতো নয়। হেড স্যারের খুব একটা বদ অভ্যাস ছিলো। আমার কোনো কাজে উল্টোপাল্টা হতে দেখলে আমার মাথায় আঘাত করতেন। এতে আমি খুব বিরক্ত হতাম। কিন্তু করার কিছুই নেই।

ক্লাসে মুশফিক ছিলো ক্যাপ্টেন। তবে সে একটু একঘেয়েমি স্বভাবের ছিলো। এমন কোনো দিন যেত না যে ওর সাথে ঝগড়া না করে থাকতাম। মাঝে মাঝে তাকে কিছু দুষ্ট নামে ডেকে খুব ক্ষেপাতাম। যতই ঝগড়া হোক না কেন আমাদের ভালো হতে বেশিক্ষণ লাগত না। আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। পড়ার বিষয় নিয়ে একে অপরকে দেখতাম।

প্রথম সাময়িক পরীক্ষা খুব নিকটে চলে এসেছে তাই পড়া নিয়ে একটু চিন্তিত। অবশ্য অঙ্ক নিয়ে একটু বেশি।

আজ থেকে পরীক্ষা শুরু হলো। অঙ্ক পরীক্ষার দিন মনে হলো যেন স্যাররা ইচ্ছে করে আমার জন্য প্রশ্নটা কঠিন করেছেন। জানি না কী লেখা আছে কপালে। মুখে চিন্তার ছাপ। আজ বাড়ি গেলে তো আপুর হাত থেকে আর রক্ষা নেই। যা হবার হবে। তাই বাড়ি চলে আসি। আমার চেহারার করুণ অবস্থা দেখে আপু ডাকল। ভেতরটা যেন হু হু করে উঠল।

– এই এদিকে আয় তো। পরীক্ষা কেমন দিলি?- আপু বলল।
– কোনো রকম।
– দেখি প্রশ্নটা দে তো।
আমি রেগে গিয়ে প্রশ্নটা ওর হাতে দিলাম। অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল প্রশ্নটা। আমার অবস্থা দেখে তার মনে সন্দেহের বাসা বাঁধে।
– পাস করবিতো?
– জানি না (রেগে গিয়ে)
এই বলে আমি সেখান থেকে চলে আসতে যাবো তখনি আমাকে চড় দিল। উফ! খুব লাগলো! তারপর:
– নে প্রশ্ন, আর হ্যাঁ এখন এগুলো আমার সামনে বসে আবার লিখে দিবি। যতক্ষণ না লিখা হবে ততক্ষণ কোথাও যাবি না। নয় আজ তোর পিঠের চামড়া তুলে ফেলব- আপু বলল।

কী করব ভেবে পাচ্ছি না। কান্না করতে করতে পড়ার টেবিলে চলে আসি। অতঃপর বাধ্য হয়ে লেখা শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর আপু এসে সামনে বসল।
– কত পাবি বলে মনে হয় গণিতে?
– জানি না আমি (কান্নাস্বরে)

অন্য রুমে চলে এলাম। চেহারাটা একদম পেঁচার মত হয়ে গেছে। বাড়ি এসে রেজাল্টের এইরকম খবর শুনে তারা খুব রেগে যায়। আপু আমাকে রুমে নিয়ে গেল তারপর দরজা আটকিয়ে আমাকে অনেক মারল। ছোটবেলা থেকে যেমন সবার আদরের ভাই ছিলাম তেমনি দুষ্ট স্বভাবেরও। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমার জন্য বেত রেডি থাকত। একদিনও মিস যেত না। দুপুরে যখন আম্মু আমাকে ঘুমানোর জন্য রুমে ডাকতো, তখন আমি আম্মুকে ঘুমে রেখে পিছনের দরজা দিয়ে পালাতাম। আর সন্ধ্যায় এলে রুটিন মাফিক মার খেতে হতো। সেইদিন থেকে খুব চিন্তায় আছি কিভাবে গণিতে ভালো ফল করা যায়। তিন মাস পর আবার দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা। তাই ভালো করে প্রস্তুতি নিচ্ছি।

অবশেষে পরীক্ষা চলে এলো। পরীক্ষা দিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার পিছু ছাড়ল না। আবারো অঙ্কে খারাপ করলাম। এইবার পেলাম মাত্র ৯। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ভাবলাম আজ আর বাড়ি যাবো না। কিন্তু আম্মু আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজবে। তাই আম্মুর কথা ভেবে আবার বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম।

বাড়ি ফিরার পরপরই শুরু হলো চিৎকার চেঁচামেচি। আমার রেজাল্টের খবর শুনে কেউ আর আমার হয়ে কথা বলছে না। আমাকে আবার ধরে মারার জন্য রুমে নিয়ে যায়। কিন্তু হ্যাঁ! আমাকে যতটা আঘাত করবে না তার চেয়ে দ্বিগুণ বেশি চিৎকার করি। আমাকে মারলে এমনটাই করি, তখন পাশের বাড়ির সকলে আমার অবস্থা দেখতে চলে আসে। এবারও তাই হলো।

– আচ্ছা, ভাই তোর সমস্যাটা কি বলতো? এইভাবে কেউ পরীক্ষায় খারাপ করে- আপু বলল।
আমি কোনো কথা বলছি না।
– দেখ, ভালো করে পড়ায় মনোযোগ দিলে দে, না হয় কী করি জানি না।
আবার কিছুক্ষণ পর,
– আচ্ছা, তুই একে একে এই রকম নাম্বার পেলি, টেস্ট পরীক্ষায় কত পাবি?
– ১১।

এই বলে আমি আর সেখানে দাঁড়াইনি। দৌড়ে চলে আসি। ধরতে পারলে আমার ১২টা বাজিয়ে ছাড়ত। দরজার আড়াল থেকে দেখছি আমার দিকে রাগী চোখে চেয়ে আছে। আমি আর দাঁড়িয়ে না থেকে সেখান থেকে চলে আসি।

টেস্ট পরীক্ষা আর বেশিদিন নেই। পরীক্ষার আগে থেকে খুব ভালোভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। প্রতিদিন ক্লাস শেষে কোচিং করতাম। সেদিন স্কুলে যাচ্ছি। সকাল থেকে তেমন কিছু ভালো লাগছিল না। মাথা ব্যথা করছে কিছুক্ষণ পর পর। ক্লাস শেষ হলে মিজান এবং মুশফিককে আমার এই করুণ অবস্থার কথা জানালাম। তখনই স্যার আমাদের অঙ্ক করাতে এলেন। তিনি আমার চেহারার এমন অবস্থা দেখতে পেলেন।

– এই, তোমার সমস্যা কী? তোমার চেহারা এমন দেখাচ্ছে কেন?- স্যার বললেন।
– স্যার, আমার খুব খারাপ লাগছে। আমি বাড়ি চলে যাবো।
– বাড়ি চলে যেতে পারবে?
– পারব স্যার!

সেখানে আর দাঁড়াইনি। বিলম্ব না করে স্কুল থেকে বেরিয়ে পড়ি। প্রচণ্ড রোদ ছিলো সেদিন। গা দিয়ে ঘাম ঝরছে। তার ওপর কাঁধে যে ব্যাগ ছিলো মনে হচ্ছে যেন চালের বস্তা বইয়ে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি। ঢুলে ঢুলে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। আশপাশে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। ইচ্ছে করছে রাস্তায় শুয়ে থাকতে। কিন্তু বাড়ি পৌঁছতে দেরি হলে তো আম্মু চিন্তা করবে। কোনো রকম হেলে দুলে করে হেঁটে সামনে যাচ্ছি। বিলের মাঝের রাস্তা পেরিয়ে এলাম। সামনে কয়েকটা বাড়ি দেখতে পাই। সামনে এগোতেই পড়ে যাচ্ছি এমন সময় এক মহিলা আমাকে ধরে ফেলেন। আমি আর হাঁটতে পারছি না।

– বাবা, তোমার কী হয়েছে? এমন করছ কেন?- মহিলা বললেন।

আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। তারপর উনি ধরাধরি করে আমাকে ওনার বাড়িতে নিয়ে গেলেন। আর আমাকে একটা রুমে শুয়ে দিলেন। একটু পর বিদ্যুৎ এলো। পাখাটা চালিয়ে দিলেন। তারপর আমার ড্রেস খুলে নিলেন এবং আদুল গায়ে আবার শুয়ে দিলেন। তারপর ভিজা কাপড় দিয়ে আবার আমার গা মুছে নেন। মাথায় পানি ঢেলে দিলেন। পিঠে বাম লাগিয়ে দিয়ে পরক্ষণে আমাকে পানি এবং একটু মধু খাইয়ে দিলেন। একটু ভালো লাগলে আমি আবার উঠে বসি।

– বাবা, তোমার কী হয়েছিলো- মহিলা বললেন।
একটু জিরিয়ে
– আসলে আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। একটু শরীর খারাপ করছিলো, তাই এমনটা হলো।
– তোমার বাড়ি কোথায়?
– এইতো সামনে লিচুগাছতলা। নুরু সওদাগরের দোকানের পাশের গলিতে।
– ওহ না, আজ তুমি এখানে থেকে যাও। তোমাকে বাড়ি যেতে হবে না।
– আসলে না। বাড়িতে আম্মু আমার জন্য চিন্তা করবে। তাই চলে যেতে হবে।
– আচ্ছা, তাহলে আরেকটু বিশ্রাম করো।
– ঠিক আছে।

অক্টোবরের শুরুর দিকে আমাদের টেস্ট পরীক্ষা শুরু হবে। তাই ভালোভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি। এদিকে উঠতে বসতে আপুর কড়া শাসন এবং নজরদারি। মাথাটা খেয়ে ফেলছে। কোথাও গেলে আসতে দেরি হলে কৈফিয়তের শেষ নেই। আসলে ব্যাপারটা হলো আমি হলাম পাঁচ বোনের এক ভাই। তাই আমার প্রতি সকলের আশা একটু বেশি। সে জন্য একটু চাপে থাকি।

কাল থেকে টেস্ট পরীক্ষা শুরু। প্রথমদিন বাংলা পরীক্ষা ছিলো। আপুর কারণে একটু রাত জেগে পড়াশুনা করতে হলো। তাই তেমন ঘুমাতে পারিনি। পরদিন সকালে আর ঘুম থেকে উঠতে পারছি না। মাথাটা খুব ভার হয়ে আছে। শরীরে আবার জ্বর এলো। এদিকে আজকে আবার পরীক্ষা। প্রথমে আম্মু মনে করল আমি ইচ্ছে করে ঘুম থেকে উঠছি না। কিন্তু গায়ে যখন হাত দিয়ে দেখেন তখন আম্মু হতভম্ব হয়ে পড়েন। আমার অনেক জ্বর। সকাল সকাল আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসা পাওয়ার পর যখন ভালো লাগছিলো তখন আম্মুকে নিয়ে স্কুলের উদ্দেশ চেম্বার হতে বের হলাম।

সব পরীক্ষা এইবার খুব ভালো হয়। বিশেষ করে অঙ্ক পরীক্ষাও। অবশ্য আপুও সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে। জানি না এইবার রেজাল্ট কেমন হয়। আগের দিনগুলোর কথা মনে উঠলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

অবশেষে পরীক্ষার রেজাল্ট দিলো। কিন্তু এবারের রেজাল্ট সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরীক্ষায় আমি সব বিষয়ে পাস করি। রেজাল্টের দিন আমরা সবাই ক্লাসে ছিলাম। স্যার আমার অঙ্ক খাতা নিয়ে সোজা আমাদের ক্লাসে চলে এলেন। তখন রওশন ম্যাডাম ক্লাস নিচ্ছিলেন। সেদিন স্যারকে আমার ওপর খুব সন্তুষ্ট হতে দেখলাম।
– ম্যাডাম, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে ছায়েম গণিতে এত ভালো ফলাফল করবে।
– স্যার! ও গণিতে কত পেয়েছে?
– ৮১ পেয়েছে।
– খুব ভালো করেছে।
খুব ভালো লাগলো সেদিন। এই টেস্ট পরীক্ষায় আমি বাকি দু’জনকে পিছিয়ে রেখে প্রথম হয়ে যাই এবং সবচেয়ে ভালো ফলাফল করি। স্কুল শেষে বাড়ি চলে এলাম। বাড়িতে আজ সবাই খুব খুশি। বিশেষ করে আপু, সে তো আমাকে এতো কষ্ট করে পড়িয়েছিল। খুব ভালো লাগছে।

দীর্ঘ এক মাস বন্ধের পর পরীক্ষার রেজাল্ট দিবে কালকে। রেজাল্টের আগের দিন সারারাত ঘুমাতে পারিনি। মাথায় নানান ধরনের চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এদিক ওদিক ছোটাছুটি। কিছুক্ষণ পর বাড়ি এসে শুয়ে রইলাম। সকালে তো রেজাল্ট দেয়নি। দুপুরের কিছুটা সময় আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। বেলা ২টার দিকে রেজাল্ট প্রকাশ হয়। যখন ক্ষিদেয় পেটের অবস্থা করুণ, তখন বাড়ি এলাম। হঠাৎ আপু বলল,এই তুই এক সাবজেক্টে ফেল করেছিস। তখন আমার তো হার্ট অ্যাটাক করার অবস্থা। আপু যখন হেসে দিলো তখন আর বুঝতে বাকি রইল না যে আমি পাস করেছি।

SHARE

Leave a Reply