Home গল্প ফুলজোড় নদীর তীরে । আহসান হাবিব বুলবুল

ফুলজোড় নদীর তীরে । আহসান হাবিব বুলবুল

ফুলজোড় নদী। এক সময় সারা বছরই কুল কুল রবে বয়ে যেত। এখন শীর্ণকায়। শুষ্ক মওসুমে পানি থাকে না।ঝরা পাতার মর্মর শব্দে চমকিত হয়ে যায় সাবা। জানালার পর্দাটা একটু টেনে দেয়। ঘন কুয়াশায় দৃষ্টির সীমানা এগোতে চায় না। বাগানের কাঁঠাল গাছগুলোকে সাদা চাদরে আবৃত মনে হয় ওর। এবার শীতটা একটু বেশি পড়েছে। সূর্য কতটা ওপরে উঠেছে তা বোঝার উপায় নেই। সাদা চাদর জড়িয়ে খাটে বসে আছে আর মাঝে মধ্যে জানালার ফাঁকে দৃষ্টি মেলছে। শামীম ও শক্তি ওরাও বিছানায় নানুর দিয়ে যাওয়া মুড়ি আর পাটালি গুড় মজা করে খাচ্ছে।
ফুলজোড় নদী। এক সময় সারা বছরই কুল কুল রবে বয়ে যেত। এখন শীর্ণকায়। শুষ্ক মওসুমে পানি থাকে না। এই নদী তীরের গ্রাম রহমতপুর। সাবা-শামীমদের নানার বাড়ি। এবার ঈদের ছুটিতে ওরা নানু বাড়ি বেড়াতে এসেছে। ছোট মামার কাছে ওরা গল্প শুনেছে এবার ঈদ আর নবান্ন একসাথে, তাই খুব ধুমধাম হবে। ঈদের পরই পৌষের মেলা বসবে। প্রচণ্ড শীতের কারণে এবার মেলার আয়োজন পিছিয়ে গেছে। এখন মধ্য মাঘ। মাঘের শীতে নাকি বাঘ কাঁপে। কিন্তু মাঘের মাঝামাঝিতে শীত একটু কমতে শুরু করেছে। তাই সব কিছুতেই যেন একটু একটু করে প্রাণ ফিরে আসছে। সাবা-শামীম ওরাও চঞ্চল হয়ে উঠেছে; ছোট মামার সাথে গ্রাম ঘুরে দেখবে। আম্মু আর ঠাণ্ডা লাগার কথা বলে বারণ করবে না।
সেদিন খুব ভোরে মৌ-মৌ গন্ধে সবার ঘুম ভাঙে। রান্নাঘরের দিকে কি যেন একটা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সাবা ছোট দুই ভাই-বোনকে ডেকে তোলে।
Ñ এই উঠ উঠ! নানু আমু মামানী ছোট খালা নিশ্চয়ই পিকনিকের আয়োজন করছে। নাঃ শুক্তিকে তোলা যাচ্ছে না।
সাবা-মীম উঠে পড়ে। রান্নাঘরে গিয়ে উপস্থিত হয়।
: অবাক কাণ্ড, এ যে পিঠে পুলি তৈরি হচ্ছে! আর আমরা কিছুই জানি না! সাবার উচ্চারণ শামীমকেও উচ্ছ্বসিত করে।
ছোট খালা বলেন- যাও হাত মুখ ধুয়ে এসো দুধ পিঠা খাবে। ভাপা পিঠাও তৈরি হচ্ছে। এরপর হবে পাটিসাপটা কুশলি দোলে পিঠা কত কী?
সারা শহরের মেয়ে। এবার যষ্ঠ শ্রেণীতে উঠেছে। শীতের পিঠার কথা বই-পুস্তকে পড়লেও পিঠার এতো বৈচিত্র্য আর কখনো দেখেনি। তাই ওর উৎসুকের শেষ নেই। এরই মধ্যে ছোট মামা এসে হাজির।
: এই সাবা তোমাকে বলেছিলাম না, নবান্নের উৎসব হবে। এই সেই নবান্ন। এসো পিঠে খাই আর গল্প করি। ছোট মামাকে পেয়ে ওরা আনন্দ করতে থাকে।
: ছোট মামা। নবান্নের উৎসবটা একটু বুঝিয়ে বলো না। সাবার জিজ্ঞাসা।
: তোমরাতো জানো পৌষ ও মাঘ মাস হলো শীতকাল। অগ্রহায়ণের সোনালি মাঠ থেকে ঘরে আসতে থাকে শীতের ধান। এই ধান কৃষকের ঘরে আনন্দ বয়ে আনে। তাদের হাসি-খুশিতে ভরে তোলে। বাড়ি বাড়ি তাই পিঠে খাওয়ার উপাদান সংগ্রহ ও আমন্ত্রণ পর্ব শুরু হয়। মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী এই পালা-পার্বণে আতপ চাল, পাটালি গুড় আর দুধ দিয়ে পিঠে পুলি বানায়। নিজেরা খায় আবার অন্যকেও খাওয়ায় এই ধুমধামটাই হলো নবান্ন। একে ঘিরেই পৌষের মেলা বসে।
: তবে আশপাশে যে তেমন একটা শোরগোল দেখছি না। সাবার কৌতূহল।
: এবার ধুমধাম একটু কম। ধানের ফলন ভালো হয়নি। প্রচণ্ড শীত আর পোকায় ধানে চিটা হয়েছে বেশি। তা ছাড়া দেশের রাজনৈতিক অবস্থাটাও তো তেমন ভালো না দেখছো। তাই কৃষকের ঘরে তেমন আনন্দ নেই।
Ñ মামার কথায় সাবার উচ্ছ্বাসে কিছুটা ভাটা পড়ে।
: মামা! আমরা আনন্দটা সবাই ভাগ করে নিতে পারি না?
: অবশ্যই পারি। সে জন্য দেখবে বিকেলে প্রতিবেশীরা আসবে। সবাইকে দাওয়াত করা হয়েছে। মামার কথায় সাবার মনটা আনন্দে ভরে ওঠে।
আনন্দটা আরো বেড়ে যায় আব্বু আসার খবরে। আজই ওদের আব্বু আসছেন ঢাকা থেকে। দুপুরে রাজশাহী ‘সিল্ক সিটি’তে রওনা দেবেন। সন্ধ্যায় এসে পৌঁছবেন। আব্বু আসার খবরে সাবা-শামীম আর শুক্তির আনন্দের আর শেষ নেই। ওরা ছোট মামার সাথে প্রোগ্রাম করেছে উল্লাপাড়া রেলওয়ে স্টেশনে যাবে আব্বুকে রিসিভ করতে।
উল্লাপাড়া রেল স্টেশনের অদূরে ফলজোড় নদীর ওপর ঘাটিনা রেলব্রিজ। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ব্রিজের কাছে পাকবাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধের সেই স্মৃতিকে ঘিরে এখানে গড়ে উঠেছে ফুলজোড় রিসোর্ট। বিকেলে বেড়ানো আর বিনোদনের জন্য এখানে ছুটে আসে প্রকৃতি পিয়াসী মানুষ। সাবা-শামীম তাই ঠিক করেছে, আব্বুকে রিসিভ করতে একটু আগেই বেরিয়ে পড়বে। যাতে রিসোর্ট দিয়ে ঘুরে আসা যায়। ওরা দেখবে নদীর তীরে সবুজ প্রকৃতি, রেল ব্রিজে ট্রেন ওঠার সেই মনোহর দৃশ্য। শুনবে অতিথি পাখির কলরব, সময় পেলে নৌকায় উঠবে।
বিকেলে মামার সাথে সাবারা রিসোর্টে এসে পৌঁছে। খুব আনন্দ হয় ওদের। ওরা ঘুরে বেড়ায় মুক্ত বিহঙ্গের মত। অপেক্ষা করতে থাকে কখন একটা ট্রেন রেল ব্রিজে উঠে, সাবা-শুক্তি চিৎকার করে উঠে.. ওই যে ট্রেন আসছে ঝিক ঝিক ঝিক্্ ঝিক্ বিচিত্র শব্দ তুলে। ট্রেনটি ব্রিজ পার হয়। ট্রেনটিকে মনে হয় যেন দীর্ঘ এক আনন্দ মিছিল। সাবা-শামীম হাত নেড়ে ট্রেনযাত্রীদের স্বাগত জানায়।
এতো আনন্দের মাঝেও সাবার মনটা কেঁদে ওঠে। কেউ বুঝতে না পারলেও মামার চোখে ঠিকই ধরা পড়ে।
: সাবা। অ্যানিথিং রং! এতো আনমনা কেন? মামার প্রশ্নে সাবার সম্বিত ফেরে।
: না কিছু না। নদীর কথা ভাবছি। নদীটা কেমন মরে গেছে। কবি না বলেছেন, ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।’ কেবল তো বর্ষা গেলো এখনই নদীতে পানি নেই।
: হ্যাঁ, এটা অবশ্য কষ্টের কথা। এক সময় এ নদী পানিতে ভরা ছিল। পাল তোলা নৌকা চলতো। জাহাজ ভিড়তো উল্লাপাড়া পাট বন্দরে।
মামার কথা খুব মন দিয়ে শুনছে সাবা। ওদিকে শামীম বলে আর বুঝি দেরি করা ঠিক হবে না। সন্ধ্যা নামছে। আব্বুর ট্রেন চলে আসবে। ওরা স্টেশনের দিকে পা বাড়ায়। আজ অপরাহ্নে মেঘ কেটে রোদ বেরিয়েছে। বেশ মিষ্টি রোদ। কিন্তু রোদের আমেজ টেকসই হলো না। সূর্যটা বড় আমগাছটার আড়াল হয়ে গেল। দূরে মেঘের কোল ঘেঁষে সারি সারি পাখি ডানা মেলেছে। কী পাখি হবে কে জানে। হয়তো শীতের পাখি। সাবা সেদিকেই চেয়ে আছে। তারপর কখন যে পায়ে পায়ে বাগানে এসে পড়েছে বুঝতেই পারেনি। শীতের শুষ্কতায় কাঁঠাল গাছের পাতাগুলো ঝরে ঝরে পড়ছে। শুকনো পাতা বাতাসে ভেসে ভেসে বিবর্ণ ঘাসের ওপর গিয়ে পড়ছে। সাবার মনটা ভালো নেই। আর ক’দিন পর ওদের ঢাকা চলে যেতে হবে। আম্মু গোছগাছ করছেন। এই গ্রাম আর দেখা হবে না। দেখা হবে না সবুজ প্রকৃতি মেঠোপথ দিগন্ত জোড়া মাঠ নীলিম আকাশ। আর বয়ে চলা ছোট নদী। কতো কি ভাবে সাবা। গ্রামের কথা এখানকার মানুষের ভালোবাসা ভুলতে পারে না ‘ও’।
হঠাৎ সাবার দৃষ্টি আটকে যায়। একটা গাছের নিচে কে যেন ঝরা পাতাগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছে। ঝাড়– দিয়ে একটা বস্তায় ভরছে। সাবা সেদিকে এগিয়ে যায়। দেখে ওর বয়সেরই একটি মেয়ে। শুকনো ফুলের পাপড়ির মতোই ওর দুঠোঁট। শীর্ণদেহ। মাথা ভরা বাবরি চুলে ধুলো জমেছে। না জানি কতকাল যতেœর হাত পড়েনি। সাবা জিজ্ঞেস করতেই ও ওর নাম জানায়, শেফালী।
সাবা ভাবে কি মিষ্টি নাম। তবে ওর মুখে শেফালীর হাসি নেই কেন! নিশ্চয়ই ওরা গরিব। সাবা অনেক কথা জিজ্ঞেস করে। শেফালী সব কথার উত্তর দেয় না। কখনো মাথা নেড়ে হু বলে শেষ করে। শেফালী বলে, এগুলো নিয়ে সন্ধ্যায় চুলা জ্বালাবে, বাবার জন্য রান্না করবে। বাবা মাঠে কাজ করে ফিরবে সন্ধ্যে নাগাদ। মা সেই কবে মারা গেছে ও বলতে পারে না।
: তুমি লেখাপড়া করো না? সাবার জিজ্ঞাসায় শেফালীর ঠোঁটের রেখায় একফালি হাসি জেগে উঠেই মিলিয়ে যায়। সাবা এই হাসির অর্থ বুঝতে পারে না।
পশ্চিম আকাশটা ততক্ষণে রক্তিম আভায় ভরে গেছে। দূরে কুয়াশা নামছে। শেফালী সেদিকেই পা বাড়ায়। সাবা শুধু চেয়ে থাকে সেদিকে….।

SHARE

Leave a Reply