Home সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস নাবিলের কান্না । জুবায়ের হুসাইন

নাবিলের কান্না । জুবায়ের হুসাইন

নাবিলের কান্নাএক.

নিজেকে খুবই ক্ষুদ্র মনে হয় ওর। এই বিশাল আকাশের শামিয়ানার নিচে কেমন এক পিঁপড়ার মতো লাগে নিজেকে। মনে হয়, সমস্ত আকাশ ও পৃথিবী ওর মাথার ওপর ভেঙে পড়বে। তখন কেমন যেন আনমনা হয়ে যায় ও। ভেতরটা অস্থিরতায় ফেটে যায়। তথাপি মুখে কোনো কথা জোগায় না। কী এক বোবা দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সম্মুখ পানে। অথচ সে দৃষ্টিতে শূন্যতা ছাড়া কিছুই থাকে না।
পুকুরপাড়ে একটা বাতাবি লেবুগাছ, সেই লেবুগাছের একটা দো-ডালের ওপর পা ছড়িয়ে পেছনে হেলান দিয়ে বসে আছে ও। হাত দুটোকে পেছনে নিয়ে গাছের সোজা ডালটাকে পেঁচিয়ে ধরেছে যেন অসতর্কতাবশতও পড়ে না যায়।
ও মাঝে মাঝেই এভাবে একা এই গাছটাতে বসে ভাবে। কেমন এক ভিন্ন জগতে বিচরণ করে ও তখন। অবশ্য গাছের ডালটা মাটি থেকে খুব বেশি ওপরে নয়। তাই কখনও দুর্ঘটনা ঘটেনি।
আজও তেমনি একটি দিন ওর এই ক্ষুদ্র জীবনটাতে। তাই মাথার মধ্যে অগোছাল ভাবনাগুলো দ্রুত ডালপালা বিস্তার করলেও স্থায়ী হচ্ছে না একটিও।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে ওর মনে হচ্ছে দূরে কেউ ওর নাম ধরে ডাকছে। কিছু যেন বলছে কেউ। সে জন্য চিন্তারাও হোঁচট খাচ্ছে। কিন্তু অন্য কিছুই দাগ কাটতে পারছে না ওর এই নিঃসঙ্গতার মাঝে।
‘কী ব্যাপার বিপ্লব, তুমি এখানে বসে? আর আমরা ওদিকে চিন্তায় পড়ে গেছি!’
এবার ওর চিন্তায় ছেদ না পড়ে থাকে না। বিপ্লবের আনমন ভাব না কাটলেও ভাবনার সুতা যেন কোথাও আলগা হয়ে যায়, তবে ঠিক ছিঁড়ে যায় না। তাকায় নিচের দিকে। কে যেন ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। মাথাটা কাত করে আরো ভালো করে দেখে। হ্যাঁ, তারেক ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
‘আজ না ফাইনাল খেলা!’ আবার বলে তারেক।
বিপ্লব বলল, ‘আমাকে মাফ করা যায় না?’
‘কী বলছ তুমি!’ যেন আকাশ থেকে পড়ে তারেক। ‘তুমি হলে আমাদের টিমের ওপেন ব্যাটসম্যান এবং ওপেন বোলারও। চলো চলো, অনেক দেরি হয়ে গেছে।’
আরও কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বিপ্লব। কিন্তু তারেকও নাছোড়বান্দা।
গাছ থেকে লাফিয়ে নামল বিপ্লব। দু’হাত মাথার ওপরে দু’পাশে ছড়িয়ে দিয়ে আড়মোড়া ভাঙলো। ক্লান্তিটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা আর কি।
তারপর অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও চলল তারেকের সাথে, ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে। ও নিজেও জানে ও টিমের নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়- কী ব্যাট হাতে, কী বল হাতে।

বিপ্লবরা খেলায় হেরে গেছে। আসলে ওদের দলের মূল ভরসা বিপ্লবই। কিন্তু বিপ্লব খেলায় মন বসাতে পারেনি আজ। মাঝে মাঝে এমনই হয়। ও কিছুতেই মন বসাতে পারে না।
হেরে গিয়ে খুবই খারাপ লাগছে বিপ্লবের। একটা উইকেটও পায়নি ও আজ। বরং রান দিয়েছে অনেক। আর ব্যাট হাতে মাত্র তিন রান।
তখন সন্ধ্যা প্রায় নেমে এসেছে। বাড়ি ফিরছিল বিপ্লব ও তারেক এক সাথে। তারেকের হাতে একটা ব্যাট। বিপ্লবের হাত খালি। আজকের দিনটা ওর জীবনে না এলেই বোধ হয় ভালো হতো। তাহলে এমন লজ্জায় পড়তে হতো না। কেননা, ও কোনো দলের হয়ে খেলেছে, আর সে দল হেরে গেছে, এমনটি আগে কখনও ঘটেনি। হারের লজ্জায় ও যেন একেবারে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। তাই তারেকের টুকটাক কথায়ও ও সায় দেয়ার শক্তি পাচ্ছে না। কোনো কিছু কেন ভালো লাগছে না ওর?
ডানে মোড় ঘুরতে বাঁ হাতে একটা বড় গাবগাছ পড়ে। গাবগাছের ওপাশে ছোট্ট একটা জঙ্গল মতো। রাতে মানে সন্ধ্যা তো দূরের কথা, দিনের বেলায়ও অনেকে একান্ত ঠেলায় না পড়লে এ দিকটা মাড়ায় না কেউ। কিন্তু ওরা তো দুরন্ত, নির্ভয়! ওদেরকে আটকায় কিসে? তাই এ পথটা হরহামেশায় মাড়িয়ে চলে ওরা। কখনও কোনো বিপত্তি ঘটেওনি।
সেভাবেই হেঁটে চলছিল ওরা। তারেক দু’য়েকটা কথা বললেও বিপ্লব হয় নীরব থেকে অথবা হুঁ-হ্যাঁ করে মাথা নেড়ে সায় বা জবাব দিয়ে যাচ্ছে।
মোড়টা ঘুরতেই আচমকা থমকে দাঁড়ায় ওরা। গাবগাছটার আড়ালে কে যেন লুকিয়ে আছে। একটু ভালো করে দেখতে বুঝল লোকটা বুঝি কোনো কিছুর ওপর নজর রেখেছে। তারেককে চুপ থাকতে বলে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল ওরা।
গাবগাছটা থেকে একটু তফাতে পাশাপাশি ইয়া মোটা দুটো নারকেল গাছ। গাবগাছ বা নারকেল গাছ কোনোটাই রাস্তা থেকে খুব ভালো করে না খেয়াল করলে চোখে পড়ে না। আর তা ছাড়া সন্ধ্যা শুরু হওয়ায় এ পথে লোকজনের চলাচলও খুব একটা নেই, অন্তত যারা সারাদিনের পরিশ্রম সেরে এ পথ দিয়েই ঘরে ফেরে।
ওরা দু’বন্ধু ওই নারকেল গাছ দুটোর আড়ালে গিয়ে লুকালো। নজর রাখল সামনের লোকটার ওপর।
উত্তেজনায় ছটফট করছে ওরা। বুকে অনেক কথা উঁকিঝুঁকি মারলেও বিপ্লবের নিষেধের কারণে কোনো কথা বলতে পারছে না তারেক। সে জন্য কেবল উসখুস করছে ও। মুখের মধ্যে কথারা যেন কিলিবিলি করছে। এভাবে কতক্ষণ থাকতে পারবে কে জানে! শেষে পেট ফেটে নাড়িভুঁড়ি বুঝি সব বেরিয়ে পড়বে- তারেকের কাছে সেটাই মনে হচ্ছে।
বিপ্লব এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের লোকটার দিকে। খরগোশের মতো খাড়া করে রেখেছে কান দুটো। ওর মনেও অনেক কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু কথা বলার সময় এটা নয়। এরকম দুয়েকটি ঘটনার সাথে ও আগেও পরিচিত হয়েছে। সে জন্য উত্তেজনা চেপে রাখতেও শিখে নিয়েছে ও। ও বাস্তবেও দেখেছে যে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যদি হাঁচি চলে আসে তবে ঘন ঘন ঢোক চিপলে সে হাঁচি আর মুখ দিয়ে বিকট শব্দে বাইরে আছড়ে পড়ে না।
একটু পর একটা মোটরসাইকেল স্টার্ট নেয়ার শব্দ শোনা গেল। সতর্ক হয়ে উঠল সামনের লোকটা। সতর্ক হলো বিপ্লবরাও।
ঠিক তখনই ওদের প্রায় পাশ ঘেঁষে একটা মোটরসাইকেল শাঁই করে বেরিয়ে গেল। নড়ে উঠল সামনের লোকটা। এগিয়ে ঢুকে গেল সামনের ছোট্ট ঝোপটার মধ্যে।
‘কুইক!’ বলে তারেককে নিয়ে এগিয়ে গেল বিপ্লবও।
মাঝারি আকারের একটা কড়ই গাছের গোড়ায় হাঁটু মুড়ে বসে আছে লোকটা। বিপ্লবরা কিছু না বলে তার কাণ্ড দেখতে লাগল।
মাটি খোঁড়া শুরু করেছে লোকটা হাত দিয়ে। বোঝাই যাচ্ছে আলগা মাটি। একটু পর কী একটা কাপড়ের পুঁটলি বের করে আনল লোকটা। এই সময় পেছন থেকে বিপ্লব বলে উঠল, ‘হ্যান্ডস আপ!’
ওর হাতে তখন তারেকের ক্রিকেট ব্যাটটা শোভা পাচ্ছে, অনেকটা মারের ভঙ্গিতে।

দুই.

বসা থেকে উঠে ঘুরে দাঁড়ালো লোকটা। সন্ধ্যা শুরু হলেও তার চেহারাটা স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছে ছেলেরা। কারণ পশ্চিমের দিগন্ত রেখায় যে লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে, তার কিছুটা ওই লোকটার মুখের ওপর যেন আছড়ে পড়েছে।
বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠল বিপ্লব, ‘ডিটু ভাইয়া তুমি!’
ডিটু ভাইয়া বলল, ‘হাতটা কি নামাব না উঠিয়েই রাখব?’
‘না না, হাত উঁচু করে রাখার দরকার নেই।’ তাড়াতাড়ি বলল তারেক।
‘স্যরি ডিটু ভাইয়া।’ বলে ক্রিকেট ব্যাটটা নামিয়ে পেছনে সেরে ফেলল বিপ্লব।
‘এসো আমরা কোথাও বসে কথা বলি।’ বলল ডিটু ভাইয়া।
আড়াল দেখে এক জায়গায় বসল ওরা। ডিটু ভাইয়া বলল কিভাবে ওই মোটরসাইকেলের লোকদের পিছু নিয়ে এখানে এলো। সে এ পথ দিয়েই যাচ্ছিল। মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে দু’বার যাওয়া-আসা করে মোটরসাইকেলটা। এতে সন্দেহ হয় তার। তাই লুকিয়ে নজর রাখতে থাকে। এবং শেষ পর্যন্ত কী হলো তা তো বিপ্লব ও তারেক জানেই।
ডিটু ভাইয়া ওদের থেকে বয়সে দুই-তিন বছরের বড় হবে। খুবই রহস্যপ্রিয় সে। সবকিছুতে ছোঁক ছোঁক একটা ভাব তার। এ কারণেই তাকে সবাই ডিটেকটিভ ভাইয়া সংক্ষেপে ডিটু ভাইয়া বলে ডাকে।
‘তুমি লোক দু’জনকে চিনতে পারনি?’ সব শুনে প্রশ্ন করল তারেক।
‘আরে তখন কি আমার সেদিকে খেয়াল আছে না কি? আমি তো দেখছি ওরা কী করে, তাই।’ বলল ডিটু ভাইয়া। ‘তা ছাড়া দু’জনের মাথাতেই হেলমেট লাগানো ছিল। তাতে চেহারা দেখার কোনো উপায় ছিল না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে ডিটু ভাইয়া,’ বলল বিপ্লব। ‘এখন তোমার হাতের পুঁটলিটা খুলে দেখা যাক ভেতরে কী আছে।’
‘হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ।’ বলে পুঁটলি খোলায় মনোযোগ দিল ডিটু ভাইয়া।
ঝুঁকে এলো বিপ্লব ও তারেক।
কাপড়ের পুঁটলিটা খুলল ডিটু ভাইয়া। ওদেরকে অবাক করে দিয়ে পুঁটলির ভেতর থেকে বের হলো কিছু স্বর্ণালঙ্কার ও ছোট্ট একটা ডায়েরি। বিস্ময়ভরা চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল সবাই। কারোর মুখেই কোনো কথা ফুটল না।
বিস্ময় ভেঙে বিপ্লবই বলল প্রথমে, ‘অলঙ্কারগুলো তো স্বর্ণের বলেই মনে হচ্ছে।’
‘আমারও তাই মনে হচ্ছে।’ বলল ডিটু ভাইয়া।
‘এগুলো নিয়ে এখন আমরা কী করব?’ কেঁপে উঠল তারেকের কণ্ঠ।
ডিটু ভাইয়া কিছু ভাবল। তারপর বলল, ‘বিপ্লব, তুমিই বল এখন আমরা এগুলো নিয়ে কী করব।’
বিপ্লব ভাবল কয়েক মুহূর্ত। তারপর বলল, ‘আমার মনে হয় এগুলো এখানেই কোথাও রেখে দেয়া উচিত।’
‘তাহলে তো ওরা আবার এগুলো নিয়ে যাবে।’
‘না, নিতে পারবে না। আমরা তো আর আগের জায়গাটাতেই এগুলো পুঁতে রাখব না। রাখব অন্য জায়গায়, যাতে ওরা খুঁজে না পায়।’
‘কিন্তু সেটা কি ঠিক হবে?’ বলল তারেক।
‘ঠিক-বেঠিক বুঝি না। এ ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায়ও নেই।’ বলল বিপ্লব। ‘এগুলো যদি চোরাই মাল হয় তবে তো আর তা ওদের হাতে উঠিয়ে দেয়া যাবে না। আর…’ এটুকু বলে রহস্যময়ভাবে থেমে গেল বিপ্লব। গোয়েন্দা গল্প পড়ে এরকমটা শিখেছে ও। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে বলতেই হঠাৎ করে থেমে যায় গোয়েন্দারা। উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে সঙ্গের লোকেদের। এতে করে তার ভারত্বও বৃদ্ধি পায়, এবং গ্রহণযোগ্যতাও।
‘আর?’ একসাথে জিজ্ঞেস করল অন্য দু’জন।
‘না ভাবছিলাম অন্য একটা কথা। শোনো তোমরা, আমরা এগুলো পাশেই একটা গোপন জায়গায় পুঁতে রাখব এবং নজর রাখব। যারা পুঁতে রেখে গেছে তারা নিশ্চয়ই আবার আসবে এগুলো উঠিয়ে নিতে। তখন অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া যাবে।’ বিপ্লব তার প্ল্যানের কথা বলল।
তারেক বলল, ‘কিন্তু আমরা এগুলো পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছি না কেন?’
‘কারণ,’ বলল বিপ্লব। ‘আমরা চাই মূল ঘটনা জানতে। এখনই পুলিশের হাতে তুলে দিলে সেটা সম্ভব নয়।’
ডিটু ভাইয়া কী যেন ভাবল। তারপর বলল, ‘বিপ্লব ঠিকই বলেছে।’
বিপ্লব এবার ডায়েরিটা হাতে উঠিয়ে নিলো। পৃষ্ঠা ওল্টালো। কিন্তু ভেতরের সমস্ত পৃষ্ঠা ফাঁকা, কোথাও কোনো লেখা নেই। ভ্রু -জোড়া কুঁচকে উঠল বিপ্লবের। একটা মাঝারি সাইজের ডায়েরি, কিছুটা পুরনোই, অথচ তাতে কিছু লেখা নেই, এটা মেনে নেয়া যায় না।
তারেক ও ডিটু ভাইয়ার দিকে তাকাল বিপ্লব। ওরাও নীরবে মাথা নাড়ল, কিছুই বুঝতে পারছে না। অবাক হয়েছে ওরাও।
প্রথমবার পৃষ্ঠা ওল্টানোতে কিছু একটা যেন দেখেছিল বিপ্লব, কোনো লেখা না। তাই আবারও পৃষ্ঠা উল্টিয়ে চলল। এক টুকরো ভাঁজ করা কাগজ পড়ল নিচে। তিন জোড়া চোখ স্থির হয়ে রইল কাগজের টুকরোটার ওপর।

তিন.

কাগজটা উঠিয়ে নিলো বিপ্লব। ভাঁজ খুলল। আঁকিবুঁকি দাগ কাটা তাতে।
‘কী আছে কাগজে?’ জিজ্ঞেস করল তারেক।
বিপ্লব বলল, ‘জানি না, কতকগুলো দাগ কাটা শুধু।’
ডিটু ভাইয়া বলল, ‘রাত হয়ে যাচ্ছে। তাই আমার মনে হয় এখন পুঁটলিটা কোথাও পুঁতে রেখে আমাদের এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। নয়তো কেউ দেখে ফেললে অন্য কিছু মনে করতে পারে।’
‘হ্যাঁ ডিটু ভাইয়া, তুমি ঠিকই বলেছ।’ বলে কাগজ ভাঁজ করে নিজের শার্টের বুক পকেটে রেখে দিল।
গোপন একটা জায়গায় জিনিসগুলো আবার পুঁতে রাখল ওরা। হাত দিয়ে মাটি এমনভাবে সমান করে দিল যাতে বোঝা না যায় নিচে কিছু রাখা আছে। অবশ্য চিহ্ন একটা রেখে দিল। ছোট্ট শাল গাছটার ঠিক নিচে পুঁতেছে পুঁটলিটা।
এখন দূর থেকে নজর রাখার পালা। তবে একসাথে নজর রাখা যাবে না। পালা ভাগ করে দিল ডিটু ভাইয়া।
বিপ্লব ও তারেক প্রথমে নজর রাখবে। এই সুযোগে খাওয়া-দাওয়া সেরে আসবে ডিটু ভাইয়া। তখন চলে যাবে ওরা এবং রাত বারোটার দিকে বিপ্লব আসবে। রাত তিনটার দিকে আসবে তারেক। এরপর ফজরের নামাজ পড়ে আবার ডিটু ভাইয়া আসবে। তারপর সকালে আশপাশেই কোথাও বসবে ওরা, যেখান থেকে ভালোভাবে নজর রাখা যায়। তখন পুনরায় ঠিক করে নেয়া যাবে এরপর কে কখন পাহারা দেবে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলে গেল ডিটু ভাইয়া। পাহারায় বসল বিপ্লব ও তারেক।
রাতের আঁধার তখন জেঁকে বসেছে। আজ বোধ হয় অমাবস্যা চলছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। একহাত সামনের জিনিসও না। তারেক একেবারে বিপ্লবের গা ঘেঁষে বসে রইল। ভয়ে দুরু দুরু করছে ওর বুক। ওর হৃৎপিণ্ডের ধুকপুক শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে বিপ্লব।
বিপ্লব অবশ্য অত ভয় পাচ্ছে না। ও এমনিতেই একটু সাহসী, আর এখন তো রহস্যের গন্ধ পেয়েই গেছে। বেশ একটা থ্রিল অনুভব করছে ও মনের ভেতর। বুঝতে পারছে, পুরো ব্যাপারটার মধ্যে একটা রহস্য না থেকেই পারে না। কেউ নিশ্চয়ই এমনিতেই এতগুলো দামি গহনা এভাবে মাটিতে পুঁতে রেখে যাবে না। আবার সঙ্গে একটা পুরনো ডায়েরি, তার মধ্যে দাগকাটা একখণ্ড কাগজ। কাগজটা নিঃসন্দেহে কোনো বারতা বহন করছে। কী বোঝানো হচ্ছে ওভাবে দাগ কেটে?
একবারই দেখেছে কাগজটা, তাই ভালোভাবে হয়তো বুঝতে পারেনি। আরোও ভালো করে দেখতে হবে। নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে ও এই দাগ কাটাকুটির মানে। গোয়েন্দারাও তো ওরই মতো মানুষ। তারা পারলে ও কেন পারবে না? শুধু গোয়েন্দাদের মতো করে একটু সূক্ষ্মভাবে দেখতে হবে। গোয়েন্দারা অনেক কিছু আগাম দেখতে ও বুঝতে পারে। চেষ্টা করলে ও-ও পারবে নিশ্চয়ই।
বিপ্লবের মাথার ভেতরে এসব চিন্তাভাবনা ঘুরপাক খেলেও যেখানে পুঁটলিটা পুঁতে রেখেছে সেদিক থেকে নজর সরায়নি একবারও। তাই চোখজোড়া কেমন ব্যথা ব্যথা করছে। এ কারণেই চিন্তায় ছেদ পড়ে ওর।
এভাবে কেটে যায় অনেকক্ষণ।
রেডিয়ামের আলোয় হাতঘড়ি দেখে তারেক। ডিটু ভাইয়া গেছে তা প্রায় দু’ঘণ্টা হয়ে গেল। সাড়ে নয়টায় আসার কথা তার।
মশারা বেশ জ্বালাতন করছে। বিপ্লব ঈশারায় চুপ থাকতে বললেও মাঝে মাঝে মশা তাড়ানোর ঠুস-ঠাস শব্দ করে ফেলছে তারেক। বিপ্লবের যে মশা কামড়াচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু অনেক চেষ্টা করে তবেই চুপ থাকছে ও। হাত ও পায়ের খোলা জায়গাগুলোতে মশারা এতগুলো কামড় বসিয়েছে এবং রক্ত চুষে খেয়েছে যে, এখন রীতিমত জ্বালা করছে সেসব জায়গাগুলো এবং চুলকাচ্ছেও।
ডিটু ভাইয়া আসতে একটু দেরিই করে ফেলল। বাড়িতে নাকি ম্যানেজ করতে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। ছোট বোনটা কিছুতেই আসতে দিচ্ছিল না তাকে। কাল নাকি ওর সাধারণ বিজ্ঞানের ক্লাস টেস্ট। ওটাই দেখিয়ে দিচ্ছিল ছোট বোনকে। অবশ্য টিচার এসে পড়িয়ে গেছে, কিন্তু তাতে হবে কী? ভাইয়া তো বিজ্ঞানের ছাত্র, আর টিচার কমার্সের- কাজেই ছোট বোনের কাছে ভাইয়াই এ ব্যাপারে পারফেক্ট- ওর ভাষায়- ‘যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ দিয়ে কি আর মহাকাশ-গ্যালাক্সি কিংবা জীবন-মরণ চলে?’
ডিটু ভাইয়া এলে তার ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলল বিপ্লব ও তারেক।
তবে মুশকিল হলো এখন বাড়িতে বোঝানো। এতক্ষণ কোথায় ছিল জিজ্ঞেস করলে কী জবাব দেবে তার? আর বাড়ি ফিরতে রাত দশটা বেজে গেছে দেখে এতক্ষণে নিশ্চয়ই ওদেরকে খুঁজতে আশপাশে লোক লেগে গেছে! সারা এলাকা জানাজানিও হয়ে গেছে যে ওরা এত রাত অবধি বাড়ি ফেরেনি। নাহ্। আরেকটু ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার ছিল। কিন্তু যা হওয়ার তা তো হয়েইে গেছে। এখন উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেয়াটাই হচ্ছে আসল কাজ।
অবশ্য বিপ্লব অত ভয় পাচ্ছে না। কিছু একটা বলে মা-বাবাকে ম্যানেজ করে নেবে। সমস্যা হচ্ছে তারেককে নিয়ে। কী বলবে ও বাড়িতে? ছোট চাচা কি অত সহজে ছেড়ে দেবে ওকে?
বিপ্লব ওকে অভয় দিল। বলল, ‘অত ভয় পেও না তো? শেষে দেখবে কিছুই হয়নি। কেউ খেয়ালই করেনি যে তুমি বাড়িতে নেই। চলো, আমিই তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছি। কিছু হলে আমি ম্যানেজ করে নেব।’
বিপ্লব যখন বলেছে, তখন কোনো একটা ব্যবস্থা ও করবেই। তাই মনের মধ্যে শঙ্কা থাকলেও কিছুটা আশা নিয়ে বিপ্লবের সাথে বাড়ি ফিরে চলল তারেক।
[চলবে]

SHARE

Leave a Reply