Home গল্প যে গল্প হয়নি বলা । ফাতেমা নার্গিস

যে গল্প হয়নি বলা । ফাতেমা নার্গিস

সে  স্মৃতি আজো কাঁদায় আমাকে। কত রাত সে স্মৃতিগুলো স্বপ্ন হয়ে আসে। মনে হয় সত্যি হাত বাড়ালেই সে মানুষটিকে ধরা যাবে, ছোঁয়া যাবে।সে  স্মৃতি আজো কাঁদায় আমাকে। কত রাত সে স্মৃতিগুলো স্বপ্ন হয়ে আসে। মনে হয় সত্যি হাত বাড়ালেই সে মানুষটিকে ধরা যাবে, ছোঁয়া যাবে। যাকে হারিয়ে ছিলাম ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর। তিনি আমার মামা মো: আজিজুর রহমান, আমার পরম আত্মীয় ছিলেন। তিনি সিলেট জেলার বিয়ানিবাজার উপজেলার শ্রীধরায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বেড়ে ওঠাও সেখানেই। বাবা তৈয়ব আলী ছিলেন কলকাতার নামকরা জাহাজ কোম্পানিতে কর্মরত। সুতরাং তিনি বাড়িতেই মায়ের তত্ত্বাবধানে থাকতেন। বাবা ছুটিতে বাড়ি এলে বাবার সাথে কলকাতা যাওয়ার বায়না করতেন। এভাবেই দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল তর তর করে। ১৯৫৮ সালে আমার মায়ের মৃত্যুর পর মামার জীবনে ছন্দপতন ঘটে। খুব দুঃখ পেয়েছিলেন বড় বোনের মৃত্যুতে। ১৯৬২ সালে আমার বাবা তাকে এক প্রকার জোর করেই ঢাকা নিয়ে আসেন। ইতোমধ্যে নানার মৃত্যু হয়েছে। তাই আমার বাবাই মামার অভিভাবকরূপে তাকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন।

১৯৬৬ সালের দিকে তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রেজিমেন্টে (ইপিআর) যোগ দেন। তখন তিনি আমাদের বাসা থেকে চলে যান। যাওয়ার সময় আমাদের দুই বোনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন। সে সময় বয়স এত কম ছিলো যে সে কান্নার কোন তাৎপর্যই খুঁজে পাইনি। আজ জীবনের এই প্রান্তে এসে নতুন করে সে কান্নার অর্থবহ দিকটা এতটাই বিস্তৃত হয়ে আছে যে নিজের চোখের পানি দিয়ে তা পরিমাপ করতে পারি। মামা চলে যাওয়ার পরে অনেক দিন বাবাকে জিজ্ঞাসা করতাম-

-মামা কবে আসবে?

-আসবে আসবে। এখনতো তার ট্রেনিং চলছে তাই সে ছুটি পায় না। ছুটি পাবে ট্রেনিং শেষ হলে তখনই সে আসবে। বাবা আশ্বস্ত করতেন আমাকে। তারপর ট্রেনিং শেষ হলো। সত্যি সত্যি এলেন মামা পুরোপুরি একজন সৈনিক। সৈনিকের বেশে মামাকে দেখে সেদিন গর্বে বুক ফুলে উঠেছিলো। আশপাশের সব প্রতিবেশী মামাকে দেখার জন্য ছুটে এসেছিলো। মামা আমাকে দেখার জন্য ছুটে এসেছিলেন। মামা আমাকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। সবার সাথে হাসি মুখে কথা বলেছিলেন। সবার কুশল সংবাদ নিচ্ছিলেন। যাবার সময় বাবা মামাকে বলেছিলেন- ‘দেখ যে পথে তুমি গিয়েছো সে পথ অনেক কঠিন। ঠিকমতো থাকবে। নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলবে তবেই জীবনে অনেক উন্নতি করতে পারবে। আমাকে কাঁদিয়ে আবারো মামা চলে গেলেন।

জীবন বহমান নদীর মতো। সে তার নিয়মে চলতেই থাকবে। মামার চলে যাওয়ার শূন্যতাটুকু জীবনে সয়েই যাচ্ছিল। মাঝে মাঝেই আসতেন মামা। এটা ওটা নিয়ে আসতেন আসার সময়। মামা এলেই মামার গলা জড়িয়ে ধরে যেন মায়ের অভাবটুকুই পূরণ করার চেষ্টা করতাম। পরে শুনেছিলাম মামা ময়মনসিংহে বদলি হয়ে গেছেন। সেখানেই তিনি ছিলেন বেশ কিছু দিন। ১৯৭০ এ তিনি একবার এসেছিলেন। যাওয়ার সময় আব্বাকে বলেছিলেন-

দুলাভাই সময় খুব খারাপ। সাবধানে থাকবেন। আব্বা হেসেছিলেন- আমার জন্য চিন্তা করো না। তুমি সতর্ক থেকো। তারপর আব্বা আর মামার মধ্যে অনেকক্ষণ কথাবার্তা হলো। তারপর যাওয়ার সময় যথারীতি সেই হাসি-কান্নার ফালিরটুকুও সমস্ত হলো।

তারপর এলো সেই ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ। ভয়াল সে রাতে স্মৃতি আমার কিশোরী জীবনের এক দুঃসহ স্মৃতি। সারারাত খাটের নিচে বসেছিলাম সবাই। সে সব দিনের স্মৃতি আজও ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমরা এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা থেকে সিলেট চলে গেলাম। আজকের ছয় ঘণ্টার রাস্তা সে সময় পার হতে পনেরো দিন সময় লেগেছিলো। আব্বা আগেই চলে গিয়েছিলেন সিলেট। নিজ এলাকার যুবকদের নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য। আমরা যাওয়ার পথে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছিলাম। মৃত্যুর বিভীষিকা দেখেছি মানুষের মধ্যে। পথিমধ্যে আমরা আজমিরীগঞ্জে যাওয়ার পর সেখানকার মানুষ তখন আমাদের সাহায্য করার জন্য বলেছিলো- একটা লঞ্চ ঘাটে আছে সেটা বেশ অনেক দূর যাবে। আপনারা এই লঞ্চে দিবাই পর্যন্ত যেতে পারবেন। আমাদের গ্রুপে ছিলো ১৫-২০ জন মানুষ। আমরা তড়িঘড়ি করে সে লঞ্চে উঠে পড়লাম। উঠে দেখি লঞ্চে কোন মানুষ নেই শুধু একজন বাঙালি জোয়ান সৈনিকের বেশে দূরে কিছু নিরীক্ষা করছেন মন দিয়ে। আমার মামার জন্য মন কেমন করে উঠল। না জানি মামা কোথায় আছেন! কেমন আছেন? অনেক কষ্টের পর আমরা আমাদের এলাকায় এসে পৌঁছেছিলাম। গিয়ে দেখি সেখানকার পরিবেশ থমথমে। শুনলাম শিগগিরই সৈনিকেরা এই এলাকায় চলে আসবে। আব্বাকে পেলাম না। তিনি এলাকার যুবকদের নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত চলে গেছেন। এরই মধ্যে একদিন মামা এলেন। তিনি অনেক পথ পাড়ি দিয়ে সিলেট এসেছেন। পথিমধ্যে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। মামাকে পেয়ে আমরা উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম-

– এখন তুমি আমাদের সাথে থাক। আব্বাও তো নেই। তুমি এখন তো আর চাকরিতে নেই। মামা হাসলেন। বললেন- ওরে বোকা মেয়ে সৈন্যরা আমাকে খুঁজে বের করবে। তারপর ধরে নিয়ে যাবে। হতাশ হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম-

– কেন মামা তুমি কি করেছো?

– আমি যে ইস্ট পাকিস্তান বেজিমেন্টের সৈনিক তাই। আমার সাথের অনেক বন্ধু সহকর্মীকে ওরা মেরে ফেলেছে। আমরা যে কয়জন বেঁচে ছিলাম তারা শুধু আক্রমণ প্রতিহত করতে করতে পালিয়ে এসেছি। এখন এখানে চার পাঁচ দিন বিশ্রাম নিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেবো।

এরই মধ্যে একদিন রাতে আব্বা এলেন। আমাদের সাথে দেখা হলো। তারপর দিনই আমাদের বিয়ানিবাজার এলাকায় পাক সেনাদের আগমন ঘটল। মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার করার জন্য চারিদিকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে ছুড়তে এসে তারা থানা কম্পাউন্ডে প্রবেশ করলো। সেদিন রাতেই আব্বা, মামা আরো অনেকে ভারত চলে গেলেন। আমরা আমাদের দাদা ও চাচাদের তত্ত্বাবধানে বাড়িতে রয়ে গেলাম। তখন পাকসেনারা চিরুনি অভিযান চালাচ্ছিলো মুক্তিযোদ্ধা এবং তার পরিবারের লোকজনদের ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতাম। পাকসেনারা তাদের দোসরদের নিয়ে গ্রামে প্রবেশ করলেই বনে জঙ্গলে পালিয়ে যেতাম। আমাদের বাড়ি ছিলো গ্রামের শেষ মাথায়। তারপর ছিলো একটা বড় বিল তার ওপারের আরো দুটো গ্রামের পরই ভারতের সীমান্ত। পাকসেনাদের তল্লাশি অভিযান থেকে বাঁচার জন্য একদিন আমরাও সীমান্ত পাড়ি দিলাম। গিয়ে উঠলাম সীমান্ত সংলগ্ন এক আত্মীয়ের বাড়ি। আমরা সেখানে আছি শুনে একদিন মামা এলেন আমাদের সাথে দেখা করার জন্য। মামাকে অনেক দিন পর দেখে খুব আনন্দ হয়েছিলো। মামা বলেছিলেন- তোমাদের সাথে আর দেখা হবে না। জানি না যুদ্ধ কবে শেষ হবে? আমি কাল এখান থেকে অন্য এলাকায় চলে যাবো। মামা যাওয়ার সময় আমি অনেক দূর পর্যন্ত মামার সাথে সাথে গিয়েছিলাম। নদীর পাড় ধরে হাঁটার পথ ছিলো। মামা অনেক কথা বলেছিলেন মন খারাপ করতে নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন আবার দেখা হবে বলে মাথায় হাত রেখে বিদায় নিয়েছিলেন। সেদিন বুঝতে পারিনি। এ দেখাই আমার শেষ দেখা মামার সাথে। আর কোন দিন মামার সাথে হাত ধরে নদীর পাশ দিয়ে হাঁটা হবে না। এই দিন এই বিদায়ের ক্ষণ চিরদিন অক্ষয় হয়ে রবে আমার হৃদয়ে।

ক্রমে ক্রমে দেশ স্বাধীন হলো। আমাদের এলাকা ১০ ডিসেম্বরে শত্রুমুক্ত হয়ে গিয়েছিলো। তখন আনন্দে অধীর হলে মামার জন্য অপেক্ষার পালা- কখন মামা আসবে? বিজয়ীর বেশে সেই সৈনিকের পোশাক পরা আমার মামা। তারপর একদিন দেখলাম আব্বার মুখ থমথম করছে। কাউকে কিছু বলছেন না। পরে শুনেছিলাম বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে সিলেটের হরিপুরের কাছে পাক সেনাদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে মামা এবং তার সাথে আরো সহযোদ্ধারা শাহাদতবরণ করেছেন। সে মুহূর্তে কী করেছিলাম তা আজ বলাই বাহুল্য। জীবনের ছন্দ পতন ঘটলো। মামার জন্য অপেক্ষার পালা শেষ হয়ে গেলো। তবু মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগলো মামার মৃত্যুটা কিভাবে হলো? কোথায় তিনি সমাহিত হলেন? তখন বয়স কম থাকায় এবং আর মামার কোনো ভাই না থাকায় সে সব জানা সম্ভব হয়নি, কারণ ইতোমধ্যে আব্বাও চলে গিয়েছিলেন না ফেরার দেশে। ২০১৪ সালে আমি আমার বোন এবং ছোট খালা মিলে সেই হরিপুরে গিয়ে এলাকার বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিদের সাথে দেখা করে যুদ্ধের সেই স্মৃতিচারণ করে জানতে পারলাম যে যখন পাক সেনারা বুঝতে পেরেছিলো যে তাদের পরাজয় নিশ্চিত তখন তারা হরিপুরে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং ভারী ভারী যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত ছিলো আক্রমণের জন্য। কিন্তু মামাদের প্লাটুনে ছিলো এগারো জন। ঐ সময়ই পাক সেনাদের সাথে সম্মুখযুদ্ধ হয়। যুদ্ধে পাকসেনারা পিছু হটে যাচ্ছিল কিন্তু অকস্মাৎ এক ভারি গোলার আঘাতে মামাদের প্লাটুনের সাতজন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এলাকার লোকজন আমাদের নিয়ে যায় একটি সমাধিস্থলে। ওরা বলেছিলো যে মৃতদেহগুলো ছিন্ন ভিন্ন হয়ে সমস্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিলো তাই কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। সব মৃতদেহের অংশবিশেষ একত্রিত করে তারা একটি স্থানেই সমাহিত করেছে। যুদ্ধের সে স্মৃতিকথা বলতে বলতে অনেক প্রবীণ ব্যক্তি স্মৃতিকাতর হয়ে উঠেছিলেন। দেখেছিলাম সেই অকুতোভয় সৈনিকেরা কত অবহেলায় রাস্তার পাশে একটি স্থানে ঘুমিয়ে আছেন। শুধুমাত্র শহীদ মিনারের মতো একটি স্মৃতিফলক লাগানো আছে পাশে। এলাকার লোকজন বলেছিলো যে আরো যারা এখানে শহীদ হয়েছেন তাদের আত্মীয়স্বজনেরাও এখানে আসেন ফাতেহা পাঠ করেন এবং তাদের জন্য দোয়া খায়ের করেন।

SHARE

Leave a Reply