Home গল্প বিড়াল তপস্বী মিলি । সোলায়মান আহসান

বিড়াল তপস্বী মিলি । সোলায়মান আহসান

বিড়াল-মিলি-২মিলির সঙ্গে বিড়ালের ভাবটা সেই ছোট্টটি থেকে। একটা ছবি তার প্রমাণ দেয়। মিলির যখন বয়স সাত কি আট মাস, তখনকার ঘটনা। মিলির নানুবাড়ি তাদের বাসা থেকে খুব কাছেই। মিলির আম্মু রানু তখনো ছাত্রী। তাই, মিলিকে নানুবাড়ি রেখে রানু প্রায়ই ভার্সিটিতে যায়। মিলি সে সময়টুকু নানু-খালাদের কাছেই থাকতো। একদিন দু’দিন নয় বেশ অনেকদিন ধরেই বিষয়টা চোখে পড়ে সবার। একটা ছাইরঙা বিড়ালের সঙ্গে মিলির ভাব জমে ওঠে। মিলি যখন মেঝেতে হামাগুড়ি দেয়, বিড়ালটা ‘মিউ’ বলে কাছে আসে তার। মিলিও ভয় পায় না বিড়ালটাকে। বরং ছোট্ট হাত দিয়ে বিড়ালের গায়ে হাত রাখে। একদিন মিলির সেঝ খালা মিনু এক অপূর্ব দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে ফেলে। ছবিটা এমন মিলির সঙ্গে বিড়ালের ভাবটা সেই ছোট্টটি থেকে। একটা ছবি তার প্রমাণ দেয়। মিলির যখন বয়স সাত কি আট মাস, তখনকার ঘটনা। মিলির নানুবাড়ি তাদের বাসা থেকে খুব কাছেই। মিলির আম্মু রানু তখনো ছাত্রী। তাই, মিলিকে নানুবাড়ি রেখে রানু প্রায়ই ভার্সিটিতে যায়। মিলি সে সময়টুকু নানু-খালাদের কাছেই থাকতো। একদিন দু’দিন নয় বেশ অনেকদিন ধরেই বিষয়টা চোখে পড়ে সবার। একটা ছাইরঙা বিড়ালের সঙ্গে মিলির ভাব জমে ওঠে। মিলি যখন মেঝেতে হামাগুড়ি দেয়, বিড়ালটা ‘মিউ’ বলে কাছে আসে তার। মিলিও ভয় পায় না বিড়ালটাকে। বরং ছোট্ট হাত দিয়ে বিড়ালের গায়ে হাত রাখে। একদিন মিলির সেঝ খালা মিনু এক অপূর্ব দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে ফেলে। ছবিটা এমন- মিলি আর বিড়ালটা কাছাকাছি যেন পরস্পর কথা বলছে। মিলির আব্বু সাংবাদিক। তিনি পত্রিকার ছোটদের পাতায় ছেপে দিলেন একটা ক্যাপশন দিয়ে- বন্ধুত্ব। সেই ছবি মিলিকে সাংবাদিক মহলে পরিচিত করে দিলো। দেলওয়ার সাংবাদিক বন্ধুদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতেন- কি আপনার বিড়ালপ্রেমিক মেয়ের খবর কী। বাধ্য হতেন বিড়ালপ্রেমিক মেয়ে মিলির খবর দিতে।

সেই মিলি দেখতে দেখতে অনেক বড় হয়েছে। এসএসসি পরীক্ষা দেবে। এর মধ্যে আরেক কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছে সে। মিলিকে ওর বন্ধুরা এখন বিড়ালপ্রেমিক নয় ‘বিড়াল তপস্বী’ বলে ডাকে। বিড়াল নিয়ে মিলি কাণ্ড কম ঘটায়নি। একবার বৃষ্টির দিনে স্কুল থেকে ফেরার পথে গলিপথের মোড়ে বৃষ্টিভেজা ছোট্ট বিড়ালছানা নিয়ে এলো মিলি। একেত খুব ছোট্ট তাতে প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে বিড়ালছানার অবস্থা খুব নাজুক। মিলির আম্মু-আব্বু, বোনেরা, ভাইয়া জিশান সবারই খুব মায়া হলো। যেভাবেই হোক বিড়ালটাকে বাঁচাতেই হবে। সবাই করল পণ। মিলির ভাইয়া নিয়ে এলো দোকান থেকে মিল্কভিটা দুধ। যে দুধ নিয়ে প্রায়ই ভাইবোনে কাড়াকাড়ি করে আজ বিড়াল ছানার জন্য তারাই দুধ খাওয়া বন্ধ করে দিলো।

বিড়াল ছানার বসবাসের জন্য বড় সাইজের জুতার বাক্সটা আব্বু দিয়ে দিলেন। জুতোতে ধুলোবালি পড়ুক বিড়াল ছানা তবু বাঁচুক, এমন উদার হলেন আব্বু। পড়াশোনা রেখে বিড়াল ছানার সেবা করাটাও বেশ কয়েকদিন অগোচরে অনুমতি পেলো। বিশেষ করে এ ব্যাপারে মিলির থাকল শিথিল শাসন। মাঝে মধ্যে আম্মু বলেন- মিলি পড়াশোনা রেখে এসব কী হচ্ছে? মিলির নরম গলায় জবাব- পড়া করে এসেছি আম্মু! পড়াশোনায় মিলি বেশ ভালো। মিরপুরের নামকরা স্কুলে পড়ে সে। সেকসন এ-তে। রোল এক দুই তিনের মধ্যেই থাকে। তাই, মিলির পড়া নিয়ে তেমন কেউ অভিযোগ করে না। অভিযোগ বিড়াল নিয়ে বাড়াবাড়ি করার। সেই বিড়ালের কাহিনী গড়ায় অনেক দূর। জিশানের পশুর ডাক্তার খুঁজে বের করা। ঔষুধ-পত্র যত্ন-আত্তি করে বিড়াল ছানার জীবন বাঁচিয়ে দেয়ার কৃতিত্ব শুধু মিলির নয়- ভাইয়া জিশান, ছোট বোন পুটুরানি, বড় আপু কেয়া এবং আম্মু-আব্বুরও কম কিসে! বিড়ালছানাটা শুধুই বেঁচেই গেলো না। ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলো। মিলি শ্যাম্পু দিয়ে গা ধোয়ায়। নিজের মধু মাছ খাওয়ায়, বিছানায় নিয়ে শোয়ায় যা সবার চোখে আপত্তিকর ঠেকে। বিরক্ত হয়ে ওঠে মিলির বিড়াল নিয়ে আদিখ্যেপনায় একে একে সবাই। কিন্তু মিলিকে বিরত করা যায় না। আব্বু একদিন মিলিকে ডেকে বললেন- অনেক হয়েছে এবার বিড়ালটা বিদায় করে নিজের চরকায় তেল দাও! পড়াশোনায় মন লাগাও! মিলি মিন মিন স্বরে বলে- আব্বু পড়াশোনা করছি তো!

নাহ মিলিকে বিড়াল থেকে আলাদা করা গেল না। এর মধ্যে বিড়ালটা একটা ইঁদুর মেরে দেখাল সে শুধু খাওয়ার গোসাই না, কম্মেরও গোসাই। পেয়ে গেল মিলি যুৎসই পয়েন্ট। নিচ তলার বাসা। দু’একটা ইঁদুরের আনাগোনা থাকেই। রান্নাঘরে ইঁদুরের উপস্থিতি টের পেয়েছে কাজের বুয়া বাতাসীর মা আরো আগে। কথাটা মিলির আম্মুর কানেও তুলেছে দু-একদিন। বলেছে ইঁদুর মারার ঔষুধ নাকি এনে দেবেন। ঐ বলা পর্যন্তই। এবার বিড়ালের হাতে ইঁদুর নিধনের ঘটনা-বিড়ালের উপস্থিতিকে যুক্তিসঙ্গত করল আর কি! থাকুক বিড়ালটা। ইঁদুরের জ¦ালাতন থেকে বাঁচা যাবে! বলল আম্মু। যথারীতি আব্বুও সায় দিলো। পাকা হয়ে গেল বিড়ালের থাকার বিষয়।

এভাবে বিড়ালটা বেশ বড় হয়ে উঠলো। ধীরে ধীরে একদিন মিলির আম্মুর চোখেই পড়ল বিষয়টা- বিড়ালটা গর্ভিণী। হায় হায় মনে মনে প্রমাদ গুনলেন রানু। তাহলেতো বাড়ি-ঘর ভরে যাবে বিড়ালে। মিলির আব্বুর সঙ্গে শলাপরামর্শ করেন বিষয়টা নিয়ে।

মিলির আব্বুও কম যান না। রসিকতা করতে ছাড়লেন না- ভালই হবে তুমি নানু হয়ে যাবে। হাসাহাসি হলো দু’জনে। অবশেষে দেলওয়ার মত দিলেন- দূরে কোথাও বিড়ালটাকে রেখে আসতে হবে। মিলি যাতে টের না পায়। কিন্তু অমন নিষ্ঠুর কাজটা করবে কে! মিলির আব্বুতো একটা মুরগি জবেহ করতে পারে না। এ নিষ্ঠুর কাজে এমনিতেই দিয়েছে মৃদু সম্মতি। দারোয়ান কিংবা চেনাজানা মানুষকে দিয়ে কাজটা করালে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। মিলি জানতে পারলে যাচ্ছে তাই কাণ্ড বাধতে পারে। এমনিতে মেয়ের রাগ অভিমান খুব বেশি।

এই সমস্যার কথা বাসার কাছে মুদি দোকানি শাহীনকে বলে ফেলেন দেলওয়ার। শাহীন দেলওয়ারকে বেশ সম্মান করে। সাংবাদিক হিসেবে তো বটেই মাসের চাল-ডাল, মসলা-পাতি ইত্যাদি ওর দোকান থেকেই যায়। একটা স্লিপ ফেলে যেতে পারলেই হলো। দোকানের পিচ্চি কর্মচারী মিলন তা যথাসময় বাসায় পৌঁছে দেয়। সেই শাহীন দেলওয়ারকে আশ্বস্ত করে। ভাইজান, এর একটা বিহিত করুমনে, চিন্তা কইরেন না। কিভাবে? দেলওয়ার জানতে চায়।

বাইজান, আমার মিলনই পারবে। একটা বস্তায় পুরে ফেলে আসবে দূরে। শাহীন হাসে।

দেলওয়ার খুশি হয়ে বাসায় এসে রানুকে জানাল। শাহীন নিয়েছে বিড়ালটা ফেলে আসার দায়িত্ব। শুনেই রানুর চোখ দিয়ে পানি এসে গেল।

দেলওয়ার তা দেখে তার মনটাও মোচড় দিয়ে উঠল। বেশ অনেকদিন হল বিড়ালটা এ পরিবারে আছে। পরিবারের সদস্য হয়ে গেছে যেন। সেই পুঁচকে থেকে বছর ঘুরে এলো বিড়ালটা আছে বাসায়। মিলির প্রিয় সাথী বিড়ালটা। মিলির জন্য ভেবে দেলওয়ারের মনটা আরো ভিজে গেল। কেন বিড়ালটা গর্ভিণী হতে গেল।

দেলওয়ার আবার জানতে চায় রানুর কাছে- বিড়ালটার পেটে বাচ্চা আছে তুমি কি নিশ্চিত?

রানু চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল- আমি তো চার চারটে বাচ্চার মা হয়েছি বুঝব না?

তাহলে সাত-পাঁচ ভেবে কি হবে, ওটাকে শাহীনের হাওলায় দিয়ে দিতেই হবে। মনটা শক্ত কর রানু। কত মানুষ কতভাবে মরছে যে দেশে, একটা বিড়ালকে নিয়ে এত দয়ালু হয়ে কাজ নেই আমাদের। পরে পস্তাতে হবে।

সবাই যখন স্কুল-কলেজে এক দুপুরে শাহীনের দোকানের কর্মচারী বালক মিলন এলো একটা সিনথেটিক সাদা রঙের বস্তা নিয়ে। বাসায় দেলওয়ারও নেই। রানুর ওপর পড়ল ওই নিষ্ঠুর কাজটা। ছাড়া বিড়াল। বাসায় সবসময় থাকে না। মিলি এলে কোত্থেকে এসে তৎক্ষণাৎ হাজির। নরম স্বরের ডাক মিঁউ…। মিলি ব্যস্ত হয়ে পড়বে খাবার দিতে।

মিলনের হাতে সিনথেটিক বস্তা দেখে ক্ষেপে গেলেন রানু। এই ছেলে, সিনথেটিক বস্তা কেন, ওতে বাতাস ঢুকতে পারবে? পাটের বস্তা আন! নতুন এবং পরিষ্কার।

অগত্যা ছেলেটি ফিরে যায় পাটের বস্তা আনতে। শাহীন তা শুনে হাসতে হাসতে খুন। বিড়ালের জন্য মায়া কত! অবশেষে সেই বিড়ালকে তুলে দেয়া হলো মিলনের হাতে। কাজটা করার জন্য যাতায়াত বাবদ একশ এবং কাজের বখশিশ একশ মোট দু’শো টাকা গুঁজে দেয় রানু মিলনের বুক পকেটে।

মিলি স্কুল থেকে এসে ডাকাডাকি শুরু করে বিড়ালকে। ভাই-বোনরা মিলে বিড়ালটার নাম দিয়েছিল লেডি মার্জার। ডাকতে থাকে-মার্জার… মার্জার…. মার্জার…। কিন্তু না বিড়াল আর আসে না। মিলিকে বলা হলো হয়তো কোথায় গেছে এসে পড়বে। একটা কালো হুলোর গতিবিধি ভালো ছিল না। মিলির বিড়ালটা সবসময়ে ভয়ে কাতর থাকত ওই হুলোর জন্য। তা ছাড়া কুকুর বড় হিংস্র প্রাণী। এ পাড়ায় কুকুরের উপদ্রবও কম না। কুকুরের দ্বারাও কিছু ঘটতে পারে। এসব নানা কথা বলে মিলিকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন রানু এবং ভাই-বোনেরা। মিলি তাতে বিড়ালের শোক ভুলতে পারে না। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে উদাস হয়ে বসে থাকে ছাদে।

সারাটা দুপুর বিকেল ছাদে মিলি বসে থাকল। খাবার খেলো না। রানু অস্থির হয়ে পড়লেন। পাশের বাসার সমবয়সী চৈতিকে ডেকে আনা হলো মিলিকে ঘরে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য। চৈতি ব্যর্থ। চৈতির আম্মু রিনা আন্টিও ব্যর্থ। বাকি আছে মিলির আব্বু। তার আসার কথা রাতে। তার মানে রাত অবধি মেয়ে ছাদে থাকবে! হেমন্তকাল। শীত পড়তে শুরু করে বিকেল থেকে। ঠাণ্ডা লেগে যাবে না মেয়েটার? রানুর দুশ্চিন্তা বেড়েই চলেছে।

ভাগ্য হলো সুপ্রসন্ন। দেলওয়ার সেদিন সন্ধ্যার একটু আগেই এসে হাজির। ঘটনা জেনে সোজা ছাদে দেলওয়ার। আদর করে কাছে টেনে দেলওয়ার বললেন- মামনি, বিড়াল তো ভালো প্রাণী না, তোমাকে সাদা ধবধবে খরগোশ এনে দেবো একজোড়া। খরগোশ দেখতে যেমন সুন্দর স্বভাবও খুব পরিপাটি। মিলির শোক খানিকটা কমলো। ছাদ থেকে নেমে এলো। পরে মিলির পছন্দ গিয়ে ঠেকে টিয়া পাখিতে। দেলওয়ার এক জোড়া টিয়া এনে দেন দিন সাতেকের মধ্যে। কিন্তু মিলির বিড়ালপ্রীতি তাতে গেলই না।

হঠাৎ সেদিন মিলি খাঁচায় দু’টো বিড়াল ছানা এনে হাজির। সঙ্গে তার বন্ধু তমা। তমা আসার কারণ এই বিড়াল দুটো সম্পর্কে বিস্তারিত আম্মুকে জানাবে। এই বিড়াল সাধারণ বিড়াল নয় সে বিষয়টা বুঝিয়ে দেবে।

তমা গিয়ে রানুকে বোঝাল তার সারমর্ম হলো : ওরা একটা সোসাইটির মেম্বার হয়েছে। যারা বিড়ালকে পছন্দ করে, পালে এবং বিড়াল জাতির সেবা করতে আগ্রহী, নাম-বাংলাদেশ ক্যাটস সোসাইটি। এরা উন্নতজাতের বিদেশী বিড়াল সংগ্রহ করে এবং যারা পালতে আগ্রহী তাদেরকে বিনে পয়সায় দেয়। তবে শর্ত হলো- এদেরকে লালন-পালনের জন্য যে ম্যানুয়েল দেয়া হবে সেটা অনুসরণ করতে হবে। দেশী বিড়ালের সঙ্গে মিশতে দেয়া যাবে না। যদি কেউ বদলি জনিত কিংবা অন্য কোনো কারণে পালতে আগ্রহী না হয়, সেক্ষেত্রে সোসাইটিকে জানাতে হবে। সোসাইটি তার হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেবে। সেক্ষেত্রে পেনালটি গুনতে হবে দশ হাজার টাকা।

সবটা শুনে রানুর চোখ চড়ক গাছ। সামনেই মিলির এসএসসি ফাইনাল। বিড়াল নিয়ে আবার ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ল? অবশ্য মানতেই হবে। খাঁচার ভেতর থাকা দু’টো বিদেশী তুলতুলে বিড়াল ছানা সত্যিই অপূর্ব সুন্দর! চোখ জোড়া কেমন মায়াবী! রানুর দিকে তাকিয়ে বলছিল-আমাদের বিদায় করো না। আর বিদায় করা কি সম্ভব! মিলি যখন নিয়েই এসেছে তার পছন্দের ভেতর হাত দেবে কে!

মুখে বলল তমাকে- ঠিক আছে, তুমি মাঝে মাঝে এসো। বিড়াল দু’টোকে দেখে যেয়ো। যা যা লাগে দিয়ে যেয়ো। আমিতো আসবই আন্টি, মিলিকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে না! আর হ্যাঁ আন্টি, বিড়াল দু’টোকে ইনজেকশন দেয়া। কোন চিন্তা করবেন না। ভাইরাস ছড়ানোর ভয় নেই একদম।

আমরা প্রতি বছর এক্সিবিশন করি। প্রাইজ দেই। মিলির বিড়ালটাও যাবে এক্সিবিশনে। তখন অনেক প্রচার হবে মিলির। যদি প্রাইজ পায় টাকা এবং ট্রফি দু’টোই পাবে।

দেলওয়ার রাতে বাসায় ফিরে। বারান্দায় তার যাওয়া পড়ে কদাচিৎ। সেদিন গোসল করবে গামছার খোঁজে বারান্দায় গেল। বারান্দার লাইট জ্বেলেই দেখল একটা খাঁচা। খাঁচার ভেতর দু’টো বিড়াল ছানা। ধবধবে সাদা একটা। আরেকটা ছাই রঙ মেশানো। বুঝতে বাকি থাকল না এ মিলির কাজ। মেজাজ চড়ে গেল। ছুটে এলো রানুর কাছে। রান্নাঘরে রানু তখন। দেলওয়ারের খাবার দিচ্ছিল গরম করে।

আবার বিড়াল এনেছে মিলি? দেলওয়ার উত্তেজিত স্বরে বলল। ওগুলো বিদেশী বিড়াল, কোন রোগ ছড়ায় না-

খাঁচার মধ্যে বিড়াল পোষা যায়? এখন আমরা থাকি চারতলায়। ছোট্ট ফ্ল্যাট। এরকম ফ্ল্যাটে কেউ বিড়াল পোষে?

তুমি গোসল সেরে খাও, পরে সব বলছি। ওগুলো নিয়ে যাবে। রানু দেলওয়ারকে তখনকার মত নিবৃত্ত করলেন।

তারপরের ঘটনা বিড়াল দু’টোকে বাসা থেকে স্থানান্তর করা হলো ছাদে। রোদ থেকে বাঁচার জন্য এক সময় পায়রা পোষা হতো ছোট একটা ঘর আছে সেখানে রাখা হলো ওদের। পুটু জিশান কেয়াপু সবাই প্রথম প্রথম বিড়ালের সেবক বনে গেল। বিড়ালের খাবারের মেনু রাজসিক। রাজসিক তো বটেই। দু’বেলা মাছ। চাট্টিখানি কথা। মানুষেরই জোটে না মাছ। তাও শোল মাছ। মরা পচা খাবে না। তাজা মাছ ফ্রাই করে দিতে হবে। গরুর দুধ। প্রতিদিন হাফ লিটার। জোগান দিতে গিয়ে সবার পাতের মাছ হাওয়া। ফ্রিজ থেকে মাছের পোঁটলা হাওয়া। দুধের প্যাকেট হাওয়া। তাতেও কুলোয় না। চৈতিদের বাসা। এছাড়া বিড়ালের প্যাটেন্ট খাবার আছে তাও দাম দিয়ে কিনে আনে মিলি। টাকা দেন আম্মু। কি করবেন না দিলে কান্নাকাটি। স্ট্রাইক পড়া বন্ধ। এভাবে বিড়াল দুটো বেশ বড় হয়ে ওঠে। আশপাশের ছেলে-মেয়েরা আসে দেখতে। এখন আর খাঁচায় সব সময় রাখা হয় না। ছাড়া হয় ঘরের মধ্যেই। ভীষণ দুষ্টু বিড়াল দুটো। ছোটাছুটি করে। এভাবে ছুটোছুটি করতে গিয়ে সেদিন ড্রয়িং রুমের চাইনিজ ফ্লাওয়ার ভাসটা ভেঙে ফেলে। ফ্লাওয়ার ভাসটা ছিল আব্বুর পছন্দের। ক্রিস্টাল কাচের। সেদিন মিলির বিড়ালের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। দেলওয়ার সোজা বলে দিয়েছিল- বাসায় বিড়াল পোষা যাবে না। রানু কানে কানে বলল তমাকে ডেকে বিদায় করার ব্যবস্থা নেবে। বেশি চটপট করলে পড়াশোনা বন্ধ করে দেবে। পরীক্ষা সামনে।

তমাকে ডাকা হলো। তমা এলো। রানু বুঝিয়ে বলল এমন ছোট্ট বাসায় বিড়াল পোষা সম্ভব নয়। তমা যেন একটা ব্যবস্থা করে। প্যানাল্টির টাকা দিলে সে ব্যবস্থা করতে পারবে। কারণ ও দুটো বিড়ালের ক্রয়মূল্য নাকি দশ হাজার টাকা। রানু গেল চুপসে। এতগুলো টাকা দেয়া কি সম্ভব! তাহলে আরো কিছুদিন থাকুক। ভালো গ্রাহক পেলে হস্তান্তর করে দেবে। ফেসবুকে ছবিসহ বিজ্ঞাপন দেয়া হলো। একদিনের মধ্যে পাঁচজন আগ্রহী ফেসবুকে আগ্রহ দেখালো নেয়ার। কিন্তু মিলি রাজি নয় হাতছাড়া করতে। অগত্যা তমার কিছু করার নেই। রানুও আর তমাকে কিছু বলল না। মনে মনে বললেন- তুমিই নষ্টের মূল। বিড়াল তপস্বী সেজেছো?

বিড়াল দুটোকে ছাদেই রাখা হয় বেশির ভাগ সময়। মিলিও থাকে ছাদে। বই হাতে মোড়ায় বসে ছাদে পড়ে। বিড়াল পাহারা দেয়। খাবার দেয়। পুটুও মিলির সহকারী হয়ে ওসব করে। যাচ্ছিল দিন কেটে ভালোই।

হঠাৎ একদিন দুপুরে মিলি ছাদে উঠে দেখে বিড়াল দুটো নেই। খাঁচার দরোজা খোলা। তালাটা ভাঙা খাঁচার পাশে পড়ে। মিলি কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ছুটে এলো। হ্যা… হ্যা… হ্যা… আমার বিড়াল চুরি গেছে… হ্যা… হ্যা… হ্যা… যে যেখানে ছিল দৌড়ে ছাদে উঠে এলো। সত্যিই বিড়াল নেই। খাঁচার তালা ভাঙা। তার মানে চুরি। তমা এলো ছুটে। বলল- থানায় জিডি করতে। রেজিস্টার্ড বিড়াল। ওদের ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক আছে। পুলিশ জিডি করতে বাধ্য। ইত্যাদি ইত্যাদি।

রানুর চোখেও পানি। পুটুও কাঁদছে। আর মিলি বিছানায় উপুড় হয়ে আছে সেই থেকে।

জিশান বলল- তমা, পুলিশ মানুষ খুঁজে বের করে না, আর বিড়াল খুঁজে বের করবে? এটা কি ইউরোপ?

রানুও বুঝতে পারে তমার কথা ঠিক না। কিন্তু বিড়াল দুটো চুরি করলো কে?

দেলওয়ারকে ফোনে জানিয়েছিল রানু। বিড়াল গেছে সে জন্য তার দুঃখ নেই মিলিকে কিভাবে শোক ভুলিয়ে দেয়া যায় সে কথা ভেবেই অস্থির হলেন তিনি।

চিন্তিত দেখে দেলওয়ারের এক কলিগ সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন- দিলু ভাই, কি চিন্তা করছেন? দেলওয়ার খুলে বলল।

হাসতে হাসতে বললেন- ও আপনার সেই বিড়াল তপস্বী মেয়ের বিড়াল চুরি গেছে? আমি একটি ফিচার করতে চেয়েছিলাম ওকে নিয়ে। চলুন, আজই সে কাজটা করে ফেলি। ফিচার নয় নিউজ। বিড়াল চুরির চাঞ্চল্য নিউজ।

যাবে? দেলওয়ার প্রশ্ন করে কাঞ্চনকে।

কিভাবে খাওয়াতে হয় পাবলিককে কুড়ি বছর সাংবাদিকতায় কম শিখিনি দিলু ভাই। হা… হা… হা… হা…

সাংবাদিক এসেছে শুনে মিলির দুঃখ মুহূর্তে উঠে গেল। ড্রয়িং রুমে এসে লক্ষ্মীমন্ত হয়ে প্রশ্নের জবাব দিলো কাঞ্চনকে। পরের দিনের পরদিন ছাপা হলো বিশাল নিউজ- সংঘবদ্ধ চক্রের দেশ থেকে বিড়াল চুরি করে পাচার। সোসাইটির কথা, বিড়াল পোষার আগ্রহীদের কথা, শীত অঞ্চল থেকে বিড়াল আনার ইতিহাস ইত্যাদি বর্ণনাসহ। নিউজের সঙ্গে মিলির ছবি এবং সাক্ষাৎকার। সেই থেকে মিলির বিড়াল তপস্বী নামটা চাউর হয়ে গেল। মিলি কিন্তু এখনো বিড়ালের সেবা করে বেড়ায়। কিভাবে? ফেসবুকে পাওয়া যাবে। মিলি আর বিড়ালটা কাছাকাছি যেন পরস্পর কথা বলছে। মিলির আব্বু সাংবাদিক। তিনি পত্রিকার ছোটদের পাতায় ছেপে দিলেন একটা ক্যাপশন দিয়ে- বন্ধুত্ব। সেই ছবি মিলিকে সাংবাদিক মহলে পরিচিত করে দিলো। দেলওয়ার সাংবাদিক বন্ধুদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতেন- কি আপনার বিড়ালপ্রেমিক মেয়ের খবর কী। বাধ্য হতেন বিড়ালপ্রেমিক মেয়ে মিলির খবর দিতে।

সেই মিলি দেখতে দেখতে অনেক বড় হয়েছে। এসএসসি পরীক্ষা দেবে। এর মধ্যে আরেক কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছে সে। মিলিকে ওর বন্ধুরা এখন বিড়ালপ্রেমিক নয় ‘বিড়াল তপস্বী’ বলে ডাকে। বিড়াল নিয়ে মিলি কাণ্ড কম ঘটায়নি। একবার বৃষ্টির দিনে স্কুল থেকে ফেরার পথে গলিপথের মোড়ে বৃষ্টিভেজা ছোট্ট বিড়ালছানা নিয়ে এলো মিলি। একেত খুব ছোট্ট তাতে প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে বিড়ালছানার অবস্থা খুব নাজুক। মিলির আম্মু-আব্বু, বোনেরা, ভাইয়া জিশান সবারই খুব মায়া হলো। যেভাবেই হোক বিড়ালটাকে বাঁচাতেই হবে। সবাই করল পণ। মিলির ভাইয়া নিয়ে এলো দোকান থেকে মিল্কভিটা দুধ। যে দুধ নিয়ে প্রায়ই ভাইবোনে কাড়াকাড়ি করে আজ বিড়াল ছানার জন্য তারাই দুধ খাওয়া বন্ধ করে দিলো।

বিড়াল ছানার বসবাসের জন্য বড় সাইজের জুতার বাক্সটা আব্বু দিয়ে দিলেন। জুতোতে ধুলোবালি পড়ুক বিড়াল ছানা তবু বাঁচুক, এমন উদার হলেন আব্বু। পড়াশোনা রেখে বিড়াল ছানার সেবা করাটাও বেশ কয়েকদিন অগোচরে অনুমতি পেলো। বিশেষ করে এ ব্যাপারে মিলির থাকল শিথিল শাসন। মাঝে মধ্যে আম্মু বলেন- মিলি পড়াশোনা রেখে এসব কী হচ্ছে? মিলির নরম গলায় জবাব- পড়া করে এসেছি আম্মু! পড়াশোনায় মিলি বেশ ভালো। মিরপুরের নামকরা স্কুলে পড়ে সে। সেকসন এ-তে। রোল এক দুই তিনের মধ্যেই থাকে। তাই, মিলির পড়া নিয়ে তেমন কেউ অভিযোগ করে না। অভিযোগ বিড়াল নিয়ে বাড়াবাড়ি করার। সেই বিড়ালের কাহিনী গড়ায় অনেক দূর। জিশানের পশুর ডাক্তার খুঁজে বের করা। ঔষুধ-পত্র যত্ন-আত্তি করে বিড়াল ছানার জীবন বাঁচিয়ে দেয়ার কৃতিত্ব শুধু মিলির নয়- ভাইয়া জিশান, ছোট বোন পুটুরানি, বড় আপু কেয়া এবং আম্মু-আব্বুরও কম কিসে! বিড়ালছানাটা শুধুই বেঁচেই গেলো না। ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলো। মিলি শ্যাম্পু দিয়ে গা ধোয়ায়। নিজের মধু মাছ খাওয়ায়, বিছানায় নিয়ে শোয়ায় যা সবার চোখে আপত্তিকর ঠেকে। বিরক্ত হয়ে ওঠে মিলির বিড়াল নিয়ে আদিখ্যেপনায় একে একে সবাই। কিন্তু মিলিকে বিরত করা যায় না। আব্বু একদিন মিলিকে ডেকে বললেন- অনেক হয়েছে এবার বিড়ালটা বিদায় করে নিজের চরকায় তেল দাও! পড়াশোনায় মন লাগাও! মিলি মিন মিন স্বরে বলে- আব্বু পড়াশোনা করছি তো!

নাহ মিলিকে বিড়াল থেকে আলাদা করা গেল না। এর মধ্যে বিড়ালটা একটা ইঁদুর মেরে দেখাল সে শুধু খাওয়ার গোসাই না, কম্মেরও গোসাই। পেয়ে গেল মিলি যুৎসই পয়েন্ট। নিচ তলার বাসা। দু’একটা ইঁদুরের আনাগোনা থাকেই। রান্নাঘরে ইঁদুরের উপস্থিতি টের পেয়েছে কাজের বুয়া বাতাসীর মা আরো আগে। কথাটা মিলির আম্মুর কানেও তুলেছে দু-একদিন। বলেছে ইঁদুর মারার ঔষুধ নাকি এনে দেবেন। ঐ বলা পর্যন্তই। এবার বিড়ালের হাতে ইঁদুর নিধনের ঘটনা-বিড়ালের উপস্থিতিকে যুক্তিসঙ্গত করল আর কি! থাকুক বিড়ালটা। ইঁদুরের জ্বালাতন থেকে বাঁচা যাবে! বলল আম্মু। যথারীতি আব্বুও সায় দিলো। পাকা হয়ে গেল বিড়ালের থাকার বিষয়।

এভাবে বিড়ালটা বেশ বড় হয়ে উঠলো। ধীরে ধীরে একদিন মিলির আম্মুর চোখেই পড়ল বিষয়টা- বিড়ালটা গর্ভিণী। হায় হায় মনে মনে প্রমাদ গুনলেন রানু। তাহলেতো বাড়ি-ঘর ভরে যাবে বিড়ালে। মিলির আব্বুর সঙ্গে শলাপরামর্শ করেন বিষয়টা নিয়ে।

মিলির আব্বুও কম যান না। রসিকতা করতে ছাড়লেন না- ভালই হবে তুমি নানু হয়ে যাবে। হাসাহাসি হলো দু’জনে। অবশেষে দেলওয়ার মত দিলেন- দূরে কোথাও বিড়ালটাকে রেখে আসতে হবে। মিলি যাতে টের না পায়। কিন্তু অমন নিষ্ঠুর কাজটা করবে কে! মিলির আব্বুতো একটা মুরগি জবেহ করতে পারে না। এ নিষ্ঠুর কাজে এমনিতেই দিয়েছে মৃদু সম্মতি। দারোয়ান কিংবা চেনাজানা মানুষকে দিয়ে কাজটা করালে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। মিলি জানতে পারলে যাচ্ছে তাই কাণ্ড বাধতে পারে। এমনিতে মেয়ের রাগ অভিমান খুব বেশি।

এই সমস্যার কথা বাসার কাছে মুদি দোকানি শাহীনকে বলে ফেলেন দেলওয়ার। শাহীন দেলওয়ারকে বেশ সম্মান করে। সাংবাদিক হিসেবে তো বটেই মাসের চাল-ডাল, মসলা-পাতি ইত্যাদি ওর দোকান থেকেই যায়। একটা স্লিপ ফেলে যেতে পারলেই হলো। দোকানের পিচ্চি কর্মচারী মিলন তা যথাসময় বাসায় পৌঁছে দেয়। সেই শাহীন দেলওয়ারকে আশ্বস্ত করে। ভাইজান, এর একটা বিহিত করুমনে, চিন্তা কইরেন না। কিভাবে? দেলওয়ার জানতে চায়।

বাইজান, আমার মিলনই পারবে। একটা বস্তায় পুরে ফেলে আসবে দূরে। শাহীন হাসে।

দেলওয়ার খুশি হয়ে বাসায় এসে রানুকে জানাল। শাহীন নিয়েছে বিড়ালটা ফেলে আসার দায়িত্ব। শুনেই রানুর চোখ দিয়ে পানি এসে গেল।

দেলওয়ার তা দেখে তার মনটাও মোচড় দিয়ে উঠল। বেশ অনেকদিন হল বিড়ালটা এ পরিবারে আছে। পরিবারের সদস্য হয়ে গেছে যেন। সেই পুঁচকে থেকে বছর ঘুরে এলো বিড়ালটা আছে বাসায়। মিলির প্রিয় সাথী বিড়ালটা। মিলির জন্য ভেবে দেলওয়ারের মনটা আরো ভিজে গেল। কেন বিড়ালটা গর্ভিণী হতে গেল।

দেলওয়ার আবার জানতে চায় রানুর কাছে- বিড়ালটার পেটে বাচ্চা আছে তুমি কি নিশ্চিত?

রানু চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল- আমি তো চার চারটে বাচ্চার মা হয়েছি বুঝব না?

তাহলে সাত-পাঁচ ভেবে কি হবে, ওটাকে শাহীনের হাওলায় দিয়ে দিতেই হবে। মনটা শক্ত কর রানু। কত মানুষ কতভাবে মরছে যে দেশে, একটা বিড়ালকে নিয়ে এত দয়ালু হয়ে কাজ নেই আমাদের। পরে পস্তাতে হবে।

সবাই যখন স্কুল-কলেজে এক দুপুরে শাহীনের দোকানের কর্মচারী বালক মিলন এলো একটা সিনথেটিক সাদা রঙের বস্তা নিয়ে। বাসায় দেলওয়ারও নেই। রানুর ওপর পড়ল ওই নিষ্ঠুর কাজটা। ছাড়া বিড়াল। বাসায় সবসময় থাকে না। মিলি এলে কোত্থেকে এসে তৎক্ষণাৎ হাজির। নরম স্বরের ডাক মিঁউ…। মিলি ব্যস্ত হয়ে পড়বে খাবার দিতে।

মিলনের হাতে সিনথেটিক বস্তা দেখে ক্ষেপে গেলেন রানু। এই ছেলে, সিনথেটিক বস্তা কেন, ওতে বাতাস ঢুকতে পারবে? পাটের বস্তা আন! নতুন এবং পরিষ্কার।

অগত্যা ছেলেটি ফিরে যায় পাটের বস্তা আনতে। শাহীন তা শুনে হাসতে হাসতে খুন। বিড়ালের জন্য মায়া কত! অবশেষে সেই বিড়ালকে তুলে দেয়া হলো মিলনের হাতে। কাজটা করার জন্য যাতায়াত বাবদ একশ এবং কাজের বখশিশ একশ মোট দু’শো টাকা গুঁজে দেয় রানু মিলনের বুক পকেটে।

মিলি স্কুল থেকে এসে ডাকাডাকি শুরু করে বিড়ালকে। ভাই-বোনরা মিলে বিড়ালটার নাম দিয়েছিল লেডি মার্জার। ডাকতে থাকে-মার্জার… মার্জার…. মার্জার…। কিন্তু না বিড়াল আর আসে না। মিলিকে বলা হলো হয়তো কোথায় গেছে এসে পড়বে। একটা কালো হুলোর গতিবিধি ভালো ছিল না। মিলির বিড়ালটা সবসময়ে ভয়ে কাতর থাকত ওই হুলোর জন্য। তা ছাড়া কুকুর বড় হিংস্র প্রাণী। এ পাড়ায় কুকুরের উপদ্রবও কম না। কুকুরের দ্বারাও কিছু ঘটতে পারে। এসব নানা কথা বলে মিলিকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন রানু এবং ভাই-বোনেরা। মিলি তাতে বিড়ালের শোক ভুলতে পারে না। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে উদাস হয়ে বসে থাকে ছাদে।

সারাটা দুপুর বিকেল ছাদে মিলি বসে থাকল। খাবার খেলো না। রানু অস্থির হয়ে পড়লেন। পাশের বাসার সমবয়সী চৈতিকে ডেকে আনা হলো মিলিকে ঘরে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য। চৈতি ব্যর্থ। চৈতির আম্মু রিনা আন্টিও ব্যর্থ। বাকি আছে মিলির আব্বু। তার আসার কথা রাতে। তার মানে রাত অবধি মেয়ে ছাদে থাকবে! হেমন্তকাল। শীত পড়তে শুরু করে বিকেল থেকে। ঠাণ্ডা লেগে যাবে না মেয়েটার? রানুর দুশ্চিন্তা বেড়েই চলেছে।

ভাগ্য হলো সুপ্রসন্ন। দেলওয়ার সেদিন সন্ধ্যার একটু আগেই এসে হাজির। ঘটনা জেনে সোজা ছাদে দেলওয়ার। আদর করে কাছে টেনে দেলওয়ার বললেন- মামনি, বিড়াল তো ভালো প্রাণী না, তোমাকে সাদা ধবধবে খরগোশ এনে দেবো একজোড়া। খরগোশ দেখতে যেমন সুন্দর স্বভাবও খুব পরিপাটি। মিলির শোক খানিকটা কমলো। ছাদ থেকে নেমে এলো। পরে মিলির পছন্দ গিয়ে ঠেকে টিয়া পাখিতে। দেলওয়ার এক জোড়া টিয়া এনে দেন দিন সাতেকের মধ্যে। কিন্তু মিলির বিড়ালপ্রীতি তাতে গেলই না।

হঠাৎ সেদিন মিলি খাঁচায় দু’টো বিড়াল ছানা এনে হাজির। সঙ্গে তার বন্ধু তমা। তমা আসার কারণ এই বিড়াল দুটো সম্পর্কে বিস্তারিত আম্মুকে জানাবে। এই বিড়াল সাধারণ বিড়াল নয় সে বিষয়টা বুঝিয়ে দেবে।

তমা গিয়ে রানুকে বোঝাল তার সারমর্ম হলো : ওরা একটা সোসাইটির মেম্বার হয়েছে। যারা বিড়ালকে পছন্দ করে, পালে এবং বিড়াল জাতির সেবা করতে আগ্রহী, নাম-বাংলাদেশ ক্যাটস সোসাইটি। এরা উন্নতজাতের বিদেশী বিড়াল সংগ্রহ করে এবং যারা পালতে আগ্রহী তাদেরকে বিনে পয়সায় দেয়। তবে শর্ত হলো- এদেরকে লালন-পালনের জন্য যে ম্যানুয়েল দেয়া হবে সেটা অনুসরণ করতে হবে। দেশী বিড়ালের সঙ্গে মিশতে দেয়া যাবে না। যদি কেউ বদলি জনিত কিংবা অন্য কোনো কারণে পালতে আগ্রহী না হয়, সেক্ষেত্রে সোসাইটিকে জানাতে হবে। সোসাইটি তার হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেবে। সেক্ষেত্রে পেনালটি গুনতে হবে দশ হাজার টাকা।

সবটা শুনে রানুর চোখ চড়ক গাছ। সামনেই মিলির এসএসসি ফাইনাল। বিড়াল নিয়ে আবার ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ল? অবশ্য মানতেই হবে। খাঁচার ভেতর থাকা দু’টো বিদেশী তুলতুলে বিড়াল ছানা সত্যিই অপূর্ব সুন্দর! চোখ জোড়া কেমন মায়াবী! রানুর দিকে তাকিয়ে বলছিল-আমাদের বিদায় করো না। আর বিদায় করা কি সম্ভব! মিলি যখন নিয়েই এসেছে তার পছন্দের ভেতর হাত দেবে কে!

মুখে বলল তমাকে- ঠিক আছে, তুমি মাঝে মাঝে এসো। বিড়াল দু’টোকে দেখে যেয়ো। যা যা লাগে দিয়ে যেয়ো। আমিতো আসবই আন্টি, মিলিকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে না! আর হ্যাঁ আন্টি, বিড়াল দু’টোকে ইনজেকশন দেয়া। কোন চিন্তা করবেন না। ভাইরাস ছড়ানোর ভয় নেই একদম।

আমরা প্রতি বছর এক্সিবিশন করি। প্রাইজ দেই। মিলির বিড়ালটাও যাবে এক্সিবিশনে। তখন অনেক প্রচার হবে মিলির। যদি প্রাইজ পায় টাকা এবং ট্রফি দু’টোই পাবে।

দেলওয়ার রাতে বাসায় ফিরে। বারান্দায় তার যাওয়া পড়ে কদাচিৎ। সেদিন গোসল করবে গামছার খোঁজে বারান্দায় গেল। বারান্দার লাইট জ্বেলেই দেখল একটা খাঁচা। খাঁচার ভেতর দু’টো বিড়াল ছানা। ধবধবে সাদা একটা। আরেকটা ছাই রঙ মেশানো। বুঝতে বাকি থাকল না এ মিলির কাজ। মেজাজ চড়ে গেল। ছুটে এলো রানুর কাছে। রান্নাঘরে রানু তখন। দেলওয়ারের খাবার দিচ্ছিল গরম করে।

আবার বিড়াল এনেছে মিলি? দেলওয়ার উত্তেজিত স্বরে বলল। ওগুলো বিদেশী বিড়াল, কোন রোগ ছড়ায় না-

খাঁচার মধ্যে বিড়াল পোষা যায়? এখন আমরা থাকি চারতলায়। ছোট্ট ফ্ল্যাট। এরকম ফ্ল্যাটে কেউ বিড়াল পোষে?

তুমি গোসল সেরে খাও, পরে সব বলছি। ওগুলো নিয়ে যাবে। রানু দেলওয়ারকে তখনকার মত নিবৃত্ত করলেন।

তারপরের ঘটনা বিড়াল দু’টোকে বাসা থেকে স্থানান্তর করা হলো ছাদে। রোদ থেকে বাঁচার জন্য এক সময় পায়রা পোষা হতো ছোট একটা ঘর আছে সেখানে রাখা হলো ওদের। পুটু জিশান কেয়াপু সবাই প্রথম প্রথম বিড়ালের সেবক বনে গেল। বিড়ালের খাবারের মেনু রাজসিক। রাজসিক তো বটেই। দু’বেলা মাছ। চাট্টিখানি কথা। মানুষেরই জোটে না মাছ। তাও শোল মাছ। মরা পচা খাবে না। তাজা মাছ ফ্রাই করে দিতে হবে। গরুর দুধ। প্রতিদিন হাফ লিটার। জোগান দিতে গিয়ে সবার পাতের মাছ হাওয়া। ফ্রিজ থেকে মাছের পোঁটলা হাওয়া। দুধের প্যাকেট হাওয়া। তাতেও কুলোয় না। চৈতিদের বাসা। এছাড়া বিড়ালের প্যাটেন্ট খাবার আছে তাও দাম দিয়ে কিনে আনে মিলি। টাকা দেন আম্মু। কি করবেন না দিলে কান্নাকাটি। স্ট্রাইক পড়া বন্ধ। এভাবে বিড়াল দুটো বেশ বড় হয়ে ওঠে। আশপাশের ছেলে-মেয়েরা আসে দেখতে। এখন আর খাঁচায় সব সময় রাখা হয় না। ছাড়া হয় ঘরের মধ্যেই। ভীষণ দুষ্টু বিড়াল দুটো। ছোটাছুটি করে। এভাবে ছুটোছুটি করতে গিয়ে সেদিন ড্রয়িং রুমের চাইনিজ ফ্লাওয়ার ভাসটা ভেঙে ফেলে। ফ্লাওয়ার ভাসটা ছিল আব্বুর পছন্দের। ক্রিস্টাল কাচের। সেদিন মিলির বিড়ালের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। দেলওয়ার সোজা বলে দিয়েছিল- বাসায় বিড়াল পোষা যাবে না। রানু কানে কানে বলল তমাকে ডেকে বিদায় করার ব্যবস্থা নেবে। বেশি চটপট করলে পড়াশোনা বন্ধ করে দেবে। পরীক্ষা সামনে।

তমাকে ডাকা হলো। তমা এলো। রানু বুঝিয়ে বলল এমন ছোট্ট বাসায় বিড়াল পোষা সম্ভব নয়। তমা যেন একটা ব্যবস্থা করে। প্যানাল্টির টাকা দিলে সে ব্যবস্থা করতে পারবে। কারণ ও দুটো বিড়ালের ক্রয়মূল্য নাকি দশ হাজার টাকা। রানু গেল চুপসে। এতগুলো টাকা দেয়া কি সম্ভব! তাহলে আরো কিছুদিন থাকুক। ভালো গ্রাহক পেলে হস্তান্তর করে দেবে। ফেসবুকে ছবিসহ বিজ্ঞাপন দেয়া হলো। একদিনের মধ্যে পাঁচজন আগ্রহী ফেসবুকে আগ্রহ দেখালো নেয়ার। কিন্তু মিলি রাজি নয় হাতছাড়া করতে। অগত্যা তমার কিছু করার নেই। রানুও আর তমাকে কিছু বলল না। মনে মনে বললেন- তুমিই নষ্টের মূল। বিড়াল তপস্বী সেজেছো?

বিড়াল দুটোকে ছাদেই রাখা হয় বেশির ভাগ সময়। মিলিও থাকে ছাদে। বই হাতে মোড়ায় বসে ছাদে পড়ে। বিড়াল পাহারা দেয়। খাবার দেয়। পুটুও মিলির সহকারী হয়ে ওসব করে। যাচ্ছিল দিন কেটে ভালোই।

হঠাৎ একদিন দুপুরে মিলি ছাদে উঠে দেখে বিড়াল দুটো নেই। খাঁচার দরোজা খোলা। তালাটা ভাঙা খাঁচার পাশে পড়ে। মিলি কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ছুটে এলো। হ্যা… হ্যা… হ্যা… আমার বিড়াল চুরি গেছে… হ্যা… হ্যা… হ্যা… যে যেখানে ছিল দৌড়ে ছাদে উঠে এলো। সত্যিই বিড়াল নেই। খাঁচার তালা ভাঙা। তার মানে চুরি। তমা এলো ছুটে। বলল- থানায় জিডি করতে। রেজিস্টার্ড বিড়াল। ওদের ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক আছে। পুলিশ জিডি করতে বাধ্য। ইত্যাদি ইত্যাদি।

রানুর চোখেও পানি। পুটুও কাঁদছে। আর মিলি বিছানায় উপুড় হয়ে আছে সেই থেকে।

জিশান বলল- তমা, পুলিশ মানুষ খুঁজে বের করে না, আর বিড়াল খুঁজে বের করবে? এটা কি ইউরোপ?

রানুও বুঝতে পারে তমার কথা ঠিক না। কিন্তু বিড়াল দুটো চুরি করলো কে?

দেলওয়ারকে ফোনে জানিয়েছিল রানু। বিড়াল গেছে সে জন্য তার দুঃখ নেই মিলিকে কিভাবে শোক ভুলিয়ে দেয়া যায় সে কথা ভেবেই অস্থির হলেন তিনি।

চিন্তিত দেখে দেলওয়ারের এক কলিগ সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন- দিলু ভাই, কি চিন্তা করছেন? দেলওয়ার খুলে বলল।

হাসতে হাসতে বললেন- ও আপনার সেই বিড়াল তপস্বী মেয়ের বিড়াল চুরি গেছে? আমি একটি ফিচার করতে চেয়েছিলাম ওকে নিয়ে। চলুন, আজই সে কাজটা করে ফেলি। ফিচার নয় নিউজ। বিড়াল চুরির চাঞ্চল্য নিউজ।

যাবে? দেলওয়ার প্রশ্ন করে কাঞ্চনকে।

কিভাবে খাওয়াতে হয় পাবলিককে কুড়ি বছর সাংবাদিকতায় কম শিখিনি দিলু ভাই। হা… হা… হা… হা…

সাংবাদিক এসেছে শুনে মিলির দুঃখ মুহূর্তে উঠে গেল। ড্রয়িং রুমে এসে লক্ষ্মীমন্ত হয়ে প্রশ্নের জবাব দিলো কাঞ্চনকে। পরের দিনের পরদিন ছাপা হলো বিশাল নিউজ- সংঘবদ্ধ চক্রের দেশ থেকে বিড়াল চুরি করে পাচার। সোসাইটির কথা, বিড়াল পোষার আগ্রহীদের কথা, শীত অঞ্চল থেকে বিড়াল আনার ইতিহাস ইত্যাদি বর্ণনাসহ। নিউজের সঙ্গে মিলির ছবি এবং সাক্ষাৎকার। সেই থেকে মিলির বিড়াল তপস্বী নামটা চাউর হয়ে গেল। মিলি কিন্তু এখনো বিড়ালের সেবা করে বেড়ায়। কিভাবে? ফেসবুকে পাওয়া যাবে।

SHARE

Leave a Reply