Home ভ্রমণ পাহাড়ি এক সন্ধ্যা – ফয়সাল বিন মাহমুদ

পাহাড়ি এক সন্ধ্যা – ফয়সাল বিন মাহমুদ

পাহাড়ি এক সন্ধ্যা
‘তোমার সৃষ্টি যদি হয় এত সুন্দর,
না জানি তাহলে তুমি কত সুন্দর’
প্রিয় কবি মতিউর রহমান মল্লিকের কথাটা যখন মনে পড়ে স্রষ্টার সৃষ্টি দেখার লোভ সামলাতে পারি না। সুযোগ পেলেই হারিয়ে যাই নাম না জানা অনেক অজানা সৃষ্টির সান্নিধ্যে। কারণ সৃষ্টির মাঝে আমি দেখতে পাই স্রষ্টার এক একটি অলৌকিক নিদর্শন। যে সৃষ্টির রূপ এত অপরূপা সেই সৃষ্টির স্রষ্টা কত সহস্র রূপে রূপায়িত হবেন তা ভেবে রোমাঞ্চিত হয়ে যাই।
অনেকদিন যাবৎ শহুরে জীবন, পড়ালেখা আর দায়িত্ব পালন নিজের শরীরে লুকিয়ে থাকা হৃদয়টা যেন রোবটের প্রোগ্রামের মত হয়ে গেছে। সুযোগ খুঁজি একটা অজানা জায়গায় গিয়ে মনের মত কিছু সময় প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে নিজের হারানো হৃদয়ের স্বকীয়তা ফিরিয়ে আনতে। স্রষ্টা তার সৃষ্টির মনোবাসনা পূরণে কার্পণ্য করে না। ঠিক তেমনি সুযোগ দিলেন ৪ মার্চ রোববার দিনে। মাসিক কাজ শেষ করে অনেক দিন পর বাড়িতে গিয়ে নিজের পরিবারের সাথে মনমাতানো সময় কাটাতে পারব। কিন্তু এর থেকে বড় কিছু যে এর পরের দিন আমার জন্য অপেক্ষা করছে তা বুঝতে পারিনি। বাড়িতে আসার সময় বন্ধুবর বেলালকে সাথে নিয়ে আসি আর আসার সময় বলেছি জীবনটা কেমন জানি যান্ত্রিক হয়ে গেছে। আমার মত ঠিক একই কথা সেও বলল। আর বলল এর পরদিন সোমবারে কোথাও ঘুরে আসার জন্য। তখন বলি আমার বান্দরবানে একটা কাজ আছে আর কাজটা শেষ করে একটু চিরচেনা অপরূপা সেই বান্দরবানের কোথায়ও গিয়ে ঘুরে আসব।
পরদিন ভোরে উঠতে দেরি করে ফেলি। ১০টা ৩০ মিনিটে বেলালকে কল দিই। তখন আমি যাব না ভেবে সে কাজে চলে গিয়েছিল। বেশি জোর করার ফলে আবার যাওয়ার জন্য রাজি হয়। দুইজনে ১১টা ৩০ মিনিটে বান্দরবান পৌঁছি। বান্দরবানের কাজ শেষ করে বান্দরবানের বিস্ময় বালক সাইফুল ইসলাম আকাশের সাথে দেখা করি। ওখানে আমার আরেক প্রিয় ব্যক্তি লেয়াকত ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে গেল। উনারা মাস্টার্সের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য একই রুমে পড়ছেন। উনাদের সাথে দেখা করে লেয়াকত ভাইসহ বান্দরবান কেন্দ্রীয় মসজিদে আমরা নামাজ আদায় করি। নামায আদায়ের পরে যখন আমিরাবাদ হোটেলে যাই তখন দেখি সেখানে আমার ফুফাতো ভাই হানিফও তার ফুফাতো ভাইয়ের সাথে খাবার খাচ্ছে। তখন তাদের সাথে খাবার খেতে বসতে অনুরোধ করায় ওদের সাথে দুপুরের খাবার খেয়ে বনফুলে কফি খাই। কফি খাওয়ার পর লেয়াকত ভাইকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে বেলালকে জিজ্ঞাস করি কোথায় যাবে? বেলাল বলে নীলগিরি যাবে। তখন বেলা ৩টা বাজে। বান্দরবান শহর থেকে নীলগীরি ৪৭ কিলোমিটার পথ। যেতে প্রায় ২ ঘন্টা সময় লাগবে। আমার তেমন ইচ্ছা নেই। তবে, বেলাল অনেক ইচ্ছা নিয়ে আসায় তাকে হতাশ করতে আমার বিবেক বাধা দিচ্ছে। অবশেষে, বান্দরবান বাস টার্মিনাল থেকে ১ লিটার অকটেন নিয়ে নীলগিরির উদ্দেশে রওনা দিই।
বান্দরবান শহর থেকে অদূরে সাঙ্গু আর সমতল ভূমির মিলনে অভূতপূর্ব সুন্দর একটা স্থান মিলনছড়ি। ইতোমধ্যে মিলনছড়ি অতিক্রম করে চলে যাচ্ছিলাম। তখন বেলাল বলে এই জায়গায়টা অনেক সুন্দর। এই একই জায়গায় আমি আরো তিনবার ছবি তুলছি কিন্তু বেলাল আফসোস করায় মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে মিলনছড়িতে দাঁড়িয়ে সবুজের মাঝে অপরূপা তিলোত্তমা সিঁথির মত বয়ে যাওয়া সাঙ্গু নদীর ছবি নিয়ে আমরা আবার নীলগিরির উদ্দেশে রওনা দিই। পথিমধ্যের স্রষ্টার প্রদত্ত অনাবিল সৌন্দর্য চোখ, মন, শরীরকে প্রশান্ত করার মত স্থানগুলোতে না থেমে পারিনি। সম্পূর্ণ পথ থেমে থেমে সৌন্দর্য উপভোগ করি আর স্থির চিত্রের কল্যাণে মোবাইলে আর মনের স্মৃতির কোটরে সংরক্ষণ করে যাচ্ছি। আঁকাবাঁকা চোখ ধাঁধানো রাস্তা যার একপাশে খাড়া পাহাড় অপর পাশে খাড়া ঢালু। যেন জীবন-মরণ সন্ধিক্ষণে এসে মন ভুলানো এক স্বর্গের দর্শনে স্রষ্টার অপরূপ সৃষ্টি খুঁজে বেড়াচ্ছি। চারপাশে বসন্ত বরণের তিক্ত মিষ্টি রোদে ঝরা শুকনো পাতা যেন আমাদের বরণ করে নিচ্ছে। আর মাঝে মাঝে আমবাগানের মনঃমধুর আমের মুকুলের ঘ্রাণ মনকে পাগল করে দিচ্ছে। মনের মাঝে লুকানো হাজারো ক্লান্তি কবে মন থেকে পালিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেল তা অনুভবও করতে পারিনি। দেখতে দেখতে নীলগিরির কাছে চলে আসি।
হঠাৎ দেখি গাড়ি পাহাড়ি এক চূড়ায় এসে বন্ধ হয়ে গেছে। দেখি জ্বালানি তেল শেষ হয়ে গেল। গাড়িতে রিজার্ভ থাকা তেলের চাবি চালু করে আবার সামনের দিকে রওনা দিই। তখন আমরা বান্দরবান শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার আর নীলগিরিতেও তেল পাওয়া যাবে না। গতবারে আসার সময় গাড়ির ড্রাইভার বলল উনারা সামনে দাঁড়াবে যেন গাড়ির পার্কিং খরচ দিতে না হয়। তখন ড্রাইভারের কথা মনে পড়ায় আমি ভাবলাম সামনে কোন বড় স্টেশন আছে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম বাকি জ্বালানি নিয়ে ওখানে পৌঁছে সেখান থেকে জ্বালানি নিয়ে পুনরায় ফিরে আসব। কিন্তু আশাকে নিরাশা করে দিচ্ছে পাহাড়ি ঢালু পথগুলো। কোথায়ও কোন দোকান নেই।
রাস্তার পাশে দূরত্ব সঙ্কেত দেখে জানলাম ওখান থেকে বলি বাজার আরো ১৫ কিলোমিটার দূরে। তখন ভাবলাম সংকেতে যখন বলি বাজার লিখা আছে তখন সেটা হয়ত বড়সড় কোন বাজার হবে। সে আশায় সামনে যাই আর দেখি কোন ঘরবাড়ি নেই নীরব নিস্তব্ধ পরিবেশ। সামনে দেখি নতুন এক পর্যটন কেন্দ্র। বেলালকে বলি এখন হাতে মোটেও সময় নেই কপালে থাকলে আসার সময় দেখব। যত সামনে যাই ততই আমার শরীর আর মন রোমাঞ্চিত হচ্ছে। ছোটবেলায় চাচার কাছ থেকে শুনেছি বলিবাজারের রোড নাকি একটা বড় মৃত্যুফাঁদ। মশার কয়েলের মত আঁকাবাঁকা আর প্রচণ্ড ঢালু রাস্তা। সামান্য এদিক সেদিক হলে সরাসরি ১০০০ ফুট নিচে পড়ে যাবে। যেখানে মানুষ আর গাড়ির স্বাভাবিক কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে আমি একটুও ভয় না পেয়ে বরঞ্চ রোমাঞ্চিত হচ্ছি। আর নতুন জায়গা দেখার লোভ সামলাতে পারছি না। নতুন কমপ্লেক্স ‘নীল দিগন্ত’ হতে বলিবাজারের শেষ পর্যন্ত জিরাফের গলায় কালো এক অজগর সাপ জড়িয়ে থাকার মত রোড। নতুন তাই গাড়ির ইঞ্জিন চালু রেখে গিয়েছিলাম। অন্যথায় ইঞ্জিন বন্ধ রেখে প্রায় ১০ কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে চলে যেতে পারতাম। অবশেষে, বলিবাজার রোডের মাথায় পৌঁছে দেখি দুই পাশে দু’টি রাস্তা আর সোজা মাঝখানে দেখি বিজিবি ৩৩ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প। যে পাশে রাস্তা ভালো সেই পাশে ব্রাকেট দিয়ে রাখছে অন্যপাশে রাস্তা তেমন ভালো নয়। তখন দ্বিধায় পড়ে গেলাম বলিবাজার কোন পাশে হবে। তখন দেখি এক শিক্ষিত পাহাড়ি মহিলা। উনাকে জিজ্ঞাস করার পর উনি পথ দেখিয়ে দেয় বলিবাজারের রোডটা। অবশেষে প্রাণ ফিরে পেলাম।
নীলগিরি থেকে খুব চিন্তায় ছিলাম কখন জানি আবার গাড়ির জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। বলিবাজার গিয়ে প্রথমে জ্বালানি নিই ৩ লিটার। তারপর বলিবাজার মসজিদে জামায়াতের সাথে আসরের নামায আদায় করি। বলিবাজার পাশ দিয়ে বয়ে চলা সাঙ্গু নদীর তীরে তামাক ক্ষেতে ছবি তুলে বাড়ির পথে রওনা দিই। রওনা দেয়ার পর ভুলে যাই একটা স্মৃতি সংরক্ষণের কথা। বলিবাজার হতে বান্দরবান সদর প্রায় ৬২ কিলোমিটার। সেই রাস্তার পাশে দেয়া কথাটি ফ্রেমবন্দি করতে পারিনি। তবে বেলালকে বলছি সামনে কোন দূরত্ব সংকেত দেখলে থেমে ফ্রেমবন্দি হবো। ঠিক ৫৯ কিলোমিটার দূরত্ব সংকেতে এসে ফ্রেমবন্দি হয়ে আবার রওনা দিই। সেই মারণফাঁদ বলিবাজারে খাড়া আঁকাবাঁকা রাস্তা বেয়ে নতুন পর্যটন কেন্দ্র ‘নীল দিগন্তে’ এসে গাড়ি থামাই।
‘নীল দিগন্তে’ এসে দেখি সেখানে কোন মানুষই নেই। চেক পোস্টের চেয়ারগুলো খালি পড়ে আছে। প্রবেশ ফি দেয়ার মতো মানুষ না থাকায় ফ্রিতে প্রবেশ করলাম। ‘নীল দিগন্তের’ কিনারায় গিয়ে বলিবাজার থেকে উঠে আসা অজগরের মত ভয়ানক আঁকাবাঁকা রাস্তায় আসতে পেরে নিজেকে এভারেস্ট বিজয়ী মনে হচ্ছে। ‘নীল দিগন্তে’ এসে দেখি নীলাভ আকাশে রক্তিম আলোয় সূর্যটা নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়ছে পশ্চিম দিগন্তে। অনেকক্ষণ উপভোগ করে রওনা দিই। থানছি উপজেলা গেটে গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলে আবার নীলগিরির উদ্দেশে রওনা হই। সন্ধ্যা ৫টা ৩০ মিনিটে নীলগিরিতে পৌঁছার পর দেখি দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার জুটি সম্পূর্ণ নীলগিরি কমপ্লেক্সে ঘুরছে আর গুটিকতক সেনাবাহিনী ছিল আর কেউ নেই। একটু একটু শীতের আবহ এখনো থাকায় সেখানে কুয়াশাচ্ছন্ন ছিল। ডুবন্ত সূর্যের রক্তিম আলো আর শ্বেত কুয়াশায় কমপ্লেক্সটিকে স্বর্গ দর্শনের মত লাগছে। পুরো পর্যটন কমপ্লেক্স ঘুরে ফিরে আর ছবি তুলে মাগরিব পর্যন্ত সময় কাটাই। সেনাবাহিনীদের সাথে মাগরিবের নামায আদায় করে নীলগিরির ক্যাফেতে যাই নাশতা করার জন্য। হতাশ হয়ে দেখি সেখানে কোন ক্যাফে খোলা নাই আর এদিকে ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। সাথে দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালানোর জন্য শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে।
এরপরও করার কিছুই নাই। অবশেষে, রওনা দিলাম বাড়ির উদ্দেশে। চাঁদহীন অসহায় মিটিমিটি জ্বলা তারাগুলো রাতটাকে অন্যরকম এক সন্ধ্যার সূচনা করে। সম্পূর্ণ রাস্তায় আমি, বেলাল আর আমাদের গাড়িটা সাথে আমাদের সঙ্গ দেয়া মিটি তারার মেলা আর বসন্তের আগমনের বাতাসে দোলা খাওয়া সহস্র রকমের বৃক্ষরাজি। মাঝে মাঝে আমবাগানের আমের মুকুলের মিষ্টি মধুর ঘ্রাণ আর বাতাসে শোঁ শোঁ করা কাশবনের রঙিন হওয়া কাশফুলগুলো গাড়ির লাইটের আলোতে অনন্য এক সুন্দর মুহূর্ত উপহার দিয়ে যাচ্ছে।
আকাশের মৃদু আলোতে লুকিয়ে থাকা চাঁদ, লক্ষ-কোটি তারার মেলা, চারপাশে ঝাড়ু গাছের বনের মাঝে লুকিয়ে থাকা হাজারো রকমের পোকামাকড়ের হরেক রকম শব্দে এক ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি করছে। আমরা ছাড়া সম্পূর্ণ রাস্তায় আর কেউ নেই। মাঝে মাঝে দুই একটা বাড়ি থাকলেও সেখানে কোন সাড়া শব্দ নেই। একেতো পাহাড়ি ভূতের ভয় সেখানে আবার পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী শান্তিবাহিনীর ভয়ে গা হিমশীতল হয়ে যাচ্ছে। ঘনকালো অন্ধকার রাস্তার ধুনোর সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। আমাদের গাড়ির লাইটের আলো আকাশের অন্ধকার ও রাস্তার ক্যাপসুলের কাল রঙকে ভেদ করে ভয়ার্ত আর রোমাঞ্চিত মন নিয়ে বাড়ির পানে আসছি। ভাবতে গা শিহরিত হয়ে ওঠে। সম্পূর্ণ ৪৭ কিলোমিটার ঘন কালো অন্ধকার রাতে আমরা দুইজন ছাড়া আর কেউ ছিল না। যেখানে ছিল ভূতের ভয়, বন্য জানোয়ারের আক্রমণ আর শান্তিবাহিনীর হাতে অপহরণ হওয়ার ভয়। পুরো রাস্তা আমাদের দখলে থাকায় সম্পূর্ণ পথকে নিজের রাজ্য মনে করে মন ভোলানো আবেগ নিয়ে বান্দরবান সদরের পশ্চিমে ‘বন প্রপাতে’ এসে থামি। সেখানকার রেস্তোরাঁয় নাশতা করে বাড়ির পথে রওনা দিই। অবশেষে বাড়িতে এসে পৌঁছতে রাত ৯টা পার হয়ে যায়। আমার জীবনে রোমাঞ্চিত করা এই ৮৪ কিলোমিটার পথের ভ্রমণকে কখনো ভুলতে পারব না ।।

SHARE

Leave a Reply