Home দেশ-মহাদেশ অপরূপ সুন্দর দেশ ক্রোয়েশিয়া – মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

অপরূপ সুন্দর দেশ ক্রোয়েশিয়া – মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

ক্রোয়েশিয়া ইউরোপ মহাদেশের একটি রাষ্ট্র। সরকারি নাম ক্রোয়েশিয়া প্রজাতন্ত্র। এড্রিয়াটিক সাগরপাড়ে মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের সংযোগস্থলে এর অবস্থান। রাজধানী জাগরেব। ক্রোয়েশিয়ার সীমান্তে রয়েছে উত্তর-পূর্বে হাঙ্গেরি, পূর্বে সার্বিয়া, দক্ষিণ-পূর্বে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও মন্টিনিগ্রো। দেশটি দেখতে এক ফালি চাঁদের মতো। কেন্দ্রীয় মহাদেশীয় ক্রোয়েশিয়া ও স্লাভোনিয়ায় সমভূমি, হ্রদ ও পাহাড় অবস্থিত। পশ্চিমে রয়েছে দিনারীয় আল্পস পর্বতমালার বৃক্ষ আচ্ছাদিত অংশ। আর রয়েছে আড্রিয়াটিক সাগরের পর্বতসঙ্কুল তটরেখা।

প্রাকৃতিক রূপে ক্রোয়েশিয়া এতটাই মোহনীয় যে, ২০১৭ সালে ১ কোটি ৮৫ লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটেছিল দেশটিতে। দেশটির উপকূলে প্রায় এক হাজার বিভিন্ন আকৃতির দ্বীপ রয়েছে। অপরূপ সুন্দর এই দ্বীপগুলোয় প্রচুর পর্যটকের ভিড় হয়ে থাকে। ক্রোয়েশিয়া পর্যটকদের জন্য খুবই উপযুক্ত একটি জায়গা। এ ছাড়াও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ক্রোয়েশিয়ায় মোট আটটি জাতীয় পার্ক আছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম স্বচ্ছ পানির প্লিৎভিচ লেক। এটি ক্রোয়েশিয়ার বৃহত্তম লেক এবং জাতিসংঘের বিজ্ঞান ও শিক্ষা বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বিশ্বের যেসব এলাকাকে ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে এটি সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া দেশটির মোট আয়তনের এক-তৃতীয়াংশ জঙ্গলে ঢাকা। রয়েছে বহু অসাধারণ ঝরনা। এমন কিছু বনাঞ্চল আছে যেখানে এখন পর্যন্ত কোনো মানুষের পায়ের ছাপ পড়েনি। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আর অসাধারণ দৃশ্যের সমুদ্র দেখতে চাইলে ক্রোয়েশিয়ায় আসতেই হবে পর্যটকদের।

ক্রোয়েশিয়া

ক্রোয়েশিয়ার আয়তন ৫৬ হাজার ৫৯৪ বর্গ কিলোমিটার (২১ হাজার ৮৫১ বর্গ মাইল)। এর মধ্যে ৫৬.৪১৪ বর্গ কিলোমিটার (২১,৭৮২ বর্গ মাইল) ভূমি এবং ১২৮ বর্গ কিলোমিটার (৪৯ বর্গ মাইল) পানি এলাকা। জনসংখ্যা ৪২ লাখ ৯২ হাজার ৯৫ জন। জনসংখ্যার ৯১.০৬ শতাংশ খ্রিষ্টান (যাদের বেশির ভাগই রোমান ক্যাথলিক), ১.৪৭ শতাংশ মুসলিম, ৪.৫৭ শতাংশ অধার্মিক এবং অন্যান্য ২.৯০ শতাংশ। জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে ক্রোট ৯০.৪২ শতাংশ, সার্ব ৪.৩৬ শতাংশ এবং অন্যান্য ৫.২২ শতাংশ। সরকারি ভাষা ক্রোয়েশিয়ান। তবে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ইতালীয়, চেক, হাঙ্গেরীয়, রুথেনিয়ান, সার্বিয়ান ও স্লোভাক ভাষা চালু রয়েছে।

ক্রোয়েশিয়ার রাজনীতি একটি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় পরিচালিত হয়। প্রধানমন্ত্রী একটি বহুদলীয় ব্যবস্থায় সরকারপ্রধান। নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের ওপর এবং আইন প্রণয়ন ক্ষমতা ক্রোয়েশীয় সংসদ বা সাবর-এর ওপর ন্যস্ত। বিচার বিভাগ নির্বাহী ও আইন প্রণয়ন বিভাগ হতে স্বাধীন। ক্রোয়েশিয়া খুবই উন্নতমানের জীবনযাত্রার একটি দেশ। ক্রোয়েশিয়ার প্রশাসনিক এলাকা ২০টি কাউন্টি এবং রাজধানী জাগরেব নগরীতে বিভক্ত। কাউন্টিগুলো আবার ১২৭টি নগরী ও ৪২৯টি পৌরসভায় বিভক্ত। ক্রোয়েশিয়ার ২১টি কাউন্টি হলো বিজেলোভার-বিলোগোরা, ব্রড-পোসাভিনা, ডুব্রোভনিক-নেরেতভা, ইসত্রিয়া, কারলোভাক, কোপ্রিভনিকা-ক্রিজেভসি, ক্রাপিনা-জাগরজে, লিকা-সেনজ, মেডিমুরজে, ওসিজেক-বারানজা, পজেগা-স্লাভোনিয়া, প্রিমরজে-গরস্কি কোতার, সিসাক-মসলাভিনা, স্পিলিট-ডালমেশিয়া, সিবেনিক-কেনিন, ভারাজদিন, ভিরোভিটিকা-পোড্রাভিনা, ভুকোভার-সিরমিয়া, জাদার, জাগরেব কাউন্টি ও জাগরেব সিটি। এদেশে সাবর নামে ১৬০ সদস্যের একটি এককক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট রয়েছে। ক্রোয়েশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট কোলিন্দা গ্রাবার-কিতারোভিস। তিনি ১৯৯০ সালে দেশে বহুদলীয় নির্বাচন শুরুর পর দেশের প্রথম মহিলা ও কম বয়সী (৪৬) প্রেসিডেন্ট। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিস।

প্লিটভাইস লেকস ন্যাশনাল পার্ক

ক্রোয়েশিয়ার বেশির ভাগ অঞ্চলে সহনীয় উষ্ণ ও বৃষ্টিবহুল মহাদেশীয় আবহাওয়া বিরাজ করে। এসব অঞ্চলে মাসিক তাপমাত্রা মাইনাস ৩ ডিগ্রি (জানুয়ারি) থেকে ১৮ ডিগ্রি (জুলাই) সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। দেশটির সবচেয়ে শীতলতম অংশ লিকা ও গরস্কি কোতারে তুষার সমৃদ্ধ জংলী আবহাওয়া বিরাজ করে। এখানকার উচ্চতা ১,২০০ মিটার (৩,৯০০ ফুট)। এড্রিয়াটিক উপকূলে ক্রোয়েশিয়ার উষ্ণতম এলাকায় ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়া বিরাজ করে। এখানে সাগরের বাতাসে আবহাওয়া সহনীয় থাকে। ক্রোয়েশিয়ায় বছরে ২৪ ইঞ্চি থেকে ১৪০ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে।

ক্রোয়েশিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জাতিসংঘ (ইউএন), ইউরোপীয় কাউন্সিল, ন্যাটো, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সদস্য এবং ভূমধ্যসাগরীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর সক্রিয় সদস্য হিসেবে ক্রোয়েশিয়া আফগানিস্তানে ন্যাটোর নেতৃত্বাধীন মিশনে সৈন্য পাঠায় এবং ২০০৮-২০০৯ মেয়াদের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হয়। ক্রোয়েশিয়ার অর্থনীতিতে সেবা, শিল্প ও কৃষি খাতের প্রাধান্য রয়েছে। পর্যটন রাজস্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ২০টি পর্যটন গন্তব্যস্থলের মধ্যে ক্রোয়েশিয়া অন্যতম। রাষ্ট্র পর্যাপ্ত সরকারি ব্যয়সহ অর্থনীতির একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। ক্রোয়েশিয়া তার নাগরিকদেরকে সামাজিক নিরাপত্তা, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং অবৈতনিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা দিয়ে থাকে।

ক্রোয়েশীয়রা খেলাধুলায় খুবই অগ্রসর। এদেশে প্রায় চার লাখ সক্রিয় ক্রীড়াবিদ রয়েছেন। ফুটবল, অ্যাথলেটিকস, হ্যান্ডবল, স্কি, দাবা, টেনিস, নৌকাবাইচ ইত্যাদি নানা রকম খেলা এদেশে হয়ে থাকে। ফিফা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নশিপ, অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বিশ্ব অ্যাকুয়াটিক চ্যাম্পিয়নশিপ, বিশ্ব স্কি চ্যাম্পিয়নশিপ, বিশ্ব হ্যান্ডবল চ্যাম্পিয়নশিপ ইত্যাদি নানা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ক্রোয়েশিয়ার ধারাবাহিক সাফল্যের ইতিহাস রয়েছে।

সদ্য সমাপ্ত রাশিয়া ফিফা বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে অর্থাৎ রানার্স আপ হয়েছে। এর আগে ১৯৯৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপে তারা তৃতীয় স্থান অধিকার করে। ঐ বছর প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসেই তারা এরকম চমৎকার সাফল্য অর্জন করে। চলতি বছর অসাধারণ নৈপুণ্যময় খেলা উপহার দেয়া ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাস বেশ রোমাঞ্চকর। ইউরোপের দেশ হওয়ায় ফুটবলের প্রতি তাদের অনুভূতি ভিন্ন। স্বাধীনতার পর ক্রোয়েশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঞ্জো তুদজম্যান বলেন, ‘ফুটবলে বিজয় একটি দেশের আত্মপরিচয়কে ততটাই রূপায়ণ করে, যতটা করে যুদ্ধ।’ তাই তো তিনি দেশের ক্রীড়াবিদদের রাষ্ট্রদূত করার ঘোষণা দেন। স্বাধীন হওয়ার মাত্র দুই বছর পর বিশ্ব ফুটবলের অংশ হয় ক্রোয়েটরা। তাদের সেরা অর্জন ছিল ২০০৮ ইউরোতে কোয়ার্টার ফাইনাল। ১৯৯৪ সালে দুর্দান্ত অগ্রগতির জন্য ওই বছর ফিফার ‘বেস্ট মুভার অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড’ পায় ক্রোয়েশিয়া। ১৯৯৬ সালের সবচেয়ে বড় চমক ছিল নিজেদের প্রথম আসরে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা। এর মাত্র দুই বছর পর ১৯৯৮ সালে ক্রোয়েটরা প্রথমবার বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে অংশ নিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে। শুধু তাই নয়, সেই আসরে ক্রোয়েটদের অবস্থান হয় তৃতীয়। ওই বিশ্বকাপে টপ স্কোরার হন ডেভর সুকার। আর সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বকাপে রাশিয়ার মাটিতে ক্রোয়েশিয়ার বিজয়ের অন্যতম মূল চাবিকাঠি হলেন ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের সোনার বুট জেতা ডেভর সুকার। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ক্রোয়েশিয়া বর্তমানে ফুটবল বিশ্বে অন্যতম এক পরাশক্তি। শুধু তাই নয়, সারা বিশ্বে নিয়মিত ফুটবল প্রতিভা সরবরাহের পাইপলাইনও। স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ড বা জার্মানি বিশ্বের বড় লিগের সবগুলোতেই ক্রোয়েটরা খেলে থাকে।

ডালমেশিয়ান কুকুর

বিরল ডালমাশিয়ান জাতের কুকুরের জন্ম ক্রোয়েশিয়ায়। সাদা চামড়ার শরীরে কালো কালো বলের স্পট। দেখে মনে হবে যেন পেইন্টিং করা। বিখ্যাত এই প্রজাতির কুকুরকে ষোড়শ শতাব্দীতে আঁকা পেইন্টিংসে এবং গির্জার ক্রনিকেলেও দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের আর কোথাও এই কুকুরটির মতো অন্য কোন কুকুর দেখতে পাওয়া যায় না। ডালমাশিয়ায় এর উৎপত্তি বলেই এর নামকরণ করা হয়েছে ডালমাশিয়ান। অপরূপ সুন্দর এসব কুকুর কেবল ক্রোয়েশিয়ায়ই দেখা যায়।

ক্রোয়েশিয়ায় বোরা নামক শুষ্ক, ঠান্ডা বাতাস

ক্রোটরা ষষ্ঠ শতাব্দীতে এই এলাকায় পৌঁছে এবং নবম শতাব্দীর মধ্যে দুটি ডাচি বা ডিউকের জমিদারি প্রতিষ্ঠা করে। তমিস্লাভ ৯২৫ সালের মধ্যে প্রথম রাজা হন এবং ক্রোশিয়াকে একটি রাজ্যের মর্যাদায় উন্নীত করেন। এই রাজ্য প্রায় দুই শতাব্দী ধরে তার অস্তিত্ব বজায় রাখে এবং রাজা পিটার ক্রেসিমির চতুর্থ ও দিমিতার জভোনিমিরের শাসনামলে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে। ক্রোয়েশিয়া ১১০২ সালে হাঙ্গেরির সাথে একটি পারসোনাল ইউনিয়নে প্রবেশ করে। ১৫২৭ সালে উসমানীয় বিজয়ের সম্মুখীন হয়ে ক্রোয়েশিয়া পার্লামেন্ট হাবসবার্গের ফারডিনান্ড প্রথমকে ক্রোয়েশিয়ার রাজা নির্বাচন করে। ১৯১৮ সালের অক্টোবরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে জাগরেবে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি থেকে স্বাধীন স্লোভিনস, ক্রোটস ও সার্ব রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়া হয় এবং ১৯১৮ সালের ডিসেম্বরে এটা সার্বস, ক্রোটস ও স্লেভিনস রাষ্ট্রে একীভূত হয়ে যায়। ১৯৪১ সালের এপ্রিলে যুগোস্লাভিয়ায় অক্ষশক্তির আগ্রাসনের পর ক্রোশিয়া অঞ্চলের বেশির ভাগ নাৎসি সমর্থিত মক্কেল-রাষ্ট্রের সাথে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এর ফলে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং ক্রোয়েশিয়া ফেডারেল স্টেট গঠিত হয়। যুদ্ধের পর ক্রোয়েশিয়া প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয় এবং যুগোস্লাভিয়া সোস্যালিস্ট ফেডারেল রিপাবলিকের একটি অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালের ২৫ জুন ক্রোয়েশিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং একই বছরের ৮ অক্টোবর তা পুরোপুরি কার্যকর হয়। ঘোষণার পর চার বছর ধরে ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতার যুদ্ধ সাফল্যের সাথে সংঘটিত হয় ।।

SHARE

Leave a Reply