Home গল্প দাদার চেয়ার – শাহাদাৎ সরকার

দাদার চেয়ার – শাহাদাৎ সরকার

আমাদের বাড়িটা ছিল গ্রামের একেবারে শুরুতে। বাড়ির সামনে দিয়ে বরাবর রাস্তা চলে গেছে পুব-পশ্চিমে; পুবে দুর্গাপুর বাজার আর পশ্চিমে হাট কানপাড়া। বাজার আর হাটের মধ্যে রয়েছে কিছু পার্থক্য; যা হোক। আমাদের বাড়ির পাশে কোন নদী ছিল না কোন কালেই। তবে আমি যে ঘরটায় থাকতাম তার দক্ষিণে ছিল ইয়া বড় দিঘী। সেই দিঘী নিয়ে আছে অনেক গালগল্প। যা আমার ছোটবেলার শিশু মানসে ভয়ের সঞ্চার করেছিল। দাদির মুখি শুনেছি, এই দিঘী তৈরি হয়েছিল একরাতে। সে আমার কোন এক পূর্বপুরুষের সময়। সেই দাদুর নাম ছিল মানিক সরকার। তিনি বাংলার বার ভূঁইয়াদের আমলে সরকারি কাজ করতেন। অবশ্য তখন থেকে আমাদের সবার নামের শেষে সরকার লাগানোর প্রবণতা শুরু হয়। যা চলে আসছে পুরুষানুক্রমিকভাবে এবং এখনো তা বলবৎ। সেই দাদু ছিলেন খুব সাহসী। তিনি একদিন অমাবস্যার রাতে ঘুরতে বেরিয়ে দেখেন আমাদের ধান ক্ষেতের মাঝ দিয়ে একটা মেয়ে ঘোমটা টেনে যাচ্ছে। দাদু মেয়েটির পথ আগলে দাঁড়ায়। বলেন,

এত রাতে তুমি কে মেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ?

সেই মেয়ে কোন উত্তর না দিলে। দাদু তাকে ভয় দেখায়। গরুগম্ভীর কণ্ঠে বলেন,

তোমার পরিচয় না দিলে বেঁধে রাখবো। কাল সকালে তোমার বাবাকে ডেকে এনে তবে ছাড়বো। তুমি জানো না মেয়েদের এত রাতে একা বের হতে হয় না। তোমার বাড়িতে কেউ নেই নাকি?

এবার সে মেয়েটি বলেন, বাড়িতে বাবা আছে। তবে তিনি তো অসুস্থ তাই কবিরাজের বাড়ি যাচ্ছি।

সে সময় কবিরাজ ছিল অপ্রতুল। তো দাদু বলেন, সে এখনো অনেক দূরের রাস্তা। তুমি একা একটা মেয়ে হয়ে কিভাবে যাবে? আমি কি তোমায় এগিয়ে দিয়ে আসবো? মেয়েটি কোন আপত্তি না করলে দাদু তাকে কবিরাজের বাড়ি নিয়ে যায়। সেখানে তার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসে। মেয়েটি দাদুর আচরণে খুশি হয়ে পরের দিন আবার দাদুর সাথে দেখা করতে আসে। এভাবে দেখা করতে করতে তাদের মধ্যে ভাব জমে যায়। মেয়েটি তার পরিচয় দেয় সে মানুষ না জিন। কিন্তু দাদুর সাথে তার সম্পর্কটা বজায় রাখার জন্য দাদুকে সে উপহার দিতে চায়। তখন গ্রামে চলছিল পানির খুব সঙ্কট। তো দাদু সেই মেয়েটিকে বলে একটা দিঘী খুঁড়ে দিতে। সেই জিনের মেয়েটি দাদুকে একরাতে সেই দিঘী খুঁড়ে উপহার দেন। এই গল্পটা দাদির মুখে ছোটবেলায় কতবার শুনেছি তার কোন ইয়ত্তা নাই। দাদি ছিলেন গল্পের রানি। বর্ষার নতুন পানি পেলে বিলে যেমন করে কই মাছ উজিয়ে উঠতো, দাদির মুখেও তেমনি গল্পের খই ফুটতো।

আমার সেই দাদার উপহারের দিঘীটি তখন গ্রামের সব লোকের পানির চাহিদা নিবারণ করতো। এখন সেই দিঘীর কদর আগের মত আর গ্রামের লোকদের কাছে নেই। তবে আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্যের একটা অংশ হয়ে আছে এই পরীর দিঘী। কেউ কেউ মানিক পরীর দিঘী বলেও ডাকে। এই দিঘীতে শনিবার আর মঙ্গলবার রাতে সেই দাদু আর ঐ জিন মেয়েটি গল্প করতো। এই গল্প করার দৃশ্য এখনো গ্রামের লোক নাকি দেখতে পায়। ছোটবেলায় আমরা দুষ্টামি করলে আমার দাদি সেই দাদু আর জিনের ভয় দেখাতো আমাদের কয়েক ভাইকে। কয়েক ভাই বলতে আমার বাবারা চার ভাইয়ের পিঠাপিঠি আমরা চার ভাই হয়েছিলাম। পর্যায়ক্রমে আল আমিন, খাইরুল, জোবায়ের আর শাহেদ। আমি মেজো ছিলাম। আমাদের বয়সের ব্যবধান খুব বেশি নয়। ফলে ছোটতেই জুটে ছিলো অনেক সঙ্গী। আর আমাদের মধ্যে সাহসী ছিলো আল আমিন। সে আমার দু-এক বছরের বড়। ফলে তার ভাগে আদর যতেœর পরিমাণ একটু বেশিই ছিলো। বাড়ির প্রথম ছেলে বলে সব অধিকার তার। আমরা তার তুলনাই ছিলাম বঞ্চিতের ভাগে। আর ছোট থেকে আমার চেহারা দেখতে এতো ভাল না হওয়ায় লোকদের মন কাড়তে পারতাম না। ফলে কোলে কোলে মানুষ বলতে যা বোঝায় তা আমার কপালে জোটেনি। তবে মা খুব ভালোবাসতো আমাকে। বাবা তো সুযোগ পেলেই কোলে নিয়ে ছুটতো মোড়ের দিকে। তবে বাবার দিনমজুরের কাজ করে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যেত অধিকাংশ দিন। ফলে তার আদরটা খুব কম সময়ই পেতাম। তবে সময়ের দিক থেকে কম হলেও; তাতে কোন কৃত্রিমতার ছাপ ছিলো না। যেন প্রাণের উৎসারণ। যা হোক তো সেই দিঘীর পাশের ঘরে থাকার কারণে আর দাদির মুখের সেই গল্প আমাদের মনে এক ধরনের ভয়ের রাজ্য তৈরি করে। যা আমাকে আমার যৌবনে এসেও ভোগায়। আমি এখনো পুকুরের পানিতে একা গোসল করতে পারি না। সেই ভয় যেন জাপটে ধরে অক্টোপাসের মত। তবে দাদার সাথে ছিলো আমার ঘনিষ্ঠতা বেশি। তার কারণ চেহারাই ভালো না হলেও পড়াতে ছিলাম সবার সেরা। সেই ছোট থেকেই একা চেয়ারএকাই পড়তে পারতাম। স্কুলের ম্যাডাম বা স্যার যা বলে দিতেন তা নিজে নিজে বাড়ি এসে পড়তে পারতাম মনে করে। আর এই কারণে আমার কখনো প্রাইভেট পড়ার সুযোগ হয়নি। এমনকি এই কোচিংয়ের যুগে। দাদার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতার ফলে জানতাম দাদার অনেক গল্পই। যেমন ফুলজান দাদির বাবা কেন দাদাকে সমীহ করতো। কেনই বা মফিজান দাদির বাড়িতে দাদার যাওয়ার সুযোগ ছিলো অবাধে। আর দুখাই মন্ডল কেনই বা আমার বড় বাপের পিছে ঘুর ঘুর করতো। দাদা ছিলেন দেখতে অন্যরকম সুন্দর। ছোটবেলায় দাদাকে যে লোক দেখতো সেই কোলে তুলে নিতো। দাদার গায়ের রঙ ছিলো পাকা আমের মত। যৌবনে তা আরো ফুটে ওঠে। দাদা ছিলেন বড় বাবার একমাত্র ছেলে ফলে তার সাথে মেয়ে বিয়ে দেয়ার জন্য ছিলো অনেক পরিবারই এক পায়ে খাড়া। তবে দাদার কখনো নৈতিক স্খলন ঘটেনি। পরিবারের ইচ্ছাতেই কার্তিকের এক সন্ধ্যায় বিয়ে করেন দাদিকে। সে থেকেই দাদার আর দাদির সংসার। দাদা-দাদির নতুন সংসারে যখন হেমন্তের অফুরন্ত হাওয়া বইয়ে চলেছে সেই সময় কোল আলো করে এলো আমার বড় কাকু। বাড়ির প্রথম ছেলে হিসেবে কোলে কোলে বেড়ে উঠলেন তিনি। তার বয়স যখন তিন বছর তখন দাদির কোল জুড়ে এলো চাঁদের মত সুন্দর রঙ নিয়ে আমার একমাত্র ফুফু। ফুফু অনেক সুন্দরী ছিলো জন্ম থেকেই। কিন্তু তার যখন আট বছর বয়স। সেই সময় একবার শীতের দিনে রসের চুলায় বসে থেকে আগুন পোহাতে গিয়ে চুলায় পড়ে দেহের কিছু অংশের চামড়া ঝলসে যায়। এবং সেই অংশগুলো সাদা হয়ে থেকে যায় সারা জীবনের জন্য। ফুফুর পরেই আমার বাবার জন্ম। আর তার পরে জন্ম নেয় আমার আরো দুই চাচা। এই পাঁচ সন্তান নিয়ে আমার দাদার সংসার। তবে পরিবারে নেই সেই আগের জৌলুস। পৈতৃক সম্পত্তির যা পেয়েছে তাতে ভালো ফসল হয় না। এই বর্ধিষ্ণু পরিবারে খরচ চালাতে তাই দাদা বেছে নেন পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রয়ের প্রক্রিয়া। যা জমি পেয়েছিলেন তা ছেলেদের বড় করতেই শেষ হয়ে যায়। মৃত্যুর পূর্বে তেমন কিছু রেখে যেতে পারেননি। দাদার সম্পত্তি বলতে ছিলো আমাদের সামনে সেই কড়ই কাঠের খাট আর পাকা মেহগনির গাছের তৈরি বড় চেয়ার। দাদার মৃত্যুর পরে দাদি হয়ে পড়েন একা। এদিকে দাদার মৃত্যুর কয়েক বছর আগে রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আমার ফুফু। রেখে গেছেন দুইটি মেয়ে। একটির বিয়ে হয়েছে। আরকেটি অবিবাহিত। সেই ফুফাতো বোনের সঙ্গে এখন দাদির সময় কাটে। দাদির দিন যে খুব ভালো যাচ্ছে না তার প্রাণের সঙ্গীকে ছেড়ে তা দেখলেই বোঝা যায়। দাদির চোখে মুখে বিরহীর ভাব ফুটে থাকে। সারা দিনে তেমন কিছু মুখে তোলেন না। অনেক বলে কয়ে হয়তো দিনে একবার খান। আর বাকি দিন না খেয়ে কাটে তাঁর। এভাবে দাদিও বেশি দিন আর থাকলেন না। তিনি আমাদের ফাঁকি দিয়ে চলে গেলেন জান্নাতে, সেখানে দাদার সাথে সুখের সময় কাটাতে। আমাদের চার চাচা সকলেই এখন স্বতন্ত্র পরিবারের মালিক। তাদের প্রত্যেকের পরিবারে এসেছে নতুন সদস্য কারো দুইটা ছেলে কারো একটা ছেলে একটা মেয়ে। সুখেই দিন গুজরান করেছেন। এখন দাদার আমলের সেই অভাব আর নেই। সকলেই কিছু কিছু করে জমিতে ফসল ফলায়। সারা বছরে জমি থেকে যা আসে তাতেই সংসার চলে যায়। সুখেই কাটছিলো সবার জীবন। কিন্তু দাদা-দাদির মৃত্যুর পর দেখা দেয় নতুন উৎপাত। এই উৎপাতের কারণ দাদার রেখে যাওয়া খাট ও বড় চেয়ার নিয়ে। কে নিবে এই চেয়ার আর খাট তা নিয়ে চলতে থাকে চাচাদের মধ্যে ঝগড়া। কখনও তা হাতাহাতি পর্যায়েও চলে যায়। এই ঝগড়ার কোনো সুরাহ নেই যেন পৃথিবীর কোথাও। আজ নিয়ে দশদিনের মত চলছে সেই একই বিষয় নিয়ে ঝগড়া। তবে তারা কেউ বাহিরের কোন লোকের পরামর্শ মানতে রাজি না। যার দরুন এই ফ্যাসাদের কোনো সমাপ্তির আশু সমাধানের মুখ দেখছি না। হঠাৎ করেই সেই সময় আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। আমি বাবা ও চাচাদের পরামর্শ দিলাম, দাদার স্মৃতি হিসেবে সেই চেয়ার আর দাদার ঘরটা রেখে দিতে- সবাই রাজি হয়ে গেল ।।

SHARE

Leave a Reply