Home ক্যারিয়ার গাইড লাইন ক্লাসে মনোযোগ এবং নির্দেশনার অনুসরণ – ড. মুহা: রফিকুল ইসলাম

ক্লাসে মনোযোগ এবং নির্দেশনার অনুসরণ – ড. মুহা: রফিকুল ইসলাম

বন্ধুরা, আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছো তোমরা। আমরা বছরের শেষ দিকে এসে গেছি। তোমাদের ফাইনাল পরীক্ষাও কাছাকাছি। তোমাদের সর্বোচ্চ সফলতার জন্য আমাদের দু‘আ অবিরত। সফলতার জন্য কী কী করণীয় সে অনেক জেনেছো। সত্য কথা হচ্ছে, অনেক কিছু জানা আছে; কিন্তু কতটুকু মানা হচ্ছে সেটাই আসল ব্যাপার। একই ক্লাসে অনেক ছাত্র-ছাত্রী থাকে, তবে সকলে প্রথম বা দ্বিতীয় হয় না। কেন হয় না? নিশ্চয় কোন কারণ আছে। আচ্ছা যারা প্রথম বা দ্বিতীয় হয়েছে তাদের মাঝে আর তোমার মাঝে কোন পার্থক্য দেখতে পাও? একটু ভেবে দেখা যাক। বন্ধুরাই বলে যে, এবার ও প্রথম হবে বা ভালো করবে। তাহলে রেজাল্টের আগেই যদি বলা যায় ঐ ছেলে বা মেয়ে ভালো করবে, তাহলে কী কী গুণ বা অভ্যাস দেখে পূর্বেই এমন কথা বলা যায়? সেই কথা যদি বন্ধুর জন্য হতে পারে, যা তোমরাই বলছো, তাহলে সেই প্রথম বা দ্বিতীয় ব্যক্তি তুমি হতে পারছো না কেন? এখানেই আসলে চিন্তা করার বিষয়।

পরিশ্রম কখনও বৃথা যায় না। যে যত বেশি পরিশ্রমী তার সফলতা অনিবার্য। এমন হতে পারে, তোমাদের কোন বন্ধু ছাত্রজীবনে খুব চেষ্টা করেছে কিন্তু কাক্সিক্ষত সফলতা পায়নি, তবে দেখো সে কর্মজীবনে সফলতা লাভ করবে। আমাদের এক বন্ধু ছিলো সে সন্ধ্যার পর এক অথবা দেড় ঘন্টার মাঝেই এ জার্নি বাই বোট, বা এ ভিলেজ মার্কেট এ ধরনের ইংরেজি রচনা মুখস্থ করতে পারতো। সে অত্যন্ত মেধাবী ছিলো, তথাপি সে কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়নি। আরেক বন্ধু সে জুট বা পাটবিষয়ক একটি ইংরেজি রচনা দীর্ঘ ছয় মাস বসে মুখস্থ করেছিল। পরবর্তীতে সেই বন্ধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন। তাহলে খুব প্রখর মেধা থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষায় ভালো করার জন্য অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে।

বন্ধুরা মূল কথায় আসি, তাহলে যারা ভালো ফলাফল করে তারা কী করে? কিছু মনে করতে পারলে? ঠিক আছে এবার তোমাদের ভাবনার সাথে আমাদের কিছু চিন্তা ভাগাভাগি করে নেই। আশা করা যায় উপকারে আসবে।

তোমাকে প্রথম থেকেই তোমার টার্গেট সেট করতে হবে। তোমার মূল কাজ কী সেটাও তোমাকে ঠিক করতে হবে। মনে করো তুমি ক্লাস এইটের ছাত্র; ফুটবল অথবা ক্রিকেট খেলা খুব পছন্দ কর। এখন তোমার হোম টাস্ক আছে, আবার পছন্দের টিমের খেলা আছে। তুমি কী করবে? বাবা-মা হয়তো অত কিছু জানেন না। সুতরাং এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তোমার সিদ্ধান্ত এমন হতে হবে, আগে হোমওয়ার্ক শেষ করতে হবে, পরে আর সব। যে ছেলে বা মেয়েরা ভালো করে, তারা এটাই করে।

এক ছেলের খুব গল্পের বই পড়ার নেশা ছিলো। মেসে থাকতো। রাত্র দশটার পর আর লাইট জ্বালানো যাবে না এই নিয়মে চলতো মেস। সে দশটার মাঝে ক্লাসের অধ্যয়ন শেষ করে হারিকেনের অথবা মোমবাতির আলোয় সারারাত গল্পের বই পড়ত এবং পরের দিন ক্লাস করত। যাই হোক বুঝাতে চাচ্ছি যাই করো না কেন তোমার মূল কাজ হলো লেখাপড়া করা।

প্রিয় কিশোর বন্ধুগণ, পরিবর্তিত সিলেবাস এবং সৃজনশীল পদ্ধতির জন্য আমাদের আর তোমাদের পড়ালেখার কিছুটা ভিন্নতা এসেছে। তবে এ কথা অতি সত্য যে, সেই শিক্ষক, সেই ক্লাস রুম এবং সেই বিদ্যালয়টি এখনও বর্তমান। এখনও আবেদন কমেনি ক্লাসের, ক্লাসের মনোযোগের এবং নিয়মিত ক্লাস-কর্মকাণ্ডের। সুতরাং পদ্ধতি যেটাই হোক, সফলতার জন্য ক্লাসের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। অতএব কার্যকর ক্লাস পারফরম্যান্সের জন্য যা করণীয় তা হচ্ছে:

  • নির্ধারিত সময়ে ক্লাসে প্রবেশ করা। অর্থাৎ তোমার যে দিন যে সকল বিষয়ের ক্লাস আছে সে সকল ক্লাসের নির্ধারিত বই, খাতা এবং কলম নিয়ে আসা। আগের রাত্রে সবকিছু ঠিক করে রাখা। সকালে অবশ্যই নাশতা করে ক্লাসে প্রবেশ করা।
  • শিক্ষকের কথা খুব মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করা। অনেক ছেলেমেয়ে ক্লাসে আসে যাদের শরীরটা ক্লাসে থাকে, কিন্তু মন একেবারেই শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকে। সে কোথায় চলে যায় নিজেও বুঝতে পারে না। শিক্ষক কিছু জিজ্ঞাসা করলে হতভম্ব হয়ে যায়। সবার সামনে লজ্জিত হয়। তার ক্লাসের প্রতি ভালো লাগা কমে যায়। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষক মহোদয় একটু কিছু বললে সেটা কি শিক্ষকের দোষ হবে, না ছাত্রের? কারণ একজন ভালো শিক্ষক অনেক পরিশ্রম করে ক্লাসে আসেন। তিনি চান সকলে সফল হোক; সে জন্যই একটু শাসনের সুরে বলেন। কিন্তু ছাত্ররাতো সেটা ভিন্নভাবে গ্রহণ করে। অথচ ভুলটা ছাত্রের।
  • নোট গ্রহণ করা। ক্লাসে স্যার যা বলেন, অথবা লেখেন অথবা নির্দেশনা প্রদান করেন, তা নিজ খাতায় লিখে রাখা। বাসায় এসে সে নোট বা ইঙ্গিত দেখে পুরো বিষয়টা আরেকবার ফ্রেশ করে লেখা। তাহলে একবার শোনা এবং দু’বার লেখা হলো। তুমি এমন করতে পারলে তোমার ফলাফল ভালো হবেই।
  • নোট গ্রহণের ক্ষেত্রে শর্ট ইঙ্গিতে লেখা। কারণ স্যার যা বলবেন তা সব লিখে শেষ করা যাবে না। সে জন্য এমন ইশারা দিয়ে ক্লাস নোট নিতে হবে, যাতে সেটা পুনরায় ভালো করে শেষ করা যায়।
  • বেশি বেশি শুনে মনে রাখা এবং কম লেখা। ক্লাসে যদি কেউ শরীর এবং মন নিয়ে যথাযথভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে, তাহলে সে অনেক কিছু মনে রাখতে পারবে। অনেক সময় বেশি লিখতে গেলে শুনতে অসুবিধা হয়। সে জন্য মনকে ক্লাসে বসানোর দুর্বার চেষ্টা করতে হবে।
  • শিক্ষককে প্রশ্ন করতে হবে। তোমার যে ব্যাপারটি অস্পষ্ট বা আরো বোঝা দরকার সে ব্যাপারে শিক্ষক মহোদয়কে বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হবে। এটা ক্লাসে তো অবশ্যই। এর বাইরেও অফিস টাইমের মাঝে স্যারের নিকট থেকে জেনে নেয়া যায়।
  • লেখার পদ্ধতি ঠিক করা। একটি টপিক নানাভাবে উপস্থাপন করা যায়। গ্রাফ করার মাধ্যমে, ম্যাপের মাধ্যমে, ভালো একটি উপমার মাধ্যমে অথবা ভিন্ন কালারের পেন ব্যবহার করে লেখা শুরু করতে পারো। অর্থাৎ শুরুটা এমন হবে যেন পরীক্ষক দেখে বুঝতে পারেন, তুমি এর পেছনে যেমন শিক্ষকের ক্লাসের দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের চেষ্টা করেছ পাশাপাশি নিজে সৃজনশীল কিছু করেছো, তাহলে তুমি যেমন ভালো করতে পারবে তেমনি খুব আনন্দ লাভ করবে। তখনই হবে ‘Reading for pleasure’ শান্তির জন্য পড়াশুনা। অন্যথায় তা হবে ‘reading for pressure’!
  • যে বিষয় সম্পর্কে তুমি যা জেনেছো তার সাথে আরো কিছু যোগ করা। অর্থাৎ ক্লাস লেকচার, তোমার নিজস্ব বিন্যাসের পাশাপাশি এ বিষয়গুলো অন্য কোথাও থাকলে সেগুলো রেফারেন্স সহকারে উল্লেখ করা।

অর্থাৎ ছাত্র-ছাত্রী হিসেবে পড়াশুনা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করাই তোমাদের ‘ফুল টাইম জব’। এর বাইরে অন্য কাজও করবে তা হবে পার্ট টাইম। সুতরাং তোমাকে বড় এবং সফল করার জন্য তোমাকেই দায়িত্ব নিতে হবে। এখন যদি অবহেলা এবং অলসতা কর, তাহলে ভবিষ্যতে তোমাকেই সে জন্য কষ্ট করতে হবে। মনে রাখতে হবে ‘সময় তরবারির মত, সময়কে যদি তুমি কর্তন করতে না পার, সময় তোমাকে কাটবে।

SHARE

Leave a Reply