Home উপন্যাস খুদে বাহিনীর গুহা অভিযান

খুদে বাহিনীর গুহা অভিযান [মূল : অ্যালান ফিনচ, রূপান্তর : হোসেন মাহমুদ]

[গত সংখ্যার পর]

ওদের কান্ড দেখে হেসে ফেলে ওরা দু’জন। কুর্ট ন্যান্সিকে বলে-

: দেখলি তো, ভালো কাজই হলো। এখন সামনে এগোই চল।

আরো একটু পথ এগোয় ওরা। এবার সমস্যা। আগুনের আলোয় দেখল, সামনে দু’দিকে চলে গেছে দু’টি পথ। ন্যান্সি বলে ওঠে-

: ভারি ঝামেলা তো! কোন দিকে যাব এখন?

কুর্ট বলে-

: তুই এখানে দাঁড়িয়ে থাক। আমি চট করে পথ দুটো দেখে আসি। দেরি করব না।

: সাবধানে যাস। ভাইকে সতর্ক করে দেয় ন্যান্সি।

কুর্ট এগিয়ে যায়। সামনে পড়ে একটা বড় পাথর। সাবধানে পাথরের ওপর ওঠে সে। দেখে, ওপাশে সেই বড় গুহাটায় এক সাথে বসে আছে লোকগুলো। নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। কুর্ট দেখল, নেতা চেহারার সে লোকটি এখন নির্দেশনা দিচ্ছে। সবাই তার কথা মনোযোগের সাথে শুনছে। তার মানে এ লোকটিই এ খারাপ লোকগুলোর নেতা। তাদের কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করে সে। এখন কাজের দায়িত্ব ভাগ চলছে। লোকটা বলছে, রবার্ট আর সিম্পসন কোকেনের চালান নিয়ে যাবে ডাবলিনে। ক্রিস্টোফার আর স্যামসন হেরোইনের একটি চালান নিয়ে যাবে বেলফাস্টে। হ্যানসেন আর উইলিয়াম হেরোইনের আরেকটি চালান নিয়ে যাবে প্যারিসে এবং ডেভিড আর রন কোকেনের আরেকটি চালান নিয়ে ব্রাসেলসে যাবে। খুব সাবধান। সবগুলো প্যাকেটই আগের মত গোপন ব্যবস্থায় যাবে। তোমরা সবাই নির্দিষ্ট ঠিকানাগুলোতে গিয়ে নগদ টাকা নিয়ে দ্রুত ফিরে আসবে।

এতক্ষণে কুর্ট নিশ্চিত হয় যে এরা এক বিরাট মাদক চক্রের লোকজন। সে অনুমান করে যে সাগরপথে মাদকের চালান এনে এ গুহায় রাখা হয়।

কুর্টের অনুমান অনেকটাই ঠিক। এ সাগর সৈকতটায় লোকজন কম আসে। আর এখানকার গুহাগুলোও মানুষের কাছে আকর্ষণীয় নয়। বিশেষ করে কিছু গুহা পানিতে ভেজা থাকায় পিচ্ছিল হয়ে থাকে। পা পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এগুলোতে কেউ আসে না। কিন্তু একটু উঁচুতে যে কিছু গুহা সব সময়ই শুষ্ক থাকে তা হয়ত কেউ খেয়াল করেনি। তার জানা নেই যে টিলার ওপাশের সদর রাস্তা থেকে একটি শাখা পথ ঘুরে এ গুহাগুলোতে যাতায়াত করা যায়। এই মাদক চক্র যেভাবেই হোক, গুহাগুলোর সন্ধান পেয়েছে এবং তাদের ব্যবহারের উপযোগী করে নিয়েছে। এটা তাদের মাদকের গুদাম। সাগরপথে নৌকায় করে গভীর রাতে তারা এগুলো এনে এখানে জমা করে। তারপর প্রয়োজন মত গাড়িতে করে নানা জায়গায় পাঠায়।

কুর্ট বুঝতে পারে, সকালে তারা হঠাৎ করে এখানে এসে পড়ায় বিপত্তি বেধেছে। তারই শিকার হয়েছে বেচারি লিন। তবে মনে হচ্ছে, এ লোকগুলো মাদক পাচারের সাথে জড়িত হলেও পাকা অপরাধী হয়ত নয়। কারণ, অপরাধীদের কাছে বহু অস্ত্র থাকে- বন্দুক, পিস্তল-রিভলবার, ছুরি, বোমা ইত্যাদি। কিন্তু এদের কাছে সে সব কিছুই নেই। এদিকে লিনকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তাকে কোথায় রেখেছে কে জানে। কী করবে বুঝে উঠতে পারে না কুর্ট।

হঠাৎ নেতা লোকটি উঠে দাঁড়ায়। সবার উদ্দেশ্যে কথা বলে সে-

: মেয়েটিকে কোণের ছোট ঘরটায় রেখেছ তো? সে খুবই ছোট। তাই তার দ্বারা কোনো ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না। তবু খেয়াল রেখ তার দিকে। সকালে তাকে ছেড়ে দেয়া যাবে।

তার কথা শুনে স্বস্তির শ্বাস ফেলে কুর্ট। যাক, লিন কোথায় আছে তা জানা গেল। এখন তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে।

এ সময় আবার কথা বলে নেতা। তার গলা বেশ গম্ভীর, ভয় ধরানো। বলে-

: এখন আমি যা বলছি সবাই মনোযোগ দিয়ে শোনো। এখানে আমরা আছি বারো জন। সবাই পোড়খাওয়া, সাহসী মানুষ। এখানে যে হেরোইন ও কোকেন আছে তার দাম এক কোটি ডলার। আমরা যদি সব ঠিকানায় চালানগুলো ঠিকমত পৌঁছে দিতে পারি তাহলে দ্বিগুণ অর্থ পাব অর্থাৎ শুধু লাভের পরিমাণই হবে পঞ্চাশ লাখ ডলার। তার মধ্যে বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় আট-দশ লাখ ডলার দিতে হবে। বাকি ডলার আমাদের মধ্যে ভাগ হবে। এ দিয়ে কিছুদিন সবারই ভালোভাবে কাটবে। এদিকে নতুন চালান আনার চেষ্টা চলতে থাকবে। কারণ সব দেশেই মাদকের চাহিদা ভীষণভাবে বাড়ছে। সুতরাং সবাই যে যার দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করবে। কোনো ভুল যে করবে তাকে কঠিন শাস্তি পেতে হবে।

একটু থামে নেতা। তারপর আবার কথা শুরু করে, আজ আমাদের বিরাট কাজ রয়েছে। প্রথম কথা হচ্ছে, আটক মেয়েটিকে উদ্ধার করার একটা চেষ্টা করা হতে পারে। তাই অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের দু’জন লোক সারাক্ষণ গুহার প্রবেশ পথে পাহারা দেবে। আমার জানা মতে, পুলিশ এ গুহার কথা জানে না। কিন্তু তাদের অসাধ্য কিছু নেই। তাই যে কোনো জরুরি অবস্থা মোকাবেলার জন্য আরো দু’জন সাহসী লোক থাকবে এখানে। বাকি সবাই এখন যাব যেখানে গুপ্তধন আছে বলে মনে করা হয় সে গুহাটাতে। শেষ অংশটুকু খুঁড়ে দেখব আসলেই ঐ গুহায় গুপ্তধন লুকোনো আছে কিনা। যদি কোনো সমস্যা বা বিপদ দেখা দেয় তাহলে এরা দ্রুত আমাদের খবর দেবে। কেউ অসতর্ক থাকবে না। বিপদ ঘটলে সবাই মিলে গোপন পথ দিয়ে বেরিয়ে যাব। কেউ আমাদের সন্ধান পাবে না।

অনেক খবরই জানা গেল- ভাবল কুর্ট। কোনো শব্দ না করে সে পাথর থেকে নেমে আসে। চাপা গলায় সব কিছু জানায় দু’জনকে। বলে, লিনকে এ গুহার একটি ঘরে আটকে রাখা হয়েছে।

: চলো, এখুনি লিনকে উদ্ধার করে আনি আমরা। বলে ডেভ।

ওর পিঠে হাত রাখে ন্যান্সি। বলে-

: না রে ভাই, বিষয়টা এত সহজ নয়। বুদ্ধি করে কাজ করতে হবে আমাদের।

কুর্টের প্যান্টের এখানে সেখানে কম করে হলেও গোটা পাঁচ-ছয় পকেট রয়েছে। তেমনি ওর গায়ের জ্যাকেটেও আছে আরো গোটা কয়েক। এসব পকেটে যে কি আছে আর কি নেই তা বলা মুশকিল। দাদুবাড়ি আসার আগে সে পকেটে নিয়ে এসেছে ছোট লাইটার, সাদা চক, অনেক মোটা কয়েক গজ সুতা যা চিকন দড়ির কাজ করে, কাপড়ের টুকরো ইত্যাদি নানা জিনিসপত্র। সে সাথে ওর প্রিয় সুইস নাইফ তো আছেই। বহু কাজের কাজী এ জিনিসটা। চকের টুকরো বের করে আনে সে এ পকেট ও পকেট খুঁজে। সেটা দিয়ে কালো মেঝের ওপর এ গুহার যেটুকু দেখেছে তার ভিত্তিতে একটা ম্যাপ আঁকে কুর্ট। তাতে মাদক চক্রের লোকজন কোথায় বসেছিল ও লিনকে কোনদিকে রাখা হতে পারে, তা দেখানোর চেষ্টা করে সে। গুহাটা বেশ বড়। তার কয়েক জায়গায় আবার ছোট গুহার মত আছে। সেগুলো ঢুকে গেছে ভেতরের দিকে। তৈরি হয়েছে ছোট ছোট ঘর। সেগুলো মাদক চক্রের লোকজন ব্যবহার করে। তারই একটাতে লিনকে রাখা হয়েছে। ওরা যাতে ভালো করে দেখতে পায় সে জন্য হাতের আড়াল করে টর্চ জ্বালে কুর্ট। এতে ন্যান্সি ও ডেভ গুহার ভেতরের পথ ও বড় গুহা সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়ে যায়।

 

৫.

বড় পাথরটার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো তারা। তিনজন টেনে নিয়ে চলেছে ড্রাগনটা। লোকগুলোর কোনো কথা শোনা যাচ্ছে না। কুর্ট ভাবতে থাকে। বড় দলটি যদি গুপ্তধনের সন্ধানে গুহা খুঁড়তে গিয়ে থাকে তাহলেও তো দু’জন পাহারাদার আর সাহায্যকারী মিলিয়ে চারজন লোক থাকার কথা। অতএব হুঁশিয়ার থাকতে হবে।

পায়ে পায়ে এগোতে থাকে কুর্টের খুদে বাহিনী। দেখতে পায়, একটি ছোট ঘরের সামনে বসে আছে মাদক চক্রের দুই সদস্য। নেশা করেছে বোধ হয়। চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু। তাই যথেষ্ট সতর্কতা তাদের মধ্যে নেই। ভালোই হলো, ভাবল কুর্ট। তার চোখে পড়ে, দু’জনের কোলের ওপর দু’টি পিস্তল। ন্যান্সিকে ইশারা করে সে। ডেভকে ড্রাগনের সাথে রেখে তাদের দিকে এগিয়ে যায় দু’জন। চোখের পলকে তুলে নেয় পিস্তল দুটো। তারা টের পেল বলে মনে হলো না। তাদের পেছনে ঘরের মধ্যে ছোটখাটো দেহের কেউ ঘুমিয়ে আছে। সে যে লিন তা বুঝতে দেরি হয় না কুর্টের। এদিকে দু’জন যখন এখানে তাহলে বাকি দু’জন পাহারা দিচ্ছে। এ গুহা থেকে বেরনো বা ঢোকার আরো পথ আছে যা তারা চেনে না। কিছু করার নেই। দু’জন লিনের কাছে পৌঁছে। ন্যান্সি তার শরীর ধরে আস্তে ঝাঁকুনি দেয়। নাম ধরে ডাকে। একবার, দু’বার, তিনবার।

চোখ খোলে লিন। প্রথমে ন্যান্সি, তারপর কুর্টের দিকে তাকায়। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে যায় তার। তারপর ঝট করে শোয়া থেকে উঠে বসে। জড়িয়ে ধরে ন্যান্সিকে। বিস্ময়ের প্রথম ধাক্কাটা কাটতে বলে-

: তোরা! কি করে এলি? ওরা টের পায়নি?

ন্যান্সি বলে-

: সে সব কথা পরে হবে। চল, জরুরি কাজ আছে আমাদের।

এ সময় দু’জন লোকের কথার আওয়াজ পাওয়া যায়। মনে হয়, গল্প বলতে বলতে এদিকেই আসছে। দ্রুত ছুটে এসে ড্রাগনের কাছে দাঁড়ায় সবাই। ন্যান্সি ও লিনকে ভেতরে ঢুকতে বলে কুর্ট। নিজে বাইরে ড্রাগনের আড়ালে দাঁড়ায়। এ সময় দু’জন লোক ভেতরে চলে আসে। কুর্ট বুঝতে পারে, তারাই বাইরে পাহারায় ছিল। লোক দু’টি এগিয়ে এসে হঠাৎ করে সামনে এক বিকট ড্রাগন মূর্তি দেখে থমকে দাঁড়ায়। পরক্ষণেই ভীষণ ভয় পেয়ে ওরে বাবারে! বলে চিৎকার দিয়ে ছুটে মিলিয়ে যায় অন্ধকারে। এদিকে এই গোলমালে ঢুলুঢুলু ভাব কেটে গেছে বাকি দু’জনের। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায় তারা। নিজেদের পিস্তল খোঁজে। না পেয়ে পরস্পরের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকায়। এ সময় তাদেরও চোখে পড়ে ড্রাগনটিকে। দু’টি চোখ থেকে আগুনের লকলকে শিখা জ্বলছে। হাত দু’টি দু’দিকে ছড়িয়ে রাখা। ড্রাগনটা এখন এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। একবার ড্রাগনের দিকে তাকিয়েই সাহস হারিয়ে ফেলে তারা। দৌড় দেয়।

সাথে সাথে তৎপর হয়ে ওঠে কুর্ট। মুহূর্তের মধ্যে সে বুঝে ফেলে যে তারা বাকি সাথীদের কাছেই যাচ্ছে যারা কিনা গুপ্তধনের খোঁজে গেছে।

: ওদের পেছনে চল সবাই।

বাহিনীর উদ্দেশ্যে নির্দেশ ছুড়ে দেয় কুর্ট। দৌড়াতে শুরু করে নিজে। মাদক চক্রের সদস্যদের হারিয়ে ফেলা যাবে না। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, ন্যান্সি ওর পাশে চলে এসেছে। লিন আর ডেভ এক হাতের মত পেছনে। দৌড়াতে দৌড়াতেই ন্যান্সিকে বলে, পিস্তল ভালো করে ধরিস। গুলি করতে হতে পারে। পারবি তো?

ন্যান্সি দৌড়ের ওপরই জবাব দেয়-

: পারব মনে হয়।

আসলে ন্যান্সি পিস্তল চালায়নি কখনো। কুর্টের একটা খেলনা পিস্তল আছে যেটা আসলের মতই। প্লাস্টিকের নকল গুলি ছোড়া যায়। অনেকবার সেটা নিয়ে খেলেছে সে। আর টিভিতে বিভিন্ন ছবিতে পিস্তলের ব্যবহার দেখেছে। সে সবের ওপর ভরসা করেই জবাবটা দিয়েছে। আসল পিস্তল খেলনা পিস্তলের মত হালকা নয়, বেশ ভারি। যদি গুলি করতেই হয়, হাত শক্ত করে তা করতে হবে।

: ঠিক আছে। লিন আর ডেভের দিকে খেয়াল রাখিস। একটা লড়াই হতে পারে।

মাদক চক্রের দু’জন ওদের চেয়ে জোরে দৌড়ে খানিকটা এগিয়ে গিয়েছিল। এদিকে অন্ধকার। তাই কাউকেই চোখে পড়ছিল না। কুর্ট আর ন্যান্সির এক হাতে পিস্তল ধরা, আরেক হাতে টর্চ। তারা এক সাথে টর্চ জ্বালতেই আলোর ফলা বর্শার মত লোক দু’জনকে স্পর্শ করে। সে মুহূর্তে একজন হোঁচট খেয়ে আছড়ে পড়ে। তার কাছে পৌঁছে চারজন একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। লিন রাগ সামলাতে না পেরে কয়েকটি ঘুষি লাগিয়ে দেয় লোকটির মুখে ও মাথায়। লোকটি ওদের কাছে বারবার মাফ চাইতে থাকে। অন্য লোকটি দৌড় থামায়নি। তার সাড়া পাওয়া যায় না। বোধ হয় এ ফাঁকে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে। সে ভয় পেয়ে গুহার বাইরে পালালো না দলের লোকদের কাছ গেল বুঝতে পারল না ওরা। যাক, একজনকে তো পাওয়া গেছে। একে ভয় দেখিয়ে গুপ্তধনের গুহায় পৌঁছে যেতে পারবে। মাদক চক্রের সদস্যরা সংখ্যায় ওদের চেয়ে দ্বিগুণ, সবাই বড় ও শক্তিশালী। কিন্তু ওদের কাছেও দু’টি পিস্তল আছে আর আছে একজন বন্দী। সুতরাং তারা একেবারে দুর্বল নয়। তবে সবার আগে এ লোকটির ব্যবস্থা করতে হবে, ভাবে কুর্ট। বিশেষ করে এ যেন পালাতে না পারে।

প্যান্টের ঊরুর সাথে লাগানো এক্সট্রা পকেট হাতড়াতে থাকে কুর্ট। পেয়েও যায়। এক পকেট থেকে বের হয় হাত দশেক দীর্ঘ চিকন দড়ির মত মোটা সুতা। লোকটির দু’হাত পেছন দিকে নিয়ে আচ্ছামত বেঁধে ফেলে সে। তারপর তাকে দাঁড় করিয়ে বলে-

: তোমার সাথীরা যে গুহায় গুপ্তধন খুঁজতে গেছে সেখানে নিয়ে চল আমাদের। কোনো চালাকি করবে না। তোমাদের পিস্তল দু’টি আমাদের কাছে। ঝামেলা করলেই কিন্তু গুলি করব। আর হ্যাঁ, তোমার মুখও বেঁধে ফেলা হবে যাতে চিৎকার করে দলের লোকদের সাবধান করতে না পার।

কুর্ট আরেক পকেট থেকে বের করে আনে দু’হাতের মত লম্বা কাপড়।

বন্দীর মুখ বাঁধা হয়ে গেলে এগোতে শুরু করে দলটি। কিছুটা এগিয়ে হঠাৎ থেমে যায় ন্যান্সি। লিন ও ডেভকে বলে-

: তোরা লোকটার ওপর কড়া নজর রাখ। আমি আর কুর্ট একটা আলোচনা করব।

কুর্টের হাত ধরে একটু দূরে নিয়ে যায় ন্যান্সি। চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করে-

: আমরা কোথায় যাচ্ছি এখন?

: কেন, ঐ গুপ্তধনের গুহায়! তাদেরকে আটক করব আমরা। তারা অপরাধী। মাদক সরবরাহ করে বহু মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাদের ছাড়ব না আমরা, পুলিশের হাতে তুলে দেবো। তাদের ভয়ঙ্কর শাস্তি হওয়া দরকার।

ন্যান্সি বলে-

: না, তাদের আটক করতে যাওয়া মনে হয় আমাদের ঠিক হবে না। ভেবে দেখ, ওরা আটজন আছে ওখানে। আমরা মাত্র চারজন, সবাই ছোট। তারা করতে পারে না এমন কোনো কাজ নেই। শুধু দু’টি পিস্তল নিয়ে তাদের সাথে পারব না আমরা। তা ছাড়া আমরা পিস্তল কোনো মত চালাতে পারব, কিন্তু ঐ লোকগুলো নিশ্চয়ই অনেক ভালো পারে। তাদের কাছে আরো মারাত্মক অস্ত্রও থাকতে পারে। তারা আমাদের ধরে ফেললে মেরে ফেলবে।

: তাই তো, আমি ব্যাপারটা এভাবে ভাবিনি। কী করা যায়!

কুর্ট ভাবতে থাকে। মিনিট পাঁচেক কেটে যায়। তখনো ভাবছে কুর্ট। অধৈর্য হয়ে ওঠে ন্যান্সি। বলে-

: কী হলো! কিছু একটা করতে হবে। দেরি হয়ে যাচ্ছে।

এতক্ষণে যেন কোনো পথ খুঁজে পেয়েছে কুর্ট। বলে-

: শোন ….।

এতক্ষণ ধরে যা ভেবেছে তা ন্যান্সিকে জানায় কুর্ট। না, মাদক চক্রের লোকগুলোর দিকে যাবে না ওরা। কারণ তাদের সাথে পারবে না। তার চেয়ে ওরা এখান থেকে ফিরে যাবে ড্রাগনটাকে যেখানে রেখে এসেছে। এতক্ষণে হয়ত ড্রাগনের আলো নিভে গেছে। সেখানে গিয়ে বড় পাথরের আড়াল থাকবে সে আর লিন। লোকটাকে হাত বাঁধা অবস্থায় ওদের কাছেই রাখবে পিস্তল থেকে গুলির ভয় দেখিয়ে। এদিকে ন্যান্সি আর ডেভ দৌড়ে যাবে বাড়িতে। দাদু আর দাদি জেগে থাকলে ভালো, নইলে তাদের জাগিয়ে তুলবে। জরুরি খবর দিতে বলবে স্থানীয় পুলিশকে। আসতে বলবে দাদুবাড়িতে। পুলিশ এলে ন্যান্সি তখন পুরো ব্যাপারটা তাদের বুঝিয়ে বলবে। পুলিশ নিশ্চয়ই রাস্তা দিয়ে গুহায় যাবার পথ চেনে। তারা সেদিক দিয়ে গিয়ে রাস্তা ঘিরে যেন মাদক চক্রের সদস্যদের পালানো রোধ করে। অন্যদিকে ন্যান্সি পুলিশকে বলে তাদের কয়েকজনকে নিয়ে বাড়ির পেছন দিকের টিলা পেরিয়ে সৈকতের দিক দিয়ে গুহায় ঢুকবে। আর পুলিশকে তার কথা বিশ্বাস করাতে প্রমাণ হিসেবে পিস্তলটা দেখিয়ে বলবে যে মাদক চক্রের লোকদের কাছ থেকে তা পাওয়া। কুর্ট ওদের অপেক্ষায় থাকবে। মাদক চক্রের সদস্যরা যদি গুপ্তধন নিয়ে বড় গুহাটায় ফিরে আসে, কুর্ট আর লিন ঘাপটি মেরে বসে থাকবে। পুলিশ যদি ঠিকমত পৌঁছায় তাহলে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার, অপরাধীরা গ্রেফতার এবং সে সাথে পুরনো দিনের গুপ্তধনও হয়ত উদ্ধার হতে পারে।

মাথা নাড়ে ন্যান্সি। সময় এখন বড় মূল্যবান। তাই আর দেরি করা ঠিক হবে না। পিস্তল ও টর্চ হাতে ডেভকে নিয়ে রওনা হয় সে। কুর্টকে বলে যায়- যত দ্রুত সম্ভব ফিরে আসবে।

ন্যান্সি ঠিকমত বাড়ি যেতে পারবে কিনা, পুলিশ সাথে নিয়ে কখন ফিরবে, এখন কী করা যায় ইত্যাদি চিন্তায় ডুবেছিল কুর্ট। হঠাৎ লিনের চিৎকারে চমকে ওঠে সে। দেখে, মাদক চক্রের যে লোকটিকে হাত বেঁধে রাখা হয়েছিল সে উঠে দৌড় দিয়েছে। চোখের পলকে তার পিছু ধাওয়া করে সে। লোকটি পেছনে হাত বাঁধা থাকায় মোটেই জোরে দৌড়াতে পারছিল না। তাই দ্রুতই তার নাগাল পেয়ে যায়।

: এই থাম, নইলে গুলি করব বলছি- হুমকি দেয় কুর্ট।

কিন্তু থামে না লোকটা। বোঝা গেল, সদ্য কিশোর কুর্টকে পাত্তাই দিচ্ছে না। গুলি করবে তাকে? না, সেটা ঠিক হবে না। তাতে লোকটি আহত হবে, ঝামেলা বাড়বে। তা ছাড়া তার দলের লোকেরা গুলির আওয়াজ শুনে ছুটে আসতে পারে। তখন বিপদ বাড়বে। আর কোনো উপায় না দেখে পেছন থেকে তাকে এক ধাক্কা দেয় কুর্ট। সাথে সাথে লোকটি হুমড়ি খেয়ে পড়ে মাটিতে। পিস্তলটা বের করে লোকটির ঘাড়ের পেছনে চেপে ধরে। কঠিন গলায় বলে-

: উঠে দাঁড়াও। সাবধান। কোনো গোলমাল করার চেষ্টা করলেই গুলি করব।

ইতোমধ্যে লিন এসে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে একটা কাঠের টুকরো। সেটা দিয়ে লোকটার পিঠে গোটা কতক ঘা লাগিয়ে দেয় সে। লিনকে থামায় কুর্ট। তারপর দু’জনে টেনে তোলে লোকটাকে। হাতের বাঁধনটা পরীক্ষা করে। না, ঠিকই আছে। পাথরের আড়ালে এসে গুহাতে বসে পড়ে তারা। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার নেই।

[চলবে]

SHARE

Leave a Reply