Home গল্প হেমন্তের গল্প – আহসান হাবিব বুলবুল

হেমন্তের গল্প – আহসান হাবিব বুলবুল

বার্ষিক পরীক্ষা হয়ে যাওয়ায়, শেষ পর্যন্ত আর তাপসের অনুরোধ ফেলতে পারলাম না। বাড়ি থেকেও অনুমতি পাওয়া গেলো। যদিও আব্বা-আম্মা একটু দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিলেন, হিন্দু পরিবারে বেড়াতে যাওয়া…। তাপস আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আব্বা-আম্মা ওকে খুব ভালো জানেন। তাই প্রথম দিকে একটু অমত করলেও শেষে অনুমতি দিলেন। আমি শহরের ছেলে। দাদা গ্রাম থেকে এসে শহরে বসতি করেছিলেন। গ্রামে যে, কোন দিন যাওয়া হয়নি তা নয়। গ্রামে এখনো আব্বার দূর সম্পর্কের দু’একজন আত্মীয়-স্বজন আছেন। ছোটবেলায় আব্বুর সাথে গ্রামে গিয়েছিলাম। এখন যাওয়া হয় কালে-ভদ্রে। তাপস যখন গ্রামে ওদের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার দাওয়াত করলো, তখন গ্রামে যাবার লোভটা সামলাতে পারলাম না। রাজি হয়ে গেলাম। আমরা সবে মাত্র জেএসসি (অষ্টম শ্রেণি) পরীক্ষা দিয়েছি। ভাবলাম, নবম শ্রেণিতে উঠলে এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। তাই বেড়ানোর এটাই মোক্ষম সময়।

এখন হেমন্ত কাল। ষড়ঋতুর হিসাবে কার্তিক-অগ্রহায়ণ দুই মাস হেমন্ত কাল। শরতের আমেজ এখনো কাটেনি। শরতের হাত ধরে আসে হেমন্ত। হেমন্ত আসে সোনালি ফসলের সম্ভার নিয়ে। হেমন্ত উপহার দেয় রাশি রাশি ভারা সোনার ধান। পাকা ধানের শীষ মৃদু মন্দ বাতাসে দুলতে থাকে; ছড়ায় সুমিষ্ট গন্ধ। তার উঠোন ভরিয়ে দেয় সোনালি ধানে। পল্লীর নিস্তরঙ্গ জীবনে আসে প্রাণের আভাস। প্রকৃতি যেন কবির ভাষায় বলতে চায়-

‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ছোট সে তরী,

আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।’

হেমন্তে কৃষকের বিস্তৃত উঠোন ধানে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কৃষাণ-কৃষাণীরা ফসল তোলার আনন্দে মেতে ওঠে। গোলা ভরা ধান তাদের মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়। এ আনন্দ প্রকাশ করার জন্য শুরু হয় নানান উৎসব। শুরু হয় নতুন ধান ঘরে ওঠার উৎসব ‘নবান্ন’। নবান্নের উৎসবে নতুন ধান দিয়ে পিঠা পায়েশ তৈরির ধুম পড়ে যায়। রাতের বেলায় আয়োজন করা হয় গানের আসর। গানে গানে মেতে ওঠে জনপদ। এ সময় রাতের আকাশে মায়াময় জোছনা কবিমনকে চঞ্চল করে তোলে- এ সব ভাবতে ভাবতে আমিও চঞ্চল হয়ে উঠলাম। হেমন্তকে বইয়ের পাতায় দেখেছি, এবার বাস্তবে দেখব বলে।

তাপসদের বাড়ি পাবনা জেলার মধুপুর গ্রামে। হেমন্তের এক হলুদ বরণ সকালে আমরা দুই বন্ধু রওনা দিলাম মধুপুরের উদ্দেশে। সড়কপথে ‘পাবনা এক্সপ্রেসে’ চেপে বসলাম। রাজধানী ঢাকা শহরকে পেছনে ফেলে সাভারের আশুলিয়ায় ঢুকতেই বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার আমেজ পেলাম। রাস্তার দু’ধারের পাথারের পানি ঢেউ তুলে আমাদের গতির সাথে হারিয়ে যেতে লাগলো। দুই পাশের সবুজ দেখতে দেখতে, দুই বন্ধুতে গল্প করতে করতে কখন যে যমুনা সেতুতে এসে পড়েছি বুঝতেই পারিনি। আমি এই প্রথম যমুনা সেতু দেখছি। বিশাল সেতু দেখে অভিভূত হলাম। তাপস বললো, যমুনা রিসোর্টে নামতে পারলে খুব মজা হতো। এনজয় করতে পারতিস। কিন্তু বিরতিহীন যাত্রা তো, তাই নামা সম্ভব নয়। তা ছাড়া এখান থেকে ব্রেক জার্নি করা বেশ কষ্টকর। বাড়ি থেকে পরিকল্পনা করে এখানে একবার আসা যাবে কেমন!

আমি ওর কথায় সায় দিলাম, বিশাল নদী সেতু আর মানুষের নির্মাণশৈলী নিয়ে ভাবতে থাকলাম।

কী সুন্দর আমাদের দেশটা। আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলাম। এই জ্ঞান তো তারই দেয়া। এই ঋতু বৈচিত্র্য, নৈসর্গিক সৌন্দর্য-সুষমার পেছনে তো তিনিই রয়েছেন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমাদের বাস মধুপুর গ্রামের অদূরে মহাসড়কের একটি স্টপেজে এসে থামলো। আমরা ঝটপট নেমে পড়লাম। তাপস আমাকে নিয়ে একটি রিকশায় উঠে পড়লো। তিরিশ মিনিটের মধ্যেই আমরা মধুপুর গ্রামে এসে পৌঁছলাম। আগে থেকেই খবর দেয়া ছিল। তাপসের বাবা এগিয়ে এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাদের দেখে হাত নেড়ে অভ্যর্থনা জানালেন। তাপস পরিচয় করিয়ে দিল, বাবা ও রাকিবুর রাজা, আমার ভালো বন্ধু। ওকে আমরা রাজা বলে ডাকি, আমি নমস্কার করলাম। উনি তাপস ও আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। দুপুরে তাপসের মা খুব আদর যত্œ করে আমাদের খাওয়ালেন। তারপর লম্বা এক ঘুম। জার্নিতে কিছুটা হলেও শরীরে ক্লান্তি এসেছিল। যখন ঘুম ভাঙলো, তখন দেখি দূর থেকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। চারদিকে শঙ্খের ধ্বনি শুনতে পেলাম। এটা হিন্দু পাড়া। এর পরই মুসলিম বসতি। আমি নামাজ পড়ার জন্য ওজু করে এলাম, একটু ইতস্তত করছি। আশপাশে তাপসকেও দেখছি না। তাপসের বাবা এগিয়ে এলেন। বললাম, চাচাজি নামাজ পড়তে চাই। তিনি বললেন, অবশ্যই পড়বে। তিনি একটি শীতলপাটি নিয়ে এলেন, সাথে একটি নকশি কাঁথা। বললেন, ‘বাবা, এ বিছানা পয়-পরিষ্কার, তুমি নির্দ্বিধায় এতে নামাজ পড়তে পারো।’

নামাজ শেষ করে পেছনে ফিরে দেখি তাপস দাঁড়িয়ে।

: স্যরি দোস্ত! তোর উঠতে দেরি দেখে একটু পুকুরঘাটে গিয়েছিলাম।

: অলরাইট, থ্যাঙ্কস। অসুবিধা হয়নি।

তাপসরা সম্ভ্রান্ত কৃষক পরিবার। এক সময় ওদের অনেক জমি ছিল। শরিকানা, ভাগবাটোয়ারার পর এখনো পঞ্চাশ বিঘা জমি আছে ওদের। তাপসের বাবা সুকুমার সরকার। নিজে জমি চষেন না। সব জমি বর্গা দেয়া। বর্গাচাষিরা যে ফসল দেয়, তাতে তাদের ভালোই চলে যায়। তিনি মওসুমি কিছু ফসলের স্টক বিজনেস করেন।

রাতে খাবার টেবিলে নানা রকম খাবারের আয়োজন করেছেন সুষমা দেবী। সুষমা দেবী হলেন তাপসের মা। রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারে এসেছি। এদের অনেক নিয়ম-কানুনই আমার জানা নেই। তাই বেশ সংকোচে আছি। পিছে কিছু ভুল করে ফেলি কিনা!

: বাদশাহ যে কিছুই খাচ্ছে না!

আমি কিছুটা ভড়কে যাই। এখানে আবার বাদশাহ কে?

: আম্মু, তুমি বাদশাহ বলছো কাকে, ওর নাম রাজা।

: যে রাজা তাকে বাদশাহও বলা যায়।

আমরা কেউ হাসি লুকাতে পারি না। চাচাজিও মিষ্টি হাসেন। বলেন, রাজা, এবার বাদশাহর মত খেয়ে দেখাও তো!

হেমন্তের সোনা ঝরা বিকেল। তাপস আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে গ্রাম ঘুরে দেখাবে বলে। আমরা হাঁটতে থাকি গ্রামের মেঠো পথ ধরে। দুই ধারে ফসলের মাঠ। পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। কৃষক ধান কাটছে, রাশি রাশি ধান। পাকা ধান কেটে মুঠি মুঠি করে গোলায় তুলছে কৃষক। পাকা ধানের গন্ধ চারদিক মৌ মৌ করছে। হঠাৎ একটি দৃশ্যপটে চোখ আটকে যায় আমার। প্রায় বিবস্ত্র নিরন্ন কিছু কিশোর-কিশোরী ধান কাটা সারা এমন মাঠে কী যেন খুঁজছে, সংগ্রহ করছে। তাপস জানায়, ওরা গরিব ঘরের ছেলেমেয়ে। ধান কাটা ক্ষেতে কিছু ধান ঝরে যায়, ইঁদুরের গর্তেও ধান থাকে। সেসব ধান সংগ্রহ করে ওরা। ওরা বেশ ধান পায়। তাতে ওদের লাভ হয়। ওদের কেউ কিছু বলে না। আমি হাঁটতে হাঁটতে ওদের কাছে চলে যাই। খুব কাছ থেকে ওদের দেখি। শত আনন্দের মাঝেও একটা বিষাদের ছায়া তাড়া করে আমাকে। তাপস আমার হাত ধরে হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে আমরা বিলের ধারে এসে পড়ি। মাটির সোঁদা গন্ধ আমাকে আপ্লুত করে। বিলে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত শাপলা ফুটে আছে। ইতোমধ্যে শীতের অতিথি পাখি আসতে শুরু করেছে। সারস, পাতিহাঁস, বালিহাঁস, বক, গাংচিল কত না নাম না জানা পাখি।

পাখির কলকাকলি, ডানা ঝাপটানোর শব্দ দিগন্তে আছড়ে পড়ছে। আমি চোখ ফিরাতে পারি না। কিছুক্ষণ পরই বিলে সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করি। হলুদ বরণ সূর্যটা ডুবে গেলেও সে তার রঙ রেখে যায়। মেঘমালা সে রঙের আবির মেখে আকাশকে আরো বর্ণাঢ্য করে তোলে।

বিলের পানিতেও সে রঙের ছায়া পড়ে। এক মনোহর দৃশ্যের সৃষ্টি করে। যেন একের আত্মাহুতি অপরকে নবজীবনে অভিষিক্ত করে।

তাপস বলে, দোস্ত চল এখন ফেরা যাক।

আজকের বিকেলটা খুব ভালো কাটলো। আজকের এ গোধূলিলগ্ন অনেক দিন মনে থাকবে আমার।

হেমন্তের মেঘমুক্ত আকাশ যেমনটি আশা করা যায়, আজ তেমনটি মনে হচ্ছে না। আমি তাপসকে বললাম, বৃষ্টি হবে নাকি। তাপস বলে, হেমন্তে সাধারণত বৃষ্টি হয় না। আবার কখনো হলে লাগাতার কয়েকদিন থাকে। আমাদের গ্রামের ভাষায় তাকে কার্তিকের কাইতান বলে। চাচাজি এসে জানালেন, টিভি খবরে বলেছে, সমুদ্রে নি¤œচাপ হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে। আজকের সকালটা মাটি হলো ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল। দুপুরের পরেই বৃষ্টি নামতে শুরু করলো। অঝোর ধারায় বৃষ্টি। তাপসদের বাড়ির উঠোনে পালা করে রাখা রাশি রাশি ধান ভেসে যেতে লাগলো। বাড়ির লোকজন, গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রী সবাই সে ধান রক্ষায় নেমে পড়লো। তাপসও নেমে পড়লো। আমি আর বসে থাকি কিভাবে। সবাই আমাকে বারণ করলো। তবুও আমি তাপসের সাথে কাজে লেগে পড়লাম। সুষমা দেবী তাপসের মা বড় একটা ছাতা এনে আমার মাথার ওপর ধরে রেখে আমাকে ঘরে উঠে যেতে বলতে লাগলেন। অসুখ করবে বলে সতর্ক করতে লাগলেন।

কয়েকদিন হলো ঢাকায় ফিরেছি। আজ হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলে শুধু তাপসের মা সুষমা দেবীর কথাই মনে পড়ছে। দুনিয়ার সব মা বুঝি একই রকম। স্নেহময়ী মমতাময়ী ।।

SHARE

Leave a Reply