Home প্রচ্ছদ রচনা সবুজ খামে হেমন্তের ডাক – রবিউল কমল

সবুজ খামে হেমন্তের ডাক – রবিউল কমল

সবুজ পাতার খামের ভেতর
হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে
কোন পাথারের ওপার থেকে
আনল ডেকে হেমন্তকে…।

কবি সুফিয়া কামাল এভাবেই হেমন্তকে ডেকে এনেছেন। ছয় ঋতুর বাংলাদেশে কার্তিক আর অগ্রহায়ণ এই দুই মাসের ভেতর দিয়ে বয়ে যায় হেমন্তের বাঁকফেরা নদী। নদীর স্বর্ণালি চরে চরে কিশোরের দঙ্গল, ভোকাট্টা ঘুড়ির পেছনে উন্মাতাল দৌড়। নদীর কোল ঘেঁষে সবুজ বুনো ঝোপে ঝোপে পতঙ্গের খুনসুটি। একটি কি দু’টি ফুলও যায় ঝরে- টুপ করে ঘাসের কার্পেটে। আর যায় ভেসে ডিঙি নাও, বেদেনৌকোর বহর। বর্ষার ঘোর শরতেও থাকে লেগে। তারপর হেমন্তের রেশমি দুপুর এসে সেই লেগে থাকা বর্ষা ও শরতের রুপালি জলের চিবুকে রাখে তার রৌদ্রাঙ্কিত মরমি আঙুল। চার পাশে হেমন্তের এই হুলস্থূল করা আবেশ এই বাংলা ছাড়া আর কোথাও কি দেখা মেলে!
রাতে বনে-বাদাড়ে জোছনার ঘেরাটোপ ফুঁড়ে উড়ে যায় রাতভর নিশুতি পাখির ধূ-ধূ গা ছমছম করা ভুতুড়ে শব্দরাজি। তারপর ঝাপসা আকাশে খুব ভোরবেলা ছড়ায় হেমন্ত সোনামুখী রোদ। আর রোদের টাওয়েলে থাকে জড়িয়ে সেগুন, দেবদারু, শিরীষের গলার ভাঁজের মায়াবী শবনম।
প্রকৃতির নিয়মে শরতের সাদা মেঘের ভেলা উড়িয়ে হেমন্ত এসেছে। তবে এবার সঙ্গে এসেছে হিম হিম মৃদু কুয়াশা। পথে পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শিউলি ফুলের মোহনীয় সুবাস। হেমন্তের প্রথম ভাগে শরতের অনেক বৈশিষ্ট্য থাকে, তাই এই দুই ঋতুতেও বেশ মিল দেখা যায়।

সবুজ পাতার খামের ভেতর
শিশিরস্নাত সকাল, কাঁচাসোনা রোদমাখা স্নিগ্ধসৌম্য দুপুর, পাখির কলকাকলি-ভরা ভেজা সন্ধ্যা আর মেঘমুক্ত আকাশে জোছনা ডুবানো আলোকিত রাত হেমন্তকে যেন আরো রহস্যময় করে তোলে সবার চোখে, প্রকৃতিতে এনে দেয় ভিন্ন মাত্রা।
হেমন্তের মৌনতাকে ছাপিয়ে বাংলার মানুষের জীবনে নবান্ন প্রবেশ করে জাগরণের গান হয়ে, মানুষের জীবনে এনে দেয় সার্বজনীন উৎসবের ছোঁয়া। নবান্ন মানেই চারিদিকে পাকা ধানের ম ম গন্ধ, নতুন অন্ন, গ্রামের মাঠে মাঠে চলে ধান কাটার ধুম, হেমন্তে এই ফসল কাটাকে কেন্দ্র করেই ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্ন উৎসব। গৃহস্থবাড়িতে নতুন ধানে তৈরি পিঠাপুলির সুগন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়ায়। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে হেমন্তের এ শাশ্বত রূপ চিরকালীন।
ধান পেকে মাঠের পর মাঠ যেন সোনালি-হলুদ রঙে সেজে উঠেছে। চারিদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে পাকা ধানের ম ম গন্ধ। সেই সঙ্গে গ্রামগুলো হয়ে উঠছে স্বর্ণভাণ্ডার আর শস্যভাণ্ডার। কৃষকের মুখে দেখা দিচ্ছে এক অনাবিল সুখের হাসি।
গ্রামবাংলার মাঠে-ক্ষেতে চলবে আমন ধান কাটার মহোৎসব নবান্ন। যা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শস্যোৎসব। নবান্ন হলো নতুন আমন ধান কাটার পর সেই ধান থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব।
কৃষকের ঘরে এই সময় ফসলের মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে দেখা দেয় নানা অভাব, একটি হাতি ঠেলে নেয়া কঠিন হলেও আরো ভয়াবহ অভাবের মাস কার্তিক মাসকে মোকাবিলা করা, কিন্তু আড়ালে চলে মাঠে ক্ষেতে ফসল উৎপাদনের আয়োজন আর যা সুখ ও আনন্দের মুখ দেখায় নবান্ন উৎসবের মধ্য দিয়ে।
হেমন্তকালের প্রকৃতি আষাঢ়-শ্রাবণ কিংবা ভাদ্র মাসের মতো বৃষ্টি হওয়ার কথা নয়, কারো মন স্যাঁতস্যাঁতে থাকার কথা নয়। এ সময় ফসলে ফসলে ছড়িয়ে থাকে মাঠ-ঘাট-বন বাদাড়। সৃষ্টির সব জীবের মাঝে দেখা মেলে চঞ্চলতা, কলকাকলিতে মুখরিত থাকে আকাশ-বাতাস-প্রান্তর। শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষার মতো হেমন্ত তীব্র, প্রখর অথবা মুখরা নয়, তাই হেমন্তকে আলাদা করে দেখা যায় না, ম্লান, ধূসরিত আর অস্পষ্ট হেমন্তকাল শুধু অনুভবের। বসন্তের তীব্র ফুলের গন্ধ, পাখির গান অথবা গ্রীষ্মের খরতাপ, বৈশাখী ঝড় কিংবা বর্ষায় ভরা নদী-নালা, ঘনঘোর বরষায় দিনব্যাপী ঝমঝম বৃষ্টির মতো করে হেমন্ত জানান দেয় না আমি আছি, আমি এসেছি।
অপরদিকে হেমন্তের আবহাওয়া বলে দেয় শীতকাল আসন্ন। প্রাণিজগতেও তার বার্তা মিলছে। আর যে কারণে শীত বা তুষারপ্রবণ অঞ্চল থেকে দল বেঁধে ছুটে আসতে শুরু করেছে শীতের অতিথি পাখি কিছুটা উষ্ণতার আশায়। হেমন্তের অতিথি হয়ে শীতের ছোট-বড় পাখিরাও তাদের শীতকালীন আশ্রয় খুঁজে নিতে আসতে শুরু করেছে বাংলাদেশের ছোট-বড় বিল-জলাশয় আর দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তরে।
হেমন্তের প্রকৃতি সকালের সোনারঙা রোদ বাড়িয়ে দেয় বাংলার পথঘাট আর মাঠের উজ্জ্বলতা, গ্রামের মাঠে যতদূর চোখ যায় সোনালি ধান। লাউয়ের মাচায় লিকলিকে প্রতিটি ডগার খিলখিল হাসি, হাওর-বিলে অতিথি পাখিদের ডাকাডাকি আর ডানা ঝাপটানোর শব্দ। কুয়াশার ধূসর চাদর গায়ে হুট করে এক ভোরে দোরে হানা দেয় শীত। বাউলেরা রঙিন পোশাকে গান গেয়ে বেড়ায়। জুঁই, গোলাপ, শাপলা, বাগানবিলাসসহ অনেক ফুলের ভেতর দিয়ে প্রকৃতি প্রাণ ফিরে পায়। এ সময়ের নির্মল বাতাস প্রকৃতিকে আকর্ষণীয় করে তোলে।
গান, কবিতায় কত রঙ রূপেই না ধরা দেয় হেমন্ত। তবে হেমন্ত শুধু হেমন্ত নয়, হেমন্ত মানে শীতের আগমনীবার্তা। একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়ে, ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি। শহরে অতটা টের পাওয়া না গেলেও গ্রামে খুব চোখে পড়ে প্রকৃতির এ বদলে যাওয়া। গাছিরা এখন খেজুরগাছ পরিষ্কার করার কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। গ্রামবাংলার এই চিরচেনা রূপ হেমন্তের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
পথে পথে দমকা বাতাসে ভাসে হেমন্তের ধুলো। কিছু ফুলও থাকে পড়ে হেমন্তের নির্জন ব্যালকনিতে। কিছু ঝরাপাতা। কাঁঠালিচাঁপার গন্ধে যায় ডুবে সারাটা দুপুর। ঘুঘুডাকা নিঝুম বিকেল। সন্ধ্যার ঘন কালো আকাশ থেকে দু-একটা তারাও যায় খসে।
শিশির আর ধুলোডোবা পথে চাষি আর রাখালের গরুর পাল নিয়ে ক্ষেত আর মাঠে যাওয়ার যে দৃশ্য হেমন্তের রৌদ্রাঙ্কিত সকালের ক্যানভাসে ফুটে ওঠে, তা কেবল এই ষড়ঋতুময় বাংলাতেই প্রত্যক্ষ করা যায়। কার্তিক কিংবা অঘ্রাণের দুপুরে হেমন্ত যেরূপে আবির্ভূত হয়- অপরাহ্নে তার রূপটা যেন আরো মায়াবী মুগ্ধতায় স্ফুরিত হয়ে ওঠে। আর সন্ধ্যায় নারিকেল পাতার ঝালরের ফিনকি গলিয়ে হেমন্তের গোল-চাঁদের মণিরত্ন এসে ছড়িয়ে পড়ে এই মৃত্তিকায়, ঘাসে, পথের ধুলোয়। রাত যত গভীর হয়- হিম হিম মৃদু বাতাসের আঙুল যেন পিয়ানোর রিডের মতো মেঘশিরীষের সবুজ খাঁজকাটা পত্রপল্লবে তোলে এক অপূর্ব গুঞ্জরণ- সোনারঙ চাঁদের কিরণ আরো ঘন আর গাঢ় হয়ে নিসর্গকে রাঙিয়ে তোলে, যা শুধুই এই হেমন্তের রাত্রিকালেই অনুভব করা যায়।
আর নিশুতি রাতের গভীর স্তব্ধতা ছিন্ন করে দিয়ে ডেকে ওঠা পেঁচার ডাক, বাদুড়ের ডানা ঝাপটানির শব্দ গ্রাম বাংলার আদি হৈমন্তী আবহটাকেই ফুটিয়ে তোলে নিগূঢ়ভাবে।
একই অঙ্গে অনেক রূপের বর্ণ ধারণ করে হেমন্ত বাংলার গ্রামে গ্রামে যে রঙ ছড়িয়ে দেয় তার তুলনা কেবল হেমন্তের সঙ্গেই চলে।
উঠোনের এক পাশে ধানের আঁটির স্তূপ থেকে থোকা থোকা ধানের আঁটি খুলে ধান খসিয়ে নিয়ে রাতভর উনুনে সিদ্ধ করার যে দৃশ্যাবলি, কিষাণিদের অবিশ্রান্ত ব্যস্ততা আর নতুন ধানের ম ম গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে ওঠার নৈসর্গিক পরিবেশকে হেমন্তের এক অনাবিল অবগাহন ছাড়া অন্য কিছু কি বলা যায়! ধান শুকিয়ে ঢেঁকি অথবা কলে ভাঙানোর পর নতুন চালের সুমিষ্ট-স্নিগ্ধ ঘ্রাণ শরীরে মেখে ঘুরে বেড়ানো প্রতিটি প্রহরে বাংলার চিরন্তন প্রতিচ্ছায়াটা ঘুর ঘুর করে বেড়ায় যেন এই বাংলারই জল, হাওয়া আর মাটির মনোভূমে ।।

SHARE

Leave a Reply