Home প্রচ্ছদ রচনা ময়ূর নাচে পেখম মেলে -নুসাইবা মুমতাহিন

ময়ূর নাচে পেখম মেলে -নুসাইবা মুমতাহিন

প্রিয় বন্ধুরা! আজ তোমাদের পছন্দের একটি প্রাণী সম্পর্কে লিখব। প্রাণীটি তোমাদের পরিচিত। বিশাল রঙিন পেখমের জন্য এরা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। হ্যাঁ বন্ধুরা! আমি ময়ূরের কথা বলছি। রঙের বিন্যাস, সৌন্দর্য এবং চালচলনে আভিজাত্য ময়ূরকে সবার থেকে আলাদা করে। ময়ূর তাই আঁকা হয় ক্যানভাসে। এর কথা লেখা হয় কবিতায়। সুন্দর পালক স্থান পায় শখের সংগ্রহে। কিন্তু ময়ূরের সব সুন্দর শেষ হয়ে যায় তার কণ্ঠস্বরে।
শুধু পুরুষ ময়ূরকেই ইংরেজিতে বলা হয় পিকক। গোষ্ঠীগতভাবে এদের ইংরেজি নাম পিফল। নারী ময়ূরের নাম পিহেন। আর ময়ূর ছানাদের বলা হয় পি চিকস। ময়ূর পরিবারকে বলা হয় বেভি।
ময়ূর কিন্তু তার এই সুন্দর পেখম নিয়েই জন্মলাভ করে না। ৩ বছর বয়স পর্যন্ত পুরুষ ময়ূরের লেজ জন্মে না। এমনকি অনেক দিন পর্যন্ত এদের স্ত্রী ও পুরুষ হিসেবে আলাদাভাবে বোঝা যায় না।
ময়ূর এবং ময়ূরী দেখতে একদম একই রকম হয়ে থাকে। ৬ মাস বয়স থেকে ময়ূর রঙ বদলাতে শুরু করে। এশিয়ায় দুই প্রজাতির এবং আফ্রিকায় একটি ময়ূরের প্রজাতি দেখা যায়। এশিয়ার প্রজাতি দু’টি হলো নীল ময়ূর আর সবুজ ময়ূর।
নীল ময়ূর ভারতের জাতীয় পাখি। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে এদের দেখা যায়। পূর্বে বাংলাদেশে এরা বিস্তৃত থাকলেও এখন সম্ভবত বিলুপ্ত। সবুজ ময়ূর মিয়ানমার থেকে জাভা পর্যন্ত বিস্তৃত। আশঙ্কাজনক হারে বিশ্বব্যাপী কমে যাচ্ছে বলে এরা বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত। ঐতিহাসিকভাবে প্রজাতিটি মিয়ানমারের জাতীয় প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।
এসব ময়ূরের পাশাপাশি সাদা ময়ূরও দেখা যায়। এদের দেহ শুধু সাদাই নয়, চোখও নীল। প্রকৃতপক্ষে নীল ময়ূরই সাদা মযূর, জিনগত মিউটেশনের কারণে এদের এমনটি দেখায়। এবার আমরা জানব সবুজ ময়ূর সম্পর্কে।
ময়ূরের সব প্রজাতি সাধারণত বনে বাস করে এবং মাটিতে বাসা বাঁধে। তবে মাঝে মাঝে লোকালয়েও দেখা যায়। বিশেষ করে সংরক্ষিত এলাকায় এরা মানুষের খুব কাছে চলে আসে। এরা সর্বভুক। চারা গাছের অংশ, কীটপতঙ্গ, বীজের খোসা, ফুলের পাপড়ি এবং ছোট ছোট সন্ধিপদপ্রাণী খায়। এরা ডিম পাড়ে ও ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। ছোট বাচ্চাগুলো মুরগির বাচ্চার মতই মায়ের সাথে ঘুরে ঘুরে খাবার খায়। বিপদ দেখলেই মায়ের ডানার নিচে এসে লুকায়। ছোট বাচ্চারা মুরগির বাচ্চার মতই মায়ের পালকের আড়ালে, আবার কখনোবা পিঠের ওপর লাফিয়ে ওঠে।
সারা পৃথিবীতে এক বিশাল এলাকা জুড়ে সবুজ ময়ূরের আবাস। প্রায় ৯ লাখ ৯১ হাজার বর্গ কিলোমিটার। আবাসস্থল এত বিশাল হলেও পুরো এলাকাটির মাত্র অল্পসংখ্যক এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে এদের বিস্তৃতি রয়েছে। আবার বিগত কয়েক দশকে এদের সংখ্যা ভয়াবহভাবে হ্রাস পেয়েছে। একসময় এরা প্রচুর পরিমাণে থাকলেও সম্প্রতি এদের দেখতে পাওয়ার কোন সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ নেই।
সমগ্র পৃথিবীতে আনুমানিক ১০ হাজার থেকে ১৯ হাজার ৯৯৯টি পূর্ণবয়স্ক সবুজ ময়ূর রয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক-প্রাপ্তবয়স্ক সব মিলিয়ে মোট সবুজ ময়ূরের সংখ্যা আনুমানিক ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার।
এক সময় সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশজুড়ে সবুজ ময়ূরের অবাধ বিস্তার ছিল। বর্তমানে জীবিত ময়ূরের বড় অংশ কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও ভিয়েতনামের পশ্চিমাংশে বসবাস করে। বাকি সবুজ ময়ূরের বসবাস উত্তর ও পশ্চিম থাইল্যান্ড, দক্ষিণ লাওস, চীনের হাইনান প্রদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার জাভায়। ভারতের মনিপুর প্রদেশে কদাচিৎ এদের দেখা মেলে। এক সময় মিজোরামে এদের স্থায়ী আবাস হলেও এখন আর সেখানে এদের দেখা যায় না। বাংলাদেশে ১৯৪০ এর দশকেও সবুজ ময়ূর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিল। এখনও বান্দরবানের গহিন বনে সবুজ ময়ূর থাকতে পারে।
সবুজ ময়ূর দেখতে অনেকটা নীল ময়ূরের মতই, তবে শরীরে ঝলমলে সবুজ পালকের আধিক্য রয়েছে। এরা বেশ বড় আকারের ভূচর পাখি। পুরুষ ময়ূরের চেহারা ও আকার স্ত্রী পাখির থেকে কিছুটা আলাদা। পুরুষ ময়ূরের পিঠ ও ঘাড় সবুজ; ঘাড়, গলা ও বুকের পালক আঁশের মত উঁচু। পালকহীন মুখের চামড়া নীল ও হলুদে মেশানো। ডানা-ঢাকনি সবুজ রঙের। ডানার মধ্যভাগ ও গোড়ার পালক বাদামি; লেজের পেখমের প্রান্তে কালো চক্রের মধ্যে বেগুনি ফোঁটা দেখা যায়। দেহতলে সরু কালো ধাতব তামাটে, সবুজ ও বেগুনি দাগ থাকে। এমনিতে স্ত্রী ময়ূর বা ময়ূরীর চেহারা সামনে থেকে পুরুষ ময়ূরের মতই, তবে দেহের কিছু কিছু অংশ ফ্যাকাসে। পিঠ গাঢ় বাদামি বর্ণের। লেজ পেখমহীন। ডানা-ঢাকনি, পিঠের শেষভাগ ও কোমর কালচে বাদামি। লেজে পীতাভ, বাদামি ও কালো রঙের ডোরা আছে।
সবুজ ময়ূর সাধারণত ছোট দলে বিচরণ করে; এক একটি দলে একটিমাত্র পুরুষ ময়ূর ও তিন থেকে পাঁচটি ময়ূরী থাকে। বেশির ভাগ এলাকাতেই এরা লাজুক স্বভাবের এবং কাছে গেলেই লুকিয়ে পড়ে বা উড়ে যায়। তবে যেসব এলাকায় এদের তেমন একটা ক্ষতি করা হয় না, সেসব এলাকায় এরা মানুষের আশপাশে পোষা পাখির মত ঘুরে বেড়ায়।
সবুজ ময়ূরের খাদ্যতালিকাও বেশ মজার। এদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে বীজ, শস্যদানা, তৃণ, কচি উদ্ভিদের কাণ্ড, গাছের পাতা, ফুলের কলি, রসালো ফল ইত্যাদি। এছাড়া এরা ঘাসফড়িং, গুবরে-পোকা, মথ, ফড়িং, ঝিঁঝিঁ পোকাসহ বিভিন্ন জাতের পোকামাকড়, ব্যাঙ, গিরগিটি ও ছোট সাপ খায়। মটরশুঁটি আর মিষ্টি আলুর মৌসুমে এরা ক্ষেতে হানা দিয়ে ফসল সাবাড় করে। মাটি আঁচড়ে, ঝরা-পাতা উল্টে এরা বনতলে খাবার খুঁজে বেড়ায়।
জানুয়ারি থেকে মে এদের প্রধান প্রজননকাল। প্রজননকালে পুরুষ ময়ূরেরা কঠিনভাবে তাদের নিজ নিজ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিটি ময়ূর তার প্রতিবেশী ময়ূরের থেকে ১০০ থেকে ৪০০ মিটারের মত দূরত্ব বজায় রাখে। ময়ূরী একাই বাসা বানাবার জন্য জায়গা নির্ধারণ করে এবং ঘন ঝোপের নিচে মাটিতে বাসা করে। বাসা বানানো শেষে ৩-৮টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলোর বর্ণ পীতাভ। ২৬-২৮ দিন পর ডিম ফুটে ছানা বের হয়। ছানারা খুব কম বয়সেই উড়তে শিখে যায়। অপ্রাপ্তবয়স্করা মায়ের সাথে ঘুরে বেড়ায়। সাধারণত ময়ূর দুই বছরে এবং ময়ূরী এক বছরে বয়োপ্রাপ্ত হয়।
সবুজ ময়ূর খুব সরব পাখি। একটু শব্দ হলে বা বিশ্রামের সময়ে এরা ডেকে ওঠে। ফলে এরা শিকারির সহজ শিকারে পরিণত হয়। আবার বড়সড় আকার ও ঝলমলে পালকের জন্য এরা খুব সহজেই দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়। নির্বিচারে শিকারের ফলে দিন দিন এরা সংখ্যায় কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া বেআইনি ব্যবসা, আবাসস্থল ধ্বংস, বিচ্ছিন্ন বিস্তৃতি, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, রোগবালাই, পরিবেশ দূষণ ও কীটনাশকের অবাধ ব্যবহারের ফলে সারা বিশ্বে সবুজ ময়ূর আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। আমাদের উচিত এদের প্রতি যত্নশীল হওয়া। তবেইতো প্রকৃতি সমৃদ্ধি হবে তার অপার সৌন্দর্যে।

SHARE

Leave a Reply