Home ক্যারিয়ার গাইড লাইন সামাজিক সমস্যা থেকে নিজকে রক্ষা করতে হবে -ড. মুহা: রফিকুল...

সামাজিক সমস্যা থেকে নিজকে রক্ষা করতে হবে -ড. মুহা: রফিকুল ইসলাম

মানুষ মহান আল্লাহর সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব। এ সৃষ্টির সাথে আর কারো তুলনা চলে না। কিন্তু একজন মানুষ যখনই মানবসত্তাকে হারায়, তখন রক্ত, মাংস ও আকৃতিতে মানুষ থাকলেও সে অমানুষ হয়ে যায়। তখন আরেকজন মানুষ বলে, ‘এই মানুষের মত মানুষ হও’। কোন প্রাণীকে তো এমন বলা হয় না। যেমন- কোন গরুকে বলা হয় না, ‘গরুর মত গরু হও’। আবার ছাগলকে বিড়ালকেও বলা হয় না। কারণ, এ সকল প্রাণী তাদের নিজস্ব সত্তায় ঠিক থাকে, বিপত্তি মানুষের ক্ষেত্রে হয়। এ জন্য মানুষকে খুব সতর্কতার সাথে এবং সযতনে লালন পালন করতে হয়। তাদের জন্য প্রয়োজন হয় সুন্দর পরিবেশ এবং যথাযথ গাইডলাইন।
একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ হওয়ার জন্য অনেক অনেক বাধার পাহাড় অতিক্রম করতে হয়। অনেক সংগ্রাম করতে হয়। বিগত লেখনীতে সে বিষয়গুলো এসেছে। আজকের বিষয়টা একটু ভিন্ন হবে। এতদিন আমরা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নানা বিষয় মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা লাভ করেছি। আজ আমরা বলবো ক্যারিয়ার গঠনে সমাজ কিভাবে আমাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় সে ব্যাপারে। অর্থাৎ সামাজিক ব্যবস্থাপনায় চলমান নানামুখী পদ্ধতি ক্যারিয়ার গঠনের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। কী কী বিষয় আমাদের ক্যারিয়ার গঠনে থ্রেট হিসেবে কাজ করে তার দিকে নজর করি-

মাদক
উঠতি তরুণ-তরুণীরা অনেক সময় আড্ডার ছলে মাদক গ্রহণ করে। অনেকে বন্ধুদের সাহচর্যে বিড়ি-সিগারেটে দু-এক টান দিয়ে থাকে। আসলে এটাই তার হাতে খড়ি হয়ে গেল। সাবধান কখনও এই কাজ করবে না। কারণ এটাই সূচনা। যদি এটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারো, তাহলে তোমার জীবনে ধ্বংস অনিবার্য। তোমাকে এককভাবে দোষারোপ করাও ঠিক না। কারণ, তোমার বাবা, অথবা বড় ভাই অথবা প্রতিবেশী এটা করে। যা দেখে তুমি অনুপ্রাণিত হতে পারো। তথাপি তোমাদের সাবধান করছি দয়া করে ‘টেস্ট কেস’ হলেও ঐ কাজ করো না। কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি একবারের জন্য হলেও সাপের বিষ মুখে দিয়ে টেস্ট করবে? কখনও না। সে নিশ্চিত জানে এটা করলে তার মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু মাদক এর থেকেও ভয়ঙ্কর। কারণ, এতে এক ব্যক্তি মারা যায় না বরং একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। অতএব ফ্যাশন করে মাদক সেবন অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে।

পরীক্ষায় নকল
এটা আরেক মহামারী। ক্যানসার হলে একজন মারা যায়, প্লেগ রোগ হলে একটা গ্রাম বা অঞ্চল উজাড় হয়ে যায়। কিন্তু যদি ‘নকল করা’ রোগে পেয়ে বসে তাহলে জাতি ধ্বংস হয়ে যায়। তুমি বা তোমরা সে কাজ করবে? যদি প্রতিটি ছাত্রও করে তুমি করবে না। পারবে না? একটা গল্প বলি, আমরা যখন হোস্টেলে থাকি তখন এক বড় ভাই পরীক্ষা দিতে এসেছেন। তার শাশুড়ি তাকে পাঁচশত টাকা দিয়েছিলেন ভালো খাবার গ্রহণের জন্য, কিন্তু তিনি সমস্ত টাকা দিয়ে গাইড বই ছোট করে ফটো কপি করে এনে পরীক্ষার হলে বহন করতেন। এবং গর্ব করে বলতেন শাশুড়ি টাকা দিলেন এক কাজে ব্যয় করলাম আরেক কাজে! বন্ধুরা নকল নিয়ে এমন অনেক ঘটনা আছে যা সত্যিই দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। অতএব, খুব সিরিয়াসলি সিদ্ধান্ত নিতে হবে কখনই সামাজিক এ ব্যাধির সাথে নিজকে জড়ানো যাবে না।

প্রশ্নফাঁস
হাল সময়ের অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ। এ কাজ আমাদের জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। যারা এ কাজের সাথে জড়িত তারা দেশের শত্রু, তারা মানবতার শত্রু। যারা এ প্রক্রিয়ায় পড়াশুনা করে, সহযোগিতা করে, খোঁজার চেষ্টা করে, এর মাধ্যমে আয় করে, এর মাধ্যমে সার্টিফিকেট অর্জন করে তারা সবাই হারাম কাজে লিপ্ত। এমনকি একজন ছাত্র যদি এভাবে সফলতা লাভ করেও তার উপার্জন হারাম পরিগণিত হবে। সর্বোপরি সে খুব খারাপ কাজের পদ্ধতি চালু করলো। মৃত্যুর পরও তাকে এ গুনাহ বহন করতে হবে।
সুতরাং বন্ধুরা! তোমরা তো এ কাজ করবেই না এবং কেউ করতে এলে তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে। অথবা তাকে প্রশাসনের হাতে ধরিয়ে দিবে। আর যদি তোমার অভিভাবক চাপ প্রয়োগ করে তা হলে সরাসরি তাকে না করে দেবে এবং বলবে যদি কিছুই না পারি তাহলে আমি রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করবো কিন্তু এ ধরনের খারাপ কাজ করতে পারবো না।

অন্যের সাথে তুলনা দেয়া
বন্ধুরা অনেক সময় অভিভাবকগণ অন্যের সাথে তোমাকে তুলনা করতে পারেন। বিশেষ করে মাতা-পিতা, ভাই-বোন এ কাজ করেন। সে ক্ষেত্রে তোমরা মন খারাপ করবে না। কারণ, তারা তোমার কল্যাণ কামনা করেন বলেই এমনটা করেন। তবে কখনও কখনও পড়শি চাচা-চাচীরা তোমাদের পিতা-মাতাকে বলতে পারে, আহাদ আলীর ছেলে না পড়েও ভালো রেজাল্ট করেছে, আর তোমার ছেলে এত পড়েও কিছু করতে পারল না! অতএব পড়াশুনা বাদ দিয়ে তোমার কাজে সাহায্য করতে বলো। আসলে ওকে দিয়ে আর লেখাপড়া হবে না। এমন তুলনা অনেককে শুনতে হয়। এ অবস্থা তোমার জন্য খুবই কঠিন। হয়ত বলেই ফেললেন, হয়েছে আর লেখাপড়ার দরকার নেই অনেক করেছিস, এবার কাজে মন দাও। বন্ধুরা! তখনই তোমার বড় চ্যালেঞ্জ। তোমার উচিত আহত বাঘের মত মৃত্যুর আগে শেষ গর্জন করে ওঠা! অর্থাৎ শত বাধার মধ্যেও তোমার পড়ার সিদ্ধান্ত চালিয়ে যাওয়া।
কারণ, এখন তোমার জন্য বাধা কিন্তু সবচেয়ে আপন। অতএব এ তুলনা যখন এসে যাবে তখন তুমি মন খারাপ করবে না। বরং তোমার অদম্য আশা আকাক্সক্ষাকে আরো বেগবান করে তোমার স্টাডি নিয়মিত করবে। তুমি নিশ্চয়ই জান, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সা: জন্মের আগে এবং জন্মের খুব অল্প সময়ের মাঝে পিতা-মাতাকে হারিয়েও সকল বাধা পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সফল মহামানব হয়েছেন। মহান আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, যদি ধৈর্য সহকারে চেষ্টা করো এবং আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করো তাহলে সফলতা অনিবার্য।

নানা ফ্যাশন
বর্তমান সময়ে ফ্যাশনের রমরমা সময় যাচ্ছে। ‘সবাই যা করে আমারও তা করতে হবে’- এ দর্শন বাদ দিতে হবে। তোমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আসহাবে রাসূলের জীবনকথা সিরিজের লেখক প্রফেসর ড. আবদুল মা‘বুদ স্যারের নাম শুনে থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমি এখনও একটা জুতা বা জামা না ছিঁড়লে আরেকটি কিনি না। কারণ এটা তো ভালো আছে! ঈদ এসেছে তো কী হয়েছে! এটা ছেঁড়ার মতো হোক তারপর আরেকটা’। কল্পনা করা যায় বলো? আমাদের নৈতিকতা রক্ষার জন্য যারা বাতিঘর হিসেবে কাজ করেন তাদের মত উঁচু মানুষ যদি এমন হন তাহলে আমাদের কেমন হওয়া উচিত? প্রিয় ভাই বোনেরা! তোমরা অবশ্যই সারফেস চাকচিক্য বাদ দিয়ে পড়াশুনায় মনোযোগ দাও। একদিন ফ্যাশন হাউজগুলো ডেকে নিয়ে তোমাকেই মডেল বানাবে ইনশাআল্লাহ।

বিভিন্ন নাটক সিনেমা সিরিয়াল লোড নেয়া এবং দেখা
এখন আরো একটি সমস্যা ভালো ভাবেই সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। একসময় এমন ছিলো যখন ছেলেমেয়েরা টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে লাইব্রেরি থেকে বই ধার এনে পড়ত এবং শেষ করে তা জমা দিয়ে আরো একটি বই নিয়ে আসতো। আর এখন অনেক ছাত্র-ছাত্রী টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে মোবাইলে নানান সিরিয়িাল লোড করে আনে এবং তা দেখে, যা কোমলমতি ছাত্রদের চরিত্র নিঃশেষ করে দিচ্ছে। তোমরা কখনই এ পথে যেও না। গেলেই তোমার সব শেষ হয়ে যাবে। তোমার স্বপ্ন একেবারেই মাটি হয়ে যাবে। অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাবে। গুনাহ বাড়তে থাকবে, পাপী হতে হবে। সর্বোপরি তোমার ক্যারিয়ারকে ইতি টানতে হবে।

বন্ধুরা এগুলো ছাড়াও আরো সামাজিক যে সকল বাধা তোমাকে ক্যারিয়ার বিচ্যুত করতে পারে তা হচ্ছে
– ইভটিজিংয়ের মত খারাপ কাজের সাথে যুক্ত হওয়া,
– নোংরা রাজনৈতিক সাংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হওয়া,
– আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের সাথে নিজকে জড়ানো,
– সন্ত্রাস জাতীয় কোন কাজের সাথে যুক্ত হওয়া,
– অপরের অন্ধ অনুকরণ করে নিজে তেমনটা হওয়ার চেষ্টা করা,
– অতিরিক্ত রেজাল্ট ভাবনা করতে করতে রেজাল্ট ফোবিয়ায় আক্রান্ত হওয়া,
– অভাব অনটন থাকলেও সবসময় তার জন্য হাহুতাশ করে সময় নষ্ট করা,
– মোবাইল প্রীতি বা সবসময় মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুকের আসক্তিতে নিমজ্জিত হওয়া।
এ ধরনের অনেক সামাজিক ব্যাধি আছে সেগুলো থেকে বাইন বা বাম মাছের মত তোমাকে শরীর ও মনকে বাঁচিয়ে সামনে অগ্রসর হতে হবে। তাহলে সামাজিক সমস্যা তোমার ক্যারিয়ার গঠনে বাধা হবে না।
তোমরা কলিন পাওয়েলের বিখ্যাত উক্তিটা সব সময় মনে রাখবে : A dream does not became reality through magic, it takes sweat, determination and hard work.
বন্ধুরা এসো, এ সমাজের জঞ্জালগুলো তোমরা পরিষ্কার করে দাও, যারা তোমাদের বিপথে নিতে চায় তাদের চক্রান্তগুলো ব্যর্থ করে দাও। যারা তোমাদের মন্দ পথ দেখায়, তাদের সামনে আলোর মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে যাও.. তোমাদের এ চেষ্টার সাথে মহান আল্লাহকে সাথে রাখতে ভুলে যেয়ো না যেন!

SHARE

Leave a Reply