Home তোমাদের গল্প জেগে আছি -রিফাতুল ইসলাম মারুফ

জেগে আছি -রিফাতুল ইসলাম মারুফ

ক্রিং…, ক্রিং…, ক্রিং…। রিক্তদের মোবাইলে কল আসছে। সময় তখন রাত আড়াইটা। শান্ত রাত। গভীর ঘুমে নিমগ্ন সবই। শুধু জেগে আছে কিছু স্বপ্ন, কিছু বেঁচে থাকার ইচ্ছা, কিছু ভালোবাসা। রিং হওয়ার সাথে সাথেই ঘুম থেকে জেগে উঠল রিক্ত। এটা তার একটি ভালো অভ্যাস বলতে হবে। ঘুম ঘুম কণ্ঠে মোবাইল কানে দিয়ে,
-হ্যালো! কে?
-হ্যাঁ, রিক্ত আমি মর্তুজা বলছি।
– হ্যাঁ বল।
– তোর রক্তের প্রুপ অ+(াব) না?
রক্তের কথা শুনে ঘুম চলে গেল তার। পরিশ্রমী কণ্ঠে সে বলল- হ্যাঁ। কেন? কার লাগবে?
-আমার এক বোনের জন্য লাগবে। গ্রামের মানুষতো অত সচেতন নয়, আর দরিদ্র যে এখন রক্ত কেনাও অসম্ভব। এখন চট্টগ্রাম মেডিক্যালে আছে, তুই একটু আসতে পারবি? কোন সমস্যা হবে না তো?
– তুই কোন চিন্তা করিস না। আমি এক্ষুনি আসছি।
এই বলে ঐ পাশ থেকে কিছু বলার আগেই ও নিজে লাল বাটনটা ক্লিক করে দিল। বিছানা ছেড়ে মুখে একটু পানি ছিটিয়ে বাড়ির কারটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। রাস্তায় মাঝে মাঝে দু-একটা গাড়ি চলছে। জ্যোৎস্নায় তার আলোকিত পথ। মনের মাঝে এক অজানা খুশির জোয়ার বইছে। প্রথমবার রক্ত দিতে যাওয়ার একটা স্মৃতি মনে পড়ে যায়।
প্রথমবার রক্ত দিয়ে যখন বাসায় ফিরল, তখন বাসার কেউ জানে না রক্তদানের কথা। কিন্তু মায়ের কাছেতো কিছু লুকানো যায় না। মা এসে তাকে বলল,
-কী সমস্যা! শরীর খারাপ নাকি?
– না মা কিছু হয়নি।
– কিছু হয়নি মানে, আমি তো দেখছি কিছু হয়েছে।
একটু গর্বিত ভাব নিয়ে সে রক্তদানের কথা তার মাকে বলল। তখন মা কি যে বকেছিল তা বলার মতো নয়। বাবা তো উদ্ধত হয়েছিল মারার জন্য, শুধু অসুস্থ ভেবে আর মারেননি। এসব স্মৃতি মনে পড়লে তার এখন হাসি পায়। সে মনে করে বকা দেয়াটাই তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। সেদিন যদি কেউ কিছুই না করত সে ভাবত, ‘এটা বুঝি সাধারণ কাজ মা-বাবাকে খুশি করতে অসাধারণ কিছু করতে হবে।’ আর অসাধারণের পিছু ছুটতে গিয়ে সাধারণ থেকে ছিটকে পড়ত সে।
এসব ভাবতে ভাবতে সে মেডিক্যালে পৌঁছাল।
মেডিক্যাল মানে একটা নোংরা পরিবেশ, ঝঞ্ঝাটময়-কোলাহলপূর্ণ এলাকা। তবুও এখানে রোজ আসতে ভালো লাগে রিক্তের। কেউ জীবনের সাথে লড়াই করে, কেউ জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে হার মেনে নেয়। এসব দেখে বাস্তবতার সংজ্ঞাটা ভালো বুঝা যায়। জীবনের মর্মার্থ খুব কাছ থেকে দেখা যায়। এক অর্থে জীবন যে কত দামি আর অন্য অর্থে কত তুচ্ছ তা মেডিক্যালে এলে খুব ভালো বুঝা যায়।
মর্তুজার সাথে গিয়ে রক্ত দিয়ে এলো। নিজের শরীরের কিছু ভালোবাসার স্রোত অন্যজনের মাঝে প্রবাহিত হবে ভেবে খুব আনন্দ পায় সে। পৃথিবীর কী অপরূপ নিয়ম! তবে এতে গর্বের কিছুই নেই। আপনার কিছু অপ্রয়োজনীয় বস্তু অন্যকে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করলে, অন্যকে বাঁচানোই আপনার কর্তব্য।
রক্ত দিয়ে এসে মর্তুজার সাথে রোগীকে দেখতে গেল। রোগী দেখা একটা পুণ্যের কাজও। মা সবসময় রোগী দেখতে আগ্রহী ছিলেন। মা বলতেন, ‘রোগীকে দেখলে নাকি রোগী সাহস পায়। রোগী তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। যদি কেউ রোগীকে দেখতে না যায়, তাহলে সে ভাবে পৃথিবীতে তার আর জায়গা নেই। কেউ তাকে সহমর্মিতা না দেখালে সে মানসিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়ে।’ তাই সে প্রতিবার রক্ত দিতে এলে রোগীকেও দেখে যায়।
রোগীকে দেখে বুঝাই যাচ্ছে সে অত্যন্ত অসুস্থ। মুখে কথাও বলতে পারছে না, নড়াচড়াও করতে পারছে না। শুধু চোখে এদিক সেদিক দেখছে। তার চোখ নাড়ার ভঙ্গিতে বুঝা যাচ্ছে সে তাদের দেখে খুবই আনন্দিত। রোগীর আত্মীয়রাও অনেক খুশি হয়েছে তাদের দেখে। বিশেষ করে বয়স্ক মহিলাটি। তিনি মনে হয় রোগীর মা। তিনি তাদের নিজের সন্তানের মতো করে আশীর্বাদ করেছেন। তিনি যা আশীর্বাদ করেছেন রিক্তের জানামতে কেউ তাকে আজ অবধি এমন আশীর্বাদ করেনি। গ্রামীণ মানুষতো তাদের সব কিছু হারালেও ভালোবাসাটা হারায় না। তাদের কিছুই না থাকলেও তারা তাদের আন্তরিকতা দিয়ে মানুষের মন জয় করে নেয়। তাদের মুখের হাসি এতটাই মিষ্টি যে, যেন তারা বংশগতভাবে হাজার বছর ধরে সুখী। তাদের মুখের ভাষা এত মধুর যে, সহস্র চরণ গানের কথায়ও মনে এত খুশির বন্যা বইবে না।
তারা যখন চলে যাওয়ার জন্য উঠল তখন বয়স্ক মহিলা অবাক করে দিয়ে বলল, ‘অ বাপ! তোয়ারার তোন হষ্ট অয়ে না হন, এতন রাতিয়া এসত হয়িদি এতাল্লায়। ঝিওয়া মরি জারগয়তে ইতাল্লায় মগজ ঠিক নোয়াছিল দে, গোসসা নঁয়উ। তোয়ারারে কিছু হাবাইত নপেল্লাম।’ মর্তুজা হাসি মুখে বলল, ‘ইনি কি হন চাচী, আঁরারে সরম কিয়া দন? আরা ত কিছু হায়ত নআয়ঁয়ি, অনারারে চাইত এসসিদি।’ রিক্তও কি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এত আনন্দঘন মুহূর্তে সেও হেসে দিয়ে, ‘আন্টি! আমরা আপনাদের জন্য জেগে আছি!’

SHARE

Leave a Reply