Home খেলার চমক কিলিয়ান এমবাপ্পে ফুটবলের নতুন তারকা -আবু আবদুল্লাহ

কিলিয়ান এমবাপ্পে ফুটবলের নতুন তারকা -আবু আবদুল্লাহ

এই মুহূর্তে যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয়- আগামী কয়েক বছর ফুটবল বিশ্বে রাজত্ব করবে কারা? উত্তর হিসেবে যে কয়টি নাম আসবে তার মধ্যে সবার আগে কিলিয়ান এমবাপ্পের নাম থাকতেই হবে। ফরাসি ফুটবলের এই তরুণ সেনানী ফুটবল বিশ্বে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছেন এক-দেড় বছর আগেই, তবে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত এবারের বিশ্বকাপের পর সেটি এতটাই জোরালো হয়েছে যে, এখনই তাকে সেরা তারকা ভাবতে শুরু করেছেন অনেকে।
বয়স বিশ বছর হতে এখনো কয়েক মাস বাকি। বয়সের হিসেবে এখনো ‘টিনেজ’ বা তারুণ্যের কোটায়; কিন্তু ওই যে প্রবাদ আছে, ‘যে মুলোটা বাড়ে তা পত্তনেই বোঝা যায়!’ এমবাপ্পে তাই এই বয়সেই জানান দিয়েছেন নিজের দক্ষতার। দ্বিতীয়বারের মতো ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ে যে কয়জনের অগ্রণী ভূমিকা ছিলো- এমবাপ্পে তাদের একজন। ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) হয়ে গত মৌসুমে দারুণ খেলেছেন, তাই বিশ্বকাপে কেমন করেন সে দিকে দৃষ্টি ছিলো সবার। এমবাপ্পে সেই পরীক্ষায় পাস করেছেন গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েই। ২০ বছর পর দেশকে এনে দিয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্বকাপ, আর ফুটবল বিশ্বকে জানিয়েছেন যে, তিনি রাজত্ব করতেই এসেছেন। বিশ্বকাপের পরই রিয়াল মাদ্রিদসহ বেশ কয়েকটি বড় ক্লাব আগ্রহ দেখিয়েছে তাকে কিনতে, যদিও এমবাপ্পে আপাতত পিএসজিতেই থাকতে চান বলে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।
জিনেদিনে জিদান যেবার ফ্রান্সকে এনে দিয়েছিলেন প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা, সে বছরই জন্ম এমবাপ্পের। সেই এমবাপ্পের হাত ধরেই এতদিন পর আবার বিশ্বকাপ পেল দেশটি। জিদানের সাথে আরেকটি মিল আছে- তার মতো এমবাপ্পের শেকড়ও যে আলজেরিয়ায়! আলজেরীয় মুসলিম মা আর ক্যামেরুন থেকে আসা অভিবাসী বাবার সন্তান এমবাপ্পে। প্যারিসের উত্তরাংশের একটি অনুন্নত আর দরিদ্র মহল্লায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এলাকাটির নাম বন্ডি। নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত এলাকাটির বাসিন্দাদের রয়েছে নানা অভিযোগ। প্যারিসের বিখ্যাত প্রশস্ত সড়ক আর উন্নত জীবনের ছোঁয়া নেই এখানে। এলাকাটির বেকারত্বের মাত্রাও অনেক বেশি। এই শত সীমাবদ্ধতার মধ্যে বেড়ে ওঠা সত্ত্বেও এমবাপ্পে শৈশব থেকেই স্বপ্ন দেখতেন বড় ফুটবলার হওয়ার। আর সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য করেছেন প্রচুর পরিশ্রম। ছোটবেলায় তার বাড়ির দেয়ালে ঝুলানো থাকতো ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পোস্টার। সিআরসেভেনকে আদর্শ মেনেই এমবাপ্পে বড় হয়েছেন। মেধা আর পরিশ্রমের জোরে আজ তিনি রোনালদোর প্রতিদ্বন্দ্বী, রোনালদোকে জুভেন্টাসের কাছে বিক্রি করে দিয়ে এমবাপ্পেকেই কিনতে চেয়েছিলো রিয়াল মাদ্রিদ। স্বপ্নকে কিভাবে জয় করতে হয়, তার জীবন্ত উদাহরণ এমবাপ্পে।
১৯ বছর বয়স একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ারের কেবল সূচনা, আর এই বয়সেই এমবাপ্পে দলের হয়ে জয় করেছেন বিশ্বকাপ। কিংবদন্তি হতে গেলে যেসব অর্জন দরকার, তার মধ্যে একটি বিশ্বকাপ জয়। পেলে, ম্যারাডোনা, বেকেনবাওয়ার, জিদান সবার নামের সাথেই জুড়ে আছে বিশ্বকাপ জেতার কীর্তি। এমবাপ্পে তার ক্যারিয়ারের শুরুতেই সেই কাজটি সেরে রাখলেন। এবার শুধু অপেক্ষা ধারাবাহিকতা রক্ষা করে মাঠ দাপিয়ে বেড়ানোর। সবে তো শুরু! সামনে দীর্ঘ ক্যারিয়ার, ফুটবলবিশ্ব হয়তো তার মাধ্যমেই পেতে যাচ্ছে আরেকজন কিংবদন্তি।
এবারের বিশ্বকাপেই এমবাপ্পে ছুঁয়েছেন ফুটবল কিংবদন্তি পেলের দু’টি রেকর্ড। তরুণ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের এক ম্যাচে জোড়া গোল আর ফাইনাল ম্যাচে গোল করার কীর্তি পেলে গড়েছিলেন ৫৬ বছর আগে। এবার সেই রেকর্ডে পেলের পর দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন এমবাপ্পে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে জোড়া গোল আর ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ফাইনালেও করেছেন একটি গোল। দ্বিতীয় রাউন্ডের সেই ম্যাচে তো দারুণ খেলেও আর্জেন্টিনা হেরে গেছে এমবাপ্পের গতির কাছেই। চার মিনিটের ব্যবধানে এমবাপ্পের পরপর দুটো গোলই ম্যাচ থেকে ছিটকে দিয়েছে মেসিদের। সব মিলে বিশ্বকাপের ৭ ম্যাচে ৪ গোল করেছেন। মেসি, রোনালদো, নেইমার সবাইকে ছিটকে বিশ্বকাপটাকে নিজের করে নিয়েছেন এই তরুণ।
দুর্দান্ত গতি আর অসাধারণ ড্রিবলিং দক্ষতায় এমবাপ্পে নজর কেড়েছেন দর্শকদের। ফ্রান্সের ফুটবলের প্রধান শক্তি কাউন্টার অ্যাটাক। প্রতিপক্ষ যখন আক্রমণে উঠে আসে তখন বল কেড়ে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে তাদের ডিফেন্স গোছানোর কোন সুযোগ না দিয়ে গোল করে আসাই কাউন্টার অ্যাটাকের মূলনীতি। আর ফ্রান্সের কাউন্টার অ্যাটাকের মূল অস্ত্র এমবাপ্পে। কখনো আগেই দৌড়ে প্রতিপক্ষের গোল পোস্টের কাছে চলে যান সতীর্থদের কাছ থেকে পাস পাওয়ার আশায়, আবার কখনো নিজেই বল নিয়ে ভোঁদৌড়। তার গতির সাথে পেরে ওঠার মতো ডিফেন্ডার এখন ফুটবল বিশ্বে কমই আছে। সদা হাসি মুখের এই তরুণ বল পেলেই যেন হয়ে ওঠেন ‘নিষ্ঠুর’, চোখের পলকে ‘খুন’ করেন প্রতিপক্ষ দলকে। এমবাপ্পের দৌড়ের গতি দেখে অনেকেই তাকে বিশ্বসেরা দৌড়বিদ উসাইন বোল্টের সাথে তুলনা করেন।
এমবাপ্পের ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয়েছে বন্ডির ‘এএস বন্ডি ক্লাবে’। সে সময় এমবাপ্পের বাবা উইলফ্রেড ছিলেন ক্লাবটির কোচ। শৈশব থেকেই তার খেলায় ছিলো প্রতিভার ঝলক। ক্লাবটির আরেক কোচ অ্যান্তোনিও রিকার্ডি একবার বলেছিলেন, ‘আমি তাকে যখন কোচিং করাতে শুরু করি তখন তার বয়স মাত্র ছয় বছর। সে সময় অন্য সব শিশুর চেয়ে এমবাপ্পে অনেক এগিয়ে ছিলো। তার ড্রিবলিং ও গতি ছিলো অসাধারণ। ওই ক্লাবে ১৫ বছর কোচিং করিয়েছি, তার মতো এমন প্রতিভা আর দেখিনি।’
স্থানীয় ক্লাবে কয়েক বছর খেলার পর সুযোগ পান ফ্রান্সের জাতীয় ফুটবল অ্যাকাডেমি ক্লারিফন্টেইনে। অ্যাকাডেমিতে থাকা অবস্থায়ই রিয়াল মাদ্রিদ, চেলসি, লিভারপুল, বায়ার্ন মিউনিখ এমবাপ্পেকে প্রস্তাব দিয়েছিলো তাদের অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হতে। তবে কোথাও যাননি এমবাপ্পে। ২০১৪ সালে প্রথম ডাক পান ফ্রান্স অনূর্ধ্ব-১৭ দলে। ১৬ বছর বয়সে যোগ দেন ফ্রান্সেরই ক্লাব এএস মোনাকোতে। ২০১৫ সালে ফ্রান্সের পেশাদার লিগে তার অভিষেক হয় মোনাকোর হয়ে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ক্লাবটিকে প্রথমবারের মতো লিগ শিরোপা এনে দেন এমবাপ্পে। দুই মৌসুম খেলার পর গত বছরের আগস্টে ১৮ কোটি মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফিতে যোগ দেন ফ্রান্সের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেইতে। টাকার অঙ্কে সেটি ছিলো কোন তরুণ ফুটবলারের জন্য ইতিহাসে সর্বোচ্চ, আর সব মিলে ব্রাজিলীয় তারকা নেইমারের পর দ্বিতীয়। গত মৌসুমে দলটির হয়ে ২৭ ম্যাচে ১৩ গোল করেছেন এমবাপ্পে।
২০১৬ সালে ফ্রান্স অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে জিতেছেন ইউরো যুব চ্যাম্পিয়নশিপ। সে টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে জোড়া গোলসহ মোট ৫ গোল করেন এমবাপ্পে। ২০১৭ সালের মার্চে ফ্রান্স জাতীয় দলের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক সদা হাসিমুখের এই তরুণের। তখন বয়স মাত্র ১৮। অল্প কয়েকটি ম্যাচ খেলেই আস্থা অর্জন করেন কোচ দিদিয়ের দেশ্যমের। কোচ তার গায়েই তুলে দেন ১০ নম্বর জার্সিটি। এমন আনকোরা এক তরুণের গায়ে সবচেয়ে সম্মানের ১০ নম্বর জার্সি দেখে অনেকেই শুরুতে ভ্রু কুঁচকেছেন। তবে দেশ্যম যে রত্ন চিনতে ভুল করেননি তার প্রমাণ তো পাওয়াই গেল।
বন্ডির মানুষ আজ গর্ব করেন এমবাপ্পেকে নিয়ে। তারা বুঝতে শিখেছেন স্বপ্ন থাকলে তা কোন সীমাবদ্ধতাই মানবে না। একদিন ধরা দেবেই হাতে। এমবাপ্পের শৈশবের ক্লাব এএস বন্ডির কিশোর ফুটবলার ১৪ বছর বয়সী ইয়ানিস জ্যাঁ বলেন, ‘তিনি আমাদের এই মহল্লার সন্তান সেটা ভাবতে গর্ব হয়। আমি একদিন তার মতো হতে চাই।’ ১৭ বছর বয়সী লুতফি বিচারেফ বলেন, ‘কেউ যখন জিজ্ঞেস করে আমি কোন ক্লাবে খেলি- গর্বের সাথে বলি এএস বন্ডির নাম, কারণ এটি এমবাপ্পের ক্লাব। এক নামেই সবাই চেনে ক্লাবটিকে।

SHARE

Leave a Reply