Home দেশ-মহাদেশ পর্যটকদের পছন্দের দেশ ফ্রান্স -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

পর্যটকদের পছন্দের দেশ ফ্রান্স -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

ফ্রান্স বা ফরাসি প্রজাতন্ত্র ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। এটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতিগুলোর একটি। ফ্রান্স আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে; বিশ্বের প্রায় সর্বত্র এর প্রাক্তন উপনিবেশগুলো ছড়িয়ে আছে। আটলান্টিক মহাসাগর, ভূমধ্যসাগর, আল্পস পর্বতমালা ও পিরিনীয় পর্বতমালা বেষ্টিত ফ্রান্স বহুদিন ধরে উত্তর ও দক্ষিণ ইউরোপের মাঝে ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও ভাষিক সংযোগসূত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে।
সারাবিশ্বের ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে বেশি পছন্দের দেশ ফ্রান্স। জাতিসংঘের পর্যটন সংস্থার জরিপে উঠে আসে, ২০১২ সালে ৮ কোটিরও বেশি পর্যটক গেছে ফ্রান্সে। অথচ দেশটির মোট জনসংখ্যাই প্রায় ৭ কোটি। পর্যটকদের ৮৩ শতাংশই আসে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে। পর্যটন খাত থেকে ফ্রান্সের মোট জিডিপির প্রায় সাত শতাংশ আসে। যা দেশটির গাড়ি শিল্প খাত থেকে যে আয় হয় তার চেয়েও বেশি। আইফেল টাওয়ার ও লুভ মিউজিয়ামের দেশ ফ্রান্স তার এ আসন পাকাপোক্ত করে নিচ্ছে। রাজধানী প্যারিস ও এর আশপাশ এলাকা নিয়ে গঠিত ‘ইল দ্যু ফ্রান্স রেজিওন’ বিশ্বের সৌন্দর্যপিপাসু পর্যটকদের প্রথম পছন্দ তালিকায় রয়েছে।
ফ্রান্সের আয়তন ৬ লাখ ৪০ হাজার ৬৭৯ বর্গকিলোমিটার (২ লাখ ৪৭ হাজার ৩৬৮ বর্গ মাইল)। আয়তনের দিক থেকে ফ্রান্স ইউরোপের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র; রাশিয়া ও ইউক্রেনের পরেই এর স্থান। ফ্রান্সের জনসংখ্যা ৬ কোটি ৭১ লাখ ৮৬ হাজার ৬৩৮ জন। জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে ৯৩.৪ শতাংশ ফরাসি, ৬.২ শতাংশ বিদেশী এবং ৮.৯ শতাংশ বহিরাগত। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে খ্রিষ্টান ৫১ শতাংশ, অধার্মিক ৪০ শতাংশ, মুসলিম ৬ শতাংশ এবং অন্যান্য ৩ শতাংশ। আর জনসংখ্যার দিক থেকে এটি ইউরোপের চতুর্থ বৃহত্তম রাষ্ট্র। মূল ভূখণ্ডের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ফ্রান্সের দশটি উপনিবেশ আছে, যেগুলো বেশির ভাগই প্রাক্তন ফরাসি সাম্রাজ্য থেকে পাওয়া।
ফ্রান্স মোটামুটি ষড়ভুজাকৃতির। এর উত্তর-পূর্বে বেলজিয়াম ও লুক্সেমবুর্গ, পূর্বে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও ইতালি, দক্ষিণ-পশ্চিমে অ্যান্ডোরা ও স্পেন, উত্তর-পূর্বে ইংলিশ চ্যানেল, পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর, উত্তরে উত্তর সাগর এবং দক্ষিণ-পূর্বে ভূমধ্যসাগর।
বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো জাতি-রাষ্ট্রের মধ্যে অন্যতম ফ্রান্স। মধ্যযুগে ডিউক ও রাজপুত্রদের রাজ্যগুলো একত্র হয়ে একক শাসকের অধীনে এসে ফ্রান্স গঠিত হয়। বর্তমানে ফ্রান্স এর পঞ্চম প্রজাতন্ত্র পর্যায়ে রয়েছে। ১৯৫৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর এই প্রজাতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় প্রবণতার উত্থান এবং বেসরকারি খাতের উন্নয়ন এই নতুন ফ্রান্সের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম প্রধান সদস্য। ফ্রান্স জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য-দেশের একটি এবং এর ভেটো প্রদানের ক্ষমতা আছে।
ফ্রান্সের ভূপ্রকৃতি বিচিত্র। দেশটির উত্তরে উপকূলীয় নিম্নভূমি ও বিস্তৃত সমভূমি। দক্ষিণ-মধ্য ফ্রান্সে আছে পাহাড়ি উঁচুভূমি। আর পূর্বে আছে সবুজ উপত্যকা ও সুউচ্চ বরফাবৃত আল্পস পর্বতমালা। ফ্রান্সের সীমানার প্রায় সর্বত্রই পর্বতময়, ফলে কেবল উত্তর-পূর্বের বাব্য সে সীমান্ত বাদে দেশটির প্রায় সর্বত্রই একটি প্রাকৃতিক সীমানা নির্ধারিত হয়েছে। ফ্রান্সের প্রধান নদীগুলো হলো সেন, লোয়ার, গারন এবং রোন।
ফ্রান্স নগরভিত্তিক রাষ্ট্র। জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শহরে বাস করে। প্যারিস ফ্রান্সের রাজধানী ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর। ফ্রান্সের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল এই প্যারিসে প্রায় এক কোটি লোকের বাস। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। মধ্য-১৯ শতকে ব্যারন জর্জ ওজেনের সময় শহরটিকে বড় রাস্তা ও অন্যান্য পরিকল্পনামাফিক ঢেলে সাজানো হয়।
ফ্রান্সের অন্যান্য বড় শহরের মধ্যে আছে লিয়োঁ, যা উত্তর সাগর ও ভূমধ্যসাগরকে সংযোগকারী প্রাচীন রোন উপত্যকায় অবস্থিত। আরও আছে মার্সেই, ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অবস্থিত একটি বহুজাতিক সমুদ্রবন্দর; গ্রিক ও কার্থেজীয় বণিকেরা খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে এ শহরের পত্তন করে। নঁত আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত একটি গভীর পানির পোতাশ্রয় ও শিল্পকেন্দ্র। বর্দো গারন নদীর ওপর অবস্থিত দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের প্রধান শহর।
ফরাসিরা বিশ্বের সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান, ধনী ও সুশিক্ষিত জাতির একটি। দেশটিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজকল্যাণ ব্যবস্থা রয়েছে, যা প্রতিটি ফরাসি নাগরিকের ন্যূনতম জীবনের মান ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে। বেশির ভাগ ফরাসি নাগরিক ফরাসি ভাষায় কথা বলে। খ্রিষ্টধর্মের রোমান ক্যাথলিক ধারা এখানকার মানুষের প্রধান ধর্ম।
ফরাসি সংস্কৃতি জগদ্বিখ্যাত; শিল্পকলা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, দর্শন ও সমাজবিজ্ঞানের উন্নয়নে ও প্রসারে ফ্রান্সের সংস্কৃতি ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। মধ্যযুগ থেকেই প্যারিস পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। ফরাসি রান্না ও ফ্যাশন বিশ্বের সর্বত্র অনুসৃত হয়।
সরকারি ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও ফ্রান্স প্রভাব রেখেছে; ফ্রান্সই প্রথম বিশ্বকে ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র উপহার দেয়। ফরাসি বিপ্লবের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে বহু প্রজন্ম ধরে বিশ্বের অন্যত্র অনেক সংস্কারবাদী ও বিপ্লবী আন্দোলন ঘটে। ফ্রান্সে একক আধা- প্রেসিডেন্সিয়াল সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। ফ্রান্সে সিনেট ও জাতীয় পরিষদ নামে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট একটি পার্লামেন্ট রয়েছে।
ফ্রান্স ইউরোপের তৃতীয় বৃহত্তম ও বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। কৃষিদ্রব্য উৎপাদনে ফ্রান্স ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ; এটি মূলত খাদ্যশস্য, পনির ও অন্যান্য কৃষিদ্রব্য ইউরোপ ও সারা বিশ্বে রফতানি করে। ফ্রান্স ভারী শিল্পের দিক থেকেও বিশ্বের প্রথম সারির দেশ; এখানে মোটরযান, ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদন করা হয়। তবে ইদানীংকার দশকগুলোতে সেবামূলক শিল্প যেমন ব্যাংকিং, পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটন ফরাসি অর্থনীতিতে ব্যাপক ও প্রধান ভূমিকা রাখা শুরু করেছে। ফ্রান্সের মুদ্রার নাম ইউরো।
ফ্রান্সের জনপ্রিয় খেলাধুলার মধ্যে রয়েছে ফুটবল, জুডো, টেনিস, রাগবি ও পেতাঙ্কু। দেশটি ১৯৩৮ ও ১৯৯৮ সালে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজন করে। ফরাসি ফুটবল টিম ১৯৯৮ ও ২০১৮ সালে দু’বার ফিফা বিশ^কাপে চ্যাম্পিয়ন হয় এবং ২০০৬ সালে দ্বিতীয় বা রানার্স আপ হয়। ফ্রান্সের খ্যাতিমান ফুটবলার জিনেদিন জিদান তিনবার বর্ষসেরা ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার নির্বাচিত হন।
ফ্রান্স পশ্চিমা বিশ্বের প্রাচীনতম রাষ্ট্রগুলোর একটি। এর ইতিহাস সমৃদ্ধ ও বিচিত্র। ফ্রান্সের সর্বপ্রথম অধিবাসীদের সম্পর্কে তেমন বিশেষ কিছু জানা যায় না। দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের গুহায় পাওয়া ছবিগুলো প্রায় ১৫,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের বলে অনুমান করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতক থেকে কেল্টীয় ও অন্যান্য গোত্রের লোকেরা ফ্রান্সে প্রবেশ করে বসবাস করতে শুরু করে। প্রাচীনকালে ফ্রান্স অঞ্চল কেল্টীয় গল নামে পরিচিত ছিল। প্রাচীন রোমানরা খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে ফ্রান্সের দখল নেয় এবং খ্রিস্টীয় ৫ম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত অঞ্চলটি শাসন করে।
রোমের পতনের পর অনেকগুলো রাজবংশ ধারাবাহিকভাবে ফ্রান্স শাসন করে। মধ্যযুগে রাজতন্ত্রের প্রভাব খর্ব হয় এবং স্থানীয় শাসকভিত্তিক সামন্তবাদের উত্থান ঘটে। ১৪শ শতক থেকে ১৮শ শতক পর্যন্ত আবার রাজতন্ত্রের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়; এসময় ফ্রান্সের রাজারা ও তাদের মন্ত্রীরা ধীরে ধীরে একটি কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র ও বড় আকারের সামরিক বাহিনী গড়ে তোলে। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং এর পর বহু দশক ধরে ফ্রান্স রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত হয়। এ সত্ত্বেও নেপোলিয়ন বোনাপার্টের শাসনামলে ফ্রান্স একটি সংহত প্রশাসনিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
১৯শ শতকে ও ২০শ শতকের শুরুতে ফরাসি শক্তি ও আর্থিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। এসময় ফ্রান্স বিশ্বজুড়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী একটি সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রায় পুরোটাই ফ্রান্সের মাটিতে সংঘটিত হয় এবং এর ফলে দেশটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি উত্তর ফ্রান্স দখল করলে মধ্য ফ্রান্সের ভিশিতে একটি অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স তার ধূলিসাৎ অর্থনীতিকে আবার গড়ে তোলে এবং বিশ্বের একটি প্রধান শিল্পরাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ফ্রান্সের উপনিবেশগুলিতে সাম্রাজ্যবিরোধী আন্দোলন জেগে ওঠে এবং এর ফলে ফ্রান্স অচিরেই তার বেশির ভাগ উপনিবেশ হারায়।
১৯৫৮ সালে আলজেরিয়ায় ফরাসিবিরোধী আন্দোলন ফ্রান্সকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। এ সময় ফরাসি সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম ফরাসি নেতা শার্ল দ্য গোল-কে একনায়কের ক্ষমতা দান করে। দ্য গোল বিশ্ব রাজনৈতিক অঙ্গনে ফ্রান্সকে অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। সাম্প্রতিককালে ফ্রান্স জার্মানির সাথে একত্রে মিলে গোটা ইউরোপের অর্থনীতি ও রাজনীতির সমন্বয়ে প্রধান ভূমিকা রেখে চলেছে।

SHARE

Leave a Reply