Home প্রবন্ধ ত্যাগই আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় -শরীফ আবদুল গোফরান

ত্যাগই আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় -শরীফ আবদুল গোফরান

ত্যাগের মাধ্যমে বান্দার আনন্দের সুযোগ রয়েছে। মুমিন বান্দা ত্যাগের মাধ্যমে যে অনাবিল আনন্দ উপভোগ করে, যে ত্যাগ স্বীকার করে না, তার ভাগ্যে এ আনন্দ জোটে না। ত্যাগের মাধ্যমে মুমিন আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য লাভের সুযোগ পায়। আর এ পরম সুযোগই তো মানুষের কাম্য। আদম সন্তান মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে জন্মলাভের পর তার সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে কামিয়াব হওয়ার চাইতে আর কী আশা করতে পারে? এইতো তার পরম সাফল্য।
এই পরম সফলতার সৌভাগ্য যার, তার জন্যই ঈদের খুশি বা আনন্দ। সাফল্যের আনন্দ প্রকাশ করা উপলক্ষে যে উৎসব, তারই নাম দেয়া হয়েছে ঈদ। আর এই ঈদ তারই জন্য খুশির খবর নিয়ে আসে, যে ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের সুযোগ পায়।
যেহেতু মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহ তায়ালার হুকুমে নিজ পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করে যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন এর ফলে এই উৎসবের নাম হলো ঈদুল আজহা। ফলে নিজের প্রিয় জিনিসকে কোরবানি দানের আনন্দই এ উৎসবকে করে তোলে সার্থক।
ঈদের উৎসব আরো একটি কারণে আনন্দের উৎসব। ধনী-গরিব সবাই একত্রে মিলে ঈদের জামায়াতে শামিল হয় ও সালাত আদায় করে। পরস্পর ভাই ভাই বলে একে অপরকে আলিঙ্গন করে। মানুষে মানুষে যে ভেদাভেদ নেই, মানুষ ছোট থেকে বড় হোক, ধনী থেকে দরিদ্র হোক, সবাই যে সমান- একথার বাস্তবতা বোঝা যায় এ ঈদের দিনে। ঈদের দিন মুমিন বান্দা নিজের কোরবানির গোশত বিলিয়ে দিয়ে ধনী-গরিবের পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়। এভাবে সমাজের মানবতার এক মহাসম্মিলনের প্রক্রিয়া চলে। সে জন্যই বলা হয়েছে, ‘ঈদ কেবল মুত্তাকির জন্য। যারা এসবের কোনো কিছুই পালন করলো না, তার জন্য ঈদের আনন্দ কোথায়?’
ঈদের আনন্দ পূর্ণ করার জন্য গরিব-মিসকিন ও দরিদ্র পাড়া-প্রতিবেশীর প্রতি আমাদের সবার রয়েছে কর্তব্য। প্রতিবেশীদের ডেকে এনে আমাদের ঘরে খাওয়ানো, তাদের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য তাদের শিশুদের জন্য কিছু নতুন জামা-কাপড় কিনে দেয়া, তাদের ঘরে গোশত পৌঁছিয়ে দেয়া আমাদের সবার কর্তব্য। মনে রাখতে হবে- তাদের খুশি না করতে পারলে আল্লাহও খুশি হবেন না। তাহলে আমরা কোরবানির পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবো।
প্রিয়নবী (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের পরই ঈদুল আজহার উৎসব পালন শুরু হয়। হিজরত করে মহানবী (সা.) মদিনায় এসে দেখেন, মদিনাবাসীরা দু’টি উৎসব পালন করে থাকে। এর একটির নাম ‘নওরোজ’ আর একটি হলো ‘মিহিরজান’। উল্লেখিত উৎসব দু’টির রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণরূপে ইসলাম পরিপন্থী। শ্রেণীবৈষম্য, ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে কৃত্রিম পার্থক্য, ঐশ্বর্য, অহমিকা ও অশালীনতার পূর্ণ প্রকাশের অযাচিতরূপে দীপ্ত ছিল এ দু’টি উৎসব। তখন এ দু’টি উৎসব পালিত হতো ছয় দিনব্যাপী। এক পর্যায়ে এ উৎসব দু’টি পালন বিস্তৃততর পরিধিতে ব্যাপ্ত হয়ে পড়ে। এবার ছয় দিনের পরিবর্তে ৩০ দিন ধরে এই উৎসব উদযাপিত হতে থাকে। মহানবী (সা.) তাঁর অনুসারীদের বললেন, ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী কোনো কাজ করা যাবে না। আমরা এই দুই উৎসব পালন করবো আল্লাহকে খুশি করার জন্য। তাই তিনি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা পালনের অনুমতি দিলেন, তখন থেকেই মুসলমানরা এই দুই উৎসব পালন করে আসছে।
বাংলাদেশের ঈদ উৎসবের একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। তবে আজকাল পল্লীগাঁয়ের সেই রঙিন স্বপ্নে মোড়া উৎসব আর নেই। যা হারিয়ে যায় তা আগলে রাখা যায় না। বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে পরিবর্তন ঘটেছে সবকিছুর। পরিবর্তন ঘটেছে ঈদ উৎসবেরও।
একসময় আমি গ্রামে ছিলাম। পল্লী গাঁয়ে। ছেলেবেলায় যে ঈদ উৎসব উপভোগ করেছি, তা আজ কিছুতেই ভোলার নয়। গাঁয়ের প্রতিটি ঈদ আসতো এক একটা রূপকথার রাজ্যের পেণ্ডোরার বাক্স নিয়ে। ঈদ আসার সপ্তাহখানেক আগে থেকে আসন্ন ঈদের আবহে গাঁয়ের মানুষগুলো জেগে উঠতো। গাঁয়ের হাটগুলো সরগরম হয়ে উঠতো। সবার মুখে মুখে থাকতো, আজ ঈদের হাট। দুপুর থেকে হাটের উদ্দেশে রওনা করতো সবাই। ছোটরাও হাটে যেতে কান্নাকাটি করতো। বাবা বুঝিয়ে বলতেন, কাঁদিস না বাপ, বাজার থেকে বড় একটা লাল গরু আনবো। তারপর হাটে গিয়ে লাল রঙের বড় একটা গরু নিয়ে বাবা অন্যদের সঙ্গে একত্রে বাড়ি ফিরতেন। গভীর রাত পর্যন্ত ছোট-বড় সবাই জেগে থাকতেন। কোরবানির গরু দেখে সবার কী যে আনন্দ হতো।
ভোরে শোনা যেতো ঢাকের শব্দ। ঈদগাহে মালি এসে ঢাক বাজিয়ে জানান দিত, আজ ঈদগাহে নামাজ হবে। আমরা খুব ভোরেই উঠতাম। ফজরের নামাজ পড়ে গিয়ে বাজার থেকে আনা গরুটাকে গোসল করাতাম। তারপর নিজেরা গোসল করে জামাকাপড় পরে ঈদের মাঠে যাবার জন্য প্রস্তুত হতাম। তারপর খাওয়া-দাওয়া সেরে বড়দের সাথে ঈদের মাঠে রওনা হতাম। ঈদগাহে লোকজন আসতেই থাকতো। নামাজের আগে বিভিন্ন বক্তা কোরবানির তাৎপর্যের ওপর আলোচনা করতেন।
আমাদের ঈদগাহ মাঠটি ছিল খুব বড়। দশ-বার গ্রামের মানুষ একসাথে এই ঈদগাহে একত্রে নামাজ আদায় করতেন। অবশ্য এখন আর সেই বড় জামাত নেই। মানুষ বেড়ে গেছে। সাথে সাথে বেড়ে গেছে হিংসা-বিদ্বেষ। একটা ঈদের জামাত ভেঙে দশটা জামাত হয়েছে। এখন আর আগের মতো কয়েক গ্রামের মানুষ একত্রিত হয় না। একসাথে হাজার হাজার মানুষ ঈদের মাঠে জামাতে নামাজ আদায় করে না। এখন আর সবার সাথে সবার কুশল বিনিময় হয় না।
ঈদের আনন্দ তখন এমন ছিল যে, অনেক সময় পুরনো জটিলতারও মীমাংসা হয়ে যেতো। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে যেতো সবাই।
ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলি, মুরব্বিদের পায়ে হাত রেখে ছোটদের কদমবুসি ইত্যাদির প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। ঈদগাহ থেকে বাড়ি ফিরে এসেও কোলাকুলি কদমবুসি চলতো। সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া, হাসি-গল্প আনন্দ-ফুর্তিতে দিনটা কেটে যেতো। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করে সালাম জানিয়ে দোয়া কামনা করা হতো। আবার এ বাড়ি ও বাড়ি গোশতও বিলানো হতো। বিকেলে খোলা মাঠে প্রতিযোগিতামূলক খেলার আয়োজন করা হতো। এসব খেলাধুলার আয়োজন করতেন বড়রা। আবার তারাই বিচারক থাকতেন। গ্রামের বিশিষ্ট কোনো মুরব্বির হাত থেকে পুরস্কার নিতে হতো। গ্রামের শান্ত-শিষ্ট পরিবেশে ঈদ হলো ব্যতিক্রমধর্মী একটি দিন। গ্রামের ছোট-বড় সবাই এদিন বিপুল উৎসাহে মহা-আনন্দে উদ্দীপ্ত হতো।
আজ আর সেসব দিনের মতো গ্রামের অনাবিল আনন্দ উৎসবে ঈদ উদযাপন হয় না। সময়ের ব্যবধানে সবকিছুর পরিবর্তন হয়ে গেছে। সেই শৈশবের অবারিত আনন্দ, গ্রামীণ জীবনের ফেলে আসা ঈদের স্মৃতি এখনো মনে পড়ে, যা আর কোনোদিন ফিরে পাওয়ার নয়।

SHARE

Leave a Reply