Home দেশ-মহাদেশ পর্যটকদের ভ্রমণের আকর্ষণীয় স্থান বসনিয়া ও হারজেগোভিনা -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

পর্যটকদের ভ্রমণের আকর্ষণীয় স্থান বসনিয়া ও হারজেগোভিনা -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

বসনিয়া ও হারজেগোভিনা বলকান উপদ্বীপে অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি দেশ। দেশটি বসনিয়া-হারজেগোভিনা বা শুধু বসনিয়া নামেও পরিচিত। সারায়েভো দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। অন্যান্য বড় শহরের মধ্যে রয়েছে বানজা লুকা, বিহাক, বিজেলজিনা, তুজলা, জেনিকা ও মস্টার। এ দেশের সীমান্তে রয়েছে উত্তর ও পশ্চিমে ক্রোয়েশিয়া, পূর্বে সার্বিয়া, দক্ষিণ-পূর্বে মন্টেনেগ্রো এবং দক্ষিণে এড্রিয়াটিক সাগর। দেশটির নিয়াম শহর ঘিরে প্রায় ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) দীর্ঘ উপকূল রেখা রয়েছে। ভৌগোলিক দিক দিয়ে দেশটির মধ্য ও পূর্বাঞ্চলীয় অভ্যন্তরভাগ পর্বতময়, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল মোটামুটি পাহাড়ি এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল প্রধানত সমতল। অভ্যন্তরভাগ বসনিয়া ভৌগোলিকভাবে বড় অঞ্চল এবং এখানে সহনীয় মহাদেশীয় আবহাওয়া বিরাজ করে। এখানে গ্রীষ্মকাল গরম এবং শীতকাল ঠান্ডা ও তুষারময়। দক্ষিণ প্রান্ত হারজেগোভিনায় ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়া বিরাজ করে এবং সেখানকার ভূমি সমতল।
বসনিয়া ও হারজেগোভিনার আয়তন ৫১ হাজার ১২৯ বর্গকিলোমিটার (১৯ হাজার ৭৪১ বর্গমাইল)। জনসংখ্যা ৩৮ লাখ ৫৬ হাজার ১৮১ জন। জনসংখ্যার শতকরা ৫১ ভাগ মুসলিম এবং ৪৬ ভাগ খ্রিষ্টান। জাতীয় ভাষা বসনিয়ান, সার্বিয়ান ও ক্রোয়েশিয়ান। এদেশে তিনটি জাতিগত গ্রুপের লোক বাস করে। এই তিনটি গ্রুপের মধ্যে বসনীয়রা বৃহত্তম জনগোষ্ঠী (৫০.১১%), সার্বরা দ্বিতীয় (৩০.৭৮%) এবং ক্রোটরা তৃতীয় (১৫.৪৩%)।
বসনিয়া ও হারজেগোভিনায় ফেডারেল সংসদীয় সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। বসনিয়া ও হারজেগোভিনায় একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা রয়েছে : উচ্চকক্ষ গণপরিষদ এবং নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ। এ ছাড়াও রয়েছে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রেসিডেন্সি। প্রত্যেক প্রধান জাতিগত গ্রুপের একজন করে সদস্য নিয়ে প্রেসিডেন্সি গঠিত। বসনিয়া ও হারজেগোভিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাকির ইজেতবেগভিস ও প্রধানমন্ত্রী ডেভিস জভিজদিক। তবে এদেশে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা খুবই সীমিত, কেননা দেশটি বহুলাংশে বিকেন্দ্রীকৃত এবং দু’টি স্বায়ত্তশাসিত সত্তা নিয়ে গঠিত: বসনিয়া ও হারজেগোভিনা ফেডারেশন এবং রিপাবলিকা সরপস্কা। এ ছাড়াও তৃতীয় আরেকটি অঞ্চল বরকো জেলা স্থানীয় সরকার শাসিত। বসনিয়া ও হারজেগোভিনা ফেডারেশন স্বয়ং বেশ জটিল এবং ১০টি ক্যান্টনে বিভক্ত। এদেশের মুদ্রার নাম কনভার্টিবল মার্ক (বিএএম)।
বসনিয়া ও হারজেগোভিনায় উচ্চ সাক্ষরতার হার, গড় আয়ু এবং শিক্ষার মান বজায় রয়েছে। এই অঞ্চলে যেসব দেশে বেশি পরিমাণে পর্যটক আসেন বসনিয়া ও হারজেগোভিনা সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৯৫ ও ২০২০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ পর্যটন বৃদ্ধির হারের দিক দিয়ে বসনিয়া ও হারজেগোভিনা তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। বসনিয়া ও হারজেগোভিনা তার প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং ছয়টি ঐতিহাসিক সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, তার জনপ্রিয় খাবার, শীতকালীন ক্রীড়া, তার হৃদয়গ্রাহী ও অনন্য সঙ্গীত, স্থাপত্য ও তার উৎসবের জন্য সুপরিচিত। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে এগুলোর কয়েকটির ক্ষেত্রে বসনিয়া ও হারজেগোভিনা সেরা।
সারায়েভোসহ অন্যান্য অঞ্চল প্রচুর পর্যটককে আকর্ষণ করছে। পর্যটনশিল্প এদেশের আয়ের অন্যতম উৎস। একটি কৃত্রিম লেক ঘিরে ৬০টি ভিলা ও অ্যাপার্টমেন্ট, সুইমিং পুল, ‘হালাল’ সুপারমার্কেট আর একটি মসজিদ নিয়ে গড়ে উঠেছে বসনিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও উচ্চাভিলাষী আবাসিক প্রকল্প। নাম সারায়েভো রিসোর্ট। শুধু এটিই নয়, বলকান অঞ্চলের এ দেশটির রাজধানীর আশপাশের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে গড়ে উঠেছে এ রকম আরো অনেক নয়নাভিরাম আবাসিক এলাকা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের পর্যটকদের কাছে যা অত্যন্ত প্রিয় একটি জায়গা।
গ্রীষ্মকালে আরব দেশগুলোর গরম আবহাওয়া থেকে বাঁচতে এ অঞ্চলের ধনাঢ্য পর্যটকদের কাছে সবুজে ঘেরা সারায়েভো অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি পর্যটন স্পট। পাশাপাশি অন্যান্য দেশ থেকেও পর্যটকেরা এখানে আসেন বেড়াতে। ফলে ইউরোপের এ দেশটির পর্যটন শিল্প ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইসলামিক পরিবেশ ও বসনীয়দের আন্তরিকতার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের লোকেরা এখানে আসেন। তারা বরাবরই এখানে বেড়াতে আসতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
সারায়েভো রিসোর্ট নির্মাণের জন্য আড়াই কোটি ইউরো বিনিয়োগ করেছে একটি কুয়েতি কোম্পানি। বসনিয়ার মুসলিম রাজনৈতিক নেতা বাকির আইয়েতবেগোভিচ বলেন, বসনিয়া ইউরোপের একটি দেশ। এর আছে পানি, বন, খনি, জ্বালানি ও পর্যটন সম্ভাবনা। আমাদের আরব বন্ধুরা এ দিকটি বুঝতে পেরেছেন। বসনিয়ায় উপসাগরীয় বিনিয়োগ আকর্ষণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে বসনিয়া ব্যাংক ইন্টারন্যাশনাল (বিবিআই)। ইসলামী ব্যাংকিং নীতির ওপর ভিত্তি করে ২০০০ সালে এ ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
বসনিয়ার মুসলিম জনগণের কারণেই এখানে আরব বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়েছে। কোনো পর্যটক এখানকার রেস্টুরেন্টে খেতে চাইলে তাকে হালাল খাবার নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। নামাজের জন্য সর্বত্রই মসজিদ রয়েছে।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাজধানী সারায়েভো ১৪৬৩ খ্রিস্টাব্দে উসমানীয় সাম্রাজ্যের দখলভুক্ত হয়। তখন শহরের বিভিন্ন প্রান্তে কাঠ দিয়ে অতি মনোরম মসজিদ নির্মাণ করা হয়। তখনকার নির্মিত কিছু মসজিদ এখনও পরিলক্ষিত হয়। কাঠের নির্মিত এসব মসজিদ যদিও অনেক বড় নয় তবে মসজিদগুলো নির্মাণের জন্য অনুপম পদ্ধতির স্থাপত্যশৈলী ব্যবহার করা হয়। অনন্য ডিজাইনে নির্মিত এসব কাঠের মসজিদ পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সারায়েভো শহরের প্রাচীন এলাকাসমূহের রাস্তায় কাঠের নির্মিত এসব মসজিদে এখনো মুসলিমরা ইবাদত করেন এবং ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে আসছে। সারায়েভোয় কাঠের মসজিদ নির্মাণের পেছনে অনেক কাহিনী রয়েছে। অনেকে এটা মনে করেন যে, শহরটি উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর সেখানে বৃহৎ আকারের একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু মুসলমানের সংখ্যা অধিক হাওয়ার ফলে ঐ মসজিদে সবার জায়গা হতো না। এর ফলে শহরের মুসলিমরা একত্রিত হয়ে নিজ উদ্যোগে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে এসব কাঠের মসজিদ নির্মাণ করেন।
ষোড়শ শতকে সারায়েভোয় মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে একটি স্বর্ণযুগ ছিল। ঐ সময় সারায়েভোয় ৮টি বড় মসজিদ এবং ১১৮টি ছোট মসজিদ ছিল। উসমানীয় সাম্রাজ্যের পর অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় আমলে বিভিন্ন কারণে ২২টি মসজিদ ধ্বংস করা হয়, যা পরবর্তীতে শহরের স্থানীয় অধিবাসীরা সেগুলো সংস্কার করেন।
দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের জন্য একটি বলিষ্ঠ প্রার্থী এবং ২০১০ সালের এপ্রিল থেকে উত্তর আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (ন্যাটো) সদস্য প্রার্থী হয়ে আছে। দেশটি ২০০২ সাল থেকে ইউরোপ পরিষদের সদস্য হয়ে আছে এবং ২০০৮ সালের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠা থেকে ভূমধ্যসাগরীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
বসনিয়া পশ্চিম বলকানে অবস্থিত। দু’টি অঞ্চল বসনিয়া ও হারজেগোভিনা থেকে এদেশের নাম গৃহীত হয়েছে। বসনিয়া উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাজুড়ে অবস্থিত এবং গোটা দেশের প্রায় চার-পঞ্চমাংশ এবং হারজেগোভিনা দেশের অবশিষ্ট দক্ষিণ অংশজুড়ে অবস্থিত। দেশটি বহুলাংশে পর্বতময় এবং মধ্য ডিনারিক আল্পস ঘিরে অবস্থিত। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অংশ প্যাননোনিয়ান সমভূমিতে পৌঁছেছে, পক্ষান্তরে দক্ষিণে এর সীমান্তে রয়েছে এড্রিয়াটিক সাগর। ডিনারিক আল্পস দক্ষিণ-পূর্ব উত্তর-পশ্চিম দিকে চলে গেছে দক্ষিণে উচ্চতর অবস্থানে পৌঁছেছে। দেশটির সর্বোচ্চ স্থান মন্টেনেগ্রো সীমান্তে মাগলিক শৃঙ্গে অবস্থিত, যার উচ্চতা ২ হাজার ৩৮৬ মিটার। প্রধান পর্বতগুলোর মধ্যে রয়েছে কোজারা, গরমেস, ভøাসিক, কভরসনিকা, প্রেনজ, রোমানিজা, জাহোরিনা, বজেলাসনিসা ও ট্রেসকাভিসা। বসনিয়ার ডিনারিক পর্বত শ্রেণী চুনাপাথরের তৈরি। তবে এখানে লৌহ, কয়লা, দস্তা, ম্যাঙ্গানিজ, বক্সাইট, সীসা ও লবণের মজুদ রয়েছে।
বসনিয়া ও হারজেগোভিনার শতকরা ৫০ ভাগ বনজঙ্গলে আবৃৃত। বেশির ভাগ বন এলাকা বসনিয়ার মধ্য, পূর্ব ও পশ্চিম অংশে অবস্থিত। হারজেগোভিনায় শুষ্ক ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়া বিরাজ করে। উত্তর বসনিয়ায় সাভা নদী বরাবর উর্বর কৃষিভূমি রয়েছে এবং এখানে ব্যাপকভাবে চাষাবাদ হয়। এই কৃষিভূমি পার্শবর্তী ক্রোশিয়া ও সার্বিয়ার মধ্যে বিস্তৃত প্যাননোনিয়ান সমভূমির অংশ।
বসনিয়া ও হারজেগোভিনায় নব্যপ্রস্তর যুগ থেকে মানববসতি চলে আসছে। ঐ যুগে ও পরে এখানে কয়েকটি ইলিরিয়ান ও সেলটিক সভ্যতার জনগোষ্ঠী বসবাস করতো। সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক দিয়ে দেশটির সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। বর্তমান এলাকায় স্লাভিক জনগণ প্রথম বসতি স্থাপন করে ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে নবম শতাব্দী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। দ্বাদশ শতাব্দীতে ব্যানেট অব বসনিয়া প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা চতুর্দশ শতাব্দীতে বসনিয়া রাজ্যে পরিণত হয়। এরপর এটি উসমানীয় রাজ্যে কুক্ষিগত করা হয়, মধ্য-পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এই অঞ্চল উসমানীয় শাসনাধীনে থাকে। উসমানীয় আমলে এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশটির সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দৃশ্যপট বহুলাংশে বদলে যায়। এরপর অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য এটি কুক্ষিগত করে, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। আন্তযুদ্ধকালে বসনিয়া ও হারজেগোভিনা যুগোস্লাভিয়া রাজ্যের অংশ ছিল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাকে নবগঠিত সোস্যালিস্ট ফেডারেল রিপাবলিক যুগোস্লাভিয়ায় পূর্ণ রিপাবলিকের মর্যাদা দেয়া হয়। যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর ১৯৯২ সালে এই রিপাবলিকটি স্বাধীনতা ঘোষণা করে, এরপর বসনিয়া যুদ্ধ হয়, যা ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চলে।
বসনিয়ানরা প্রচুর রক্ত দিয়ে তাদের স্বাধীনতা রক্ষা করেছেন। সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞ ঘটেছিল স্রেব্রনিচায়। এই ছোট্ট গ্রামের ৮ হাজার নারী-শিশু আর বৃদ্ধকে হত্যা করেছিল সার্ববাহিনী। এরা সবাই ছিল মুসলিম। প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ বসনিয়াবাসীকে হত্যা করা হয়েছিল ওই যুদ্ধে। বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর ইউরোপে এমন ঘটনা ঘটবে তা ভাবা যায়নি। বিশ্বের পরাশক্তিও প্রায় দশ বছর এ অঞ্চলের গৃহযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছিল। যখন পদক্ষেপ নিয়েছিল ততক্ষণে ইউরোপের ইতিহাসে আরেকটি কলঙ্কিত অধ্যায় যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

SHARE

Leave a Reply