Home গল্প সিফাতের প্রার্থনা -শেখ বিপ্লব হোসেন

সিফাতের প্রার্থনা -শেখ বিপ্লব হোসেন

মুয়াজ্জিনের সুমধুর আজানের ধ্বনি শুনে মুমিন সাহেবের ঘুম ভেঙে গেল। তিনি আল্লাহু আকবার বলে বিছানায় উঠে বসলেন। স্ত্রীকে বললেন, “বেগম ওঠো! ফজরের সময় হয়ে গেছে।” স্বামীর ডাকাডাকিতে নূরজাহান বেগম বিছানা ছেড়ে উঠলেন। পাশেই তাদের আদরের ছেলে সিফাত ঘুমিয়েছিল। বাবা-মায়ের কথা শুনে তারও ঘুম ভেঙে গেল। সে ঘুমকাতর চোখে বলল, “আব্বু! তুমি কোথায় যাও?” মুমিন সাব বললেন, “বাবা, আমি মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছি। তুমি এখনই উঠলে কেন?” সিফাত চোখ ডলতে ডলতে বলল, “আব্বু! আমিও তোমার সাথে যাবো!” মুমিন সাব বললেন, “বেশ তো! তাহলে চলো!”
বাপ-ছেলে মিলে ভালো করে ওজু করে মসজিদে গেলেন। নামাজ শেষে মহান আল্লাহ্র কাছে পরিবারের সবার জন্য দোয়া করলেন। মসজিদ থেকে বেরিয়ে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ ধরে হাঁটছেন তিনি। নানান বিষয় নিয়ে বাপ-ছেলে গল্প চলছে। গল্পের একফাঁকে সিফাত বাবাকে জিজ্ঞাস করলো, আব্বু! নামাজ কেন পড়তে হয়?
তিনি বললেন, “বাবা, নামাজ আল্ল্হার আদেশ। আল্লাহ্ আমাদের সৃষ্টি করেছেন শুধু তাঁরই ইবাদতের জন্য। তাই নামাজ পড়তে হয়।
– আব্বু! নামাজ না পড়লে কী হয়?
– নামাজ না পড়লে আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদেরকে শাস্তি দেবেন। আল্লাহ্ নিজেই তা মহাগ্রন্থ আল কোরআনে বলেছেন।
– আব্বু! আল-কোরআন কী?
– আমাদের ধর্মীয় মহাগ্রন্থের নাম হচ্ছে আল-কোরআন।
-আব্বু! আল্লাহ্ কে? তাঁকে দেখতে কেমন?
– যিনি এই আসমান-জমিন, গাছ-পালা, তরুলতা, নদী-নালা, খাল-বিল, ঝর্ণা-পাহাড়, চাঁদ-সুরুজ, মানুষ, পশুপাখি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন- তিনিই আল্লাহ্। আল্লাহকে দেখা যায় না। তবে আল্লাহ বলেছেন যে, তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের সাথে জান্নাতে দেখা করবেন।
– আব্বু! আল্লাহর প্রিয়বান্দা কারা?
– যারা আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলে। কোনো খারাপ কাজ করে না। কাউকে কষ্ট দেয় না। কখনো কারো কোনো ক্ষতি করে না। তারাই আল্লাহর প্রিয়বান্দা।
– আব্বু! আমি যদি কাউকে কষ্ট না- দিই, তাহলে কি আমিও আল্লাহর প্রিয়বান্দা হবো?
– হ্যাঁ বাবা। তুমিও আল্লাহ্র প্রিয়বান্দা হবে।
বাবার কথা শুনে সিফাত খুব আনন্দিত। বাবার সাথে হাঁটতে হাঁটতে আবার নতুন গল্প শুরু করে সে।
সিফাত নার্সারিতে পড়ে। ছাত্র হিসেবে মন্দ নয়। ক্লাসের শিক্ষকরাও অনেক আদর-স্নেহ করেন তাকে। প্রতিদিনই বাবার সাথে স্কুলে যায় সিফাত। ঘাসফড়িং তার খুব প্রিয়। সুযোগ পেলেই সবুজ মাঠে ঘাসফড়িংয়ের সাথে খেলায় মেতে ওঠে। মাঝে মাঝে ঘাসফড়িং হয়ে নীল আকাশ উড়তে চায়। আকাশে সাদা-শুভ্র মেঘ দেখে তারও মন চায় মেঘ হয়ে মেঘের ভেলায় ভেসে বেড়াতে। পাখির কলকাকলিতে মন নেচে ওঠে তার। হাজারও প্রশ্ন করে বাবাকে জর্জরিত করে সিফাত। বাবা একটুও রাগ করেন না। তিনি ধৈর্যের সাথে তার প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করেন। দিনে দিনে মুমিন সাব ছেলের ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছেন।
আজ ছুটির দিন। মুমিন সাব বিছানায় শুয়ে আছেন। তার শরীরটা বেশি ভালো নেই। অফিসে কাজের প্রচুর চাপ। কয়েক দিন হলো তার গা ব্যথা করছে। শরীরে হালকা জ্বর বইছে। সে জন্য সিফাতকে নিয়ে আজ হাঁটতে বের হননি। নূরজাহান বেগম রান্নাঘরে সকালের নাশতা তৈরি করতে ব্যস্ত। অনেক ক্ষণ হয়ে গেল সিফাতের কোনো সাড়া নেই। নূরজাহান বেগম হাতের কাজ সেরে ছেলেকে খুঁজছেন। তাকে কোনো রুমেই পাওয়া গেল না। ছেলেটা কোথায় গেল কে জানে! ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না শুনে, মুমিন সাব বিছানা ছেড়ে উঠলেন। তিনি আশপাশের বাসায় খোঁজাখুঁজি করলেন। কিন্তু, সিফাতকে কোথাও পাওয়া গেল না। ছেলেকে না-পেয়ে নূরজাহান বেগম কান্নাকাটি করতে লাগলেন। মুমিন সাবও খুব চিন্তিত ছেলেকে নিয়ে। কারণ, সিফাত তো কখনো একা বাইরে যায় না। কোথায় যেতে পারে সে? ছেলের চিন্তায় মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো তার! ফোনে আপনজনদের জানানো হলো সিফাতকে পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই যে যার মতো খুঁজতে শুরু করলো শিশু সিফাতকে। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে কোথাও পাওয়া গেল না। ছেলেকে না-পাওয়ার বেদনায় মুমিন সাবের যেন চোখ ফেটে দু’ফোঁটা বৃষ্টি গড়িয়ে পড়লো মাটিতে। এখন কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। যখন সবাই হতাশ হয়ে বাসায় ফিরছিলেন, হঠাৎ একজনের দৃষ্টি গেল পাশের মসজিদে।
দ্যাখে, সিফাত ভেতরে বসে আছে। সবাই সিফাতের কাছে গেলেন। মুমিন সাব ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে দু’গালে দুটো চুমো দিয়ে বললেন, ‘বাবা, তুমি এখানে কী করছো? আমরা তো তোমাকে না পেয়ে দিশাহারা।
সিফাত বলল, ‘আব্বু! তুমিই তো বলেছিলে যদি কিছু চাও, তাহলে আল্লাহর কাছে চাও। আল্লাহ অনেক দয়ালু। তাই আল্লাহর কাছে চাইলাম।’ তিনি বললেন, ‘তুমি আল্লাহর কাছে কী চাইলে শুনি?’ সিফাত বলল, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন আম্মুর কাছে জানলাম তোমার খুব অসুখ করেছে, আমি সোজা চলে এলাম মসজিদে। আল্লাহকে বললাম, আল্লাহ! তুমি আমার বাবাকে ভালো করে দাও!’

SHARE

Leave a Reply