Home ক্যারিয়ার গাইড লাইন পারিবারিক বাধা পাড়ি দিতে হবে -ড. মুহা: রফিকুল ইসলাম

পারিবারিক বাধা পাড়ি দিতে হবে -ড. মুহা: রফিকুল ইসলাম

বন্ধুরা, আস্সালামু আলাইকুম। আশা করি তোমরা পবিত্র সিয়াম পালন এবং ঈদুল ফিতর ভালোভাবে উদযাপন করেছো। মহান স্রষ্টা আমাদের যে সুযোগ দিলেন সে জন্য তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একান্ত কর্তব্য। তোমরা সকলে এখন আবার ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে মনে হয়, ইস! ঈদটা যদি এখন হতো! তাই না? আসলে আনন্দের সময় খুব তাড়াতাড়ি চলে যায়, আর কষ্টের সময় বেশ দীর্ঘ মনে হয়। জীবনটা এমনই। একটা ঘটনার পর আরেকটা; এভাবে আমাদের আনন্দ-বেদনাগুলো আসে আবার চলে যায়।
বিগত বেশ কয়েক সংখ্যায় আমরা অনেক কথা আলোচনা করেছি। আজ আমরা ক্যারিয়ার গঠনের ক্ষেত্রে আমাদের সব থেকে নিরাপদ এবং সাপোর্টের জায়গা তথা পরিবার থেকে কী কী প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে সে ব্যাপারে কথা হবে, পাশাপাশি তা উত্তরণের কৌশল নিয়ে কিছু পরামর্শ থাকবে ইনশাআল্লাহ।
আব্বা-আম্মা, ভাই-বোন এবং আশপাশের সবকিছু নিয়ে আমাদের পরিবার। আমরা যে সব পরিবারে বেড়ে উঠি তার একেকটির প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য একেক রকম। একটির সাথে আরেকটির কোনো মিল নেই। যার ফলে আমরা সমাজের মানুষকেও নানারূপে দেখতে পাই। তবে এটা নিশ্চিত, যে মানুষ যেমন তার খোঁজ নিলে জানা যাবে, এর পেছনে তার পরিবারের ভূমিকা ছিলো। ছোট বাচ্চারা নরম কাদারমত, তাদের যা বানানো হয়, তারা সেটাই হয়। বন্ধুরা তোমরা একসাথে চলার সময় একেকজনকে একেকরকম দেখতে পাও তাই না? কেউ খুব হাসি-খুশি, কেউ খুব আড্ডাবাজ, কেউ কথায় কথায় মারমুখী, কেউবা অশ্লীলভাষী, কেউ কৃপণ, কেউবা খুব উদার। মানুষ এমন কেন হয়? কারণ, এর পেছনে পরিবারের খুব বড় ভূমিকা রয়েছে।
নীল নদের দেশ মিসরের একজন বিখ্যাত কবি হাফিজ ইবরাহিম। তিনি তার একটি কবিতার শিরোনাম দিয়েছেন- ‘হিদনুল উম্মাহাত হিয়াল মাদরাসাতু লিল বানিনা ওয়াল বানাত’ মায়ের কোল সন্তানদের শিক্ষালয়। সুতরাং বুঝতেই পারছো মা কর্তৃক প্রদত্ত শিক্ষা ছাড়া অর্থাৎ ভালো পারিবারিক শিক্ষা ছাড়া আমরা ভালো মানুষ হতে পারি না।
আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সা.কে শিশু অবস্থায় সা‘য়দ গোত্রে পাঠানে হয়েছিলো ভালো ভাষা শেখার জন্য এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য। কারণ এ ছাড়া মানুষ ভালো কিছু করতে পারে না। সুতরাং পরিবার এবং পারিবারিক বন্ধন ক্যারিয়ার গঠনের জন্য যেমন সহায়ক তেমন মাঝে মাঝে ক্যারিয়ারকে চ্যালেঞ্জেও ফেলতে পারে।

ক্যারিয়ার গঠনের ক্ষেত্রে পারিবারিক যেসব বিষয়গুলো খুব বেশি বাধাগ্রস্ত করে তা হচ্ছে
-পরিবারের সদস্যবৃন্দের অজ্ঞতা,
-পরিবারের কর্তার ইচ্ছা সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেয়া,
-আর্থিক কষ্ট সহ্য করার সাহস না করা,
-পরিবারকে সহযেগিতার নামে ক্যারিয়ার শেষ হওয়া,
-কঠিন পরিস্থিতিতে সাহস দেয়ার ব্যক্তি না থাকা,
-প্রতিবেশী ছেলে পড়ালেখা না করে বাবাকে সাহায্য করছে সুতরাং তুমিও করো,
-প্রতিবেশী প্রভাবশালী ব্যক্তি বলেন ‘চাকরির যা বাজার! এত লেখাপড়া করে লাভ কী, বরং কাজে লাগিয়ে দিন অর্থ উপার্জন করতে পারবে।
-পিতা-মাতার মাঝে দূরত্ব তৈরি হওয়া বা ডিভোর্স হয়ে যাওয়া,
-মাত্রাতিরিক্ত মায়া মমতা,
-প্রয়োজনের চাইতে অতি বেশি সুযোগ-সুবিধা লাভ করা,
-পরিবারের পক্ষ থেকে যথাসময়ে যথাযথভাবে অ্যাকাডেমিক নির্দেশনা দিতে না পারা,
-পরিবারের সদস্যগণ বাধা হয়ে দাঁড়ানো,
-আর্থিক অসচ্ছলতা,
-পরিবারের সদস্যদের অবাধ এবং অনৈতিক জীবন যাপন,
-ঘরের মানুষেরা অসৎপ্রবণ হওয়া,
-নানারকম আর্থিক অনিয়ম যেমন : সুদ, ঘুষের সাথে জড়িত থাকা, ভাই অথবা বোনের অধিকার ফাঁকি দেয়া, অন্যের জমি দখল করা ইত্যাদি,
-হারাম পথে অর্থোপার্জন এবং তা ভক্ষণ করা,
এসব কাজ যদি পারিবারিক পর্যায়ে চলমান থাকে তাহলে একজন ব্যক্তির ক্যারিয়ার গঠন খুব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।

এ অবস্থায় তোমার কী করণীয়?
তুমি তো অনেক ছোট তাই না? তার পরও তোমাকে এখানে অনেক কিছু করতে হবে। তা করতে পারলে তোমার সফলতা আসবেই ইনশাআল্লাহ। পরিবারের এ সকল বাধা তোমাকে পার হতেই হবে। যারা এমন বাধা পার হয়ে সফল হয়েছেন তার কিছু দৃষ্টান্ত নিম্নরূপ:
-জাহিলি যুগে যখন সবাই অন্যায় করতো, তখন নবী করিম সা. তা করেননি।
-পাথর বা মাটি বহনের সময় যখন অনেকেই পরিধানের কাপড় খুলে মাথায় বেঁধে নিতো, নবী করিম সা. তা করেননি
-রাসূল সা.-এর বয়স যখন ১৫ বা ১৬ বছর তখন চাচাদের সাথে যুদ্ধে গিয়েছেন কিন্তু বিপক্ষের যোদ্ধাদের প্রতি অন্যায় আঘাত করেননি।
-আমরা জানি, আবদুল কাদির জিলানী র. ডাকাতদের মুখোমুখি হয়েও তার কাছে থাকা অর্থের কথা স্বীকার করেছেন, কিন্তু মিথ্যা কথা বলেননি।
-নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত তৎকালীন কঠিন এবং প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও পড়াশুনা ছেড়ে দেননি।
-আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন কাঠুরিয়ার সন্তান হলেও তার প্রচেষ্টা এবং অধ্যয়নের ফলে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।
-বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ‘ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ এর অধ্যাপক অবিশ^াস্য দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়েও সফল হয়েছেন,
-অসংখ্য নবী জীবিকার জন্য মেষ বা ছাগল চরিয়েছেন,
-অসংখ্য নবী এবং সাহাবী ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে পেটে পাথর বেঁধেছেন অথবা কখনও অজ্ঞান হয়েছেন।
বন্ধুরা আমাদের পরিবারসমূহে ক্যারিয়ার গঠনে যে সব বাধা আছে এগুলো কি আগেরগুলোর থেকেও কঠিন? নাকি আমরা চেষ্টা করি না? হতে পারে পরিবারের এ সমস্যাগুলো খুবই প্রকট, যা তুমি সমাধান করতে পারছ না এবং পরিবারের বাবা অথবা মা অথবা অন্য কোন সদস্যকে গালমন্দ করে পড়াশুনা বন্ধ করে দিয়েছো। আচ্ছা তুমি যখন বাবা হবে, তোমার সন্তান কি একইভাবে তোমাকে গালমন্দ করবে না? অবশ্যই আরো বেশি করবে। অতএব তুমি হতোদ্যম হবে না, পরিবারের কোন অসুবিধা দেখে ভেঙে পড়বে না বরং উত্তরণের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করবে।

এ প্রতিকূল অবস্থায় যা করবে
ক.কখনও হতাশ এবং নিরাশ হয়ে থেমে যাবে না, কারণ, এটা মু’মিনের বৈশিষ্ট্য নয়।
খ.কাউকে দোষারোপ না করে সমস্যা সমাধানের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
গ.চেষ্টার ক্ষেত্রে কখনও হারাম এবং অবৈধ পথ অবলম্বন করবে না।
গ.মহান রবের কাছে সমস্যা সমাধানের জন্য সব সময় দোয়া করবে।
প্রিয় কিশোর ভাই ও বোনেরা, তোমরা যদি আত্মবিশ্বাসী হও, চেষ্টা করো তাহলে তুমি ছোট হলেও তুমিই হবে পরিবারের সফল ব্যক্তি এবং Change Maker.

SHARE

Leave a Reply