Home খেলার চমক বিদায় রাশিয়া দেখা হবে কাতারে -আবু আবদুল্লাহ

বিদায় রাশিয়া দেখা হবে কাতারে -আবু আবদুল্লাহ

শেষ হলো বিশ্বকাপ ফুটবলের ২১তম আসর। চার বছরের মতো দর্শক-সমর্থকদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসবে মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট দেশ কাতারে। আবার বিশ্ব মেতে উঠবে ফুটবল উৎসবে। এবার তোমাদের জানাব বিশ্বকাপের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
গণহত্যার প্রতিবাদ
শাকিরি-জাকার
গ্রুপ পর্বে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে গোল করার পর সুইজারল্যান্ডের ফরোয়ার্ড জাদরান শাকিরি ও গ্র্যান্ট জাকার উদযাপনের ভঙ্গি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গোল করার পর শাকিরি ও জাকা দুই হাত বুকের কাছে নিয়ে জোড়া ঈগলের ভঙ্গি করেন। এ ছাড়া ওই ম্যাচে শাকিরি যে বুট জোড়া ব্যবহার করেছিলেন তাতে বাম পায়েরটিতে ছিলো সুইজারল্যান্ডের পতাকা, আর ডান পায়েরটিতে কসোভোর।
শাকিরি ও জাকার এই উদযাপন ছিলো মূলত কসভোর মুসলিমদের ওপর সার্বিয়ার বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদ। দু’জনেরই জন্ম কসভোয়। কসভো এখন স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও এক সময় সেটি ছিলো সার্বিয়ার অংশ, তারো আগে ছিলো যুগোস্লাভিয়ার অংশ। ১৯৯২ যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যে ছয়টি রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিলো তার একটি সার্বিয়া। সার্বিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় কসভো এলাকাটি মুসলিম দেশ আলবেনিয়ার সীমান্তবর্তী। কসভোর অধিকাংশ জনসংখ্যাও আলবেনীয় মুসলিম। ১৯৯২ সালের যুদ্ধের সময় থেকেই কসভোর মুসলিমরা স্বাধীনতা চেয়েছে। এ কারণে তাদের ওপর ব্যাপক হত্যা ও নির্যাতন চালায় সার্বরা। এই যুদ্ধের সময় আরো অনেক বাসিন্দার মতো শাকিরি ও জাকার পরিবারও সুইজারল্যান্ডে চলে যায়। স্বাধীনতার দাবিতে কথা বলায় সাড়ে তিন বছর জেলও খেটেছেন জাকার বাবা। সার্ব বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে ১৯৯৯ কসভোয় অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটো। এর ফলে কসভো ছাড়তে বাধ্য হয় সার্বিয়ার বাহিনী। এরপর ২০০৮ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করে কসভো।
এখন সুইস ফুটবলের বড় তারকা হলেও নিজেদের শেকড় ভোলেননি জাকা বা শাকিরি। সার্বিয়ার বিপক্ষে গোল করে তাই ‘আলবেনিয়ান ঈগল’ উদযাপনের মাধ্যমে দুই যুগ আগের সেই গণহত্যার প্রতিবাদই জানালেন তারা। দু’জনই নিজেদের গোলের পরে দুই হাত দিয়ে বানিয়েছেন ‘জোড়া ঈগল’, যা কিনা আলবেনীয়দের ঐতিহ্য ও গৌরবের প্রতীক। এই দু’জনের গোলেই সেদিন সার্বিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়েছে সুইজারল্যান্ড।

সালাহকে নিয়ে রাজনীতি
বিশ্বকাপের সময় মিসরীয় সুপারস্টার মোহাম্মদ সালাহর ইমেজ কাজে লাগিয়ে মুসলিম বিশ্বে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা করেছেন চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট রমজান কাদিরভ। বিশ্বকাপে মিসর দলের বেস ক্যাম্প ছিল রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশ চেচনিয়ার রজাধানী গ্রোজনিতে। আর এই সুযোগটিই নিয়েছেন কাদিরভ।
রাশিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা পেতে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করে চেচেন মুসলিমরা। ১৯৯৩ সালে চেচনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এরপর রুশ বাহিনী চেচনিয়া আক্রমণ করলে রমজান কাদিরভের বাবা আখমদ কাদিরভ তার বাহিনী নিয়ে হাত মেলায় রুশদের সাথে। ফলে পরাজয় হয় চেচনিয়ার স্বাধীনতা যোদ্ধাদের। আখমাদ কাদিরভকে চেচনিয়ার প্রাদেশিক প্রেসিডেন্ট বানায় রাশিয়া। বাবার মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট হন রমজান। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে বিরোধী দলের লোকদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ আছে। সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, আর এসব অভিযোগ ঢেকে মুসলিম বিশ্বে নিজের সুনাম বৃদ্ধি করতেই সালাহর ইমেজ কাজে লাগাতে চান কাদিরভ। মিসর দলের অনুশীলনে গিয়ে সালাহকে সাথে নিয়ে পিতার নামে স্থাপিত স্টেডিয়াম পরিদর্শন করেন রমজান কাদিরভ। এরপর সালাহকে চেচনিয়ার সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেয়ারও ঘোষণা দেন।

জার্মানি, আর্জেন্টিনার বিদায়ে
রঙহীন বিশ্বকাপ
এবার যে কয়েকটি দলকে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ধরা হতো তাদের মধ্যে জার্মানির নাম ছিলো সবার ওপরে; কিন্তু মূল লড়াইয়ে এসে সেই চিরচেনা জার্মান ছন্দ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এক সময় জার্মানির লড়াইয়ের মূল শক্তি ছিলো মাঝমাঠ। বিশ্ব ফুটবলে মাইকেল বালাক, বাস্তিয়ান শোয়েনস্টাইগারের মতো মিডফিল্ডার দিয়েছে যে দলটি, তারাই এবার ভুগেছে মাঝমাঠে তারকা শূন্যতায়। মিরোস্লাভ ক্লোসার মতো স্ট্রাইকারও আর পায়নি চারবারের চ্যাম্পিয়নরা। ২০০২ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপ খেলে জার্মানির পক্ষে ১৬টি গোল করেছেন মিরোস্লাভ ক্লোসা। বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসেই তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতা। গত বিশ্বকাপ জেতার পর অবসরে যান দীর্ঘদিন জার্মানির হয়ে ১১ নম্বর জার্সি পরে খেলা এই স্ট্রাইকার; কিন্তু এবার তার জায়গায় কেউ খেলতে পারেনি দলের চাহিদা অনুযায়ী। যার ফলে তিন ম্যাচে জার্মানি গোল করেছে মাত্র দু’টি। হেরেছে মেক্সিকো ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ছোট দলের কাছে।
বিশ্বকাপে এক আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরের আসরে প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নেয়ার ঘটনা অবশ্য এটাই প্রথম নয়। তবে এই অঘটনের শিকার সবচেয়ে বেশি ইউরোপীয় দেশগুলোই। ১৯৯৮ সালের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স ২০০২ বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিয়েছে। ২০০৬ সালের চ্যাম্পিয়ন ইতালি ২০১০ সালে বিদায় নিয়েছে প্রথম রাউন্ড থেকে। ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন স্পেন ২০১৪ সালে বিদায় নিয়েছে প্রথম রাউন্ড থেকে। একটু পেছন ফিরে তাকালে এই তালিকায় আসবে ব্রাজিলের নাম। ১৯৬২তে কাপ জয়ী ব্রাজিল পরের বার বরণ করেছে একই পরিণতি। তালিকায় দুইবার আছে একমাত্র ইতালির নাম। ২০১০ সালের আগেও একবার তারা এই পরিণতি বরণ করেছিলো। সেটা ১৯৫০ সালে।
আর্জেন্টিনার খেলায়ও ছিলো না ফেবারিটের ছাপ। গ্রুপ পর্ব পার হয়েছে অনেক কষ্টে। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে না পারার কারণে দ্বিতীয় রাউন্ডে তাদের খেলতে হয়েছে আরেক ফেবারিট ফ্রান্সের বিপক্ষে। ফ্রান্সের গতি আর কাউন্টার অ্যাটাকের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারেনি মেসিরা। তাই দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রথম দিনই বাড়ি ফেরার টিকিট হাতে পায় লিওনেল মেসির দল। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার মেসির জন্য একটি আন্তর্জাতিক শিরোপার আক্ষেপ তাই আরো দীর্ঘ হলো। আরেক সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দলও বিদায় নিয়েছে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে। উরুগুয়ের কাছে হেরেছে দলটি।

এশিয়া আফ্রিকার হতাশা
এশিয়া থেকে একমাত্র দল হিসেবে দ্বিতীয় রাউন্ডে গিয়েছে জাপান। আফ্রিকার সব দেশ বিদায় নিয়েছে প্রথম রাউন্ড থেকে। একই গ্রুপে জাপান ও সেনেগালের পয়েন্ট ও গোল সংখ্যা ছিলো সমান। এরপর হলুদ কার্ড বেশি পাওয়ার জন্য বিদায় নিতে হয় সেনেগালকে। এই পদ্ধতিটিকে বলা হয় ‘ফেয়ার প্লে’, অর্থাৎ যারা পরিচ্ছন্ন ফুটবল খেলেছে। এছাড়া আফ্রিকার দলগুলোর মধ্যে হতাশ করেছে মিসর। মোহাম্মদ সালাহর জন্য প্রথম বিশ্বকাপটা তাই হতাশাই হয়ে রইলো। মরক্কো ও তিউনিসিয়া ভালো ফুটবল খেললেও শক্ত গ্রুপে পড়ার কারণে পেরে ওঠেনি। নাইজেরিয়াও আশা জাগিয়ে শেষ ম্যাচে হেরে গেছে আর্জেন্টিনার কাছে। এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে সৌদি আরব শেষ ম্যাচে মিসরকে হারালেও তাদের খেলা দর্শকদের মন কাড়তে পারেনি। তার ওপর উদ্বোধনী ম্যাচে রাশিয়ার বিপক্ষে হেরেছে ৫-০ গোলের ব্যবধানে। দক্ষিণ কোরিয়া নিজেরা দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে না পারলেও শেষ ম্যাচে জার্মানির হাতে দেশে ফেরার টিকিট ধরিয়ে দিয়েছে ২-০ গোলে হারিয়ে।

আলোচিত ভিএআর
এবারের বিশ্বকাপের আরেকটি আলোচিত চরিত্র ছিলো ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর। ভিডিও প্রযুক্তির সহায়তায় ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য এই প্রযুক্তিটি ব্যবহার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই প্রথম এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। বিষয়টি অনেকটা ক্রিকেটের থার্ড আম্পায়ারের মতো। মাঠে ৩২টি বিশেষ ক্যামেরার মাধ্যমে বিভিন্ন স্থান থেকে খেলা ধারণ করা হতো। কোন বিষয়ে রেফারির সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে শরণাপন্ন হতেন ভিএআর পদ্ধতির। এক্ষেত্রে দু’ভাবে আসতো সিদ্ধান্ত, কন্ট্রোল রুমে বসা চতুর্থ রেফারি ভিডিওতে দেখে ফিল্ড রেফারিকে জানাতেন, অথবা মাঠের পাশে রাখা মনিটরের কাছে গিয়ে ভিডিও দেখে রেফারি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতেন।
গোলের বিশ্বকাপ

উদ্বোধনী ম্যাচে সৌদি আরবের জালে পাঁচ গোল দিয়েছে স্বাগতিক রাশিয়া। সেই শুরু এরপর বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই ছিলো গোলের ধারা। শুধুমাত্র প্রথম রাউন্ডের ম্যাচগুলোতেই গোল হয়েছে ১২২টি। আবার দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রথম দুই ম্যাচেই গোল হয়েছে ১০টি। এত গোল সাম্প্রতিক সময়ে আর কোন বিশ্বকাপে দেখা যায়নি। প্রথম রাউন্ডে শুধুমাত্র একটি ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হয়েছে। আর সব ম্যাচেই এক বা একাধিকবার জাল স্পর্শ করেছে বল। এত গোল হওয়ার আরেকটি কারণ ছিলো ভিএআর। এই পদ্ধতির কারণে অনেক ম্যাচেই পেনাল্টি হয়েছে। পেনাল্টি থেকে হয়েছে গোল।
গোল করার ক্ষেত্রে স্ট্রাইকারদের লড়াই ছিলো দেখার মতো। প্রথম দুই ম্যাচেই হ্যাটট্রিকসহ পাঁচ গোল করেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেন। প্রথম দুই ম্যাচে পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এক হ্যাটট্রিকসহ করেন চার গোল। বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকুও করেন চার গোল। অথচ ২০১৪ বিশ্বকাপের পুরো টুর্নামেন্টেই ছয় গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন কলম্বিয়ার হামেস রড্রিগেজ। ২০০৬ বিশ্বকাপেও মাত্র পাঁচ গোল করে সেরা গোলদাতার পুরস্কার গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা। সেখানে এবার প্রথম রাউন্ডেই পাঁচ গোল করেছেন হ্যারি কেন।

SHARE

Leave a Reply