Home গল্প ম্যাগনেটিক স্টোন -মুজাহিদুল ইসলাম সৌরভ

ম্যাগনেটিক স্টোন -মুজাহিদুল ইসলাম সৌরভ

জানুয়ারি মাস। তীব্র শীত থাকলেও অন্য দিনের তুলনায় আজ কুয়াশা নেই বললেই চলে। ক্লাস রুমে আনমনা হয়ে বসে আছে ফাহিম। জানালা দিয়ে বাইরের প্রকৃতি দেখছে। হঠাৎ কাঁধে হাতের স্পর্শ পেয়ে ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এলো। তাকিয়ে দেখলো এমি দাঁড়িয়ে আছে। মুখে চিরচেনা সেই হাসি।
কলেজে শীতকালীন ছুটি ঘোষণা করেছে জানো কি? জিজ্ঞেস করলো এমি।
ফাহিমের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কয়দিনের ছুটি?
দশ দিন, উত্তর দিল এমি।
তাহলে তো আমরা এই ছুটিতে বাহিরে কোথাও কাটিয়ে আসতে পারি তাই না? বললো ফাহিম।
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে এমি বললো, তা কোথায় যাওয়ার প্ল্যান করছো মিস্টার ফাহিম?
বান্দরবান গেলে মন্দ হয় না। সেদিন ওরা ক্লাসে বন্ধুদের সাথে মিটিং সারলো। অবশেষে ফাহিম, এমি, রিফাত, এনাম, বেলাল এবং ফারুক যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করলো।
ফাহিম একজন খুদে গোয়েন্দা। ইতঃপূর্বে সে বিভিন্ন জটিল রহস্যের সমাধান করেছে। প্রতিক্ষেত্রেই এমি, রিফাত এবং এনামকে পাশে পেয়েছে। এবার যোগ দিয়েছে জুডো মাস্টার বেলাল এবং অতিকায় ক্ষুদ্র ফারুক।
দিন ঠিক হলো ১০ জানুয়ারি। সকাল ৯টার দিকে রাজশাহী হতে পাজেরো গাড়িতে করে তারা চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলো। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের সাউদিয়া হোটেলে সিট বুকিং করে রেখেছিল এনাম। হোটেলে পৌঁছতে প্রায় রাত তিনটা বেজে গেল। সারাদেশে শীতের তীব্রতা খুব বেশি হলেও চট্টগ্রামে সে তুলনায় অনেকটাই কম। রাতটা কোনরকম কাটিয়ে দিয়ে সকাল আটটায় নাশতা সেরে তারা বান্দরবানের উদ্দেশে রওনা দিল।
শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে, হাই তুলতে গিয়ে বললো রিফাত। সারারাত জার্নি করে শেষ রাতে একটু ঘুম, এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়, যোগ করলো এমি।
ফাহিম ড্রাইভারের পাশে বসেছে। ইতোমধ্যে ওদের কালো রঙের পাজেরোটি চট্টগ্রাম শহর পেরিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলে ঢুকে পড়েছে।
পিছনে সহযাত্রীদের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল ফাহিম। দেখতে পেল রিফাত এবং ফারুক নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। জানালার গ্লাস নামিয়ে দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলো।
প্রকৃতির অপার লীলাভূমি দেখে আনমনেই সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা করলো। কত সুন্দর সৃষ্টি!
ফাহিমের কথা শুনে ড্রাইভার বললো, আর কিছু পথ গেলে উঁচু উঁচু পাহাড় দেখতে পাবেন। পথ কমানোর জন্য ড্রাইভার মূল রোড ছেড়ে শর্টকাট রোড অনুসরণ করলো। এতক্ষণ কোন সমস্যা হয়নি। তবে এখানকার রাস্তাগুলো খানাখন্দে ভরপুর, বেশ সরু এবং ভয়ঙ্কর বাঁকসমৃদ্ধ। কখনো উঁচু কখনো বা অনেক নিচু।
একপাশে সুবিশাল পাহাড়ের গা কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। অন্যপাশে শত শত ফুট গভীর গিরিখাত। রাস্তা খারাপ হওয়ায় ঝাঁকুনিতে রিফাত এবং ফারুকের ঘুম ভেঙে গেল।
তারাও উপভোগ করতে লাগলো প্রকৃতির সৌন্দর্য। উঁচু উঁচু সুবিশাল পাহাড় দেখে রীতিমত হৈ চৈ শুরু করে দিল। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি ঢাল বেয়ে তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে ওদের কালো পাজেরোটি। সামনের পাহাড়টি বেশ উঁচু, বললো ড্রাইভার।
কিছু পথ অতিক্রমের পথ ড্রাইভার গাড়ির গতি পরিবর্তন করতে গিয়ে পড়লো বিপদে। ইঞ্জিন আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। আচমকা গাড়ি পিছনে আসতে শুরু করলো। এনাম চেঁচিয়ে বললো, ব্রেক করেন। কিন্তু ড্রাইভার সেদিকে কান দিলো না। কারণ, এতটা খাড়া উঁচুতে ব্রেক করলে নিশ্চিত উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি চাইলেন গাড়িটাকে কোনভাবে পাহাড়ে ঢালে আটকানো যায় কিনা। চেষ্টা ব্যর্থ হলো। ততক্ষণে গাড়ি অনেকটাই নিচে নেমে এসেছে। হঠাৎ পেছনে চোখে পড়লো বড় ধরনের একটা বাঁক। বাঁকের শেষপ্রান্ত শত ফুট গভীর গিরিখাত। চাইলেও আর বাঁচা সম্ভব নয়। তাহলে কি এই সুবিশাল পাহাড়ের গিরিখাতে তাদের সমাধি রচিত হবে?
বাঁকে আসতে আর কয়েক গজ দূরে। দরজা খুলে লাফ দাও, চিৎকার করে উঠলো ফাহিম। হুমড়ি খেয়ে পড়লো রাস্তার ওপর। খানিকটা ব্যথা পেয়েছে ফাহিম। ড্রাইভার কই? সবাই তাকাচ্ছে এদিক ওদিক। না কোথাও নেই! তাহলে কি সেও গাড়ির সাথে নিচে? বুক কেঁপে উঠলো ফাহিমের। গিরিখাতের পাশে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। আশ্চর্য হয়ে তারা দেখলো গাড়িটা নিচে পড়ার সাথে সাথেই হাওয়ায় মিশে গেল। পড়ার শব্দ হলো না, আগুনও জ্বলতে দেখলো না। ব্যাপারটা রহস্যজনক, বললো এমি। নিচে গিয়ে দেখলে বুঝা যাবে যোগ করলো ফাহিম।
পাহাড়ের এ পাশটা খাড়া হওয়াতে খানিকটা দূরে গিয়ে নিচে নামতে শুরু করলো তারা। কিছুই তো চোখে পড়ছে না, বললো রিফাত। ঘন কুয়াশা ঢেকে ফেলেছে ওদের চারদিক। বহুকষ্টে তারা চূড়া থেকে নিচে নামতেই একটা গোলাকার খাদ দেখতে পেল। খাদের ভেতরটা এতটাই অন্ধকার যে কোনকিছুই দেখার উপায় মিলছে না।
খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালো ফাহিম, এমি এবং রিফাত। বাঁচাও! বলে চিৎকার দিল ফারুক। সহসাই ঘুরে দাঁড়ালো ওরা তিনজন। কোন এক অদৃশ্য শক্তি এনাম, বেলাল এবং ফারুককে টেনে নিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি গুহার দিকে। খুব সাবধানতার সাথে গুহামুখের দিকে ছুটলো ওরা তিনজন। কাছাকাছি পৌঁছতেই গুহামুখ আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে গেল।
এ কোন জায়গায় এসে পড়লাম? প্রথমে গাড়িসহ ড্রাইভার নিখোঁজ, তারপর ওরাও উধাও! ফাহিমকে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে। বলতে গেলে ওর জন্যই সবাই ট্যুরে আসতে রাজি হয়েছে। এই রহস্যের সমাধান না করে এখান থেকে ফিরে যাওয়া উচিত নয়, বললো ফাহিম।
ফিরে এলো আবারো সেই খাদের নিকট। হাত ঘড়িটায় বেশ টান অনুভব করলো ফাহিম। খাদের গভীরতা আন্দাজ করা যাচ্ছে না। পায়ের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলো তারা বৃহৎ আকৃতির এক ম্যাগনেটিক স্টোনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ওই দেখো, গুহামুখ খুলে গেছে! চেঁচিয়ে উঠলো রিফাত।
কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই কোন অদৃশ্য শক্তি এক ঝটকায় তাদেরকে গুহার ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো। জ্ঞান হারিয়ে ফেললো সবাই। হঠাৎ একটা শব্দ এসে কানে পৌঁছতেই জ্ঞান ফিরে পেল ফাহিম। দেখলো সহযাত্রীরা পাশেই পড়ে আছে। সকলেই অচেতন।
একে একে সবার জ্ঞান ফিরলো। নিজেদের আবিষ্কার করলো এক ভয়ঙ্কর গুহায়। কত সময় পার হয়ে গেছে কেউ বলতে পারলো না। গুহার ভেতরটায় আলো খুবই কম। একপাশে সরু রাস্তা চোখে পড়লো, ওদিক থেকেই আলোটা আসছে। আরে দেখো দেখো, এই তো আমাদের গাড়িটা! দুমড়ে মুচড়ে গেছে। কাছে গিয়ে দেখলো ভিতরে ড্রাইভার নেই। কোথায় গেল তাহলে? মরে গেলে তো গাড়ির ভেতরেই থাকতো।
এই অশুভ স্থান দ্রুত ত্যাগ করতে হবে, বললো এনাম। গাড়ি থেকে ব্যাগপত্র নামিয়ে হাঁটা শুরু করলো হালকা আলোময় সরু পথ ধরে। দাঁড়াও! বিপদে পড়েছি, চিৎকার করে বললো বেলাল। তার চিৎকারে পাহাড়ের গুহায় প্রতিধ্বনি হতে শুরু করলো।
একটা গর্তে তার পা ঢুকে গেছে। বের করাতে পারছে না। ওদিক দেখো! গুহামুখ খুলে যাচ্ছে, বললো এনাম। তোমরা বেলালের কাছে থাকো, একটা রিস্ক নিতেই হবে এই রহস্য সমাধানের জন্য। বলেই এমিকে নিয়ে ছুটলো গুহামুখের দিকে। কাছে পৌঁছানোর আগেই আকস্মিকভাবেই গুহামুখ আবারো হারিয়ে গেল। পা বের হয়ে গেছে বেলালের। ব্যথা পেয়েছে খুব, খোঁড়াতে খোঁড়াতে বললো। ব্যাগ থেকে টর্চলাইট বের করলো ফাহিম। চারদিকে খুঁজতে লাগলো রহস্য সমাধানে কোন উপকরণ পেয়ে যায় কি না।
কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পরেই পেয়ে গেল ধুলো জমে ঝাপসা হয়ে যাওয়া ইংরেজিতে লেখা একটি বোর্ড। পড়তে গিয়ে রীতিমত ঘামতে শুরু করলো ফাহিম। কী সাংঘাতিক ব্যাপার!
উপমহাদেশে ব্রিটিশদের শাসনামলে এটি তৈরি করেছিল তারা। বৃহৎ আকৃতির দুটো ম্যাগনেট এমনভাবে বসানো হয়েছিল যে, এর নিকট দিয়ে কোন লোহার বস্তু গেলেই আকস্মিকভাবে টেনে নিয়ে আসবে এখানে। তারপর খাদের মুখে এলে দুটি ম্যাগনেটের বিকর্ষণে এক ধাক্কায় তাকে গুহামুখে ঠেলে দেবে। কী অদ্ভুত কান্ড, তাই না? বললো রিফাত। ওর দিকে তাকিয়ে ফারুক বললো, আজকের ঘটনাটা রহস্যময় হলেও বেশ ভয়ঙ্কর। তার চেয়ে আমি গত রাতে এনামের সাথে একবেডে ঘুমানোকেই বেশি মিস করবো। ওর এই কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।

SHARE

Leave a Reply