Home তোমাদের গল্প নিভে যায় প্রাণ -মোহাম্মদ ইশমাম কবির

নিভে যায় প্রাণ -মোহাম্মদ ইশমাম কবির

অনেকদিন ধরেই মা পাখি আর বাবা পাখিটার মনে খুবই আনন্দ আর খুশি। নিশ্চয় তার কোনো কারণ আছে। হ্যাঁ অবশ্যই আছে। কারণ তাদের ঘর আলোকিত করে এসেছে দু’টি ছোট্ট ছোট্ট ছানা। কী সুন্দর ছানাগুলো। দেখতে খুব আদর লাগে। নরম নরম গা। সারাটা দিন কিচিরমিচির আওয়াজ ব্যতীত কোনো ভাষা নেই। অবশ্য ভাষাগুলোও অনেক মধুর। মানুষের কাছে না হলেও পাখিদের কাছে হবে। মানুষের কথা বলে কী লাভ, তারা তো নিজের লাভ ছাড়া আর কিছুই বুঝে না। যাই হোক মূল গল্পে আসি, মা পাখি আর বাবা পাখি খুব আদর আর যতœ করে তাদের বড় করে তুলছে। বাবা পাখি সারাদিন বাহির হতে খাবার জোগাড় করে আনে আর মা পাখি নরম নরম সুস্বাদু খাবারগুলো নিজ ঠোঁট দিয়ে বাচ্চার মুখে দেয়। বাচ্চারাও তা আনন্দের সাথে গ্রহণ করে। এভাবে এক এক করে অনেকদিন কেটে গেল। বাচ্চাগুলো আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল।
একদিনের কথা, ভোরবেলা বাবা পাখিটা বাহিরে চলে গেল। সূর্য একটু একটু উঁকি মারছে পূর্ব আকাশে। হঠাৎ কিসের শব্দে মা পাখিটার ঘুম ভাঙল। উঠে দেখে, একদল লোক বনে এসে কী বিষয়ে জানি কথা বলছে। কিছুক্ষণ পর তারা চলে যায়। লোকগুলো চলে যাওয়ার পর সারা বনে খবর হয়ে গেল যে, আজ থেকে এই বনটা নাকি কাটা শুরু করবে। তাই পাখির রাজা ঈগল ঘোষণা দিল যে এখনি বন ছেড়ে সবাইকে চলে যেতে। রাজার ঘোষণায় এক এক করে সব পাখি বন ছেড়ে চলে যাচ্ছে। একদিকে মা পাখিটা অস্তির হয়ে উঠল কখন তার স্বামী আসবে। স্বামীকে ছাড়া তো আর যাওয়া যাবে না।
বনের মধ্যে প্রায় সব পাখি চলে গেছে ইতোমধ্যে। শুধু দুই একটা আছে। তারাও যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। একটা পাখি এসে মা পাখিটাকে বলল, ‘কিরে তোমরা যাবে না? এখনও যে বসে আছ? লোকগুলো তো কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে।’ মা পাখিটা সব বলল পাখিটাকে। পাখিটাও আর কিছু বলল না।
সারা বন খালি হয়ে গেছে। এখনও তার স্বামী আসেনি। এদিকে ছানাগুলোও কিচিরমিচির আওয়াজ শুরু করে দিয়েছে ক্ষুধার যন্ত্রণায়। বেশ কিছুক্ষণ পর স্বামী ফিরে এলো। এসে সব শোনে স্ত্রীকে ধমক দিয়ে বলল, ‘তোমাকে আমার জন্য কে বসে থাকতে বলছে? ছানাগুলোর যদি কিছু হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি কর।’ মা পাখিটা আর বাবা পাখিটা আর দেরি না করে ছানাগুলো নিয়ে যখনি উড়াল দিবে ঠিক তখনি একটা ঢিল এসে পড়ল বাবা পাখিটার মাথায়। সাথে সাথে বাবা পাখিটা মাটিতে পড়ে ছটফট করতে লাগল আর চিৎকার দিয়ে দিয়ে মা পাখিটাকে বলল, ‘তুমি তাড়াতাড়ি চলে যাও। আর এক মুহূর্তও দেরি করো না। নয়ত তুমিও মারা পড়বে।’ মা পাখিটাও স্বামীর কথা মত ছানাগুলোকে নিয়ে বাসস্থানের খুঁজে আকাশ পানে উড়াল দিল।
শত শত রাস্তা পাড়ি দিয়ে চলছে মা পাখিটা। ছানাগুলো তার ঠোঁটে। খুব ক্লান্ত মা পাখিটা। এক জায়গায় এসে নামল মাটিতে। ছানাগুলো ক্ষুধার যন্ত্রণায় অস্তির হয়ে পড়েছে। খাবার না পেলে মারা পড়বে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে অবশেষে কিছু খাবার জোগাড় করল মা পাখিটা। নিজেও কিছু খেল এবং ছানাদেরও খাওয়াল। যাই হোক, আবার ছানাদের ঠোঁটে নিয়ে আকাশপথে উড়াল দিল মা পাখিটা। যেকোনো একটা জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে। সূর্য প্রায় ডুবে পড়েছে। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত একটা বনে এসে পৌঁছল মা পাখিটা। অনেক কষ্টে একটা ঘর তৈরি করল। এতক্ষণে সূর্য ডুবে গেছে। ছানাগুলোকে ঘুম পাড়িয়ে বাহিরে গিয়ে একটা গাছে বসে আকাশের দিকে চেয়ে থাকল মা পাখিটা। তার স্বামীর কথা মনে পড়ছে। নিজের প্রাণ দিয়ে সে তাদের পাঠিয়ে দিয়েছে এই গভীর বনে। স্বামীর কথা মনে পড়তে দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। এভাবে রাতের আঁধার মুছে দিনের আলো উঁকি মারল পৃথিবীতে। এবার মা পাখিটা নিজেই ছানাগুলোর দেখা শোনা করতে লাগল। এভাবেই অনেক দিন কেটে গেল।
একদিন সকালে মা পাখিটা খাবারের উদ্দেশে বাহির হলো। ছানাগুলোকে বাসায় রেখে গেল সে। অনেকক্ষণ পরে কিছু খাবার নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল মা পাখিটা। প্রায় বাসার কাছাকাছি আসতেই একটা তীর এসে পড়ল মা পাখিটার ডান চোখে। সাথে সাথে রক্তে লাল হয়ে মাটিতে পড়ে গেল মা পাখিটা। মাটিতে পড়ে ছটফট করতে লাগল সে। আর চিৎকার দিয়ে বলতে লাগল, ‘ওহে নিকৃষ্ট মানুষের দল, আমি তোমাদের কী করেছিলাম যে তোমরা আমাকে এভাবে তীর ছুড়ে মারলে। আমার চোখের রক্ত দেখতে খুব ভালো লাগে কি তোমাদের? কেন তোমরা আমার ছানাগুলোকে এতিম করলে? তারা তো এখন ক্ষুধার যন্ত্রণায় হাউমাউ করে কান্না করবে? তাদের কান্নার আওয়াজ অনেক ভালো লাগে তোমাদের? এখন কী হবে আমার আদরের ছানাগুলোর? তাদের এখন কে খাবার এনে দেবে?’ এইসব বলতে বলতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল মা পাখিটা। এতিমের কাতারে দাঁড়ায় ছোট্ট ছোট্ট ছানাগুলো। অন্যদিকে ছানাগুলোরও ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে। তারা ছটফট করতে লাগল। এমন সময় এলো এক বিশাল বাতাস। ভয়ঙ্কর বাতাস ছানাগুলোকে উড়ে নিয়ে ফেলে দিল বহুদূরে। সাথে সাথে তাদের জীবনের বাতিও নিভে গেল। আর এভাবে চারটি মৃত দেহ পড়ে থাকল চার দিকে। কেবল মাত্র মানুষ নামের এই নিষ্ঠুর প্রাণীর জন্যই চারটি অসহায় জীবের দেহ হতে নিভে যায় প্রাণ।

SHARE

Leave a Reply