Home দেশ-মহাদেশ ইউরোপের সদ্য স্বাধীন মুসলিম দেশ কসোভা -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

ইউরোপের সদ্য স্বাধীন মুসলিম দেশ কসোভা -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

কসোভা দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলের একটি মুসলিম রাষ্ট্র। সার্বিয়ান ভাষায় এটাকে কসোভো বলা হলেও আলবেনীয় ভাষায় বলা হয় কসোভা। এটি আগে সার্বিয়ার একটি প্রদেশ ছিলো। প্রদেশটি ১৯৯৯ সাল থেকে জাতিসংঘ প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একাংশ প্রদেশটির ওপর সার্বিয়ার সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে, কার্যত এটির ওপর সার্বীয় শাসনের কোনো প্রয়োগ নেই। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই এলাকার জনগণ কসোভা প্রজাতন্ত্র হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু দেশ কসোভাকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সার্বিয়া কসোভার নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে এই অঞ্চলের প্রশাসনের স্বীকৃতি দিলেও দেশটি এটাকে তার কসোভা ও মেতোহিজা স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ হিসেবে দাবি অব্যাহত রেখেছে।
কসোভার সীমান্তে রয়েছে পশ্চিমে মন্টেনেগ্রো, দক্ষিণ-পশ্চিমে আলবেনিয়া, দক্ষিণ-পূর্বে মেসিডোনিয়া প্রজাতন্ত্র এবং উত্তর ও পূর্বে বিরোধপূর্ণ অঞ্চল। কসোভো ইউরোপের দশম ছোট দেশ। কসোভার আয়তন ১০ হাজার ৯০৮ বর্গ কিলোমিটার (৪,২১২ বর্গ মাইল) এবং জনসংখ্যা ২০ লক্ষ। জনসংখ্যার বেশির ভাগই জাতিগতভাবে আলবেনীয় (৯৩%)। তবে সার্বীয়, তুর্কি, বসনীয়, জিপসি এবং অন্যান্য জাতির লোকেদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রয়েছে। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে মুসলিম (৯৫.৬ শতাংশ), খ্রিষ্টান (৩.৭ শতাংশ) ও অন্যান্য। কসোভার সরকারি ভাষা আলবেনীয় ও সার্বিয়ান। এদেশের জনগণের শতকরা ৯৫ ভাগ আলবেনীয় ভাষায় এবং ১.৬ ভাগ সার্বিয়ান ভাষায় কথা বলে।
কসোভার সবচেয়ে বড় শহর ও রাজধানীর নাম প্রিস্তিনা। প্রিস্তিনায় প্রায় ৩ লাখ লোক বাস করে। অন্যান্য প্রধান শহর এলাকার মধ্যে রয়েছে প্রিজরেন, পেক ও ফেরিজাজ। কসোভার মুদ্রার নাম ইউরো।
২০০৬ সালে কসোভার ভাগ্য নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক আলোচনা শুরু হয়।
কসোভা মধ্য বলকান উপদ্বীপের একটি ভূমি-পরিবেষ্টিত অঞ্চল। বলকানে কৌশলগত অবস্থানে থাকায় কসোভা মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপ, এড্রিয়াটিক সাগর ও কৃষ্ণসাগরের মধ্যে সংযোগ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কসোভার সবচেয়ে উত্তরের স্থান বেলোবারডা, দক্ষিণের স্থান রেসটেলিকা, পশ্চিমের স্থান বোজে এবং পূর্বের স্থান ডেসিভোজকা। কসোভার সর্বোচ্চ স্থান গজেরাভিকা, যার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,৬৫৬ মিটার (৮,৭১৪ ফুট) এবং সর্বনিম্ন স্থান হোয়াইট ডরিন, যার উচ্চতা ২৯৭ মিটার (৯৭৪ ফুট)। সার পর্বতমালা কসোভার ভূখন্ডের এক-দশমাংশ ঘিরে রেখেছে।
দেশটির সীমান্তের বেশির ভাগ জুড়ে রয়েছে পার্বত্য বা উচ্চ ভূমি। কসোভার ভূমিতে সবচেয়ে লক্ষণীয় হলো বজেশকেত ই নিমুনা ও সার পর্বতমালা। বজেশকেত ই নিমুনা আলবেনীয় আল্পস বা প্রকলেতজি নামেও পরিচিত। এটি ডিনারিক আল্পসের ভৌগোলিক ধারাবাহিকতা। এই পর্বতমালা পশ্চিমে আলবেনিয়া ও মন্টেনেগ্রোর সাথে সীমান্তের পাাশাপাশি অবস্থিত। দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে সার পর্বতমালার প্রাধান্য। এই পর্বতমালা মেসিডোনিয়া প্রজাতন্ত্রের সাথে সীমান্ত গঠন করেছে। এই পার্বত্য রেঞ্জগুলো ছাড়াও কসোভার বেশির ভাগ ভূমি দুটি প্রধান সমভূমি নিয়ে গঠিত। সেগুলো হলো পূর্বে কসোভা সমভূমি এবং পশ্চিমে মেতোহিজা সমভূমি।
কসোভার জলজসম্পদ তুলনামূলকভাবে কম। দেশটির সবচেয়ে লম্বা নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে হোয়াইট ডরিন, দক্ষিণ মোরাভা ও ইবার। ইবার নদীর শাখা সিতনিকা হলো সম্পূর্ণভাবে দেশের মধ্যে অবস্থিত সবচেয়ে বড় নদী। এ ছাড়া নেরোডিমকা নদী হচ্ছে ইউরোপে নদী দ্বিভাগের একমাত্র দৃষ্টান্ত, যা বিভক্ত হয়ে কৃষ্ণ সাগর ও এজিয়ান সাগরে প্রবাহিত হচ্ছে।
কসোভার মোট ভূমির ৩৯ শতাংশ জুড়ে রয়েছে বনজঙ্গল। দেশটির জীববৈচিত্র্য দু’টি জাতীয় পার্ক, ১১টি ন্যাচার রিজার্ভ এবং ১০৩টি অন্যান্য এলাকায় সংরক্ষিত। কসোভার কয়েকটি বিরল বা বিপন্ন প্রাণীর মধ্যে রয়েছে বাদামি ভল্লুক, বনবিড়াল, নেকড়ে, খেকশিয়াল, বন্য ছাগল ও হরিণ। এ ছাড়াও এদেশে আছে ২২৫ প্রজাতির পাখি।
কসোভায় ভূমধ্যসাগরীয় ও আলপাইন প্রভাবের মহাদেশীয় আবহাওয়া বিরাজ করে। দেশটির সবচেয়ে ঠাণ্ডা এলাকা হলো পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্বের পর্বতমালা, এখানে আলপাইন আবহাওয়া লক্ষণীয়। দেশের সবচেয়ে উষ্ণ এলাকা হলো আলবেনিয়ার সাথে সীমান্তের কাছে একেবারে দক্ষিণ এলাকা। এখানে ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়া বিরাজ করে। এখানে মাসিক তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি (জানুয়ারি) থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (জুলাই) মধ্যে ওঠানামা করে। প্রতি বছর বৃষ্টিপাত হয় ৬০০ থেকে ১৩০০ মিলিমিটার (২৪-৫১ ইঞ্চি) সারাদেশে সমানভাবেই বৃষ্টিপাত হয়।
কসোভায় সংসদীয় প্রজাতন্ত্র পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। এদেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন হাশিম থাচি এবং প্রধানমন্ত্রী রামুশ হারাদিনাজ। কসোভা প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক এলাকা সাতটি জেলায় বিভক্ত এবং জেলাগুলো আবার ৩৮টি পৌরসভায় বিভক্ত। জেলাগুলো হলো পেক, মাইট্রোভিসা, প্রিস্টিনা, জিলান, জাকোভা, প্রিজরেন ও ফেরিজাজ। এদেশে ১২০ সদস্যের একটি এককক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট বা কুভেন্ডি রয়েছে। পার্লামেন্টের ১০০ আসনে সরাসরি ভোট হয়, ১০টি আসন সার্বদের জন্য এবং ১০টি আসন অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত।
ভিনকা ও স্টারসেভো সংস্কৃতির প্রস্তরযুগ পর্যন্ত কসোভোর ইতিহাস পাওয়া যায়। ক্লাসিক্যাল আমলে এখানে ইলিরিয়ান-দারদানিয়ান ও সেলটিক জনগণ বাস করতো। খ্রিষ্টপূর্ব ১৬৮ সালে রোমানরা এই এলাকা কুক্ষিগত করে। মধ্যযুগে বাইজানটাইন, বুলগেরিয়ান ও সার্বিয়ান সা¤্রাজ্য এই এলাকা দখল করে। ১৩৮৯ খ্রিষ্টাব্দের কসোভো যুদ্ধ সার্বিয়ান মধ্যযুগীয় ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই অঞ্চলটি এককালে সার্বীয় মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রের কেন্দ্র ছিল। চতুর্দশ শতাব্দী থেকে এখানে সার্বীয় অর্থোডক্স চার্চের অবস্থান ছিল।
পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত কসোভা উসমানীয় সা¤্রাজ্যের অংশ ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে কসোভা আলবেনীয় জাতীয় জাগরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়। বলকান যুদ্ধে পরাজয়ের পর উসমানীয়রা কসোভাকে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর অনকূলে ত্যাগ করে। প্রথম বিশ^যুদ্ধের পর উভয় দেশ যুগোস্লাভিয়ায় যোগ দেয় এবং রাজ্যে যুগোস্লাভ একত্ববাদের একটি মেয়াদের পর দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ পরবর্তী সংবিধানের আওতায় যুগোস্লাভ সংবিধিবদ্ধ সার্বিয়া প্রজাতন্ত্রের মধ্যে কসোভা ও মেটোহিজা স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিংশ শতাব্দীতে কসোভার আলবেনীয় ও সার্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা ধূমায়িত হয় এবং মাঝে মাঝে সহিংসতা ঘটতে থাকে। ফলে ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে কসোভা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আর এর পরিপ্রেক্ষিতে সার্বীয় সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহার করা হয় এবং কসোভোয় জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন মিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরিশেষে ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সার্বিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। সেই থেকে কসোভা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের ১১৩টি সদস্য দেশের কূটনৈতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৩ সালের ব্রাসেলস চুক্তি সত্ত্বেও সার্বিয়া কসোভাকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।

SHARE

Leave a Reply