Home ফিচার হাওরপাড়ের মানুষের কথা -আবদাল মাহবুব কোরেশী

হাওরপাড়ের মানুষের কথা -আবদাল মাহবুব কোরেশী

দখিনা বাতাসে মৃদু ছন্দে দোল খাওয়া ছোট বড় ঊর্মিমালার বিরামহীন নাচনের অপূর্ব দৃশ্য। হাজারো পাতিহাঁসের প্যাক প্যাক। শঙ্খচিল ডাহুকসহ নাম না জানা হরেক রকম পাখির অবাধ বিচরণ। ডিঙি আর ঘোমটি নায়ের হাট। ওড়াল, প্লেন ও টানাজালসহ জেলেদের কর্মব্যস্ততা আর জ্যোসনালোকিত বিস্তীর্ণ গহিন অঞ্চলে উত্তাল জলরাশি এ সবই হচ্ছে একটি হাওয়রের নিত্যনৈমিত্তিক দৃশ্য। সন্ধ্যা নামলে দৃশ্যপট বদল হয়, পাল্টে যায় দিনের চিরচেনা রূপ। রাত গভীরের সাথে সাথে ভূতুড়ে এক পরিবেশের আবহ তৈরি হয় সমস্ত হাওরজুড়ে। তার সাথে নৈসর্গিক রূপের রহস্যময়তা আমাদের বারবার ভাবিয়ে তোলে এবং মুগ্ধ করতে বাধ্য করে। মনে হয় জীবনের শ্রেষ্ঠ দেখা কোন এক স্বর্গীয় দৃশ্য, যা শুধু মনের গভীরে অঙ্কন করা যায়। হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করা যায়। কিছূ প্রকাশ করা দুষ্কর হয়। হাওরের রূপে এমনি এক মাদকতা। বিশেষ করে বৈশাখের রাতে ভরা পূর্ণিমায় মেঘের ফাঁকে ফাঁকে চাঁদের লুকোচুরি আর ছোট ছোট টেউয়ের ফাঁকে জোছনার ঝিলিক বিস্তীর্ণ হাওরের জলরাশিকে মনোমুগ্ধকর করে তুলে। প্রকৃতির এ অপার রহস্যময়তার সঙ্গে হৃদয়-মন একাকার হয়ে কবির কলম থেকে জন্ম নেয় শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ লেখা। ভাবুক প্রেমিক খুঁজে পায় অপার শক্তিমান সৃষ্টির কারিগর স্রষ্টাকে। গুণ-কীর্তনে ব্যাকুল হয় তাঁরই রহস্যভরা সৃষ্টিতে।
হাওরের এ চিত্রায়ণ যদি এত চমৎকার হয় তবে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে হাওরপাড়ের মানুষের জীবন কেমন? কেমন তাদের জীবনচলা? কত সুন্দর তাদের জীবন সংসার? জানতে ইচ্ছে হয়, এ সুন্দর পরিবেশে তাদের শিশুসন্তানদের ভরণ-পোষণ, লেখাপড়াসহ সামাজিকভাবে বেড়ে ওঠার কাহিনী। চোখ বুজে একবার কল্পনার সাগরে ডুব দিয়ে ভাবতে ইচ্ছে হয়- আহারে যদি হাওরপাড়ে জন্ম নিতুম কতই না ভালো হতো। মনের রঙে পাল তুলে ঘুরতাম সারা বেলা। পড়ন্ত বিকেলের মিষ্টিরোদে হাওর জলে ভাসতাম কোন এক ডিঙির বুকে চড়ে। বিশাল জলরাশি ভেদ করে হাওরের একূল ওকূল আর শাপলা শালুকের আঁটি বেঁধে ঢেউয়ের নাগরদোলায় দুলে দুলে দেখে নিতাম হাওরের প্রকৃতি। একেবারে আপন করে আর মিষ্টি বাতাসের শন শন শব্দে সুর তুলে গাইতাম-
তোমার সৃষ্টি যদি হয় এত সুন্দর
না জানি তাহলে তুমি
কত সুন্দর, কত সুন্দর…
কিন্তু বিস্তীর্ণ হাওরের নৈসর্গিক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ আর হাওরপাড়ের মানুষের সামাজিক পরিবেশের মধ্যে যে বিস্তর ফারাক তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। কষ্টে যাদের জীবন ভরা, তাঁদের সুখ সুদূর পরাহত। জীবনের প্রতিটি ছন্দে নেই কোনো অন্তমিল। নিরাশার বনে আশার শক্তি শুধু তাদের মনের জোর আর সে জোর নিয়েই তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে হর-হামেশাই তাদের শ্রম বৃথা যায়। শ্রমের ফসল চোখের সামনে তলিয়ে যায় অকাল বন্যায়। তাই দেখা যায়- প্রায় প্রতি বছরই অসময়ে পানি এসে হাওরাঞ্চলের সোনালি ফসল বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় নির্মম চিত্র। একদিকে হাওরপাড়ের মানুষগুলো তাদের জীবন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন বোরো ধান হারিয়ে যখন দিশেহারা তখন হাওরের পানি দূষিত হয়ে মাছ মরে ভেসে ওঠার দৃশ্য প্রায়ই দৈনিকের শিরোনাম হয়। শিরোনাম হয় গবাদিপশুর খাবার নেই, বাতাস পানি আর পরিবেশ দূষিত হওয়ার খবর ইত্যাদি ইত্যাদি। বিকল্প কোনো কর্মসংস্থানও নেই। সব মিলে হাওরপাড়ের মানুষের পরিবেশ পরিস্থিতি হয় অনেকটা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা এর মত। তখন রিক্ত-নিঃস্ব কৃষক তার বুক ঠেলে ফসল রক্ষার ব্যর্থ চেষ্টা করে। আসমান চুঁইয়ে পড়া জ্যোৎস্না অবারিত জলরাশি কৃষকের চোখের কোণে অশ্রবিন্দু তখন চিক চিক করে ওঠে। বৃষ্টি ও জলজ্যোৎস্নার নৈসর্গিক দৃশ্য হাওরপাড়ের মানুষের জীবনে অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়। বুকের তপ্ত নিঃশ্বাস চারপাশের বাতাসকে ভারি করে। এ সময় অসহায় এ মানুষগুলোর দিন কাটে চরম অভাব অনটনে। নিজের পরিবার পরিজনের মুখে একমুঠো আহার তুলে দেয়ার জন্য জীবিকার তাগিদে রাতের আঁধারে জীবন বাজি রেখে মাছ ধরতে গিয়েও নানা বিড়ম্বনার শিকার হয় তারা। তখন বিভিন্ন ধরনের রোষানলে পড়ে ইজারাদারদের হাতে। সুযোগসন্ধানী এসব ইজারাদার নানা শর্তের বেড়াজালে আটকে তাদের কাছ থেকে নানা সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে। সুতরাং এ রোষানল থেকে বাঁচতে তাদের অনেক মূল্য দিতে হয় বৈকি। কেউ ঋণের বোঝা বহন করে জীবনভর, কেউ বা আবার গ্রাম ছাড়ে চিরতরে। জীবনের আরাম আয়েশ পায়ে ঠেলে ওরা বাঁচতে চায়। তবে ভিক্ষা করে নয়। পরিশ্রম করে, নিজের গতর খাটিয়ে। শুধু তাই নয়, নিজের আত্মমর্যাদা শতভাগ বজায় রেখে, সম্মানের সাথে। কিন্তু সব সময় তা পেরে ওঠা যায় না। ভ্যাগের নির্মম পরিহাসে ক্ষত-বিক্ষত এ সব মানুষ কোন কোন সময়, সময়ের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। বাধ্য হয় পরিবার পরিজন ও নিজ সন্তানদের বায়না মেটাতে, নিজ পেশা ছেড়ে অন্য কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে। তখন ধান গোয়ালে তোলা আর হাওরের গহিন জলে মাছ শিকার করা তাদের কাছে কল্পনাই মনে হয়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার নিষ্পাপ সন্তানের কচি মুখ। কি জানি আজ কত দিন হয়, বাচ্চাটার মুখে আহার জুটেনি। একটি আর্তচিৎকার তখন কানে বাজে ‘বা-বা’! এসব আনমনা ভাবে কখন যে চোখের কোণে ক’ফোঁটা পানিবিন্দু জমাট বাঁধে টেরই করতে পারে না। হোঁচট খায় তার সন্তানদের বড় করার স্বপ্ন দেখা। লেখাপড়া করিয়ে সন্তানকে জজ-ব্যারিস্টার করবে সেটা আকাশ কুসুম কল্পনার মতোই মনে হয়। যেখানে নুনের জোগান দিতে শত বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় সেখানে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো তাদের কাছে বিলাসিতাই বটে। তাই তো সরেজমিনে দেখা যায় তার বাস্তব চিত্র টাঙ্গুয়া হাওরপাড় ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন গ্রাম জয়পুর, গোলাবাড়ী ও আলমপুর। এই তিন গ্রামে শিশু-কিশোরদের সংখ্যা রয়েছে প্রায় ৩ শতাধিকের মতো। গ্রামে ঘুরে যে চিত্র চোখে ধরা পড়ে তা ভীষণ পীড়াদায়ক। স্কুলবিমুখ এসব শিশু দু’টি পয়সা কামাইয়ের জন্য ভিন্ন পেশায় নেমে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে পয়সা কামাইয়ের প্রধান ক্ষেত্র বেছে নিয়েছে ছোট নৌকা নিয়ে পর্যটকদের গাইড হিসেবে ঘুরে বেড়ানো। হাওরের বুকে ছোট নায়ে চড়ে হিজল-করচ বাগানের ভেতর ঘুরে ঘুরে নানা ধরনের গান আর বিভিন্ন ভঙ্গিতে শারীরিক কসরত প্রদর্শন। প্রথম দিকে এ পেশায় হাতেগোনা কতজন হলেও বর্তমানে শতাধিক শিশু-কিশোর রয়েছে এই পেশায়। কেউ কেউ পর্যটকদের গান গেয়ে শোনাচ্ছে আবার কেউ কেউ পর্যটকদের নিয়ে ছোট ছোট নৌকা করে হাওর ঘুরে দেখাচ্ছে। এভাবেই দিন দিন বিদ্যালয়বিমুখ হয়ে পড়ছে শত শত শিশু। গ্রামের অধিকাংশ পরিবার হতদরিদ্র। বিদ্যালয়ে না গিয়ে তাদের সন্তানরা রোজগার করছে এ বিষয়টা তারা স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন। ফলে কোমলমতি এই শিশু-কিশোররা লেখাপড়া বাদ দিয়ে জড়িয়ে পড়ছে এ ধরনের কাজে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশের কর্ণধার এসব শিশু-কিশোর যখন বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, খেলাধুলার মাধ্যমে নিজের মনকে বিকশিত করার কথা ঠিক এ সময়ে হাওরপাড়ের সন্তানরা পরিবারের ভরণ-পোষণের কঠিন দায়িত্ব নিতে বাধ্য হচ্ছে। যা একটি সভ্য সমাজের জন্য দারুণ লজ্জার ব্যাপার বটে। শুধু কি তাই? মৌলিক চাহিদার সকল নিয়ামক থেকে বঞ্চিত এসব শিশু আমাদের খামখেয়ালি আর নানা অব্যস্থাপনা ও দুর্নীতির নির্মম শিকার, তা বলতে আমাদের কোন সংকোচ নেই। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। মৌলিক চাহিদার অন্যতম চাহিদা হলো এই স্বাস্থ্যসেবা। এ স্বাস্থ্যসেবা থেকে হাওরপাড়ের মানুষ বিশেষ করে তাদের শিশুসন্তানরা চরমভাবে অবহেলিত। বলা চলে তথাকথিত শিক্ষিত কোটপরা ভদ্রলোক দ্বারা প্রতারিত। এখানে অর্থাৎ হাওর এলাকার বেশির ভাগ মানুষের চিকিৎসা ক্ষেত্র হলো কমিউনিটি ক্লিনিক, সাব-সেন্টার ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কমিউনিটি সেন্টার ও সাব-সেন্টার প্রায় সময়ই বন্ধ থাকে। এসব চিকিৎসা কেন্দ্রে আমাদের সভ্য সমাজের যেসব ভদ্র(!) সাহেবেরা কর্মরত আছেন তাদের মধ্যে অনেকেই বেশির ভাগ দিন অনুপস্থিত থাকেন। কারণ এসব হাওর এলাকা তাদের পছন্দ নয়। কিন্তু এই হাওরপাড়ের মানুষকে পুঁজি করেই মাস শেষে মাইনা নিতে তারা কখনো ভুল করেন না। যা মানবতার সাথে চরম প্রতারণা বলেই আমরা মনে করি। চিকিৎকদের এমন অবহেলা আর হাওরপাড়ের মানুষের শিক্ষার অভাবে তাদের সঠিক কোনো চিকিৎসা হচ্ছে না বললেই চলে। যার কারণে এসব অঞ্চলে জীবাণুঘটিত নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, সর্দি, জ্বরসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছরই বিনা চিকিৎসায় মারা যায় অনেক শিশু-কিশোর। যা সত্যিই বেদনাদায়ক। সুতরাং এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটাতে হবে সাহসিকতার সাথে।
পরিশেষে আমরা এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারি যে, আমাদের বাঙালি সমাজের যে হাজার বছরের স্বর্ণালি ইতিহাস আর নিজস্ব শিল্প সংস্কৃতি আছে তার সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে হাওরপাড়ের মানুষের সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনা ও বিভিন্ন উৎসবের গল্প। এ হাওরাঞ্চলেই বাংলা সাহিত্যের অনত্যম ধারা বাউল, ভাটিয়ালি, জারি, সারির মতো মৌলিক ধারার উৎপত্তি। সুতরাং এটাকে মোটেই অবহেলা করা যাবে না। আমাদের জাতীয় স্বার্থেই এ এলাকার মানুষসহ সকল ধরনের উপসর্গকে যত্ন নিয়ে দেখভাল করা আমাদের তথা সরকারের দায়িত্ব। আমাদের মনে রাখতে হবে এসব অঞ্চল থেকেই জন্ম নিয়েছেন জগদ্বিখ্যাত মরমি কবি ও গায়ক দেওয়ান হাছন রাজা চৌধুরী, দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম, রাধারমন, দুর্বিন শাহ, শেখ ভানু, শীতালং শাহ, পন্ডিত রাম কানাই দাশ, সাহিত্যিক শাহেদ আলী, উকিল মুন্সির মতো যুগস্রষ্টা শিল্প, সাহিত্যিক, মনীষীগণ। তাই হাওরাঞ্চল তথা হাওরাঞ্চলের মানুষের সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের পথ খুঁজে বের করা সরকার তথা সকলের দায়িত্ব।

SHARE

Leave a Reply