Home ধারাবাহিক উপন্যাস নাবিলের টাইমমেশিন -হারুন ইবনে শাহাদাত

নাবিলের টাইমমেশিন -হারুন ইবনে শাহাদাত

গাজীপুর ঢাকা থেকে খুব একটা দূরে নয়। ট্রেনে উঠে বসতে পারলে এক ঘণ্টাও লাগে না গাজীপুর থেকে ঢাকা আসতে। কিন্তু বাসে উঠলে কয় ঘণ্টায় পৌঁছা যাবে বলা মুশকিল। কেন মুশকিল? এই প্রশ্নের উত্তর একটাই- যানজট। আরো সহজ করে বললে যার নাম জ্যাম। এই জ্যাম থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে গিয়েই নাবিলের মনে পড়ে যায় টাইমমেশিনের কথা। টাইমমেশিন শব্দটা মাথায় আসতেই সে হারিয়ে যায় ভাবনার রাজ্যে। ওর বড় শখ হয় টাইমমেশিনে গোটা বাংলাদেশ ঘুরে দেখার।
কেন তার এমন শখ প্রশ্ন করতেই সে বলল : ‘আমি তো শুধু বর্তমান বাংলাদেশ নয়, অতীতের বাংলাদেশেও যেতে চাই। আর টাইমমেশিন ছাড়া কি তা সম্ভব?’
: অতীতের বাংলাদেশকে জানতে তোমাকে বেশি বেশি পড়তে হবে। এ কথা বলতেই নাবিলের পাল্টা প্রশ্ন : ‘আর কী করতে হবে?’
: ‘প্রাচীন দর্শনীয় স্থানগুলোতে ভ্রমণ করতে পারো। জাদুঘরে গেলেও দেখা যাবে অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য।’
জাদুঘরের কথা বলতেই লাফিয়ে উঠলো নাবিল : ‘কখন যাবো জাদুঘরে? ওখানে কি টাইমমেশিন আছে?’
: ‘আজই যাবো। আর টাইমমেশিন, তা আছে বলতে পারো। তবে সেই টাইমমেশিনটি সচল নয়। অচল।’ খুশিতে লাফাতে লাফাতে সে বলল : ‘আমি ঐ অচল মেশিনকে সচল করব।’
: ‘চলো।’ তার আর তর সইছে না। সে আর অপেক্ষা করতে রাজি না।
অবশেষে অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো।

২.
রাজধানী ঢাকার শাহবাগ জাদুঘর। টিকেট কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন। নাবিল আমার প্যান্টের বেল্ট শক্ত করে ধরে পাশে দাঁড়ালো। টিকেট সংগ্রহ হলো আর দেরি নয়। কিন্তু না কিছু দূর এগোনোর পরই আমাদের আবার দাঁড়াতে হলো। মেটাল ডিটেক্টর পার হওয়ার আগেই আবার দাঁড়াতে হলো। ব্যাগ চেক করা হলো। তারপর টিকেট চেক। এবার সামনের সিঁড়ি বেয়ে সোজা দোতলায় এলাম। আমাদের সামনে বাংলাদেশের বিশাল মানচিত্র। মানচিত্রটিতে বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বালিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা চিহ্নিত করা হয়েছে। নাবিল মামাকে বলে : বা! কী সুন্দর! যদি সব কয়টি জেলা ঘুরে ঘুরে দেখতে পেতাম, কী মজাই না হতো?
: ‘সাথে সাথে যদি জেলাগুলোর ইতিহাসও জানা যায়।’ আমি বললাম।
তৃতীয় তলায় এসে অবাক বিস্ময়ে নাবিল দেখছে, তার চিরচেনা বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ। বিভিন্ন প্রাচীন নিদর্শন। একটি কাঠের ঘোড়ার কাছে দাঁড়ালো নাবিল। এখানে কোন কিছু স্পর্শ করা নিষেধ। কিন্তু এ ঘোড়ার কাছে এসে সে তা ভুলে গেলো, আনমনে হাত দিলো ঘোড়ার পিঠে। কী আজব ব্যাপার! নাবিলের হাতের ছোঁয়ায়, নড়ে চড়ে উঠলো কাঠের ঘোড়া।
হ্রেষা বলে তাকে ডাকলো, ‘নাবিল, আমার পিঠে এসে বসো।’ নাবিল অবাক হয়ে ফেল ফেল করে তাকিয়ে রইলো। ঘোড়াটি আবার তাকে ডাকলো, ‘কী ব্যাপার, নাবিল। আমার পিঠে উঠছো না, কেন? তুমি ভুলে গেছো, জাদুঘরে আসার আগে কী বলেছিলে?’
এবার নাবিল মুখ খুললো, ‘কী বলেছিলাম।’
: ‘তুমি অচল টাইম মেশিনকে সচল করবে। আমিই সেই টাইম মেশিন, তোমার হাতের ছোঁয়ায় সচল হয়েছি। এবার আমার পিঠে ওঠো। তোমাকে আমি অনেক দূরে নিয়ে যাবো।’
: কেউ কিছুই বুঝতে পারবে না।
: জাদুঘরে কত পাহারা….
: কেউ কিচ্ছু বুঝবে না।
: কেন?
: নাবিল, তুমি বলতো, সবচেয়ে দ্রুতগতিতে কী চলে?
: মানুষের মন?
: আমি তো মনপবন দিয়ে তৈরি ঘোড়া?
: তুমি আমার সাথে ভ্রমণে বের হলেও কেউ বুঝতে পারবে না, তোমাকে বা আমাকে কেউ খোঁজবেও না।
: আজব ব্যাপার, কিন্তু কিভাবে এটা সম্ভব?
: আমি মনপবনে তৈরি তো, তাই সম্ভব।
: আমি ঠিক বুঝলাম না।
: শোন, তুমি যখন স্বপ্ন দেখ, তখন তোমাকে কি কেউ হারিয়ে ফেলে…
: আমি তখন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বিশ্বভ্রমণ করি, আমি বিছানাতেই থাকি, তাই কেউ খোঁজ করে না।
: ‘মনপবনে তৈরি টাইম মেশিনের ব্যাপারটাও ঠিক এমন, এবার তুমি উঠবে কি না বল?’ আজব ঘোড়াটি বিরক্তি প্রকাশ করে জানতে চায়।
: ‘অবশ্যই যাবো।’ বলে নাবিল ঘোড়ার পিঠে উঠে বসে।

৩.
আজব ঘোড়াটি টগ্বগ টগ্বগ্ করে জাদুঘর থেকে বের হয়। তারপর পাখা মেলে, আকাশে উড়তে থাকে। ঠিক যেন ডালিম কুমারের পঙ্খিরাজ ঘোড়া।
ঘোড়াটি নাবিলকে বলে : ‘চলো, এবার আমরা ১৬১০ সালে চলে যাই।’
: ঠিক আছে। চলো।
নাবিলের ঘোড়া আকাশ থেকে নেমে এলো ঢাকার পথে। পথের দুই ধারে বড় বড় ডাব গাছ। কোন মোটর গাড়ি, যানজট, উঁচু দালান-কোঠা নেই। লোকজন চলছে পায়ে হেঁটে, ঘোড়া, গাধা আর টমটমে সওয়ার হয়ে। হঠাৎ তোপের শব্দে নাবিল চমকে উঠলো : ‘কিসের শব্দ।’
: ‘ভয় পেলে নাকি?’ হাসতে হাসতে ঘোড়া নাবিলের কাছে জানতে চায়।
: তুমি তো আচ্ছা লোক হে, আমি ভয় পাচ্ছি আর তুমি হাসছো?
: হাসছি তোমার বোকামির জন্য..
: তুমি আমাকে বোকা বললে…
: ঠিক আছে, এই আমি কান ধরছি, তুমি বোকা নও। তবে শোন, এ তোপের শব্দ ইসলাম খানের কামানের। এই মাত্র তিনি বুড়িগঙ্গার তীরে এসে নামলেন।
: চলো। চলো। নাবিলের আর তর সইছে না।
আলোর গতির চেয়েও দ্রুতগতিতে নাবিলের ঘোড়া পৌঁছে গেল বুড়িগঙ্গার পাড়ে। নদীর তীরে বাঁধা মোগল সুবেদার ইসমাইল খাঁ চিশতির বড় বড় রণতরী। চারদিকে সাজ সাজ রব। রণতরী থেকে নেমে এলেন এক সুদর্শন পুরুষ। তিনি নাবিলের দিকে হাত এগিয়ে দিলেন বললেন : ‘আসসালামু আলাইকুম। আমি শেখ আলাউদ্দিন চিশতি।’
নাবিল ওয়ালাইকুমুস সালাম বলে হাত বাড়িয়ে দিয়ে নিজের পরিচয় দিলে বলল : ‘তাহলে আপনিই মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ।’
: হ্যাঁ ঠিক তাই, আমার নাম আলাউদ্দিন চিশতি। আমার শৈশবের খেলার সাথী মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর। তিনি ইসলাম খাঁ উপাধি দিয়ে আমাকে এ বাঙাল মুল্লুকে পাঠিয়েছেন সুবেদার করে।
: আপনি তো বাংলার সুবেদার হিসেবে নিয়োগ পেয়ে প্রথম ঢাকা আসেন ১৬০৮ সালে।
: ঠিক বলেছো। তবে এবার মানে এই ১৬১০ সালে আমি ঢাকায় এসেছি, বিশেষ ফরমান তামিল করতে।
: কী সেই ফরমান।
: রাজমহল থেকে বাংলার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করে, এর নতুন নামকরণ করব জাহাঙ্গীরনগর। আজকের এ শুভদিনের মোবারক আয়োজনে তোমাকে দাওয়াত, দরবারে চলো।
নাবিল ওর ঘোড়া নিয়ে ইসলাম খাঁর পেছনে চললো।

৪.
নীল আকাশ ঘেঁষে চলছে নাবিলের ঘোড়া। মেঘের হলকায় ভিজে যাচ্ছে ওর চুল। নিচে সবুজ গ্রাম। মাঝে মাঝেই চোখে পড়ছে এঁকে বেঁকে বয়ে যাওয়া নদী। দূরে দেখা যাচ্ছে সুরম্য অট্টালিকা।
: ‘ওটা কোন রাজার প্রাসাদ?’ নাবিল জানতে চায়।
: ‘এটা রায় লক্ষ্মণ সেন রাজার প্রাসাদ।’ নাবিলের ঘোড়া বলল।
: আমরা এখন কোথায় আছি?
: আমরা এখন ৪০০ বছর পেছনে চলে এসেছি। এখন ১২০০ সাল। আমরা আছি রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজ্য লক্ষ্মণাবতীর রাজধানী নদীয়ায়।
: চল রাজ দরবারে যাই।
: ঠিক আছে, চলো।
রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজদরবার। মন্ত্রী-অমাত্যরা নিজ নিজ আসনে বসা। বড় বড় বইয়ের পৃষ্ঠা খুলে চিন্তামগ্ন গণক জ্যোতিষীরা। কারো মুখে কোনো কথা নেই। গম্ভীর মুখে রায় লক্ষ্মণ সেন জানতে চাইলেন: জ্যোতিষীগণ, চুপ করে আছেন কেন?
‘মহারাজ। ভয়ঙ্কর বিপদ! এ বিপদের কথা বলতে ভয়ে বুক কাঁপছে।’ বিশাল ঝটাধারী এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন।
: অভয় দিচ্ছি। সত্য যত নির্মমই হোক, প্রকাশ করুন। রাজা বললেন।
: অচিরেই আপনার এ রাজ্য তুর্কিস্তানের এক সেনাপতি আক্রমণ করবে।
: এ কথা বলতে এত ভয় কেন? আমার বিশাল সৈন্যবাহিনী আছে। হস্তীসেনা, হ্রষসেনা, পদাতিক সেনা কিসের অভাব আমার। প্রয়োজনে আরো সৈন্য সংগ্রহ করবো।
: মহারাজ এতে রক্তক্ষয় ছাড়া কোনো লাভ হবে না।
: কারণ আপনার ভাগ্যলিপি বলছে, আপনি তার হাতে পরাজিত হবেন। যুদ্ধ করলে রক্তের বন্যা বয়ে যাবে, তা ছাড়া কোনো লাভ হবে না।
: ‘সেই তুর্কি বীরের কোনো বিশেষ চিহ্ন আপনারা দেখতে পাচ্ছেন কি? যা দেখে তাকে আমরা চিনতে পাব?’ রাজা লক্ষ্মণ সেন জানতে চান।
: ‘আছে।’ ব্রাহ্মণ বলেন।
: সেই সেনাপতি দাঁড়ালে তার হাত হাঁটু পর্যন্ত লম্বা হবে।

৫.
রাজা লক্ষ্মণ সেনের দরবারের এ পরিবেশ নাবিলের ভালো লাগছে না। তার ঘোড়াকে সে বলল : বাংলাদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার নায়ক মালিক ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীকে দেখতে ইচ্ছে করছে।
: ‘চলো। তোমার স্বপ্নের নায়কের কাছে।’
রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজদবরার থেকে বের হয়ে আবার আকাশে পাখা মেললো নাবিলের ঘোড়া। ওপরে নীল আকাশ। নিচে সবুজের অপরূপ সমারোহ। আম জাম, নারকেল, সুপারি, জাম, জামরুল, দেবদারু গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ফসলের মাঠে কাজে ব্যস্ত চাষিরা। ঐ যে দূরে ধুলো উড়ছে। বিশাল এক সেনাবাহিনী এদিকেই আসছে। কিন্তু ওরা কারা? সামনে ক্ষুদ্র বাহিনীর একটি দল এক ধনী কৃষকের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? ওরা কি তস্কর, না কী? কিন্তু না দেখে তেমন মনে হয় না। তাহলে ওরা কারা? নাবিল ভালো করে লক্ষ করলো, সতেরো জন ঘোড়সওয়ার রাস্তার পাশের এক কৃষকের বাড়ির বাইরের উঠানে গিয়ে থামলো।
দলের সরদার হাঁক ছাড়লো : ‘বাড়িতে কেউ আছেন, আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি, একটু পানি পান করাবেন। মশকের পানি শেষ হয়ে গেছে। যা সামান্য আছে, তাও গরম হয়ে গেছে, একটু ঠান্ডা পানি চাই।’ মাঝ বয়সী একজন অন্দর থেকে বের হলেন। তার সামনে ঘোড়সওয়ার রাজপুরুষদের দেখে তিনি সালাম জানিয়ে বললেন : ‘অপরাধ ক্ষমা করবেন, আপনাদের জন্য কী করতে পারি?’ ইসলামি কায়দায় সালাম দেয়ায় ঘোড়সওয়ারদের সরদার অবাক হলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, মুশরিক রাজার এ রাজত্বেও তাহলে দুই-এক ঘর বনেদি মুসলমান আছেন। তিনি এ দেশে আসা ইসলাম প্রচারকদেরকে (মোবাল্লিগ) মনে মনে ধন্যবাদ জানালেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শুকরিয়া আদায় করলেন। সালামের জবাব দিয়ে তিনি বললেন : আমি ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী। আমরা এই বাঙাল মুল্লুকে ইসলামের সাম্য ও ইনসাফের পতাকা উড়াতে এসেছি। এ কাজ প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের পবিত্র দায়িত্ব। সেই দায়িত্বই আমাদের এত দূর নিয়ে এসেছে। ভাই, আমরা পিপাসার্ত। দয়া করে আমাদেরকে একটু পানি পান করাবেন।
: ‘এতো মহান আল্লাহর হাজার শুকরিয়া। আপনাদের মতো মেহমানের খেদমত করার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছি।’ এ কথা বলে তিনি একজন চাকরকে ডাকলেন। চাকর গাছে উঠে ডাব পাড়লো। তিনি তাদেরকে ডাব কেটে পানি দিলেন। পানি বের করার পর ডাবের ভেতরের নরম নারকেলশাঁস বের করে খেতে দিলেন।
অবাক বিস্ময়ে বখতিয়ার বললেন : আলহামদুলিল্লাহ। এত নিয়ামতে ভরা এ বাঙলা মুল্লুক। গাছে সুমিষ্ট পানি আর রুটি পাওয়া যায়। এত সহজ এখানে জীবন ধারণের ব্যবস্থা।
: ‘আলহামদুলিল্লাহ। সব মহান আল্লাহর দয়া।’ মেজবান বললেন।
: আমার জন্মভূমি তুর্কিস্তানের মানুষকে কঠোর পরিশ্রম করে জীবনধারণ করতে হয়। সেখানে কাজের বড় অভাব। তাই তো কাজের সন্ধানে কত দেশ ঘুরে এখন আমি এই বাঙলা মুল্লুকে।
নাবিল ওর ঘোড়ার পিঠে বসে আড়াল থেকে তাদের কথা শুনতে ছিল। এবার আর ওর তর সইলো না। সে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে সালাম জানিয়ে বখতিয়ারের কাছে জানতে চাইলো : কোন কোন দেশ পেরিয়ে আপনি বঙ্গদেশে এসেছেন।
: বালক, তোমার আগ্রহ দেখে আমি মুগ্ধ। তোমার ঘোড়ায় তুমি যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে ভ্রমণে বের হয়েছো, তা সফল হোক। এখন শোন, তুমি যা জানতে চেয়েছো তার উত্তর, কাজের সন্ধানে প্রথমে আমি আসি গজনী, তারপর ভারতের বাদাউন। আমার আজীবন স্বপ্ন ছিল কোন মহান মুসলিম শাসকের সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ্যতা প্রমাণ করার। দিল্লি ও গজনী অধিপতির অধীনে চাকরির আবেদন করি। কিন্তু তারা আমায় ফিরিয়ে দেন। কারণ আমার অস্বাভাবিক দৈহিক গঠন। দেহের তুলনায় আমার হাত দু’টি বেশি বড়। অবশেষে আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার স্বপ্ন পূরণ হয়। বাদাউনের সিপাহসালার আমার সাহসিকতা, অসি চালানো এবং ঘোড়া চালানো দেখে বুঝতে পারেন দৈহিক গঠন কোন সমস্যা নয়। প্রবল ইচ্ছাশক্তি দিয়ে জয়ের মুকুট ছিনিয়ে আনার যোগ্যতা আমার আছে। আমার সুনাম আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। অযোধ্যার শাসনকর্তা মালিক মুয়াজ্জম হিসামউদ্দীন আমাকে তার দু’টি পরগণার জায়গিরদার নিযুক্ত করেন। এ দুটি পরগণার নাম তোমাদের ঐতিহাসিকরা কেউ লিখেছেন, ভগবৎ ও ডোহালি, কেউ সহলন্ড ও সহিলী বা কম্পিলা ও পতিয়ালি। ঐতিহাসিক গোলাম হোসেন সলিমী তার লেখা রিয়াযুস্ সালাতিনে লিখেছেন কম্পিলা ও বেতালি।
: নামে কী আসে যায়, নাম তো পরিবর্তনশীল। এই তো আমাদের এ দেশের কত নাম ছিল, বঙ্গদেশ, বাঙ্গাল মুল্লুক, বঙ্গ, বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান। এখন বাংলাদেশ। দু’টি পরগণা পেয়েছিলেন এটাই হলো বড় সত্য।
নাবিলের কথা শুনে বখতিয়ার বললেন : তুমি তো খুব বুদ্ধিমান বালক।

৬.
নাবিল তার ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ইতিহাসের অলি-গলিতে ভ্রমণ করার সুযোগ পেয়ে খুব খুশি। সে ভাবছে। টাইম মেশিন নামের এ আজব যন্ত্রের গল্প সে অনেক শুনেছে। বাহ! কী মজার ব্যাপার নাবিল নিজেই এখন টাইম মেশিনের মালিক। সে ভাবছে, ইখতিয়ার উদ্দীন বখতিয়ার খিলজীর সাথে তো দেখা হলো, তার অভিযানটাও এবার দেখবো কী মজা! নাবিলের মনোভাব বুঝতে পেরে ঘোড়া বলল : ‘তাহলে আর দেরি কেন? চলি।’
নাবিল বলল, ‘চলো’।
বখতিয়ারের সাথের অন্য সৈনিকরা এখনো অনেক পেছনে। কিন্তু তিনি ভাবছেন, যে দেশে এত সহজে রুজি রোজগার সম্ভব। গাছে রুটি আর পানি পাওয়া যায়, সে দেশের মানুষরা খুব বেশি পরিশ্রমী হওয়ার কথা নয়। তিনি তাঁর সাথের মাত্র ১৭ জন সৈনিক নিয়েই রাজা লক্ষ্মণ সেনের প্রাসাদের দিকে ঘোড়া ছুটালেন। রাজার কাছে বখতিয়ারের আগমনের খবর আগেই পৌঁছে গেছে। লক্ষ্মণ সেনের গুপ্তচর বাহিনীর প্রধান তার কাছে বখতিয়ারের দৈহিক গঠনের বর্ণনা দিয়েছেন। বর্ণনা শোনে রাজার জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণীর কথা বার বার মনে পড়ছে। ভয়ে তার আত্মা কাঁপছে। তিনি ভাবছেন, রক্তক্ষয় ছাড়া এ যুদ্ধে কোন লাভ হবে না। তা ছাড়া, তুর্কি সেনাপতি মালিক ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর প্রতি দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দীন আইবেকের পূর্ণ সমর্থন আছে। ইতোমধ্যে তিনি সমগ্র বিহার তার শাসনাধীনে নিয়েছেন।’
টগবগ টগবগ করে বখতিয়ারের ঘোড়া ছুটে চলছে বাংলার রাঢ় ও বরেন্দ্র অঞ্চল নিয়ে গঠিত লক্ষ্মণ সেনের লক্ষ্মণাবতীর দিকে। এই রাজ্যের রাজধানী নদীয়ায়। কিন্তু রাজধানীসহ লক্ষ্মণ সেনের সমগ্র রাজ্য লক্ষ্মণাবতী নামেই পরিচিত। এ রাজ্যে বখতিয়ার খিলজীর অভিযানের খবর আসার সাথে সাথে ব্রাহ্মণ-পন্ডিত, ভূস্বামীরা রাজার দিকে সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে দেশত্যাগ করে আশপাশের জগন্নাথ, কামরূপ ও অন্যান্য আশপাশের রাজ্যে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। কিন্তু রাজত্ব আর রাজধানীর মায়ায় রাজা তার কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচর নিয়ে রাজধানীতেই অবস্থান করছিলেন। যদি ভাগ্যগুণে কোনক্রমে রাজত্ব টিকে যায়, এমন আশা তার মনে। একদিকে জীবনের ভয় আরেক দিকে রাজত্ব। শেষ পর্যন্ত তুর্কি বীরসেনাপতি প্রাসাদ আক্রমণ করলে যেন দ্রুত পালাতে পারেন, লক্ষ্মণ সেন সে ব্যবস্থাও করে রেখেছিলেন। প্রাসাদের গোপন দরজার শেষ প্রান্তে নদী। তিনি এই নদীতে নৌকা প্রস্তুত রেখেছিলেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের কথা বিফলে যাবে না, তারা শাস্ত্র অধ্যয়ন করে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান দেখে বলেছেন, এ রাজ্য আর তার অধীনে থাকছে না। তবে কেন বৃথা রক্ত ক্ষয়? কেন মিছিমিছি যুদ্ধ করে প্রাণ হারাবেন?
আল্লাহু আকবর! আল্লাহু আকবর! ধ্বনিতে কেঁপে উঠলো লক্ষ্মণাবতী। পথের ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলছে বখতিয়ার আর তার সাথের ১৭ জন ঘোড়সওয়ার সৈনিক। রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে নতুন রাজার আগমনকে স্বাগত জানাচ্ছেন নদীয়ার জনগণ। তারা জানে, রাজ্যের রাজা আর লক্ষ্মণ সেন থাকছেন না। জ্যোতিষ পন্ডিতদের ভবিষ্যদ্বাণীর খবর তারাও ইতোমধ্যে জেনে গেছে। লক্ষ্মণ সেনের বর্ণবাদী শাসনের অবসানে খুশি রাজ্যের সাধারণ প্রজারা। হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান প্রজারা দলে দলে ছুটে আসছে বরণডালা নিয়ে বীর বখতিয়ারকে বরণ করতে। সেনরাজাদের অত্যাচারে এতদিন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বন-জঙ্গলে পালিয়েছিলেন, তারাও রাস্তায় নেমে এলেন। রাজপ্রাসাদের ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে লক্ষ্মণ সেন পেছনের খিড়কি দিয়ে নৌকায় উঠলেন। নৌকা ছুটে চললো বিক্রমপুরের দিকে। বখতিয়ার খিলজী লক্ষ্মণ সেনের পিছু নিলেন না। এটা তার নীতি নয়। তিনি কখনো প্রাণ ভয়ে পালানো কোন সৈনিকের পিছু নেন না। তিনি মনে করেন, যুদ্ধ হয় বীরের সাথে বীরের, কোন কাপুরুষের সাথে যুদ্ধ করা বীরের ধর্ম নয়।

৭.
১৫৯৬ খ্রিষ্টাব্দের মহাকালের মহাসড়ক। নাবিলের ঘোড়া ছুটছে। সে মহাকালের অলিগলি পেরিয়ে চলছে। সময়ের এ রাজপথের অভিযাত্রী হওয়ার আগে নাবিলের ধারণাই ছিল না, এই পথ ধরে সত্যি সত্যি এত দ্রুত ছুটে চলা যায়। নাবিল ভাবতো টাইম-মেশিন বিষয়টি পুরোটাই কল্পনা। কিন্তু আজ সত্যি সত্যি প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধ নগর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ, হাট বাজারের পাশ দিয়ে ঘোড়ার খুরে টগবগ টগবগ আওয়াজ তুলে ছুটছে নাবিলের ঘোড়া। যাত্রাপথের দৃশ্য দেখছে দু’চোখ ভরে। নদী-বন্দরে বাঁধা বড় বড় মহাজনী নৌকা, পাল তুলে চলছে ছোট বড় নানান আকারের ডিঙি নাও। মাঝিরা মনের সুখে ভাটিয়ালি গান গাইছে। ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে রাস্তা দিয়ে চলছে গরুর গাড়ি, গাড়িতে ধান পাট সরিষার বোঝা, ছই টানা গাড়িতে যাচ্ছে গ্রামের বউ-ঝিরা, টমটম হাঁকিয়ে চলছে রাজা-জমিদারের লোকজন, পাশে বর্শা নিয়ে টগবগিয়ে চলছে আরবীয় ঘোড়সওয়ার সিপাইয়ের দল, কেউ বা চলছে পায়ে হেঁটে, কারো মাথায়, কারো কাঁধে বোঝা। নদীর তীরে, রাস্তার ধারে সারি সারি সাজানো বাড়ি-ঘর, ফসলের মাঠ, ফলমূল আর নানান জাতের বৃক্ষের বাগান।
চলতে চলতে চোখ জুড়ানো এমন দৃশ্য দেখে নাবিলের মন আটকে যায়। বা! কী সুন্দর! কল কল ঢেউ তুলে ছুটে চলতে চলতে দু’টি নদী এসে মিলেছে এক মোহনায়। এই সুন্দরের আকর্ষণে বাঁধা পড়ে তার মন। সে ঘোড়ার লাগাম ধরে টান দেয়। থমকে দাঁড়ায় তার ঘোড়া। নাবিল বলে, ‘একটু বিশ্রাম নিলে কেমন হয়।’
‘খুব ভালো হয়। এ নগরের নাম কী, জান?’ নাবিলের কথায় সায় দিয়ে ঘোড়া প্রশ্ন করে।
‘না।’ নাবিল উত্তর দেয়।
‘এর নাম টোকনগর, মোগল সম্রাট আকবরের বিখ্যাত সেনাপতি মানসিংহের রাজধানী।’ ঘোড়া উত্তর দেয়।
নাবিলকে দেখে শুভ্রকেশের একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এসে বলেন, ‘বাবা, তোমাকে বড় বেশি অচেনা মনে হয়, তুমি কি বিদেশী কোন পর্যটক?’
‘আমি ঠিক বিদেশী নই দাদু, তবে বিসময়ী বলতে পারেন?’ নাবিল বলে।
‘বিসময়ী, এমন কোন শব্দ অভিধানে আছে বলে তো আমার মনে হয় না।’ চোখ কপালে তুলে বৃদ্ধ প্রশ্ন করেন।
‘অভিধানে আছে কিনা জানি না, তবে কি জানেন, আমি এ সময়ের লোক নই। বিদেশের কেউ এদেশে এলে যদি তাকে বিদেশী বলেন, তাহলে অন্য সময়ের কেউ আপনার সময়ে ভ্রমণ করতে এলে তাকে বিসময়ী বললে কি ভুল বলা হবে।’ নাবিল বলে।
‘বা! তুমি তো খুব বুদ্ধিমান ছেলে। তা তুমি কোন সময় থেকে এসেছো?’ বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করেন।
‘আমি একবিংশ শতাব্দী থেকে এসেছি।’ নাবিল উত্তর দেয়।
‘এবার বুঝতে পেরেছি, তুমি ইতিহাসের স্বপ্নচারীছাত্র, খুব ভালো। তুমি ঠিক জায়গায় ঘোড়া থেকে নেমেছো।’ বৃদ্ধের কথা শোনে নাবিল জানতে চায়, ‘ঠিক জায়গায় মানে, ঠিক বুঝতে পারলাম না।’
বৃদ্ধ বলেন, ‘তাহলে শোন, এই গ্রামের নাম টোকনগর, হ্যাঁ গ্রামই বটে। অবশ্য এটি এখন আর গ্রাম নয়, মোগল সম্রাট আকবরের বিখ্যাত সেনাপতি মানসিংহের রাজধানী টোকনগর। ১৫৯৬ সালে রাজস্থান থেকে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরের এই টোকনগরেই রাজা মানসিংহ তার রাজধানী স্থানান্তর করেন। এর অবস্থান তোমাদের একবিংশ শতাব্দীর গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার উত্তর-পূর্বাংশে। এখানে এসে মিলেছে ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদ। ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ তীরে টাঙ্গার গ্রাম ও টোকনগর। ব্রহ্মপুত্র নদের অপর পাড়ে ঈসা খাঁর বিখ্যাত দুর্গ এগারসিন্দু।’
‘তিনি কেন রাজস্থান থেকে বাংলা মুল্লুকের এই স্থানে রাজধানী স্থানান্তর করেছিলেন?’ নাবিল জানতে চায়।
‘বাংলার বারোজন জমিদার আকবরের মতো পরাক্রমশালী মোগল সম্রাটের অধীনতা অস্বীকার করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। ঈসা খাঁ ছিলেন এই বারোজন জমিদার বা বারো ভুঁইয়াদের নেতা। তাকে বশে আনতে পারলে বাংলা মুল্লুকে মোগলদের পুরোপুরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সহজ হবে…’ বৃদ্ধের কথা শেষ হওয়ার আগেই নাবিল বলে, ‘ বুঝতে পারলাম দাদু।’
বৃদ্ধ বলেন, ‘তারপর কী হলো শোন।’
‘বলুন।’ নাবিলের কথা শেষ হলে বৃদ্ধ শুরু করেন, ‘একদিন ঈসা খাঁর অনুপস্থিতিতে মানসিংহ এগারোসিন্দুর আক্রমণ করলেন। সংবাদ পেয়ে ঈসা খাঁ দুর্গ রক্ষায় ছুটে এলেন। কিন্তু তার সৈন্যরা এতোই ক্লান্ত ছিল যে, তারা পরাক্রমশালী মোগল সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানালো। ঈসা খাঁ মানসিংহকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহ্বান করলেন। মানসিংহ এ প্রস্তাবে রাজি হলেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে মানসিংহের তরবারি ভেঙে গেলে ঈসা খাঁ তাকে আঘাত না করে নিজের তরবারি মানসিংহকে দিলেন। কিন্তু মানসিংহ তরবারি না নিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে এলেন। ঈসা খাঁ তখনও মানসিংহকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করলেন। কিন্তু মানসিংহ তা গ্রহণ না করে ঈসা খাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করেন। তার সাহস ও মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। মানসিংহ ঈসা খাঁকে নিয়ে সম্রাট আকবরের দরবারে গেলে, তিনি ঈসা খাঁকে ২২ পরগনার শাসক নিয়োগ করেন এবং মসনদ-ই আলা উপাধিতে ভূষিত করে বাংলা মুল্লুকে পাঠালেন।’ কথা শেষ করে বৃদ্ধ নাবিলকে প্রশ্ন করেন, ‘তোমাদের একবিংশ শতাব্দীতে এগারোসিন্দুরের অবস্থান কোথায় জান?’
নাবিল বলে, ‘জানি, এটি কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজলোর এগারসন্দিুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম, ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব তীরে এর অবস্থান। এর উল্টা পাড় হতেই বানার নদীর উৎপত্তি। অপর পাড়ে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলা।’
বৃদ্ধ বলেন,‘ বহুত আচ্ছা, বহুত আচ্ছা।’
নাবিল বলল, ‘গোস্তাকি মাফ করবেন, আমি একটু মসনদ-ই আলা ঈসা খাঁর সাথে দেখা করতে চাই।’
বৃদ্ধ মুচকি হেসে নাবিলকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘এত কষ্ট করে মহাকাল পেরিয়ে এসে শুধু দেখা কেন, বুকের উষ্ণতাও নিয়ে যাও। [চলবে]

SHARE

Leave a Reply