Home ভ্রমণ কাপ্তাই লেক পাড়ি দিয়ে সাজেক উপত্যকা -ওয়াহিদ জামান

কাপ্তাই লেক পাড়ি দিয়ে সাজেক উপত্যকা -ওয়াহিদ জামান

বাংলাদেশ আমাদের দেশ। প্রিয় মাতৃভূমি। ভালোবাসি সবাই। ভালোবাসি খুউব। এ দেশের পরতে পরতে রূপের বাহার। ঢেউ খেলানো নদী, নীল সমুদ্দুর, সুউচ্চ পাহাড়, সবুজ বনভূমি, চোখ জুড়ানো ফসলের মাঠ, আঁকাবাঁকা মেঠোপথ। কী নেই এ দেশে? সব সুন্দরের সমাবেশ এখানে। জন্ম থেকেই দেখছি। হাঁটছি এদেশের পথে পথে। মুগ্ধতায় চোখ ফেরাতে পারি না। বাঁক ঘুরেই হই অভিভূত। তাই বলতেই পারি- জন্ম থেকে ভালোবাসার শুরু হলেও দেখে দেখে সে ভালোবাসা হয়েছে পোক্ত। তখন ২০১১ সালের শীতকাল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম সারা বাংলাদেশ ঘুরে দেখার। তারপর শুরু। সুযোগ পেলেই কোথাও না কোথাও। প্রতি বছরই যুক্ত হয় নতুন নতুন স্থান। এভাবেই শেষ করেছি বায়ান্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থানগুলো। এরপর লম্বা বিরতি। দু’বছর যেতে পারিনি কোথাও। সময় আর সুযোগের সমন্বয় ঘটেনি একদম। মানসিক পীড়ায় ভুগেছি খুব। অবশেষে ২০১৮-এর শুরুতেই এলো ঘোষণা। এ বছর আমাদের অফিস থেকেই যাচ্ছি ভ্রমণে। বাংলাদেশের বিখ্যাত ভ্রমণস্পট সাজেক ভ্যালিতে।
তিন দিন তিন রাতের আয়োজন। অভিজ্ঞদের পরামর্শে করা হয়েছে সুবিন্যস্ত পরিকল্পনা। তা ছাড়া পথে পথে থাকবেন পরিচিত গাইডও। আমরা যাচ্ছি ঢাকা থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম। তারপর বাসে রাঙ্গামাটি। এক রাত হোটেলে থেকে ট্যুরিস্ট বোটে কাপ্তাই লেক পাড়ি দিয়ে লংগদু উপজেলা। সেখান থেকে চান্দের গাড়িতে আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ পেরিয়ে সাজেক উপত্যকা। এক রাত থাকবো সেখানে। পরের দিন ফিরে আসবো খাগড়াছড়ি। তারপর রাতের গাড়িতেই ঢাকা। এই ছিল আমাদের পূর্বপরিকল্পনা।
কাক্সিক্ষত ১৩ মার্চ। মঙ্গলবার। সকাল থেকেই একে একে কমলাপুর রেলস্টেশনে আসতে শুরু করেছে সবাই। সকাল ৭টার মধ্যেই আসতে বলা হয়েছিল। যদিও ট্রেন ছাড়ার সময় ৭টা ৪৫ মিনিট। দুদিন আগেই টিকেট কাটা ছিল। মনির ভাইয়ের নেতৃত্বে তিনজনের টিম এই টিকেট কেটেছে। কিন্তু সমস্যা হলো- এক বগিতে সবার সিট পাওয়া যায়নি। কারণ, একজনের কাছে একটার বেশি টিকেট বিক্রি করে না এবং এক টিকেটে সর্বোচ্চ আসন থাকে চারটি। সুতরাং তিনজন লাইন দিয়ে টিকেট কাটতে পেরেছে তিনটি। যাতে আসন ছিল ১২টি। কিন্তু আমাদের আসন দরকার আরো ৪টি। অগত্যা আরেকবার লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে একজনকে। ততক্ষণে আগের বগির আসনসংখ্যা শেষ। টিকেট এলো অন্য বগির। উল্লেখ্য, পরিবহন বিভাগের দায়িত্ব ছিল আমার। স্টেশনে দাঁড়িয়ে যখন সিট বণ্টন হচ্ছে তখন ভিন্ন বগিতে কে কে যাবে তা নিয়ে চোখ চাওয়াচাওয়ি চলছিল। দ্বিধান্বিত ছিলাম আমি। এমন সময় রানা ভাই এগিয়ে এসে বললেন, আমি যাচ্ছি ওখানে। সাথে সাথে রাজি হলেন ফাহিম ভাই। তারপর আমি হাত ধরে টেনে নিলাম আজাহার ভাইকে। এভাবেই অন্য বগিতে আমরা চারজন। যথাসময়েই ছেড়ে দিল ট্রেন। ঝকঝকা ঝক ঝকঝকা ঝক…।
শোঁ শোঁ শব্দে বাতাস কেটে কেটে এগিয়ে চলছে ট্রেন। এসি বগির জানালা পথে চোখ। শহর নগর বন্দর পেরিয়ে গ্রাম। তারপর সবুজের সমারোহ। খাল বিল নদী নালা পলকে পলকে উধাও। বন থেকে পাহাড় সবই আছে এ পথে। আন্তনগর ট্রেনগুলো গুরুত্বপূর্ণ শহরে শহরে থামে। সে ধারাবাহিকতায় থামছে মাঝে মধ্যে। আবার গন্তব্য পানে ছুটছে। এর মধ্যে আমাদের অনলাইন গ্রুপে চলছে ছবি শেয়ারিং এবং মজার মজার কৌতুক চালাচালি। শৃঙ্খলা বিভাগের প্রধান ফাহিম ফয়সাল ভাই এই গ্রুপেই দিয়ে দিলেন তার নির্দেশনা। অফিস বিভাগের প্রধান ইমাম হোসেন ভাই একটি ছবির সাথে অভিযোগ দিলেন- তোফাজ্জল ভাইয়ের কারণে সিটে জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। তারপর হাসির রোল পড়ে গেল। হঠাৎ করেই মেসেজ এলো আমাদের ভ্রমণ ব্যবস্থাপক সালাহউদ্দিন আইউবী ভাইয়ের। দুঃখজনক যে তিনি অসুস্থতার কারণে আমাদের সাথে আসতে পারেননি। তিনি আমাদের নানাবিধ খোঁজখবর নিলেন। খোঁজ নিলেন খাবারের। তখনই মনে পড়লো সকালের খাবার খাওয়া হয়নি আমাদের। প্যাকেটজাত ডিম খিচুড়ি নিয়ে উঠেছিলাম আমরা। একদিন আগেই হোটেলে অর্ডার করা ছিল। মনির ভাই এবং ফাহিম ভাই সেগুলো নিয়ে এসেছেন। অতএব শুরু হলো খাইদাই। খাবারটা বেশ ভালোই ছিল। পরিমাণেও ছিল অনেক। মাঝে মধ্যে এ-বগি ও-বগি ঘোরাঘুরি করছি আমরা। একপর্যায়ে বেলাল ভাইকে সাথে নিয়ে ইমাম ভাই এলেন আমাদের বগিতে। জমে উঠলো আড্ডা। অর্ডার করলাম চায়ের, দিয়ে গেল কফি। তারপর গ্রুপে জানিয়ে দেয়া হলো এখন চা-পর্ব। কিন্তু সবাই চা না পেয়ে কফিই খেলেন। কিছুক্ষণ থেকে চলে গেলেন ইমাম ভাই। তখন এলো নাহিদ জিবরান, কিশোরকণ্ঠ সম্পাদক কবি মোশাররফ হোসেন খানের একমাত্র ছেলে। সে আমাদের ভ্রমণের অন্যতম সহযাত্রী। সে সময় আমরা চিপ্স কিনলাম। প্যাকেট খুলে দেখি চিপ্সের চেয়ে হাওয়া বেশি! মাঝে মধ্যেই আমাদের সার্বিক খোঁজখবর নিচ্ছেন কিশোরকণ্ঠ পরিবারের অভিভাবক প্রিয় কবি মোশাররফ হোসেন খান। ইমাম ভাইও তাঁকে মোবাইলে ছবি পাঠাচ্ছেন ক্ষণে ক্ষণে। আর এরই মধ্যে অনলাইন গ্রুপে কবি হয়ে উঠেছেন অনেকে। ছড়ার পিঠে ছড়া চলছে অবিরাম। প্রকৃতির অপরূপ বর্ণনা থাকছে সেসব ছড়ায়। আল্লাহর প্রশংসারও কমতি ছিল না মোটেও। আর হ্যাঁ মধ্যে মধ্যে কিন্তু আমরা আপেল ও কমলা খেয়েছি সব্বাই মিলে। কেউ কেউ অবশ্য নাক ডেকে ঘুমও পেড়েছেন। সেসব ছবি ভাইরাল হয়েছে আমাদের গ্রুপে। মজাদার একটি ছবি তুলেছিলেন আমাদের ফটোগ্রাফার জামাল ভাই। ছবিতে বদনার গলায় লোহার শিকল। শিরোনাম ছিল- এ দেশে একটি বদনাও নিরাপদ নয়। এভাবেই আনন্দ আড্ডায় আমাদের ট্রেন ছুটে চলেছে চট্টগ্রামের পথে। তবে একটু ধীরগতিতেই। যে কারণে নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় দু’ঘণ্টা পরে আমরা পৌঁছেছি। চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে যখন আমরা নামলাম তখন সময় আড়াইটা পেরিয়ে গেছে। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন চট্টগ্রামের রশিদ ভাই। স্টেশন থেকে বেরিয়ে আমরা গ্রুপ ছবি তুললাম। এটিই আমাদের ভ্রমণের প্রথম গ্রুপ ফটো।
রশিদ ভাই আমাদের নিয়ে গেলেন পার্শ্ববর্তী হোটেলে। দুপুরের খাবারের জন্য আগে থেকেই বলা ছিল। কিন্তু ঐ হোটেলে গিয়ে দেখা গেল বসার মতো কোন সিট খালি নেই। বাধ্য হয়ে তার পাশের হোটেলে যেতে হলো আমাদের। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে সবার। টেবিলে ভাত দিয়েছে তো তরকারি দেয় না। গরম করে তবেই দেবে। বুঝতে বাকি রইলো না আগের তরকারি খেতে হবে আমাদের। খেলামও চুপচাপ। হালকা হালকা নষ্ট হলেও খাবার অযোগ্য ছিল না। খাওয়া শেষে হেঁটে হেঁটে গেলাম নিউ মার্কেট মোড়ে। সেখান থেকে মিনি বাস রিজার্ভ করে যেতে হবে চট্টগ্রাম অক্সিজেন মোড়ে। বাস রিজার্ভ করতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হলো আমাদের। স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ভাড়া চাইতে লাগলো সবাই। অবশেষে স্থানীয় ভাইদের সহায়তায় মোটামুটি সহনীয় ভাড়ায় পেয়ে গেলাম একটি বাস। বাসে বসে চট্টগ্রাম শহর দেখতে থাকলাম আমরা। চট্টগ্রামের অনেকগুলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আমার নামে। সেটা নিয়ে খুব হাসি ঠাট্টা হলো। এভাবে মজা করতে করতে আমরা পৌঁছুলাম অক্সিজেন মোড়ে। বাস থেকে নেমেই পার্শ্ববর্তী মসজিদে গেলাম। হালকা ফ্রেশ হয়ে জোহর এবং আসরের কসর নামাজ আদায় করলাম সবাই। তারপর টিকেট কেটে রাঙ্গামাটির উদ্দেশে রওনা হলাম। বাসের টিকেট আগে থেকেই বিক্রি শেষ হওয়ায় আমাদের আসন পড়লো পেছনের দিকে। যদিও রাস্তা ভালো থাকায় খুব বেশি সমস্যা হয়নি।
চট্টগ্রামের রাস্তায় ধুলাবালি বেশ। তবে যানজট কম থাকায় অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের বাস শহর এলাকা ছাড়তে পারলো। বাসের খোলা জানালা দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দে বাতাস ঢুকে আমাদের অক্সিজেনের ঘাটতি পূরণ হতে থাকলো। উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম থেকে রাঙ্গামাটির সড়ক পথের দূরত্ব ৭৮ কিলোমিটার। সারা দেশের রাস্তাঘাটের অবস্থা বেহাল হলেও এ রাস্তাটিকে মোটামুটি ভালোই বলা যায়। যাই হোক, কিছুদূর যেতেই শুরু হলো উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ। বাঁক ঘুরতেই আবার বাঁক। এর মধ্যেও আমাদের বাসচালক বেশ দ্রুতগতিতেই গাড়ি চালাচ্ছেন। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় দুরু দুরু কাঁপছে সবাই। হঠাৎ-ই শুরু হলো বৃষ্টি। সাথে দমকা বাতাস। চালকের এসবে কোনো খেয়াল নেই। আসলে সে অভ্যস্ত। যাক, আল্লাহর মেহেরবানিতে কোনো বিপদ আপদ ছাড়াই সন্ধ্যা ৭টার দিকে আমরা রাঙ্গামাটি শহরে পৌঁছলাম। কাপ্তাই লেকের মধ্য দিয়ে পিচঢালা রাস্তা। মাঝেমাঝে ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট। একটু পর পর গাড়ি থামছে আর যাত্রী নামছে। আমরা আমাদের ব্যাগ-পত্র গুছিয়ে নামার জন্য প্রস্তুত। এমন সময় হেলপার ডাক দিলেন- দোয়েল চত্বর, দোয়েল চত্বর…। আমরা আস্তে ধীরে নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে। চারিদিকে শান্ত প্রকৃতি, ঠাণ্ডা বাতাস। সেখান থেকে অকৃপণভাবে অফুরন্ত নির্মল বায়ু সেবন করে নিলাম। শান্ত হলো দেহ। জুড়িয়ে গেল প্রাণ। আহ! কী প্রশান্তি!
দোয়েল চত্বরের পাশেই আমাদের হোটেল। হোটেল প্রিন্স। আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছেন সামসুদ্দিন ভাই। তিনি আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। নিয়ে গেলেন দোতলায়। একটা কক্ষ খোলা ছিল। সেখানে গিয়েই থপাস করে বসে পড়লাম খাটে। তারপর কক্ষ বরাদ্দ এলো। আমি, নাহিদ এবং বেলাল ভাই এক রুমে। চাবি নিয়ে চলে গেলাম। ফ্রেশ হয়ে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করলাম। তারপর এ-রুম ও-রুম ঘোরাঘুরি করে গল্পে মাতলাম আমাদের সিনিয়র ভাই আবুল কালামের সাথে। আবুল কালাম, এনামুল ভাই, মোস্তফা ভাই এবং আমিনুল ভাই এক রুমে। আমিনুল ভাই বাদে তারাই আমাদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতালব্ধ সদস্য। বিগত অনেক অফিসিয়াল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে তাদের। সেসব গল্প শুনলাম মনোযোগ দিয়ে। এরই মধ্যে চলে এলো হালকা নাশতা। নেক্সাস বিস্কুট আর পাহাড়ি কলা। দারুণ স্বাদের পাহাড়ি কলা। নাশতা শেষে বের হলাম রাস্তায়। রাতের রাঙ্গামাটির সৌন্দর্য সত্যিই অসাধারণ। চারিদিকে পানি আর পানি। মাঝে মধ্যে আলোজ্বলা বাড়ি-ঘর। রাস্তায় দ্রুতগতিতে ছুটে চলা মোটর যান। মজার বিষয় এ শহরে কোনো রিকশা নেই। থাকবেই বা কেন? এত উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তায় তো রিকশা চালানো সম্ভব না। জেনে রাখা ভালো- রাঙ্গামাটি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ জেলা। এটি বাংলাদেশের একমাত্র জেলা, যার সাথে ভারত ও মিয়ানমার দুটি দেশেরই আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে। রাঙ্গামাটি ১০টি উপজেলা, ১২টি থানা ও ২টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এখানে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ প্রায় ১৫টি উপজাতি জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম পানিপথ। যাক সেসব। বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যার পর পরিচ্ছন্ন রাত। রাস্তায় হাঁটছি আমরা তিনজন। অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছি প্রতিক্ষণ। মন চাচ্ছেÑ সারা রাত এভাবেই কাটিয়ে দিতে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আগেই জানিয়েছে রাতের খাবার ৯টার সময়। তাই হাতে আর সময় না থাকায় ফিরতে হলো হোটেলে। রুমে না ঢুকে সরাসরি চলে গেলাম চারতলার রেস্টুরেন্টে। আমাদের জন্য স্পেশাল রান্না হয়েছে। কাপ্তাই লেকের বাচা মাছ। আহ! সে কী স্বাদ! বলে বোঝানো যাবে না। আনন্দঘন পরিবেশে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে হোটেলের ছাদে একত্রিত হলাম সবাই। ছাদের রেলিং ধরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেলাম আমরা। ঝলকে উঠলো ক্যামেরা। ক্লিক ক্লিক শব্দ। একই ফ্রেমে আবদ্ধ হলাম আমরা। তারপর যার যার রুমে। ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর এলিয়ে দিলাম খাটে। একটি দিন পার হয়ে গেল। দুঃখের বিষয়, পৌঁছতে দেরি হওয়ার কারণে দুই দুটি দর্শনীয় স্থান বাদ পড়ে গেল। ঝুলন্ত ব্রিজ এবং রাজবন বিহার। এতটুকু অপূর্ণতা নিয়েই ঘুমিয়ে গেলাম আমরা।
১৪ মার্চ। বুধবার। ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন। বেশ আগেই ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে নিলাম। তারপর ফজরের নামাজ আদায় করলাম জামাতে। চলছে রুমে রুমে ডাকাডাকি। বের হতে হবে এখনই। অল্প সময়ের মধ্যেই হোটেল ছেড়ে বের হলাম আমরা। স্মৃতির ফ্রেমে হোটেলটাকেও রাখতে চাইলো সবাই। দুই সারিতে দাঁড়িয়ে গেলাম। দীর্ঘকায় যারা পেছনের সারিতে আর বাকিরা যথারীতি সামনে। প্রথমে ক্যামেরা ধরলেন জামাল ভাই। তারপর তোফাজ্জল ভাই। গ্রুপ ছবির পর আমরা অবস্থান করছি দোয়েল চত্বরে। ট্যুরিস্ট বোটের জন্য অপেক্ষা করছি। বিক্ষিপ্তভাবে ঘোরাফেরা আর ফটোশেসন চলছে। সিঙ্গেল এবং ডুয়েল ফটোই তুলছে বেশি। আমিও অংশ নিলাম বেশ কিছু ছবিতে। তবে সেসব ছবির মধ্যে তুহিন ভাইয়ের সাথে তোলা ছবিটা শ্রেষ্ঠ বলাই যায়। দু’জনের প্রাণবন্ত হাসিতে ছবিটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ভেজা গামছা হাতেও ছবি তুলেছিলাম কিছু। সেগুলোও অসাধারণ শৈল্পিক। এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়েই কেটে গেল প্রায় ঘণ্টাখানেক। হালকা বিরক্তি ভাব সবার মধ্যে। নৌকা আসতে দেরি হচ্ছে। এ সময় ফোন দিলেন সামসুদ্দিন ভাই। বায়তুশ শরফের সামনের ঘাটে যেতে হবে আমাদের। মাল সামানা নিয়ে চললাম সবাই। দু-তিন মিনিটেই পৌঁছে গেলাম ঘাটে। উঠে পড়লাম ট্যুরিস্ট বোটে। ছেড়ে দিল বোট। কিছুদূর গিয়েই থামলো লঞ্চঘাটে। তেল নিতে হবে। মাঝি গেল তেল আনতে। আমরা নৌকার মধ্যেই আড্ডা দিচ্ছি। পাশের এক নৌকার ইঞ্জিনে সমস্যা। ভটভট শব্দে বারবার চালু করছে। বন্ধও হচ্ছে সাথে সাথে। কালো কালো ধোঁয়ায় আমাদের নৌকা ভরে গেল। বিচ্ছিরি এক অবস্থা! আলোচনায় এলো ইঞ্জিন। মানুষওতো এক ধরনের ইঞ্জিন। ট্রলারের ইঞ্জিনের মত ধোঁয়াও বের হয়, পানিও বের হয়। তবে সবসময় না। মাঝে মধ্যে। তা ছাড়া সে ধোঁয়ার গন্ধ থাকলেও কোন রঙ কিন্তু থাকে না। এই সাদৃশ্যের কথায় হাসিতে ফেটে পড়লো সবাই। এরই মধ্যে তেল নিয়ে ফিরে এলো মাঝি। চালু করলো বোট। কাপ্তাই লেকের বুক চিরে এগোতে থাকলাম আমরা।
কাপ্তাই লেক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম মনুষ্যসৃষ্ট স্বাদুপানির লেক। কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ১৯৫৬ সালে কর্ণফুলী নদীর ওপর কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা হলে রাঙ্গামাটি জেলার ৫৪ হাজার একর জমি ডুবে এ লেকের সৃষ্টি হয়। সাধারণত নদীর জোয়ারে ডুবে যায় ফসলি মাঠ, ঘর-বাড়ি। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য এখানে নদীই ডুবে গেছে। তাও একটা নয়। চার চারটা নদী ডুবে গেছে কাপ্তাই লেকে। পরিচিতজন ছাড়া কেউ বলতেই পারবে না নদীগুলোর গতিপথ কোথা থেকে কোথায়। এ প্রকল্পে ১৮০০ পরিবারের প্রায় ১ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি চাকমা রাজার রাজপ্রাসাদও তলিয়ে যায় লেকের পানিতে। তবে এর মাধ্যমেই এ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। তা ছাড়া একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ ও দীর্ঘ জলপথের সৃষ্টি হয়েছে। আগে যেখানে যেতে সারাদিন বা তারও বেশি লেগে যেত, এখন সেখানে স্রিড বোট বা লঞ্চে যেতে লাগছে মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময়। কৃষি উন্নয়নেও এর অবদান উল্লেখযোগ্য। বছরের বিভিন্ন মাসে পানির উচ্চতা ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায়, তীরবর্তী এলাকা এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় সেচসুবিধা লাভ করছে যা চাষের জন্য জমিকে খুব উর্বর করে তুলছে। মৎস্য উৎপাদনের মূল্যবান আধারও এটি। জলাধারের উৎপাদিত মাছ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও দেশের অন্যান্য এলাকায় চালান করা হয়। যাই হোক, আমাদের ট্যুরিস্ট বোট ভটভট শব্দে এগিয়ে চলছে। স্বচ্ছ পানির ছোট্ট ছোট্ট ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে নৌকার গায়ে। দেখে মনে হচ্ছে পাল্লা দিয়ে চুমু খেয়ে খেয়ে ফিরে যাচ্ছে হল্লা করে। গত রাতের বৃষ্টির কারণে আমাদের নৌকার ছাদ ভিজে আছে। ইচ্ছে হলেও উঠতে পারছি না ছাদে। ইতোমধ্যে সকালের নাশতা শুরু হয়ে গেছে। পরাটা, ডালভাজি এবং ডিম মামলেট। প্রচণ্ড রকমের ক্ষুধা লেগেছে সবার। স্বাদও হয়েছে খুব। তাই চলছেও বেশ। সাথে এনেছে এক কাঁদি পাহাড়ি কলা। যে যার মতো ছিঁড়ে ছিঁড়ে উজাড় করা সঙ্গীতসিক্ত প্রাণভরে খাচ্ছে। হঠাৎ-ই পূর্ব দিকে উঁকি দিলো রক্তিম সূর্য। লেকের পানিতে এসে পড়লো সোনালি রোদ্দুর। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুকিয়ে গেল আমাদের নৌকার ছাদ। একে একে উঠতে থাকলাম ছাদে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ। পাহাড়ে পাহাড়ে সবুজ বৃক্ষরাজি। পানিতে ভেসে চলা হরেক রকম নৌযান। সবমিলিয়ে নয়নাভিরাম দৃশ্য। মুগ্ধ হওয়ার মতোই। মুগ্ধ হয়েছিও আমরা। জেগে উঠেছে শিল্পী মন। গেয়ে উঠেছে গান। তাল মিলিয়েছি আমরা সবাই। জমে উঠেছে আড্ডা। তবে মাঝে মধ্যে ওভারওয়েট মানুষগুলোর জন্য নৌকা কাত হয়ে যাচ্ছে। হইচই করে ব্যালান্স আনতে গিয়ে দুলে উঠছে নৌকা। এভাবেই আনন্দ আড্ডায় এগিয়ে যাচ্ছি আমরা।
ঘণ্টা দুয়েক চলার পর আমাদের নজর কাড়লো পাহাড় চূড়ায় দাঁড়ানো বিরাট এক বুদ্ধমূর্তি। সোনালি রঙের মূর্তিটি যেন আমাদের অভ্যর্থনা করছে। এটি নির্বাণ নগর বনবিহার। ২৯ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার এ মূর্তিকে ঘিরে এখানে গড়ে উঠেছে বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আবাসিক এলাকা। ক্যামেরায় বেশ কিছু ক্লিক ক্লিক করে চললাম সম্মুখে। কিছুদূর যেতেই চোখে পড়লো- ‘স্বাগতম বরকল উপজেলা’। সাধারণত সড়ক পথে এ ধরনের লেখা দেখা যায়। কোন এলাকার শুরুতে স্বাগতম আর শেষে ধন্যবাদ। পানিপথেও যে এগুলো থাকে তা এই প্রথম দেখলাম। মেটালিক অক্ষরের লেখাগুলো পাহাড়েই খুঁটি গেড়ে বসানো হয়েছে। পাহাড়টির ওপরের দিকে মাটি থাকলেও নিচের দিকে কঠিন শিলা। সবুজ গাছপালায় ভরপুর পাহাড়টি। নান্দনিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পাহাড় যে কত রকমের তা এখানে না এলে বুঝতে পারতাম না। আরও খানিক যেতেই হাসান তারিক ভাই হাতের ইশারায় দেখালেন- এটাই সুবলং ঝরনা। যদিও তখন পানি ছিল না। এখানেই ভরা বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু থেকে পানি আছড়ে পড়ে মুগ্ধ করে পর্যটকদের। আগামীতে বর্ষাকালে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেই বিদায় নিতে হলো আমাদের। চলছে আমাদের ট্যুরিস্ট বোট। সামনে একটি বাঁক ঘুরেই থামলো আমাদের মাঝি। এটিই সুবলং পাহাড়ের পাদদেশ। ছোট্ট একটি বাজারও আছে এখানে। নাম সুবলং বাজার। সময় স্বল্পতায় পাহাড়ে ওঠায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলো। দু-একটা ছবি ওঠানো এবং হালকা ঘোরাফেরার জন্য সময় দেয়া হলো ১০ মিনিট। কিন্তু সবাই কি আর বাধা মানে! দু-তিনজন ঠিকই উঠে গেল পাহাড়ে। ১৮৬০ ফুট উচ্চতার সুবলং পাহাড় অল্পতেই কি জয় করা সম্ভব? সময় তো লাগবেই। এ সুযোগে আমরাও উঠলাম কিছুদূর। ফটোসেশন শেষে নেমে এলাম নিচে। সেনাবাহিনীর ছোট্ট একটা দোকান আছে এখানে। সেখানে পাওয়া গেল পাহাড়ি আনারস। আমাদের জামাল ভাই কাটতে থাকলেন। আর আমরা খেতে থাকলাম। দুর্দান্ত স্বাদ! ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব না। খেয়েই বুঝতে হবে। এখানে কখন যে আধা ঘণ্টা পার হয়ে গেছে আমরা বুঝতেই পারিনি। পাহাড় থেকে সবাই নেমে এলো। উঠলাম নৌকায়। গুনে দেখা গেল দু-তিন জন এখনো আসেনি। তার মধ্যে নাহিদ জিবরানও। নেমে এলাম ওকে খোঁজার জন্য। সুবলং বাজারের এ-মাথা ও-মাথা ঘুরেও পেলাম না ওকে। মধ্যে দেখা হলো ইয়াসিন মাহমুদ ভাইয়ের সাথে। উপজাতিদের এক দোকানে কেনাকাটা করছেন। ওনাকে সাথে নিয়ে ফিরে এলাম ঘাটে। তারপর অপেক্ষা আর অপেক্ষা। ১৮ মিনিট পরে ফিরে এলো নাহিদ। ইতোমধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেছে এখানে। ১০ মিনিটের জায়গায় ৬০ মিনিট! তারপর যথারীতি ট্যুরিস্ট বোটে। ভটভট ভট এবং ভটভট ভট…।
এখন সূর্য মাথার ওপর। নৌকার ছাদে বসার উপায় নেই। তাই নিচে বসেছি সবাই। এখানে ইঞ্জিনের শব্দটা ভয়ঙ্কর ডিস্টার্ব করছে আমাদের। কিন্তু কী আর করা! এর মধ্যেই গানের আসর জমিয়েছেন আজাহার ভাই। দারুণ সব মজাদার গান। চকোলেট, বিস্কুট, ভাজাভুজি যে যার মতো খাচ্ছে। কেউ কেউ এর মধ্যে ঘুমও পাড়ছে। লেকের পানিতে হাত ডুবিয়ে মজা করছি আমি। কোষ কোষ পানি ছিটিয়ে দিচ্ছি প্রিয়জনের গায়ে। আর লেকের পানিতে বিস্কুট ভিজিয়ে খাওয়া? আহ, সে কী মজা! এসবের মধ্যেও নৌকা চলছে তার আপন গতিতে। আমরা পৌঁছলাম কাট্টলি বিলে। অতিথি পাখির বিচরণ আর কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত কাট্টলি বিল। বিলের বিশাল জলরাশিতে ভেসে বেড়াচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে পানকৌড়ি, সারস, সাদাবকসহ নানা প্রজাতির পাখি। জলাভূমি আর নীল আকাশের নিচে নিঃশব্দেই জেগে আছে অনেকগুলো দ্বীপ। কাপ্তাই লেকের বিস্তৃত জলরাশির মাঝখানে এই দ্বীপগুলোতে গড়ে উঠেছে মানুষের বসতি। কাট্টলি শুধু বিল নয় এটি একটি দ্বীপগ্রামও। সবমিলিয়ে নৈসর্গিক দৃশ্য যাকে বলে! আল্লাহর অকৃত্রিম সৃষ্টি দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম লংগদু উপজেলা লঞ্চ ঘাটে। সেখানে নেমে গেলেন হাসান তারিক ভাই। ওনার বাড়ি এখানেই। আমাদের ভ্রমণ গাইড বলতে গেলে উনিই। আমাদের নৌকা আরও একটু সামনে গিয়ে রাবেতার ঘাটে থামলো। রাবেতার অর্থায়নে এখানে মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, স্কুল, রেস্ট হাউজসহ অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান আছে। হালকা ঘোরাঘুরি এবং ফটোসেশন শেষে আমরা আমাদের রিজার্ভকৃত চান্দের গাড়িতে উঠলাম।
এ গাড়ির ধারণক্ষমতা ১২-১৫ জন। কিন্তু দু’জন গাইড এবং ড্রাইভার, হেলপারসহ আমরা ২০ জন। অগত্যা ৫-৬ জনকে ছাদে উঠতে হলো। গাড়ি ছেড়ে দিলো। উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তা ধরে চলছে চান্দের গাড়ি। গাড়ির ছাদে সতর্কভাবে বসে আছেন উপরওয়ালারা। একটু ভুল হলেই ঘটে যেতে পারে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। আর ভেতরে যথারীতি গানের আসর। আমাদের সাথে যোগ দিয়েছেন মোস্তফা ভাই। সেই মিষ্টি গলা! কণ্ঠ শুনে বোঝার কায়দা নেই তার বয়স হয়েছে। চান্দের গাড়ির লোহার ফ্রেমে সারি সারি বস্তার মতো বসানো হয়েছে আমাদের। প্রতিটা ঝাঁকিই টের পাচ্ছে আমাদের শরীর। টের বললে ভুল হবে। যথারীতি আঘাত পাচ্ছি আমরা। করার কিছু নেই। ঘণ্টাখানেক চলার পর এক মসজিদের পাশে থামলো গাড়ি। সবাই নেমে পড়লাম। হালকা ফ্রেশ হয়ে জোহর ও আসরের কসর নামাজ আদায় করলাম। তারপর মসজিদের বারান্দায় সারিসারি বসে দুপুরের খাবার। লংগদু থেকেই প্যাকেট করে নিয়ে এসেছেন তারিক ভাই। সাদা ভাত, লেকের বড় মাছ, সবজি এবং বোতলে করে ডাল। পরিমাণেও অনেক। সবটুকু খাওয়া সম্ভব হয়নি আমার। খাওয়া শেষ করে যখন গাড়িতে উঠলাম তখন ঘড়িতে বাজে ২টা। ড্রাইভার খুব দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাচ্ছেন। বাঘাইহাট গিয়ে আর্মি এস্কর্ট ধরতে হবে। এখানকার সিস্টেম হলো- দিনে দুই বার আর্মিদের তত্ত্বাবধানে সকল গাড়ি একসাথে যেতে হয়। আঁকাবাঁকা সরু রাস্তা এবং নিরাপত্তার কারণে। সে জন্য বেলা আড়াইটার মধ্যে বাঘাইহাট পৌঁছানোর কথা। কিন্তু ওভার লোডের জন্য গাড়ি খুব একটা ভালো সার্ভিস দিতে পারছে না। গরম হয়ে বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ইঞ্জিনে পানি দিলে আবার কিছুক্ষণ চলছে। এভাবে আমরা যখন বাঘাইহাটে ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা ৩টা পেরিয়ে গেছে। আর্মি এস্কর্টও ছেড়ে গেছে। অজানা আশঙ্কায় সবার মুখে কালো ছাপ। সুবলং পাহাড়ে দেরির খেসারত হয়তো দিতে হবে।
এস্কর্ট! আমাদেরকে কি এস্কর্টের বেষ্টিনী দিয়ে গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হবে! ওয়াও! আমরা কি ভিআইপি হয়ে গেলাম! চিমটি কেটে নিজেদের অস্তিত্ব পরখ করতে মন চাইল কারো কারো। রোমান্স যেন নিজেদের অজান্তে কাতুকুতু দিতে এগিয়ে আসছে! আরে না তেমন কিছুই না। আসল কথা হলো গিয়ে পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং প্রকাশের লক্ষ্যে এই শিল্পকে আকর্ষণীয়, নির্ঝঞ্ঝাট, নিরাপদ রাখা, পর্যটকদের আকৃষ্ট করা এবং পর্যটন শিল্পকে প্রত্যাশিত শিল্প মানে উন্নীত করার জন্যই এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যবস্থাপনার আয়োজন।
গাড়ির ড্রাইভার এবং হাসান তারিক ভাই আর্মি চেকপোস্টে আলোচনার জন্য গেলেন। অনেক অনুরোধ করার পর অনুমতি মিললো। কিন্তু ছাদের সবাইকে নামতে হলো। গাড়ির মাঝের জায়গাতে গাদাগাদি করে বসলাম আমরা। পরপর অনেকগুলো চেকপোস্ট। আর্মি, বিজিবি, পুলিশ, আনসার। এক ক্যাম্পের পাশে আরেক ক্যাম্প। চেকপোস্টগুলো পেরিয়ে আবার ছাদে উঠলো ৫-৬ জন। গাড়ি শোঁ শোঁ শব্দে উঠে যাচ্ছে খাড়া পাহাড়ে। তারপর নামছে একদম গোড়ায়। এভাবে পাহাড় পেরিয়ে পাহাড়। এখানে কোন সমভূমি নেই বললেই চলে। মাঝে মধ্যে দু-একটা উপজাতি বাচ্চা হাত নেড়ে টা টা জানাচ্ছে। হৃদয়টা ভরে যাচ্ছে তখন। হঠাৎ-ই দুটো বাচ্চা ছুরি দেখিয়ে আমাদের মারার ইঙ্গিত দিল। বেশ আশ্চর্যান্বিত হলাম। পরে জানলাম ওরা ওভাবেই বেড়ে ওঠে। এখানকার উপজাতিরা অধিকাংশই নারীপ্রধান। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে বাড়ি-ঘরের সকল কাজকর্মই করে নারীরা। পুরুষদের কাজ হলো বসে বসে খাওয়া আর যুদ্ধ-বিগ্রহ করা। যদিও ইদানীং সে অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসছে তারা। পড়াশুনা করে সবার সাথে স্বাভাবিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত হচ্ছে। যাক সে সব। একটা উঁচু পাহাড় থেকে নেমে আমাদের গাড়ি বন্ধ হয়ে গেল। ড্রাইভার বললোÑ কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে গাড়িটাকে ঠাণ্ডা করে নেয়া দরকার। সবাই সম্মতি জানিয়ে গাড়ি থেকে নামলো। উপজাতিদের ছোট্ট দুটো দোকান আছে এখানে। একটা দোকানে শুয়োর পুড়িয়ে চামড়া ছুলছে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম আমরা। আরেকটা দোকানের পাশে বাঁশের তৈরি লম্বা একটা বেঞ্চ। সেখানে বসে আছে অনেকগুলো উপজাতি নারী-পুরুষ। তাদের সাথে কথা বললেন তুহিন ভাই। আচার-আচরণ, কৃষ্টি-কালচার নিয়ে। ছবিও তুললাম তাদের সাথে। ১৫-২০ মিনিট অপেক্ষা করে চালু হলো গাড়ি। এবার আমি উঠেছি চান্দের গাড়ির ছাদে। ওপরে ওপরে সাহসের পাহাড় দেখালেও ভেতরে ভেতরে কাঁপছি আমি। শক্ত করে ধরে আছি ছাদের রেলিং। গাড়ি যখন পাহাড়ে উঠছে দেহ তখন পেছনের দিকে ঝুঁকে আছে। হাত ছাড়লেই হবে চিৎপটাং। আবার যখন পাহাড় থেকে নামছে দেহ তখন সামনের দিকে। ভয় ঠেকাতে চোখ বন্ধ করে থাকছি মাঝে মধ্যে। এভাবে ২০-২৫ মিনিট চলার পরে আমরা পৌঁছলাম সাজেক ভ্যালির রুইলুই পাড়া।
কাক্সিক্ষত সাজেক। রুইলুই পাড়া, কংলাক পাড়া এবং মধ্যের হেলিপ্যাড এলাকা, এই নিয়েই সাজেক উপত্যকা। আমরা এখন আছি রুইলুই পাড়ায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭২০ ফুট ওপরে। চারিদিকে পাহাড় আর পাহাড়। মাঝে মধ্যে উপজাতিদের ঘর-বাড়ি। সাজেকে মূলত লুসাই, পাংখোয়া এবং ত্রিপুরা উপজাতি বসবাস করে। রাঙ্গামাটির অনেকটা অংশই দেখা যায় এখান থেকে। তাই সাজেক ভ্যালিকে রাঙ্গামাটির ছাদ বলা হয়। আমরা পাহাড়িকা হোটেলে উঠেছি। এটা হাসান তারিক ভাইয়ের চাচার হোটেল। কাঠের তৈরি দোতলা হোটেল। ইমাম ভাই আমাদের রুম বণ্টন করে দিলেন। আমি, রানা ভাই, আজাহার ভাই এবং নাহিদ এক রুমে। রুমে ঢুকে হালকা ফ্রেশ হয়ে নিলাম একে একে। অল্প একটু রেস্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। চারিদিকে শুধু ছবির ফ্রেম। ক্যামেরা ধরলেই সুন্দর দৃশ্য। দৃশ্য দেখতে দেখতে আর ফটো তুলতে তুলতে আমরা পৌঁছলাম ২ নং হেলিপ্যাডে। সূর্য ডোবার দৃশ্যে মুগ্ধ হচ্ছেন পর্যটকরা। আমরাও পশ্চিম দিকে তাকিয়ে বিদায় জানালাম সূর্যকে। শান্ত প্রকৃতি, নির্মল বাতাস প্রশান্তির গভীরে ডুবিয়ে নিচ্ছে আমাদের। এরই মধ্যে মুয়াজ্জিনের ডাক- আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার…। পাশেই সুন্দর মসজিদ। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করে ফিরে এলাম সেই হেলিপ্যাডে। সূর্য ডুবে গেলেও খুব একটা অন্ধকার হয়নি। আবছা আলোয় ভরে আছে। ছোট ছোট পিদিম জ্বালিয়ে বিক্রি করছে কলা, আচার, ঝালমুড়িসহ অনেক কিছু। সাজেকের কলা ও কমলা বেশ বিখ্যাত। আমরা সেগুলো কিনে কিনে খাচ্ছি। আর আড্ডা তো চলছে। সবাই একসাথে চা খেয়ে রাত ৮টার দিকে হোটেলে ফিরলাম। নাহিদ পায়ে ব্যথা অনুভব করায় আমাদের সাথে যায়নি। সে আবুল কালাম ভাইয়ের সাথে রুমেই ছিল। এসে দেখি রুম বাইরে থেকে তালা দেয়া। জানালার পর্দা সরিয়ে দেখলাম ভেতরে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে নাহিদ। হালকা ডাকাডাকি করলাম। কিন্তু জাগলো না সে। তারপর দু-তিনজন মিলে আবার ঘুরতে বেরুলাম রুইলুই পাড়ায়। দোকান, ঘরবাড়ি, মানুষজন সবই দেখার মতো। প্রথিমধ্যে আবুল কালাম ভাইয়ের সাথে দেখা। ওষুধ কিনতে বের হয়েছিলেন। তাই বাইরে থেকে তালা দিয়ে এসেছেন নাহিদকে। অবশ্য ওষুধ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। যাক, আমরা আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে হোটেলে এলাম। এসে দেখি নাহিদ রুমে নেই। কালাম ভাই জানালেন- তিনি এসে তাকে রুমে পাননি। আশ্চর্য! তালা দেয়া ঘর থেকে সে বের হলো কিভাবে? আর গেলই বা কোথায়? দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। যদিও কিছুক্ষণের মধ্যেই ও ফিরে এসে জানালো- জানালা দিয়েই বেরিয়ে গেছে সে। এখন পুরোপুরি সুস্থ। আল্লাহ মুক্ত করলেন আমাদের। রাত ৯টার দিকে আমরা নিচ তলার খাবার ঘরে জড়ো হলাম। মুরগির গোশতের সাথে ডাল-ভাত। এটা অবশ্য দুপুরের রান্না। এখন গরম করে দিয়েছে। হোটেলওয়ালাদের বোঝার ভুলে এমনটা হয়েছে। তারা ভেবেছিল আমরা দুপুরে এসে খাবো। যাক, কোন রকমে খাওয়া শেষ করে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিলাম নরম বিছানায়। তারপর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
১৫ মার্চ। বৃহস্পতিবার। ভ্রমণের শেষ দিন। মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম। কারণ ঘুম থেকে জাগতে দেরি হলে সূর্য ওঠার মুহূর্তে হেলিপ্যাডে থাকা সম্ভব হবে না। যথাসময়ে বেজে উঠলো অ্যালার্ম। ধড়ফড়িয়ে উঠে গেলাম বাথরুমে। গোসল সেরে রেডি হয়ে নিলাম। জামাতে নামাজ আদায় করেই বেরিয়ে পড়লাম বাইরে। ১ নং হেলিপ্যাডে আমরা। পেঁজা পেঁজা সাদা মেঘ ভেজা ভেজা অনুভূতির পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে কুয়াশা। ছেঁড়া ছেঁড়া ঘাসের ডগা মেঘের ছোঁয়ায় সিক্ত হয়ে লুটোপুটি খাচ্ছে পায়ে পায়ে। মাঝে মাঝে ক্যামেরার ঝলকে পলক পড়ছে চোখে। তাকিয়ে আছি পূর্বদিকে। ভারতের মিজোরামের দিকে। উল্লেখ্য, সাজেকের পূর্বদিকে ভারতের মিজোরাম আর উত্তরে ত্রিপুরা রাজ্য, পশ্চিমে খাগড়াছড়ি আর দক্ষিণে বান্দরবান। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে উঁকি দেবে সূর্য। অপেক্ষায় আছি আমরা। ঘড়ির কাঁটা ৭টা পেরিয়ে গেছে। তবুও দেখা নেই তার। অগত্যা রওনা দিলাম কংলাকের পথে। আমরা ১ নং হেলিপ্যাড ছেড়ে ২ নং পেরিয়ে বিজিবি ক্যাম্পের সামনে। এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থিত বিজিবি ক্যাম্প। হঠাৎ-ই পেছন দিক থেকে তীব্র আলোর ঝলকানি। সূর্য মামার দেখা। বেশ ওপরে তখন। দু-একটা ফটো তুলে চলতে থাকলাম সামনে। দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম সাজেকের সর্বোচ্চ পাহাড় কংলাকের চূড়ায়। সবার আগে পৌঁছেছি আমি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮০০ ফুট ওপরে আছি আমরা। বিল্ডিং হিসেবে ধরলে বলা যায় প্রায় ২০০ তলার ওপরে। বড় একটা পাথরের ওপরে উঠে বিভিন্ন স্টাইলে ছবি তুলছে সবাই। কংলাক বিজয়ের ছবি। আজাহার গাজী ভাইয়ের মোবাইল ক্যামেরায় তুলছে ছবি। কারণ, তখনও আমাদের ক্যামেরাম্যান জামাল ভাই এসে পৌঁছেনি। এখানে উঠতে এতটাই কষ্ট হয়েছে যে পায়ে হেঁটে হোটেলে ফেরার মতো সাহস আর নেই। বাধ্য হয়ে ফোন দিয়ে গাড়ি নিয়ে আসতে বলা হলো ড্রাইভারকে। সে গাড়িতেই এলেন জামাল ভাই, তুহিন ভাই, আবুল কালাম ভাই, এনামুল ভাই ও মোস্তফা ভাই। তুহিন ভাই অবশ্য কংলাকের চূড়ায় ওঠেননি। গাড়ি যতদূর এসেছে উনিও ততদূর। কংলাক পাহাড় থেকে লুসাই পাহাড় ¯পষ্ট দেখা যায়। চারদিকে পাহাড়, সবুজ আর মেঘের অকৃত্রিম মিতালি চোখে পড়ে। উল্লেখ্য, পাহাড়চূড়ার ছোট্ট গ্রামটিতে ত্রিপুরা ও লুসাই নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস। জুম চাষ এ পাড়ার প্রধান খাদ্য ও উপার্জনের উৎস। বেশি চাষ হয় হলুদ, আদা ও কমলার। কংলাক পাড়াটি কমলাক পাড়া নামেও পরিচিত। স্থানীয় তথ্য মতে, এই পাড়াটির পাশে বড় বড় কমলা বাগান অবস্থিত বলে এটিকে কমলাক পাড়া বলা হয়। পাহাড়ের নিচে কংলাক ঝরনা অবস্থিত এবং এই ঝরনার নামানুসারেই এই পাহাড়ের নামকরণ করা হয়েছে। যাই হোক, এখানে দুটো উপজাতি কিশোরের সাথে আমাদের পরিচয় হয়। সুমন ত্রিপুরা এবং আকাশ ত্রিপুরা। তারাই আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালো সব। আমরা ফুটবল নিয়ে গেছিলাম। কিন্তু সমতল জায়গা না পাওয়ায় খেলতে পারিনি। ঐ দুটো ছেলে অবশ্য অল্প কিছুক্ষণ খেলেছিল। কংলাক পাড়ায় ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে ফিরে এলাম গাড়িতে। চান্দের গাড়ি আমাদের নিয়ে এলো হেলিপ্যাড এলাকায়। গাড়ি থেকে নেমে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালাম আমরা। গ্রুপছবি তোলা হলো। এ ছবিগুলোই স্মৃতির স্বাক্ষর বহন করবে। এসময়স খুব করে মনে হলো দেশের অন্যতম সেরা আর্টিস্ট হামিদুল ইসলাম, গ্রাফিক্স ডিজাইনার মনিরুজ্জামান, উদীয়মান কবি মোস্তফা মাহাথির ও আতিকুর রহমান ভাইয়ের কথা। ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে আসতে পারেননি আমাদের সাথে। উনারা থাকলে এ ছবি পূর্ণতা পেতো। যাই হোক ছবির পর্ব শেষ করে আমরা হোটেলে ফিরলাম।
সকাল ৯টার পর পরই পাহাড়িকা হোটেলের খাবার রুমে আমরা। এখনকার মেনু ব্যাম্বু চিকেন। উপজাতিদের বিখ্যাত খাবার। মুরগির গোশত টুকরো টুকরো করে কেটে মশলা মাখিয়ে বাঁশের চোঙায় ভরে আগুনে দিয়ে রান্না হয় এটা। স্বাদে নতুনত্ব আছে। মজা করে খেলাম সবাই। তারপর ১০টার আগেই হোটেল ছেড়ে গাড়িতে উঠলাম আমরা। লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনেক চান্দের গাড়ি। সেনাবাহিনীর গাড়ি এলো আরও আধা ঘণ্টা পরে। একসাথে ছেড়ে দিলো সব গাড়ি। সেই উঁচু-নিচু, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে ফিরে যাচ্ছি আমরা। সাজেক থেকে খাগড়াছড়িতে। পথিমধ্যে বাঘাইছড়ি উপজেলার হাজাছড়া এলাকায় এসে থামলো আমাদের গাড়ি। এখানে আছে হাজাছড়া ঝরনা। মূল রাস্তা থেকে ১৫ মিনিট ঝিরিপথ ধরে হেঁটেই পৌঁছানো যায় ঝরনার পাদদেশে। সবাই যেতে চাইলো না। আমরা ৩-৪ জন চলে গেলাম। কয়েকটা খানাখন্দ এবং রাঙ্গামাটির কাঁচা পথ পেরিয়ে। মনে পড়লো রবীন্দ্রনাথের গান- গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ, আমার মন ভোলায় রে…। পানি খুব অল্প থাকলেও ঝরনা দেখার প্রশান্তি কম নয়। অপেক্ষাকৃত কম দামে ডাব পেলাম এখানে। স্বাদও ভালো। তারপর ফিরে এলাম গাড়িতে। গাড়ি আমাদের নিয়ে দুপুরের মধ্যেই পৌঁছে গেল খাগড়াছড়ির শাপলা চত্বরে। পার্শ্ববর্তী হোটেলে একটা রুম নেয়া হয়েছে মালামাল রাখা এবং হালকা ফ্রেশ হওয়ার জন্য। কিন্তু রুমটা এতই ছোট যে এতগুলো লোক এখানে ফ্রেশ হওয়া সম্ভব না। বাধ্য হয়ে পাশের শাহী মসজিদে গিয়ে ফ্রেশ হলাম আমরা। জোহর এবং আসরের কসর নামাজ আদায় করে মনটানা হোটেলে ঢুকলাম। ছোট মাছ এবং ডাল-ভাত খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির কাছে গেলাম। সেখানে দেখলাম শহীদ জিয়ার প্রতিকৃতি। জিয়ার কোন প্রতিকৃতি দেশে আছে, তা জানতাম না। ছবি তুলে স্মৃতির পাতায় যুক্ত করলাম। তারপর উঠে পড়লাম চান্দের গাড়িতে। গাড়ি আমাদের খাগড়াছড়ি শহর ছাড়িয়ে আলুটিলা ইকো পার্কে নিয়ে এলো।
আলুটিলা পাহাড় থেকে খাগড়াছড়ি শহরের পুরো চিত্র দেখা যায়। প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখার জন্য একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারও আছে। এখানে আছে একটি প্রাকৃতিক গুহা। যা এর মূল আকর্ষণ। লম্বা আঁকাবাঁকা সিঁড়ি বেয়ে প্রথমে এর নিচের প্রান্তে যেতে হয়। এটা ২৮২ ফুট দৈর্ঘ্য এবং একপাশ থেকে অন্য পাশে যেতে সময় লাগে প্রায় ১৫ মিনিট। গুহার একপাশ থেকে অন্যপাশে পানি প্রবহমান। ভেতরে খুব অন্ধকার তাই টর্চ লাইট বা মশাল নিয়ে যেতে হয়। পর্যটন কেন্দ্রের গেট থেকে মশাল কিনে এনেছিলাম আমরা। সেগুলো জ্বালিয়ে আলুটিলা গুহা অতিক্রম করেছি। স্যাঁতস্যাঁতে কাদা-পানি পেরিয়ে যখন পাথুরে গুহা থেকে বের হলাম তখন মনে হলো বিরাট এক বিজয় অর্জন করেছি। আসলেও তাই। খুবই ভালো লেগেছে সবার। আলুটিলা থেকে বের হয়ে আমরা এলাম পার্বত্য জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কে। এখানে এসে আমরা চান্দের গাড়িকে বিদায় করলাম। অনেক সুন্দর সাজানো গোছানো পার্ক। পাহাড়, লেক, ঝুলন্ত ব্রিজ সবই আছে এখানে। ঝুলন্ত ব্রিজে মজা করলাম বেশ। ছবি তুলে চলে গেলাম লেকের পাড়ে। মুড়ি ছিটিয়ে দিতেই ছুটে এলো মাছ। হরেক রকম মাছ। হরেক রঙের মাছ। এখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটিয়ে ফিরে গেলাম শাহী মসজিদে। মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করে মসজিদেই হালকা রেস্ট নিলাম আমরা। তারপর হোটেলে গিয়ে রাতের খাবার খেয়ে একটা মিষ্টি পান মুখে পুরলাম। ততক্ষণে সাড়ে ৮টা বেজে গেছে। আমাদের গাড়ি ৯টায়। তড়িঘড়ি করে সবকিছু গুছিয়ে হোটেল ছেড়ে দিলাম। হাঁটা ধরলাম কাউন্টারের দিকে। গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। গুনে দেখলাম দু’জন কম। কে কে? কেউ বলতে পারছে না। এদিকে গাড়ি ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন ফাহিম ভাই ও আমিনুর ভাই। উনারা উঠতেই গাড়ি দিলো ছেড়ে। কিছুক্ষণ পরেই ঘুমে ঢুলুঢুলু সবাই। আমি আর বেলাল ভাই ছবি আদান-প্রদানে ব্যস্ত। বাকি সবাই ঘুম। একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়লাম আমরাও। হঠাৎ-ই ঘুম ভেঙে গেল। গরমে ঘেমে গেছি। দেখি গাড়ি থেমে আছে। সারিসারি দাঁড়িয়ে আছে আরও অনেক গাড়ি। একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়েছে। কেউ হতাহত না হলেও আটকে গেছে রাস্তা। ঘণ্টাখানেক পরে মুক্ত হলাম আমরা। তারপর আবার ঘুম। ফজরের অ্যালার্ম যখন বাজলো তখন আমরা নারায়ণগঞ্জের কাছাকাছি। তায়াম্মুম করে ফজরের নামাজ আদায় করলাম। রাস্তায় বেশ যানজট লেগে আছে। থেমে থেমে একটু করে এগোচ্ছে। সকাল ৭টায় গাড়ি আমাদের নামিয়ে দিলো মানিকনগর বাসস্ট্যান্ডে। রিকশা নিয়ে চলে এলাম বাসায়। শেষ হলো আমাদের ৩ দিন ৩ রাতের ভ্রমণ। আর এরই মধ্যে আমার ভ্রমণকৃত জেলার সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ালো চুয়ান্নোয়। আর বাকি মাত্র ১০টি জেলা। এগুলো শেষ হলেই বলতে পারবো বাংলাদেশকে দেখেছি আমি। সেদিনের স্বপ্ন বুনতে বুনতে কাটাচ্ছি সময় আর খুঁজছি সুযোগ।

SHARE

Leave a Reply