Home ক্যারিয়ার গাইড লাইন মোরা বড় হতে চাই – আহসান হাবীব ইমরোজ

মোরা বড় হতে চাই – আহসান হাবীব ইমরোজ

শিক্ষা শ্রেষ্ঠত্বের চাবিকাঠি

“And He taught Adam the nature of all things; then He placed them before the angels, and said:—Bow down to Adam;”(Baqarah-31-34 )
মিল্লাতে ইবরাহিমের সকলের সাধারণ বিশ্বাস আদম-হাওয়া বা এডাম-ইভের মাধ্যমেই পৃথিবীতে মানব সভ্যতার সূচনা। সৃষ্টির শুভ-সূচনাতেই পরম প্রভু শিক্ষক হয়ে প্রথম মানব আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূত্রপাত ঘটালেন। এ শিক্ষায় সর্বোচ্চ সফলতার কারণে আদম আ:-এবং সমগ্র মানবজাতি হলো আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব।
শিক্ষা কাকে বলে?

শিক্ষা ও সভ্যতা একই সূত্রে গাঁথা। বর্তমান মানবসভ্যতা শিক্ষারই ফলশ্রুতি। চলমান সময়ে অগ্রসরমান এই পৃথিবীতে শিক্ষা সবচাইতে আলোচিত, আকর্ষণীয় এবং সবচাইতে ব্যবহৃত এক অনুষঙ্গ। এই শিক্ষার অর্থ এবং উদ্দেশ্য কী? এ উত্তর দিতে গিয়ে মহামতি সক্রেটিস বলেছেন, ‘মিথ্যার বিনাশ আর সত্যের আবিষ্কার’। প্লেটো বলেছেন, ‘শরীর ও আত্মার পরিপূর্ণ বিকাশ ও উন্নতি’। এরিস্টটলের মতে, ‘ধর্মীয় অনুশাসনের অনুমোদিত পবিত্র কার্যক্রমের মাধ্যমে সুখ লাভ করা।’ কিন্ডারগার্টেন পদ্ধতির উদ্ভাবক ফ্রোবেলের মতে, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সুন্দর বিশ্বাসযোগ্য পবিত্র জীবনের উপলব্ধি। ’
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষাকে ভেবেছেন, ‘পরশ পাথর হিসেবে যা মানুষের মনে জ্বালে আশার আগুন’। কবি আল্লামা ইকবালের মতে, ‘শিক্ষা হলো সৃষ্টির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য মানুষের অন্তরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলা’। মুলত শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ ব্যঞ্জনা ফুটে উঠেছে প্যারাডাইস লস্টের বিখ্যাত কবি মিল্টনের বক্তব্যে; তিনি বলেছেন, Education Is The Harmonious development of body, mind and soul. অর্থাৎ ‘শিক্ষা হচ্ছে দেহ, মন এবং আত্মার সমন্বিত উন্নয়নের নাম।’
বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম মানুষ মুহাম্মদ সা: জ্ঞানের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, “জ্ঞানার্জন করা প্রতিটি মুসলিম নর এবং নারীর জন্য ফরজ।” এর সময়সীমা সম্পর্কে বলেছেন, “তোমরা দোলনা হতে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জন কর।” এর বিস্তৃতি সম্পর্কে বলেছেন “এ জন্য প্রয়োজনে চীন দেশে যাও।”
রাসূল সা.-এর জ্ঞানার্জনের সাধনা ও তার বিজয়ের চিত্রকে পূর্ণরূপে তুলে ধরে প্রখ্যাত পন্ডিত ইমানুয়েল ডিউস বলেছেন, “কুরআনের (এর শিক্ষার) সাহায্যে আরবরা মহান আলেকজেন্ডারের জগতের চাইতেও বৃহত্তর জগৎ, রোম সাম্রাজ্যের চাইতেও বৃহত্তর সাম্রাজ্য জয় করে নিয়েছিলেন। কুরআনের সাহায্যে একমাত্র তারাই রাজাধিপতি হয়ে এসেছিলেন ইউরোপে, যেথায় ভিনিসীয়রা এসেছিল ব্যবসায়ী রূপে, ইহুদিরা এসেছিল পলাতক বা বন্দী রূপে।”

শিক্ষাই পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক

৮৫৯ সালে মরোক্কোর ফেজ নগরীতে ফাতেমা ফিহরী ও মরিয়ম নামক দুবোন ‘Al-Karaouine University’ (in the Guinness Book of World Records as the world’s oldest continuously operating degree-granting university) নামক বিশ্বের সর্বপ্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। অতঃপর ৯৭২ সালে মিসরের আল আজহার, ১০৬৫ সালে নিজামিয়া ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার পর ইউরোপের প্রথম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১০৮৮ সালে ইতালির বেলাগোনাতে। যেটি মুসলিমদের প্রথম প্রতিষ্ঠার প্রায় ২৩০ বছর পরের কথা। মুসলিমরা ৭৫১ সালে বিশ্বের সর্বপ্রথম কাগজের মিল প্রতিষ্ঠা করেন সমরকন্দে। এর ৪০০ বছর পর ১১৫০ সালে তাদের দ্বারাই ইউরোপের প্রথম কাগজের মিল প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপের নুরে‌্যমবার্গে খ্রিষ্টানরা প্রথম কাগজের মিল প্রতিষ্ঠা করে মুসলিমদের ৬৪০ বছর পর। মুসলিমরা ৭১০ সালে দামেস্কে সর্বপ্রথম আধুনিক হসপিটাল বা বিমারিস্তান প্রতিষ্ঠা করেন। এর ৩৫৫ বছর পর নর্মানরা ১০৬৬ সালে ব্রিটেনের প্রথম হসপিটাল প্রতিষ্ঠা করে।
সেই নবম শতাব্দীর সূচনায় স্পেনের আন্দালুসিয়ায় আব্বাস ইবনে ফিরনাস প্রথম ফ্লাইং মেশিন নিয়ে উড়াল দেন। এর ১১শত বছর পর সেই প্রেরণাতেই ধাপে ধাপে উন্নত হয়ে ১৯০৩ সালে আমেরিকার রাইট ব্রাদার্স উড্ডয়ন মেশিন নিয়ে আকাশে সফল উড্ডয়ন সম্পন্ন করেন।
এ ছাড়াও প্রায় ১০০১টি মৌলিক বিষয় যা মুসলিমরা আবিষ্কার করেছে।

1001 Inventions is an award-winning international educational project dedicated to the history of science and technology in Muslim civilization during the period known as the Golden Age. The 1001 Inventions project was created by the Manchester-based non-profit Foundation for Science, Technology and Civilisation.1001 Inventions was launched in 2006 with a traveling exhibition at the Manchester Museum of Science and Industry and an accompanying hardback book. This first exhibition then went on to tour the United Kingdom, visiting Birmingham Thinktank, Glasgow Science Centre, the British Parliament in London, the European Parliament in Brussels and at the United Nations in New York.Then at the National Geographic Museum in Washington, DC. The exhibition were attracted more than 400,000 to 500,000 visitors
অর্থাৎ এ সকল চিত্র থেকে বোঝা যায় বিশ্ব সভ্যতার গোড়াপত্তন করেছিল মুসলিমরা। কিন্তু আজ? গত ৫ শত বছরে সে অবস্থা একেবারে উল্টে গেছে। মাত্র একটি ঘটনা থেকেই এই সার্বিক পরিবর্তন এর ধারাক্রম অনুধাবন করা যায়। ১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ২২ বছর সময়ে মোগল সম্রাট শাহজাহান ২০ হাজার শ্রমিক এবং ১ হাজার হাতি কাজে লাগিয়ে তাজমহল প্রতিষ্ঠা করেন। তার নির্মাণব্যয় বর্তমান মূল্যমানে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার (মানে ১০০,০০,০০,০০০ ডলার)। এর আউটপুট কী? জনগণের অর্থে অমর প্রেমের নিদর্শন প্রতিষ্ঠা। এটি দেখতে প্রতি বছর প্রায় ৭০ লক্ষ দর্শক আসেন; এইতো।
ঠিক একই সময় সুদূর আমেরিকায় ১৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে যোহান হার্ভার্ড নামে কোন রাজা নয় একজন শিক্ষিত যুবক মাত্র ৭৮০ ডলার এবং ৩২০টি বই দিয়ে যে কলেজটির যাত্রা শুরু করেন তাই আজকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ড নামে খ্যাত। শুধুমাত্র এর জীবিত সাবেক ছাত্রের সংখ্যা বিশ্বের ২০২টি দেশে প্রায় ৩,৭১,০০০ জন। এখান থেকে ৮ জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং নানা দেশে ৩২ জন সরকারপ্রধান হয়েছেন। এর সাবেকরা ৫২ জন জীবিত বিলোনিয়ার ৪৮ জন পুলিৎজার আর ১৫৭ জন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। ৭৩টি শাখা নিয়ে এর লাইব্রেরির বইসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ। বর্তমানে ২১০ বর্গ একরে প্রতিষ্ঠিত এই বিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদের পরিমাণ ৩৬ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ যা টাকার মূল্যে প্রায় তিন লক্ষ কোটি টাকা; যা বাংলাদেশের জাতীয় রিজার্ভের চাইতেও বেশি।
শিক্ষা : শ্রেষ্ঠতম বিনিয়োগ

সমসাময়িক কালে জন্ম নিয়েও অনেক দেশ উন্নয়ন, ঐক্য ও সমৃদ্ধির বিশ্ব-মহাসড়কে আমাদের পিছু ফেলে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বিশ্বে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মাথাপিছু আয় বা পার ক্যাপিটা ইনকামকে একটি সূচক ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে ২০১৭ সালের আইএমএফের তথ্যমতে মাত্র ১৫৩২ ডলার নিয়ে বিশ্বে আমাদের অবস্থান ১৪৯তম। সমসাময়িক সময়ে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশসমূহের ভেতর মালয়েশিয়া (১৯৫৭, স্বাধীনতা লাভ) আমাদের চেয়ে সাড়ে ৬ গুণ, কুয়েত (১৯৬১) ১৮ গুণ, আরব আমিরাত (১৯৭১) ও বাহরাইন (১৯৭১) ২৪ গুণ, আর সিঙ্গাপুর (১৯৬৫) ৩৫ গুণ বেশি ইনকাম নিয়ে বিশ্ব তালিকায় তার অবস্থান ১০ম। কিছুটা আগে স্বাধীন হলেও একই মহাদেশের মাত্র ২০-৩০ বছর আগে একই অবস্থানে থেকেও তুরস্ক আমাদের তুলনায় সাড়ে ৭ গুণ, তাইওয়ান প্রায় ১৬ গুণ, সাউথ কোরিয়া ১৯ গুণ বেশি আয় করে। ১৯৭১ সালে আমাদের মাত্র ১০৪ দিন আগে জন্ম নেয়া কাতার আমাদের তুলনায় সাড়ে ৪০ গুণ। আর ১,০৭,৭০৮ ডলার আয় নিয়ে লুক্সেমবার্গ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ধনীদেশ। ১৯৯৭ সালে অর্থাৎ মাত্র ২০ বছর আগে স্বাধীন হওয়া হংকংয়ের পার ক্যাপিটা আয় আমাদের সাড়ে ২৯ গুণ বেশি।
পেট্রো ডলারের ভিত্তিতে ধনী হওয়া কুয়েত, কাতার, বাহরাইনের বা আমিরাতের কথা বাদ দিলেও আমরা মালয়েশিয়া, তুরস্ক, সাউথ কোরিয়া তাইওয়ান, হংকং বা সিঙ্গাপুরের কথা কি বলবো? না, কোন পেট্রোডলার তাদের নেই। তবে তাদেরও খনি আছে আর সেটি প্রাকৃতিক সম্পদের কোন বড় খনি নয়। বরং মেধাবী, দক্ষ আর প্রতিশ্রুতিশীল মানুষের খনি। যাদেরকে তৈরি করেছে পরিকল্পিত, পরিশ্রমী নেতৃত্ব এবং আধুনিক শিক্ষা ও স্কুলিং সিস্টেম। ভাবতে অবাক লাগলেও এ বিষয়টি চরম সত্য। আজকে মেধার সে পরীক্ষায় আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান কোথায় যাচ্ছে আর চীন, জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান, তুরস্ক, মালয়েশিয়া উন্নতির কোথায় যাচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। এ ব্যাপারে আমরা পিসা এর রিপোর্ট দেখলে সহজেই অনুধাবন করতে পারবো।

The Programme for International Student Assessment (PISA) is a worldwide study by the Organisation for Economic Co-operation and Development (OECD) – School pupils’ scholastic performance on mathematics, science, and reading. It was first performed in 2000. 470,000 15-year-old students representing 65 nations and territories participated in PISA 2009. An additional 50,000 students representing 9 nations were tested in 2010. China-Education professor Yong Zhao has noted the PISA 2009 Chinese education system is excellent in preparing outstanding test takers, just like other education systems within the Confucian cultural circle: Singapore, Korea, Japan, and Hong Kong.

সোনার বাংলা গড়তে হলে
সোনার মানুষ চাই
সোনার বাংলাদেশ। অভ্যুদয়ের সাড়ে চার দশক অতিক্রম করে যৌবনের শেষ ধাপে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু হতাশার গহিন সাগরে জাতি আজ নিমজ্জিত। উন্নত শিক্ষা, সুযোগ্য নেতৃত্ব এবং আদর্শ ও ঐতিহ্যের ঘাটতি এর অন্যতম কারণ বলে চিন্তাশীলদের অভিমত। পৃথিবীর মানচিত্রে এ দেশের অবস্থান একটি বিন্দুর মত যা আয়তনে পৃথিবীর স্থলভাগের প্রায় হাজার ভাগের এক ভাগ। পৃথিবীর স্বাধীন ১৯৫টি রাষ্ট্রের ভেতর আয়তনে এ দেশের অবস্থান ৯৪তম কিন্তু জনসংখ্যায় ৮ম। এমনকি বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র রাশিয়া আয়তনে বাংলাদেশের তুলনায় ১১৬ গুণ বড় হলেও জনসংখ্যায় কিন্তু ৪ কোটি কম। জনসংখ্যা ঘনত্বে বিশ্বে আমাদের অবস্থান ১৩তম। আমাদের অবস্থান সাউথ কোরিয়ার ২ গুণ, ভারত ও জাপানের তুলনায় ৩ গুণ, ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের ৪, চীনের সাড়ে ৭, যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ এমনকি সমগ্র বিশ্বের তুলনায় ২২ গুণ বেশি। যদিও আমাদের চেয়ে ৯ গুণ জনসংখ্যা চীন, ৮ গুণ ভারত এবং ২ গুণ নিয়ে আমেরিকা এবং জনঘনত্বে আমাদের চেয়ে ৬ গুণ হংকং,৭ গুণ বেশি নিয়ে সিঙ্গাপুর উন্নয়নের পথে বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা সঠিক পরিকল্পনা ও সুষ্ঠু শিক্ষার ভিত্তিতে তাদের বিপুল জনসংখ্যাকে আপদ নয় সম্পদে পরিণত করতে পেরেছে।
আমাদেরও সমৃদ্ধির মহাসড়ক একটিই, বক্তৃতাবাজি আর তোষামদী নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সুশিক্ষার ব্যবস্থা করে একটি নৈতিকতা, দক্ষতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন সমৃদ্ধজাতি গঠন করে বিশ্বের এই ক্ষুদ্র জনপদে সবচেয়ে আলোকিত মানুষদের সমাহার গড়ে তোলা। আর সার্বজনীন সুশিক্ষাই হচ্ছে সেই নবজাগরণের জিয়নকাঠি।
তাহলে, আর বিলম্ব কিসের? গোল্ডেন এ প্লাসের মায়াবী ভেল্কি নয় পূর্ণাঙ্গ ও সত্যিকার শিক্ষা অর্জনে আজ থেকেই এবং সর্বপ্রথম আমি নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়ছি না কেন?
মনের গহিন থেকে এক অবিনাশী শ্লোগান তুলি-
“বিশ্বটাকে গড়তে হলে,
সবার আগে নিজকে গড়ো।”

SHARE

Leave a Reply