Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস স্বপ্নজয়ী শাহবাজ -মোশাররফ হোসেন খান

স্বপ্নজয়ী শাহবাজ -মোশাররফ হোসেন খান

রুহি স্কুল থেকে এসে ল্যাপটপের ওপর এক মনে ঝুঁকে আছে। ফেসবুকিং করছে। স্কুল থেকে এসে সে একটু ফ্রেশও হয়নি। কিছু খায়ওনি। আম্মু রান্নাঘর থেকে চিৎকার করে বলছেন,
– কিরে রুহি, এত ডাকছি উত্তর পাই না কেন? কি করিস? খাবি কখন? তোদের ক্ষুধা লাগে না? সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়, বুঝলি?
রুহি যেন আম্মুর কথা শুনতেই পায়নি।
সে তখন ল্যাপটপে কার্টুন এক মনে দেখে যাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর আম্মু রান্নাঘর থেকে মুখ মুছতে মুছতে রুহির কাছে আসেন। দেখেন রুহি এক মনে ল্যাপটপ নিয়ে পড়ে আছে।
ক্লাস সেভেনে পড়ে মেয়েটা। এখনও কা-জ্ঞান হলো না। সারাদিন ল্যাপটপ, ফোন এসব নিয়েই পড়ে আছে। আম্মুর আর সহ্য হয় না।
রেগে মেগে বলেন, ওসবের মধ্যে কি খাবার দাবার আছে? কিছু না খেলে কি পেট ভরবে? কি আছে ওসবের মধ্যে? সারাদিন ওসব নিয়ে থাকিস! হাত-মুখ ধুয়ে আয়। আমি তোর খাবার আনছি।
মায়ের মন বলে কথা।
রুহি উঠে ওয়াশরুমে গেল। ওয়াশরুম থেকে বের হতে না হতেই আবার আম্মুর ডাক-
– কইরে রুহি, আবার কোথায় গেলি? এদিকে আয়। খাবার নিয়ে বসে আছি কতক্ষণ। আমার কত কাজ পড়ে আছে। সেদিকে একটু খেয়াল রাখবি তো। নাকি তোদের নিয়েই সারা দিন পড়ে থাকব? এত জালাস কেন? মায়ের কথা শেষ না হতেই রুহি রুমে চলে এল।
আম্মু অনুযোগ, অভিযোগ এবং মমতা মিশিয়ে রুহির মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন।
রুহি খেতে খেতে মোবাইলটা হাতে তুলে নিলো।
ব্যাস! আম্মুর রাগ আবার বেড়ে গেল, কিরে! আবার মোবাইল হাতে নিলি কেন? এগুলো কি ছাই রাখা যায় না একটু? মনে হচ্ছে তোদের জাদু করে রেখেছে এসব যন্ত্রদানব। আর সহ্য হয় না।
কত করে ওনাকে বললাম ছেলে মেয়েদের এত বায়না শুনতে নেই। যা চায় তা দিতে নেই। আমার কথা কি আর শোনে? উনারতো আর এসব ঝামেলা পোহাতে হয় না। সকালে উঠে খাবার নিয়ে যাবেন অফিসে ফিরে আসবেন রাতে। সংসারের কোন খবর উনি রাখেন? ছেলেমেয়েদের একটু শাসন করলে হয়। এদিকে মেয়েটা এসব করছে। আর ওদিকে তুহিনের তো কোনো খবরই নেই। কখন ঘরে আসবে তাও ঠিক নেই। রুহি হাসতে হাসতে বললো,
– আম্মু তুমি শুধু আমাকে আর তুহিন ভাইয়াকে দোষ দিচ্ছ? এত বকছ? কই শাহবাজ ভাইকে নিয়ে তো একটা কথাও বললে না? নাকি সে সবার বড় বলে?
আম্মু ধমক দেন। চুপ! পাকনি মেয়ে। শাহবাজ কি আর তোদের মত? সে রুটিন মত চলে। দেখতে পাস না? তোর ভাইয়া খাওয়ার সময় খায়, ঘুমানোর সময় ঘুমায়, খেলার সময় খেলে। নামাজের সময় নামাজ পড়ে। তা ছাড়া কত কিছু করে। এই একটা ছেলেই আমার ঘর আলো করে রেখেছে। কোনো যন্ত্রণা দেয় না। আর তোরা হয়েছিস উল্টো। যত্তসব। আর কথা বাড়াসনে। খেয়ে নে। আমার রান্নাঘরে কাজ আছে।
রুহি চুপচাপ খায় আর মিটমিট করে হাসে আম্মুর মুখের দিকে তাকিয়ে। বলে- আম্মু তোমার মুখের ঘামটুকু দারুণ লাগছে।
শাহানা বেগম মুখ মুছতে মুছতে বলেন, ওরে আমার পাকনি মা। নে এবার খাওয়া শেষ করে গোসল করে আয়।

দুই.

বেলা চারটা বেজে গেছে।
তুহিন ঘাড়ে ব্যাগ, স্কুলের পোশাক আর কাঁধে একটা ব্যাট নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
জুতা খুলতে খুলতে জোরে ডাকল।
আম্মু ও আম্মু কোথায় তুমি? আমার কাঁধের ব্যাগটা একটু নামিয়ে দাও না আম্মু। মনে হচ্ছে কাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।
শাহানা বেগম কোথায় ছিলেন, দৌড়ে তুহিনের কাছে এলেন। ঘাড়ের ব্যাগ আর ব্যাট নামাতে নামাতে বললেন,
কিরে অমন করে চিৎকার করছিস কেন? স্কুল ছুটি হয়েছে কখন? আর এতক্ষণে এলি? এতক্ষণ কোথায় ছিলি?
তুহিন অপরাধীর মত মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো-
– কেন আম্মু তুমি জাননা, ছুটির পর আমি স্কুল মাঠে খেলি।
মা বললেন-
– সেতো জানি। তাই বলে প্রতিদিন খেলতে হবে?
রোদ, ঝড়, বৃষ্টি এসব দেখবি না? শরীরের দিকে তাকাবি না? এখনও কি ছোট্ট আছিস? নিজের ভালো নিজে বুঝবিতো। না খেয়ে রোদে এতক্ষণ খেলা করলে শরীর খারাপ করে। তাও একদিন, দুদিন হলে হয়। এরকম তো প্রায় করিস। আমার চিন্তা হয় না বুঝি?
তুহিন আস্তে করে বললো-
কত আর দেরি হল মা? মাত্র এক ঘণ্টা।
মা ধমক দিয়ে বলেন- এক ঘণ্টা কম সময়? এক ঘণ্টার দাম নেই বুঝি? তোদের কাছে তো কোনো কিছুরই দাম নেই। গিয়ে দেখ তোর ভাই শাহবাজ কী করছে? সময়ের কি মূল্য তার কাছ থেকে শিখে নে।
তুহিন ড্রেস পাল্টাতে পাল্টাতে বললো-
আম্মু খুব খিদে পেয়েছে। আজ আর বকোনা প্লিজ। আমি হাত মুখ ধুয়ে নিচ্ছি। খাবার দাও।
তুহিনের কথায় মুহূর্তে মায়ের রাগ উধাও হয়ে গেল। সেখানে রূপ নিলো এক মায়াবী মুখ। ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন-
এমনটি করে না বাবা। আমি যে কষ্ট পাই। যা খেয়ে নে। টেবিলে সব কিছু দেয়া আছে।
তুহিন হাসতে হাসতে বললো- খাবার সময় তুমি সামনে থাকবে না আম্মু!
শাহানা বেগম বললেন- থাকবো রে থাকবো। আমি জানিতো আমি টেবিলে না থাকলে তোর পেট ভরবে না। তুই তাড়াতাড়ি আয়। আমি সব রেডি করে দিচ্ছি।
তুহিনের খাওয়া শেষ হতে না হতেই আসরের আজান পড়ল। আম্মু বললেন।
– বাবা খাওয়া শেষ করো। ওদিকে নামাজের আজান হয়েছে। যাও মসজিদে যাও। নামাজ আদায় করে একটু খেল। তারপর মাগরিবের নামাজ পড়ে বাসায় এস।
আবারও খেলার অনুমতি পেয়ে তুহিনের আনন্দ আর ধরে না। সে আম্মুর মুখে একটা চুমু দিয়ে ব্যাট হাতে আবার বেরিয়ে গেল।
আম্মু ছেলের দিকে হেসে বললেন-
পাগল ছেলে আমার। ক্লাস টেনে পড়ে এখনও বুদ্ধি হল না।
এরকমই হয়। মা-বাবার কাছে ছেলে-মেয়েরা সকল সময় অবুঝই থাকে। এযে মায়ার টান।
বুঝতে শিখলে তো সে মায়ার টানটা আর থাকে না।
মায়ার তৃষ্ণাও থাকে না।
মা বোঝে না। তার বয়সটা সামনে এনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। আহ! আমিও তো ইন্টার পড়া পর্যন্ত আব্বু-আম্মুর কাছে সেই ছোট্টটিই ছিলাম। পিতা-মাতার কাছে সন্তানের কি কখনও বয়স বাড়ে? আমারও তো বাড়েনি। খামাখা তাদের দোষ দিয়ে লাভ কি? বাস্তবতার মুখোমুখি হলে সবাই একসময় বুঝতে শিখে। বড় হয়ে যায়।

তিন.

রাত প্রায় ১০টা।
হঠাৎ কলিংবেলটা বেজে উঠলো।
শাহানা বেগম রান্নাঘরে ছিলেন।
তুহিন ও রুহি পাশের রুমে লেখাপড়া করছে। দরজা ঠেলে দিয়ে।
সম্ভবত তারা কোনো শব্দই শুনতে পায়নি।
কলিংবেলটা আবারও বেজে উঠলো :….
শাহানা বেগম রান্নাঘর থেকে দ্রুত গতিতে দরজাটি খুললেন।
দেখলেন শাহবাজ ও তার আব্বু হাসান সাহেব দু’জন দু’টি বাজারের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ব্যাগ দু’টি বেশ ভারী।
শাহবাজ আম্মুকে সালাম দিয়ে বললো-
– আম্মু তুমি আব্বুর হাতের ব্যাগটা ধরো না! আব্বুর ব্যাগটা বেশি ভারী।
হাসান সাহেব হেসে বললেন,
– আরে, আরে করছ কি? আমার চেয়েওতো শাহাবাজের ব্যাগটা বেশি ভারী। ওরটা বরং তুমি হাতে নাও। এসব কথার ফাঁকেই দুজনই ব্যাগ নিয়ে ঢুকে পড়েছেন।
শাহানা বেগম দরজার সিটকানি এঁটে রান্না ঘরের সামনে রাখা ব্যাগ দুটির দিকে তাকিয়ে বললেন।
ইসরে! এত রাতে রাজ্যের বাজার ঘরে তুলেছ বাপ-বেটা। এখন এসব বাজার নিয়ে আমি কি করব? সারারাত জেগে জেগে কি কুটা বাছা করব?
শাহানা বেগম শাহাবাজের দিকে তাকিয়ে বললেন,
– কিরে, তুই তোর আব্বুকে কোথায় পেলি? তোর আব্বুও বা তোকে কোথায় পেল?
বাপ-বেটা যুক্তি করে আম্মুকে কষ্ট দেয়ার জন্য কি বাজার থেকে সব মাছ-তরকারি বাসায় আনলি?
হাসান সাহেব ড্রেস চেঞ্জ না করেই হাসতে হাসতে শাহানা বেগমকে বললেন,
– আরে ওগুলো দেখে ভয় পাচ্ছ কেন? কোনোটাই রাতে পচে যাবার মত জিনিস নয়। শাহাবাজের সাথে দেখা হলো বাজারের কাছে। সে আবদার করলো একটু বাজার করার জন্য। পকেট থেকে আবার টাকাও বের করে ছেলেটা আমার পকেটে ঢুকিয়ে দিল। এবার তুমিই বলো বাজার না করে কি পারা যায়?
শাহানা বেগম হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন-
– তা ছেলেটা টাকা কোথায় পেল সে খবর নিয়েছ? নাকি দিলো আর পকেটে ভরলে?
হাসান সাহেব বললেন-
– তা হবে কেন?
শাহবাজ বলেছে যে আজ দু’ জায়গা থেকে টিউশনির টাকা পেয়েছে। সেটা আমার পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছে। শাহানা বেগম বললেন,
– কি! পুরো টাকাই?
– সেটা তোমার ছেলেকে জিজ্ঞেস কর। আমি কিভাবে বলব? আমি কি কখনও ওর টাকার হিসেব নেই?
কথার মধ্যেই চলে আসে শাহবাজ।
বললো, না আম্মু। দুটো টিউশনি থেকে যা পেয়েছি তার অর্ধেকটা আব্বুকে দিয়েছি বাজারের জন্য। আর অর্ধেকটা এনছি আমার মিষ্টি আম্মুর জন্য।
এই নাও। কি এবার খুশি তো?
শাহানা বেগম টাকাটা মুঠোয় ভরে কি মায়াবী আদরে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিলেন।
কপালে ছেলেকে চুমু দিতে দিতে বললেন, আমার সোনার টুকরো বাবা। এ রকম ছেলে এখন আর কয়টাই বা পাওয়া যায়?
হাসান সাহেব বললেন,
– নাও। অনেক হয়েছে। এবার তাড়াতাড়ি বাজারগুলো ফ্রিজে না হয় ঢুকিয়ে রাখ।
শাহানা বেগম দ্রুত হাতে মাছ, গোশত এবং তরকারি ফ্রিজে ঢোকাতে যাবেন সে সময় থমকে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
– কিরে বাবা শাহবাজ! এই মাছ গোশত কি এখন রান্না করতে হবে? না দুপুরে যা রান্না হয়েছে তা খেতে পারবি।
শাহবাজ হাসতে হাসতে বললো,
-আম্মু এত রাতে তোমাকে কষ্ট কি দিতে পারি? তুমি ওসব ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখ। আমি হাত মুখ ধুয়ে আসি। খুব খিদে পেয়েছে।
আম্মু জিজ্ঞেস করলেন,
– কিরে সেই দুপুর থেকে কিছুই খাসনি?
শাহবাজ বললো,
হ্যাঁ। মাগরিবের পর হালকা নাস্তা হয়েছে। কিন্তু তোমার হাতের রান্না ছাড়া কি আমার পেট ভরে?
– সেতো ঠিকই। আমার বাবার পেট আমার রান্না ছাড়া কি করে ভরে? এবার এসো সবাই খেয়ে নাও।
এইতো মুহূর্তেই শুরু হয়ে গেল। হাঁকাহাঁকি। ডাকাডাকি!
কইরে তুহিন, রুহি গেলি কোথায়? তাড়াতাড়ি খাবার টেবিলে আয়। বলেই শাহানা বেগম প্রত্যেকের প্লেটে খাবার খোলা শুরু করলেন।
ততক্ষণে হাসান সাহেবও ফ্রেশ হয়ে টেবিলে এসেছেন। সবাই যে যার প্লেট নিয়ে বসেছে। কিন্তু রুহির কোনো খবর নেই।
হাসান সাহেব আদর করে জোরে ডাক দিলেন,
– আম্মু,
একবার নয় দুবার নয় তিন তিনবার তিনি ডাকলেন, রুহির কোনো সাড়াই নেই। সে দরজা বন্ধ করেই আছে। কি করছে আল্লাহ জানেন।
এবার হাসান সাহেব নিজেই খাবার টেবিল থেকে উঠে এলেন। দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে বললেন,
– কই আম্মু কি করেন?
দরজা ফাঁক করে দেখলেন রুহি ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত। ঘাড় গুঁজে বসে আছে। আর হি হি করে হাসছে। আব্বুজান ডাকছেন। সেদিকে খেয়াল নেই।
হাসান সাহেব আরো কাছে এলেন। রুহির মাথায় হাত দিয়ে বললেন-
– কি আম্মু? এত নিবিড়ভাবে কী দেখছেন? আবার হাসছেন। কিছুই বুঝতে পারছি না।
এবার রুহি আব্বুর দিকে তাকালো। বললো,
– আব্বুজান আমি একটি জরুরি জিনিস দেখছি। ১০ মিনিট লাগবে।
হাসান সাহেব বললেন,
– পাগলি আম্মু, তা কি হয়? একসাথে সবাই খেতে না বসলে আমার মুখে খাবার ওঠে না। আসেন। বলে রুহির হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলেন।
শাহানা বেগম এবার তেড়ে মেড়ে উঠলেন।
কি আমার আল্লাদ রে! খাবার ফেলে মেয়ের ঘরে গেছে ডাকতে। ডাকা তো দূরে থাক। মেয়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে এলেন। মনে হচ্ছে কি জরুরি কাজে ব্যস্ত! কেন ডাক শোনা যায় না? কানে কি তুলো দিয়ে থাকে?
হাসান সাহেব বললেন-
– আরে রাখো তো ওসব। সবাই মিলে আনন্দ করে খাব। এর মাঝে আবার রাগ করছ? শাহানা বেগম বললেন-
-হ্যাঁ বুঝেছি। যত দোষ আমার। ছেলে-মেয়েকে কিছুই বলা যায় না। সবাই যেন বরফের পুতুল। একটু কিছু বললে গড়িয়ে পড়বে। কোথায় শাসন করবে, তা নয়।
হাসান সাহেব বললেন-
– এখানে শাসনের কি আছে? আমার কোনো ছেলে-মেয়েই তো অবাধ্য নয়। তোমার মাথাও কেউ গরম করে না। এমন দুষ্টুমি কেউ করে বলো?
শাহানা বেগম এবার মুচকি হেসে বললেন, তা আর কি? তুমি যাও সকালে আর আস রাতে। মাঝখানে সময় ওদের কাটে কিভাবে জান?
স্কুল থেকে এসেই একজন বসবে ল্যাপটপ নিয়ে। আর একজন ব্যাট হাতে। কোথাকার কোন ক্রিকেটার। একবার খেলবে। একবার খেলা দেখবে। তারপর আবার হাইলাইটসও দেখা দরকার। বাবারে! পারেও বটে। আমি এমন আর কখনোও দেখিনি। কানে আবার তার গুঁজে বসে থাকে রুহি। তোমার ডাক শুনবে কিভাবে?
হাসান সাহেব হাসতে হাসতে বললেন-
খুবইতো বললে। তোমার শাহবাজ সম্পর্কে কিছু বললে না?
শাহবাজ তখন এক মনে খাবার খাচ্ছিল।
শাহানা বেগম বললেন- ওতো আছে ওর মত। ওকে কিছু বলতে হয় না। আবার আমাদের জন্য টিউশনিও করে। ও কি আর দশটা ছেলের মত? ঠিক আমার বাবার মত হয়েছে।
হাসান সাহেব এবার জোরে হাসলেন-
শাহবাজ খুব ভালো ছেলে। তোমার বাবার মত। কিন্তু বাবা তো আর নয়। অন্যগুলো কাদের মত হয়েছে?
শাহানা বেগম বললেন-
আমার মত না। তোমার বা তোমার পরিবারের কারও মত না। কার মত যে হয়েছে জানি না। আল্লাহই মালুম।
কথায় কথায় সবার খাওয়া শেষ হয়ে গেল। হাসান সাহেব বললেন,
– আচ্ছা! এই যে আমাদের সবার খাওয়া শেষ হয়ে গেল। তুমিওতো তোমার খাবারটা খেতে পারতে। তোমাকে বারবার এমনটা বলতে হয় কেন!
শাহানা বেগম বললেন-
– আমিও যদি খেতে বসি তাহলে অন্যদের খাওয়া কে দেখবে? সবাইতো এক খাবার খায় না। আমি যদি না দেখি তাহলে ওরা ঠিকভাবে খাবে কিভাবে?

চার.

খাওয়া শেষে সবাই যে যার রুমে চলে গেল। শাহানা বেগম এবার খেতে বসলেন। খাওয়া শেষ করে সব কিছু গুছিয়ে তিনি ঘরে ঢুকলেন। রাত তখন ১২টা।
১২টা হলেও শাহানা বেগমের কাজ শেষ হয় না।
এটা ওটা টুকিটাকি কত কিছু!
মায়েদের এটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। তাদের উঠতে হয় সকলের আগে আর ঘুমাতে যেতে হয় সকলের শেষে। সারাদিন অন্যদের কিছুটা বিশ্রাম থাকলেও মায়েদের কোনো বিশ্রাম থাকে না। থাকতে নেই।
যে সকল মা এর ব্যতিক্রম ঘটান তাদের সংসারে কোনো শৃঙ্খলা বা শান্তি থাকে না।
শাহানা বেগম তেমনটি চান না। চান না বলেই তিনি এত কষ্ট স্বীকার করেন।
ঘুমোতে যাবার আগে তিনি ছেলে মেয়েদের রুমে একবার ঢু মারবেন। দেখে নিতে চান তার ছেলে-মেয়েরা ঘুমাচ্ছে, না কে কি করছে।
শাহাবাজের রুমে টোকা দিতেই ঘুমকাতর চোখে বললো,
– কি আম্মু! কিছু বলবে?
শাহানা বেগম বললেন,
– না বাবা। ঘুমাচ্ছ?
– হ্যাঁ আম্মু। ঘুম আসছে।
– ঘুমাও।
বলে শাহানা বেগম দরজাটা আবার টেনে দিলেন। এবার নক করলেন তুহিনের দরজায়। তুহিন ধড়ফড় করে উঠে দরজা খুলে দিল। সেও জানে যে এ সময় আম্মু ছাড়া আর কেউ দরজায় নক করে না।
আম্মু এবার দরজায় দাঁড়িয়ে নয়, তুহিনের খাটের কাছে এলেন। তিনি দেখতে চাইলেন ছেলে কী করছে? শাহানা বেগম খাটের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন তারপরও জিজ্ঞেস করলেন-
– কী করছ বাবা?
তুহিন জবাবে বললো-
– আম্মু অনেক লেখা-পড়া করেছি আজকে। হোম ওয়ার্ক। স্কুলের পড়া সব কমপ্লিট।
শাহানা বেগম দু’ হাত বুকে বেঁধে বললেন
– হুঁ, তারপর?
তুহিন এবার ধরা পড়ার ভয়ে স্বরটা একটু পাল্টালো। খুব নরম কণ্ঠে বললো,
– আম্মু সামনে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা। এর ওপর একটা ভালো আর্টিক্যাল ছাপা হয়েছে সেটা পড়ছিলাম। পড়াটা প্রায় শেষ। এটুকু কি শেষ করে ঘুমাবো? নাকি না পড়েই ঘুমাবো?
শাহানা বেগম বুঝলেন ছেলের কা-। মা বলে কথা। না বোঝার কি আছে? দুনিয়ার সবাইকে বুঝিয়ে বলতে হয় না। সন্তানের মুখ দেখে সব বুঝে যান।
তিনি তুহিনের মাথায় হাত রেখে বললেন-
– বেশ, সেটুকু পড়েই ঘুমাও।
তবে দেখো বেশি রাত জেগো না কিন্তু। এবার রুহির দরজায় টোকা দিতেই এমন ভঙ্গি করে রুহি দরজা খুললো যেন ঘুমে পড়ে যাচ্ছে মেয়ে। আহ্লাদে একবারে আটখানা।
চোখ ডলতে ডলতে আম্মুর হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে এলো খাটের কাছে।
আম্মু জিজ্ঞেস করলেন-
– কি রে মা! ঘুম আসে না?
– আসছে তো আম্মু।
– হ্যাঁ হ্যাঁ কতটা ঘুম আসছে সেতো আমি বুঝতেই পারছি। তোমার পাশের ল্যাপটপটি অন নাকি অফ করা! একবার চেয়ে দেখোতো! রুহি খুব লজ্জা পেল। বললো-
স্যরি আম্মু। ওটা অফ করতে একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম। এইতো এখন ওটা অফ করে শুয়ে পড়ছি। আম্মু তুমি আমার মাথার পাশে বসে গল্প শোনাবে? ক্লাস সিক্স এ পড়ার সময় যেমন করে গল্প শুনতে শুনতে ঘুম পাড়াতে।
শাহানা বেগম বুঝতে পারেন। গল্প সোনার খুব একটা ইচ্ছে এ সময় তার নেই। তারপরও মেয়ে যখন কিছু আড়াল করতে চায় তাহলে তিনি কিভাবে তাকে লজ্জা দিবেন!
খুব বুদ্ধিমতী শাহানা বেগম। হাসলেন,
– আম্মু তুমি শোও। এইতো আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে গল্প শোনাচ্ছি। শোন-
হযরত উসামা ইবন জায়িদ (রা)!
শৈশবে লালিত-পালিত হয়েছেন রাসূলের ঘরে। রাসূল প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন শিশু উসামাকে। এমন সৌভাগ্য আর কয়জনের ভাগ্যে জোটে? শুধু কি শৈশব?
না। যৌবনেও রাসূলের প্রাণ নিংড়ানো ভালোবাসা পেয়েছিলেন হযরত উসামা।
কি সৌভাগ্য তার! স্বয়ং রাসূল তাকে উপহার দিলেন তাঁরই ব্যবহৃত একটি চাদর। অপূর্ব পুরস্কার!
কী চমৎকার উপঢৌকন!
হযরত উসামা ছোটকাল থেকেই ছিলেন অপরিসীম সাহসী। আর যুদ্ধের জন্য ছিলেন পাগলপারা।
ওদিকে বেজে উঠেছে উহুদের যুদ্ধের দামামা। তখন নিতান্তই কিশোর হযরত উসামা।
সবাই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। দেখছেন এক কিশোর ব্যাকুল দৃষ্টিতে। আবেগভরা কচি হৃদয়ে।
কচি কিন্তু কঠিন পাথরের মত তার বিশ্বাস। উসামা পরামর্শ করলেন কয়েকজন কিশোর বন্ধুর সাথে। তারাও যুদ্ধে যাবার জন্য উদগ্রীব।
কম্পিত হৃদয়ে দাঁড়ালেন কিশোর উসামা রাসূলের সামনে। সাথে আছেন কিশোর বন্ধুরা। উদ্দেশ্য রাসূলের সম্মতির প্রার্থনা। রাসূল তাদের দেখে একটু মুচকি হাসলেন। কিন্তু ভেতরে তাঁর গভীর বিস্ময়!
এতটুকু ছেলেরা যুদ্ধে যেতে চায়! কম কথা নয়। তবুও বাস্তব বলে কথা।
রাসূল উসামাসহ কিশোরদের অধিকাংশকে ফিরিয়ে দিলেন। এত কম বয়সে যুদ্ধে যাওয়া ঠিক নয়। ফিরে এলেন উসামা।
চোখ দুটি তার বেদনার পানিতে টলমল করছে। বুকে ঢেউ খেলে যাচ্ছে কষ্টের দরিয়া।
উহুদ গেল। এলো খন্দকের যুদ্ধ। আবার রাসূলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন হজরত উসামা। আবারও যদি ছোট বলে বাদ দিয়ে দেন রাসূল!
ভয় আর শঙ্কায় দুলে উঠলো কিশোর মন। বের করলেন এক অভিনব কৌশল। রাসূল যেন তাকে বাদ না দেন, এ জন্য উসামা পায়ের আঙুলের ওপর ভর রেখে যতটুকু সম্ভব লম্বা করলেন শিরদাড়া। এখন তাঁকে বেশ উঁচু মনে হচ্ছে। রাসূল এবার আর তাকে বাদ দিলেন না। যুদ্ধে যাবার অনুমতি পেয়ে সেকি উল্লাস কিশোর উসামার। তাঁর বয়স তখন বারো কি তেরো।
ঠিক তার উচ্চতার সমান লম্বা তরবারি, কাঁধে ঝুলিয়ে যুদ্ধযাত্রা করলেন কিশোর উসামা।
আর মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে, ‘হারকা’ অভিযানের নেতৃত্বের ভার রাসূল তুলে দেন, বুদ্ধিদীপ্ত-সাহসী যোদ্ধা উসামার হাতে।
এটাও একটা বিরল ইতিহাস। মুতার যুদ্ধ। সেনাপতি-স্বয়ং পিতা-জায়িদ ইবন হারিসা। যুদ্ধ চলছে তীব্রগতিতে। একসময় এই যুদ্ধে শহীদ হলেন সেনাপতি জায়িদ ইবন হারিসা। উসামা নিজের চোখে দেখলেন প্রাণপ্রিয় পিতার নির্মম শাহাদাতের করুণ দৃশ্য।
কিন্তু কি আশ্চর্য! একটুও ভেঙে পড়লেন না উসামা। এতটুকুও বিচলিত হলো না তার হৃদয়। হৃদয়ের শোককে তিনি দ্রুত পরিণত করলেন শক্তিতে। এবং তারপর-
তারপর এক সময় সেনাপতি খালিদ ইবন ওয়ালিদের নেতৃত্বে তিনি অসীম সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে রোমান বাহিনী থেকে মুক্ত করলেন মুসলিম বাহিনীকে।
আর যুদ্ধ শেষে- যে ঘোড়ার ওপর শহীদ হয়েছিলেন সেনাপতি পিতা-জায়িদ ইবন হারিসা-ঠিক সেই ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে তিনি ফিরে এলেন মদিনায়।
একাদশ হিজরি। উসামার বয়স তখন বিশেরও কম। রোমানরা চারদিক থেকে শুরু করেছে উৎপাত। তাদের সমুচিত জবাব দেবার জন্য রাসূল তৈরি হতে বললেন মুসলিম মুজাহিদদের। আর এই অভিযানের সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করলেন কমবয়সী এক যুবক-হযরত উসামাকে। সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে যাত্রা করলেন কমান্ডার যুবক।
এদিকে অসুস্থ হয়ে পড়লেন দয়ার নবী এবং ইন্তেকালও করলেন। খলিফা নির্বাচিত হলেন হযরত আবু বকর। কিন্তু তবুও রাসূলের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেন তিনি।
বললেন, রাসূল যাকে নিযুক্ত করে গেছেন তিনিই থাকবেন রোমান অভিযানের কমান্ডার। রাসূলের ইন্তেকালের পর যুবক কমান্ডারের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী পৌঁছে গেলেন রোমানে। আবু বকর তাঁদেরকে কিছুদূর এগিয়ে দেয়ার জন্য চললেন বাহিনীর সাথে।
উসামা ঘোড়ার পিঠে আর আবু বকর চলছেন পায়ে হেঁটে। একসময় উসামা বিনয়ের সাথে আরজ করলেন, হে রাসূলুল্লাহর খলিফা! আল্লাহর কসম, হয় আপনি ঘোড়ায় উঠুন, না হয় আমি নেমে পড়ি।
খুব মিষ্টি করে হেসে বললেন খলিফা হযরত আবু বকর :
আল্লাহর কসম! তুমিও নামবে না, আমিও ঘোড়ার পিঠে উঠবো না। কিছুক্ষণ আল্লাহর পথে আমার পদযুগল ধূলিমলিন হতে দোষ কী?
তারপর একটু থেমে আবার বললেন :
তোমার দীন, তোমার আমানতদারি এবং তোমার কাজের সমাপ্তি আল্লাহর কাছে ন্যস্ত করলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) যে নির্দেশ তোমাকে দিয়েছেন, তা কার্যকরী করার উপদেশ তোমাকে দিচ্ছি।
তারপর উসামার দিকে একটু ঝুঁকে তিনি বললেন, উসামা! তুমি যদি ওমরের দ্বারা আমাকে সাহায্য করা ভালো মনে কর, তবে তাকে আমার কাছে থেকে যাওয়ার অনুমতি দাও।
খলিফা হযরত আবু বকরের কথা শুনে উসামা বললেন : ঠিক আছে, তাই হোক। আনুগত্যের কী চমৎকার নিদর্শন!
রোমান অভিযানে সফল হলেন কমান্ডার উসামা। রাসূলের আদেশ তিনি পালন করেন অক্ষরে অক্ষরে।
তার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী পদানত করেন ফিলিস্তিনের বালকা এবং কিলায়াতুত দারুম সীমান্ত। এই অভিযানের ফলে মুসলমানদের হৃদয় থেকে চিরতরে দূর হয়ে যায় রোমানভীতি। আর গোটা সিরিয়া মিসর ও উত্তর আফ্রিকাসহ কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূ-ভাগের বিজয়দ্বার খুলে যায় চমৎকারভাবে। এই অভিযানেই হযরত উসামা হত্যা করেন তার পিতার হত্যাকারীকে।
এবং তারপর যে ঘোড়ার পিঠে শহীদ হয়েছিলেন তার পিতা, সেই ঘোড়ার পিঠে বহন করে আনলেন বিপুল পরিমাণে গনিমতের মাল।
যোগ্য প্রতিশোধই বটে!
হযরত উসামা! যার ছিল একটি অনাড়ম্বর অথচ বর্ণাঢ্য জীবন। ছিল গভীর প্রজ্ঞা, সাহস আর আল্লাহর, রাসূল ও ইসলামের প্রতি অঢেল ভালোবাসা।
যে ভালোবাসা, প্রজ্ঞা আর সাহসের কারণে খুব কম বয়সে সেই কৈশোরেই তিনি পেয়েছিলেন নবীজীর কাছ থেকে কমান্ডারের মত এত বিরল মর্যাদা।
গল্প শেষে মেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। তিনি তখন উঠে ঘড়ির দিকে তাকালেন।
দেখেন দেড়টা বেজে গেছে।
চিন্তা করলেন, তাহাজ্জুতের নামাজটা শেষ করেই ঘুমাই।
তিনি ওযু করতে ওয়াশরুমে গেলেন।

পাঁচ.

সপ্তাহ খানেক ধরে হাসান সাহেব বেশ বিমর্ষ।
কেন?
শাহানা বেগম জানতে চেয়েও যেমন উত্তর পাননি, তেমনি বুঝতেও পারছেন না।
হাসান সাহেব তো এমন মুখ ভার করে থাকার মানুষ নন। খুব উচ্ছল উদ্দম। হাস্যরসে এবং কৌতুকে সংসারটি মাতিয়ে রাখেন। এ জন্যই তিনি যখন অফিসে যান আর যতক্ষণ ফিরে না আসেন ততক্ষণ পর্যন্ত সংসারটি কেমন গুমোট, অন্ধকার হয়ে থাকে। তিনি ঘরে ফিরলে সব উজালা।
অফিস থেকে ফেরার পর আজ শাহানা বেগম চা-নাশতা দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা তুমি সত্যি করে বলোতো তোমার কী হয়েছে? তুমি এতটা বিমর্ষ হয়ে আছ কেন? আমার সাথে কি বলা যায় না? বলতে না চাইলে বলবে না। কিন্তু বলতে চাইলে বলো। এমনও তো হতে পারে আমার কোনো পরামর্শ তোমার কাজে আসতে পারে।
হাসান সাহেব শান্ত প্রকৃতির মানুষ। তিনি স্বাভাবিক থাকতে পছন্দ করেন। কিন্তু হঠাৎ পরিবর্তনে শুধু শাহানা বেগম নন, গোটা পরিবার যে পরিবর্তন হয়েছে এটা তিনি বুঝতে পারলেন। তাই সবাইকে তিনি বিষয়টা জানান।
হাসান সাহেব চা-নাশতা খেতে খেতে বললেন-
– না, সমস্যা তেমন না।
– তবে!
হাসান সাহেব যতটুকু সম্ভব শান্ত স্বরে বললেন
– আজ কয়েকদিন হলো ঘটনাটি ঘটেছে। আমি নিজেই কষ্টটা হজম করতে পারছি না বলে বলতে পারছি না।
– সেটা কি?
– আব্বাজানের দোস্ত গত শুক্রবারে মারা গেছেন।
শুনেই শাহানা বেগম থতমত খেয়ে বললেন
– সে কি!
আব্বাজানের দোস্ত মারা গেছেন? আমাকে জানাওনি? খবরটা তোমাকে কে জানালো?
– আব্বাজান!…
– আব্বাজানের শরীর এখন কেমন আছে?
ভালোই আছে। তবে দোস্তের ইন্তেকালে তিনিও অনেকটা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। হাজার হলেও তো একই বয়সের।
শাহানা বেগম বললেন-
আব্বাজানের সাথে কি ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ রাখ?
-হ্যাঁ রাখি।
– আজকে ফোন করেছিলে?
– না।
– ভাবছি, চা-নাশতার পর একটু বিশ্রাম করেই ফোন দিব।
– থাক। তোমাকে ফোন করতে হবে না। আমি আজ আব্বাজানের সাথে কথা বলব।
বলে শাহানা বেগম ফোনটি হাতে নিলো। নিজেকে মনে মনে ভর্ৎসনা করলো। ইস! একটা সপ্তাহ গেল। আব্বাজানকে আমি একবারও ফোন দিলাম না? এটা তো অপরাধ হয়ে গেল।
নিজের অপরাধে নিজেই কুঁকড়ে গেলেন। তিনি ফোন দিলেন।
ও প্রান্ত থেকে আব্বাজান নিশ্চয় কথা বলছেন সেটা বুঝতে পারছে হাসান সাহেব।
মোবাইলটা লাউডে দেও না।
শাহানা বেগম কানে ধরে কথা বলছেন। লাউডে দিয়ে কথা বলা বা শোনা তিনি পছন্দ করেন না। অনেকটা আড়ি পাতার মত অপরাধ মনে হয়। যিনি ফোন করেছেন তিনি শুধু কথা বলবেন বা শুনবেন। তাহলে প্রাইভেসিও রক্ষা হয়। এটা ভদ্রতারও অংশ।
কিছুক্ষণ কথা বলার পরে শাহানা বেগম হেসে বললেন
– আব্বাজান আপনি কবে আসছেন? না না, একটু নিশ্চিত করে বলুন না আব্বাজান!
সম্ভবত আব্বাজান ব্যস্ততার কোনো দোহায় দিচ্ছিলেন।
না না আব্বাজান কোনো কথা শুনব না। আপনাকে আগামী সপ্তাহে আসতেই হবে। এবার কিন্তু বাসে আসবেন না। হয় প্লেনে নাহলে ট্রেনে আসবেন। শাহবাজ আপনাকে স্টেশন থেকে নিয়ে আসবে।
সম্ভবত আব্বাজান মজা করে বললেন প্লেনে আসব এত টাকা কে দেবে? হাসান সাহেব এমনটাই বুঝলেন। শাহানা বেগম বললেন-ওসব আপনাকে চিন্তা করতে হবে না।
কাল সকালে আপনার ছেলে ইনশাআল্লাহ বিকাশ করে দেবেন। আপনি শুধু টিকেট করেই আসবেন। এবার আব্বাজান সম্ভবত হাসলেন। শাহানা বেগমের খুশিতে হাসান সাহেব বুঝলেন।
শাহানা বেগম বললেন-
তাহলে আগামী বৃহস্পতিবার আপনি প্রথম ফ্লাইটে আসবেন। শাহবাজ আপনাকে রিসিভ করবে। ঠিক আছে?
শাহানা বেগম মোবাইলটা রেখে মুখ মুছতে মুছতে হাসানকে বললেন- দেখেছ, আব্বাজান এখনও কতটা প্রাণবন্ত! বরং তার চেয়ে তুমি অনেক বুড়ো হয়ে গেছো মনের দিক দিয়ে।
আব্বাজান আসছেন বৃহস্পতিবার। খেয়াল রেখ। আর কাল দুপুর ১২টার মধ্যে আব্বাজানের বিমানের টাকাসহ অন্যান্য খরচ বিকাশ করে দিবে। তুমি অফিসে গেলে আমি ফোন করে মনে করিয়ে দেব। এবার সব চিন্তা দূর কর। তোমার বুড়ো ছেলে তোমার কাছে আসছে। এর চেয়ে ভালো খবর কী আছে?
হাসান সাহেব শাহানা বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
ঐ হাসিটুকুর মধ্যে ছিল অনেক গূঢ় অর্থ। যা শাহানার পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভবপর নয়।
এমনকি অন্য কারও।

ছয়.

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার আগেই শাহবাজ বিমানবন্দরে একটি ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে হাজির হলো। এবার অপেক্ষার পালা!
এক ঘণ্টা অপেক্ষায় আছে। দাদু ভাইয়ের কোনো খবর নেই।
কত প্লেন আসছে আর যাচ্ছে। কিন্তু কোনোটাতেই দাদু ভাই নেই। একটু চিন্তায় পড়লো শাহবাজ। তার সাথে তুহিন ও রুহিও আছে।
হঠাৎ মোবাইলটার রিংটোন বেজে উঠলো।
কার কল!
শাহবাজ দ্রুত দেখে নিল। আম্মুর কল। কানে ধরতেই আম্মু বললেন, তোমরা ওখান থেকে সোজা রেল স্টেশন, কমলাপুর যাও গাড়ি নিয়ে।
– কেন?
– তোমার দাদুভাই ট্রেনে এসছেন। স্টেশনে অপেক্ষা করছেন।
– দাদু ভাইয়ের সাথে আর কেউ আছে কি?
– তাতো জানি না। জিজ্ঞেস করিনি। শুধু বলেছি একটু অপেক্ষা করতে।
– ঠিক আছে আম্মু, আমরা এখনি যাচ্ছি।
যানজট উপেক্ষা করে শাহবাজদের পৌঁছাতে আরও এক ঘণ্টা লাগলো। গাড়ি থেকে তিন ভাই-বোন নেমে প্লাটফর্মের এদিক-ওদিক তাকাতেই পেয়ে গেল দাদুভাইকে। সাথে একটা লাগেজ।
শাহবাজ দাদুভাইকে সালাম দিয়ে এগিয়ে গেল।
সাথে তুহিন ও রুহিও।
লাগেজে হাত দিতেই দাদুভাই হেসে বললেন, এই যে দাদু ভাই!
– জি।
– এর চেয়েও যে আর একটা ভারী কিছু আছে। সেটা নেবে কে?
– সেটা কী?
– ঐ দেখো।
আল্লাহু আকবর!
শাহবাজ চমকে উঠলো প্রথমত। একি! দাদীও এসেছেন? চোখের ঘোর কাটতে না কাটতেই দাদী বললেন, আমার দিকে তাকানোর কোনো সুযোগ নেই তোমাদের, না!
শাহবাজ পরিস্থিতি শামাল দিতে পারে। বললো, কিযে বলেন দাদীআপু। এই দেখুন আপনাকে রিসিভ করতে আমরা সব ভাই-বোন চলে এসেছি।
দাদু বললেন, হুম! হয়েছে এবার চলো।
শাহবাজ ড্রাইভারকে লাগেজটা গাড়ির পেছনে দিতে বললো। দাদু ও দাদীকে নিয়ে তারা গাড়িতে বসলো।
একটা দম ছেড়ে শাহবাজ বাসার উদ্দেশে গাড়ি ছাড়তে বললো ড্রাইভারকে।
গাড়ির মধ্যে শাহবাজ জিজ্ঞেস করলো, কিছু কি খেয়েছেন দাদুভাই? নাকি দু’জনই রোজা আছেন?
– খেয়েছি ভাই। যাকে বলে চোস্ত নাস্তা!
– সেটা আবার কী রকম?
– আসার সময় তোমাদের বড় আম্মু নাস্তাসহ সবই গুলিয়ে দিয়েছেন। এমনকি পানসুপারি পর্যন্ত।
– রাতে ট্রেন পর্যন্ত কেউ এসেছিল কি?
– আসবে না মানে? তোমার বড় আব্বু তার গাড়িতে করে এনে ট্রেনের বিজার্ভ কেবিনে উঠিয়ে দিয়ে গেল।
– দাদীর কথা আমাদের বলেন নি কেন?
– সারপ্রাইজ, সারপ্রাইজ দেবার জন্য দাদু ভাইয়া। কেমন হলো?
দারুণ! কোনো জবাব নেই দাদু ভাই।
রুহি ও তুহিন বললো, আম্মুকে ফোন করে জানিয়ে দেই?
দাদু ভাই জিজ্ঞেস করলেন, কী?
দাদী আসছেন। সবার জন্য নাস্তার ব্যবস্থা করতে।
দাদু ভাই একটা পান মুখে দিতে দিতে বললেন, তার আর দরকার নেই। তাকেও সারপ্রাইজ দেয়া যাক। শাহবাজ হাসলো।
রুহি বললো, দাদুভাই এখনো সেই রকম মজার মানুষ। যেন জাদুর কাঠি।
দাদী রুহির মুখ টিপে হাসতে হাসতে বললেন, তাতো অবশ্যই। দেখতে হবে না কাদের দাদু ভাই! গাড়ির ভেতর হাসির রোল পড়ে গেল। ড্রাইভার মাথা ঘুরিয়ে একবার দেখে নিল আনন্দঘন মুহূর্তটি। গাড়িটি বাসার সামনে পৌঁছে গেল।
শাহবাজ গাড়ি ভাড়া দিতে দিতে তুহিনকে বললো, তুমি দাদুভাইয়ের হাত ধরো আর রুহি আপু তুমি দাদীকে ধরে আস্তে করে উঠিয়ে নিয়ে যাও সিঁড়ি বেয়ে। যেন কষ্ট না পান।
– আর লাগেজ?
ওটা আমি দেখছি।
গাড়িভাড়া দিয়ে দারোয়ানের সহযোগিতা নিয়ে লাগেজসহ ওপরে উঠছে শাহবাজ। এর মধ্যেই তার কানে কলিংবেলের আওয়াজ এলো। অর্থাৎ তারা উঠে গেছে দরোজা অবধি।
পিছে পিছে শাহবাজও উঠে পড়লো।
আম্মু কলিংবেলের শব্দ শুনে দৌড়ে এলেন। তিনি রান্নাঘরে ছিলেন। শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে দরোজা খুললেন। দরোজা খুলেই শাহানা বেগম হতবাক!
আব্বাজানের সাথে আম্মাকে দেখেই মূলত তিনি অবাক!
কারণ, কাল রাতে কিংবা সকালে যখন ফোনে কথা হয় তখনো তিনি আম্মার কথা বলেননি।
দাদুভাই বললেন, কি হে মা! চমকে গেলে তো?
– হ্যাঁ আব্বুজান। ফোনেও তো কিছু বললেন না।
– আরে মা, সবই বলে ফেললে আর মজাটা থাকে কোথায়? কিছু রহস্যেরও মজা আছে!
আছে না বলো?
– জি আব্বুজান। আসুন, আসুন। ভেতরে আসুন। বলে তিনি আম্মার গলা জড়িয়ে ধরে ঘরে নিয়ে এলেন। তুহিনের বোগলবন্দি দাদুর হাত। আর শাহাবাজের হাতে লাগেজ। সবাই হাসতে হাসতে বাসার ভেতর প্রবেশ করলেন।
শাহানা বেগম দ্রুত ফোন করলেন হাসান সাহেবের কাছে। বললেন-
– আব্বাজান ও আম্মাজান আসছেন।
হাসান সাহেব খুশিতে বাগ বাগ হয়ে বলেন, তাই নাকি? আম্মাও আসছেন?
– হ্যাঁ। তুমি একটু আগে আসার চেষ্টা কর। আব্বা আম্মা যা যা খেতে পছন্দ করেন সে রকম বাজার করে নিয়ে এস। পারবে তো? নাকি আমি শাহবাজকে বাজারে পাঠাব?
হাসান সাহেব বললেন-
তার আর দরকার নেই। আমি আসার সময় বাজার করে নিয়ে আসব। তুমি বরং নাশতা এবং দুপুরের খাবার ব্যবস্থা করতে থাক।
দ্রুত গোসল করে নিতে বল। ফ্রেশ হয়ে একটু ঘুমিয়ে নিন।
দাদী বললেন শাহবাজকে
– ভাইয়া, তোমার গায়ে তো ভালোই শক্তি আছে দেখছি। বস্তার মুখটা একটু খোলোতো। জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে কিনা কে জানে? যে গরম পড়েছে!
শাহবাজ দাদীর কথা মত প্রথম বস্তার মুখ খুললো। বললো-
দাদী আপু এটা কি উপুড় করে ঢেলে দিব?
– হ্যাঁ দাও। তবে ঐ চেয়ার টেবিল একটু সরিয়ে নাও।
শাহবাজ এবার বস্তার মুখ উপুড় করে ঢেলে দিল। একে একে বস্তা থেকে গড় গড় করে পড়তে থাকল রাজ্যের তরিতরকারি। ঠিক আব্বাজান যা যা খেতে পছন্দ করেন সকল তরকারি, চাল কুমড়ার বড়ি, কাসুন্দি, এমনকি আমসত্ত্ব পর্যন্ত বয়ে এনেছেন। অন্য ছোট একটি বস্তায় দেখা গেল নানা রকম পিঠা, পায়েস ও বড় এক বোতল দুধ। সেই সাথে আছে গুড়, নারকেল ও ঘাটকল। দানাদার সন্দেশ, আমড়া, চালের গুঁড়ো আরও কতকিছু।
শাহানা বেগম হাসতে হাসতে বললেন
– আম্মা বাড়িতে আর কিছু রেখে আসেননিতো? নাকি যা ছিল সব নিয়ে এসেছেন?
আম্মা বললেন-
ধুর পাগলী, এটা আর কি! এতো আমার মাঝচার সব প্রিয় খাবার। তুমি সব গুছিয়ে রাখ। যেন কোনটাই নষ্ট না হয়।
শাহবাজ হেসে বললো-
দাদী আপু, কেবল আপনার মাঝচার জন্য সব নিয়ে আসছেন, আমাদের কোনো ভাগ নেই?
– থাকবে না কেনরে, পাগল? মাঝচা মানে তো বাসার সবাই। আমরা একসাথে খাব সবাই। ও পায়েসটা বেশি পছন্দ করেতো এ জন্যই নিজ হাতে রান্না করে নিয়ে এসেছি। রুহি বললো
– কেন দাদী আপু! অন্য কোনো আম্মুরা কি এরকম পায়েস রাঁধতে পারেন না?
– পারে। কিন্তু মাঝচা আমার হাতের পায়েস ছাড়া অন্য কোনো পায়েস খেয়ে তৃপ্তি পায় না। এটা ওর ছোটকালের অভ্যাস। পিঠা, পায়েস, গুড়, চাল ভাজা, ছোলা ভাজা সব সময় ওর জন্য আমার রেডি করে রাখতে হতো। যদি খেয়াল হয় তো রাত ৩টার সময় আমাকে বলবে-
মাগো, একটু পিঠা বানিয়ে দেবে? তেলের পিঠা? এ কথা শুনে আমি কি আর শুয়ে থাকতে পারি? ব্যাস উঠে তার জন্য তেলের পিঠা তৈরি করে দেই। ও চুলার পাশে বসে থাকে।
এখনও বাড়ি গেলে এমনই পাগলামি করে। শাহানা বেগম বললেন-
অনেক হয়েছে আম্মা। এবার ওঠেনতো। আপনাকে এসব কিছুই গোছাতে হবে না। আমি গোছাই। আপনি ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হন। পারলে গোসল করে আসেন। আপনার মাঝচা বলেছে।
হাসলেন কুলসুম বেগম। সত্যিই তাই! আমার কথা বলেছে? আচ্ছা তাহলে যাই। মাঝচা এসে যদি দেখে তার কথা আমি শুনিনি তাহলে আবার কিযে কা- করবে কে জানে!
ততক্ষণে দাদু ভাইয়ের গোসল শেষ। তাঁকে কিছুই বলা লাগে না। কখন কি করতে হবে আর যখন যেটা করা প্রয়োজন তখনই সেটা করেন।
ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়েই হাঁক ছাড়লেন। বউ মা!
তাড়াতাড়ি নাশতা পানি কিছু দাও। দুপুর তো হয়ে গেল। তার মধ্যে একটু বিশ্রাম করে নেই।
শাহানা বেগম আগেই নাশতা তৈরি করে রেখেছিলেন। তিনি সেগুলো টেবিলে দিয়ে বলেছিলেন আসুন আব্বাজান। খেয়ে নিন। ওয়াজেদ সাহেব টেবিলে বসতে বসতে বললেন
– কিরে। পাগলি মেয়ে? নাশতা শুধু আমার জন্য কেন? আমার ভাই-বোনদের জন্য কই?
– ওরা খেয়ে নিয়েছে আব্বাজান।
– বললেই হলো? ওদের এখানে নাশতা দাও। তুমিও আস। তোমার আম্মা কোথায়? তাকেও আসতে বলো। সবাই এক সাথে বসে নাশতা করব।
ওয়াজেদ সাহেবের শুধু এখন না, সব সময়ের অভ্যাস। বাসা বাড়িতে যখন খাবেন তখনও সবাই একসাথে খাবেন। এটা নিয়ম-নীতি। এর ব্যত্যয় হবার কোনো উপায় নেই।
শাহানা বেগম এটা বোঝেন। তিনি ছেলে-মেয়েকে ডেকে সবার জন্য নাশতা দিলেন। তখন আম্মাও এসেছেন। নাশতা খেতে খেতে ওয়াজেদ সাহেব বললেন-
মেজো আব্বা কখন আসবে? ফোন করেছ?
– জি আব্বাজান বলেছি। উনি যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি চলে আসবেন।
– হ্যাঁ। তাই যেন হয়। হাতে সময় কম। কাজ অনেক বেশি।
বলেই শাহাবাজের দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন
– এই দাদু ভাই, ঐ যে পূর্বাচলের প্লটটার এখন কি অবস্থা?
শাহবাজ বললো
– ওটাতো রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে দাদুভাই।
– চারপাশে কি ওয়াল দেয়া হয়েছে?
– না, এখনো হয়নি।
– কিছু গাছ লাগানো হয়েছে?
– না, দাদুভাই।
– হুম। তা হবে কেন? আচ্ছা ঠিক আছে। কালকের জন্য একটা মাইক্রোবাস ভাড়া কর। আমরা সবাই সেখানে যাব। প্লটটা দেখে আসি। কি অবস্থায় আছে। আর হ্যাঁ, আজ বিকেলে আমার সাথে বাজারে যাবে। কাজ আছে।
– ঠিক আছে দাদুভাই।
জোহরের নামাজ পড়ে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে দাদুভাই জামা-পাজামা পরে গুছিয়ে লাঠিটা হাতে নিয়ে মুখে পান দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
– কই হে দাদুভাই, কোথায়? এত দেরি কেন?
– শাহবাজ দ্রুত ছুটে এল। এইতো দাদুভাই আমি রেডি।
– ঠিক আছে। চলো সাথে। নাকি আমি তোমার সাথে যাব?
শাহবাজ হাসলো-
দাদুভাই কথা তো একই।
বেশ, চল।
বলেই ওয়াজেদ সাহেব ছড়িটা ঘোরাতে ঘোরাতে ঘর থেকে বের হলেন।
পেছনে শাহবাজ রাস্তায় নেমে বললো
– দাদুভাই রিকশা নেব?
– এখান থেকে কতদূর বাজার?
– মাত্র ১০-১৫ মিনিটের রাস্তা।
– না। তাহলে রিকশার দরকার নেই। এটুকু হেঁটে যাই। হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
ওয়াজেদ সাহেব পেশায় ছিলেন শিক্ষক। অবসর নিয়েছেন। কিন্তু এখনো স্বাস্থ্য অটুট। নিয়ম মেনে চলার কারণে স্বাস্থ্য নষ্ট হয়নি এখনো।
– দুই ভাই হাঁটতে হাঁটতে কামারের দোকানে গেল। সেখান থেকে মাটি খুঁড়তে যা যা লাগে কিনলেন দাদুভাই। তারপর জিজ্ঞেস করলেন- আশপাশে কোনো নার্সারি আছে?
– আছে তো দাদুভাই। ঐ তো পাশে।
– তাই! আলহামদুলিল্লাহ। চলো। নার্সারিতে এসে অর্জুন, হরীতকী, বয়রা, নিম, আম, কাঁঠাল, জাম, সুপারি, নারকেল ও লেবুসহ বিভিন্ন গাছের চারা কিনলেন। তারপর একটা ভ্যান ঠিক করতে বললেন শাহবাজকে।
শাহবাজ সেটাই করল। ভ্যানে ওগুলো সব বাসায় আনা হলো। ঘরে প্রবেশ করে দাদুভাই বললেন- এবার একটা মাইক্রোবাস ভাড়া কর। তোমার ফোনে কোনো কনট্যাক্ট নাম্বার আছে?
– জি আছে।
– ঠিক আছে। আগামী কাল শুক্রবার। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর ৪টায় ড্রাইভারকে গাড়ি আনতে বলো। আর এই চারাগুলো সুন্দর করে বারান্দায় সাজিয়ে রাখ। কাল গাড়িতে করে নিয়ে যাবো।

সাত.

রাতে খাওয়া দাওয়ার সময় হাসান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, আব্বাজান আসতে কোনো সমস্যা হয়নিতো?
আমি তো প্লেনেই আসতে বলেছিলাম। ট্রেনে এলেন কেন?
ওয়াজেদ সাহেব বললেন
– ও তুমি বুঝবে না বাপু! প্লেনে কোনো মজা নেই। উঠলাম চলে এলাম। আর এই যে তোমার মেভাই কাল ট্রেনে তুলে দিল আমরা কি সুন্দর চারপাশ দেখতে দেখতে এলাম। মনেই হলো না আমরা জার্নি করছি। কত ক্ষেত, গাছপালা। এসব না দেখলে কি মন জুড়ায়? আমি তো আর বিদেশে যাচ্ছি না। যে আমার প্লেনে উঠতে হবে। দেখার মধ্যেই অনেক শিক্ষা আছে। বুঝলে?
এসব আগেকার মানুষ ভালোই বুঝতেন। সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াতেন। প্রকৃতির এ শিল্প অনেক বড় শিখায় যা বইয়ে পাওয়া যায় না। এর মর্ম কী বুঝবে? চার দেয়ালের মাঝে। হাসান সাহেব আর কিছু বললেন না। চুপ থাকলেন। আব্বাজান বললেন-
তুমি তো আর একদিনে এত বড় হওনি। তোমার কি মনে নেই সেই শৈশব। কৈশোরের কথা। গ্রামের কথা, ক্ষেত ভরা ফসল, পাখ-পাখালির ডাক শেয়ালের হাঁক। কি এসব ভুলে গেছ? মূলকে সব সময় মূলের মতই গুরুত্ব দিতে হয়।
হাসান সাহেব নিচুস্বরে বললেন
– আমি কি এসব ভুলে গেছি আব্বাজান! দেখেন না সময় পেলে চলে যাই। শহরের এসব দূষিত হাওয়া থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য চলে যাই গ্রামে। আপন ঠিকানায়।
ওয়াজেদ সাহেব হাসলেন।
হ্যাঁ। তাতো হবেই। হবে না কেন? তোমরা তো আমাদের সন্তান। এখনও মুখ উঁচু করে বলতে পারি যে আমার সাত ছেলে মেয়ে সাতটি বটবৃক্ষ কিংবা সাতটি মহাদেশ। আমি কি কিছু বেশি বললাম বউমা? শাহানা বেগম হাসতে হাসতে বললেন
– না আব্বাজান। আপনি ঠিকই বলেছেন। আপনার সাত ছেলে মেয়ে সত্যিই সাতটি মহাদেশ। এসব মনে হলে আমার হৃদয় ভরে যায়। আপনারা সত্যিই সার্থক পিতা-মাতা।
একটা দম ছেড়ে শাহানা বেগম বললেন
– বরং আমরাই পরাজিত। আমাদের সন্তানদের সেভাবে গড়ে তুলতে পারিনি। যেভাবে আপনারা পেরেছেন।
পরিবেশটা ক্রমশ ভারী হয়ে যাচ্ছিল।
কুলসুম বেগম সেটা বুঝতে পেরে বললেন –
খাবার সময় এত কথা বলতে হয় না। জার্নি করে এসেছি। ঘুমাতে হবে না?
ওয়াজেদ সাহেব বললেন
– তাইতো! দেখছো না কেমন যেন স্মৃতিতাড়িত হয়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়ি।
ছেলেমেয়েরা যদি আমার কাছে থাকত ইশ কতই না ভালো হতো। শাহানা বেগম খুব বুদ্ধিমতী। বললেন- আপনার ছেলে-মেয়েরাতো এমন যে পুকুর কিংবা দিঘীতে তাদের জায়গা হওয়ার কথা নয়। তাদের জন্যতো বিশাল বিশাল সাগরই প্রয়োজন। হাসান সাহেব বললেন
– বাহ। তুমি সত্যিই বলেছ। এটা খাস আল্লাহর রহমত।
জানো বউমা! তোমাকে একটা কথা বলি। আমার এই সাতটি ছেলেমেয়েকে মানুষ করার জন্য আমি বাড়িতে কখনো ছাগল-গরু পুষিনি। কারণ এগুলো পালতে গিয়ে ছেলে-মেয়েরাও যদি ছাগল গরু হয়ে যায়? কত কষ্ট করে যে তাদের মানুষ করেছি। মুরগি পালকের মধ্যে রেখে যেমন বাচ্চাদের পালন করে আমরাও ঠিক তেমনি ভাবে আমাদের সন্তানদের প্রকৃত মানুষ করার চেষ্টা করেছি। আলমাহদুলিল্লাহ। প্রত্যেকে এখন প্রতিষ্ঠিত। স্বনামে দেশ বিদেশে পরিচিতি। কারও নামে আমার কাছে অভিযোগ আসেনি। বড় ছেলে যখন চেয়ারম্যান ও এমপি ছিল তখনও না। এর চেয়ে আনন্দ ও খুশি আর কি হতে পারে বলো? আমার জন্য মহান রবের এটাই বড় বরকতময় দান।
খাওয়া শেষ করে প্রত্যেকেই যে যার মত ঘুমোতে গেল।
সকালে উঠে নাশতা সেরে দাদু ভাই বললেন
– আজ শুক্রবার। পবিত্র দিন। পবিত্র মন নিয়ে সকলেই আমার সামনে এসে বসো। এমন চাঁদের হাট আর কবে দেখতে পাব তার কোনো ঠিক নেই।
ওয়াজেদ সাহেবের কথা মতো সবাই গোল হয়ে বসে গেছে। তিনি বললেন-
আমার মাত্র কয়েকটি কথা বলার আছে তোমাদের জন্য।
হাসান সাহেব বললেন
– বলুন আব্বাজান।
ওয়াজেদ সাহেব বললেন
– এখানে আমার বউমা আছ। শাহবাজসহ আমার ৩ ভাইবোন আছ। সবাই শোনো।
আমি আমার ছেলে-মেয়েদের কাছে ডেকে নিয়ে বলতাম
– তোমরা জীবনে কখনোও সংকট কালেও মিথ্যা বলবে না। পিতা-মাতার অবাধ্য হবে না। আল্লাহর ফরজ এবাদত থেকে গাফেল হবে না। আমানতদারিতা সকল সময় রক্ষা করবে। সকলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে। তোমরা সকল কিছু থেকে শিক্ষা গ্রহণের চেষ্টা করবে। সেটা ভালো থেকে হোক কিংবা খারাপ। সুখে-দুঃখে সকল সময় শিক্ষা গ্রহণ করবে। আলহামদুলিল্লাহ। আমার এই কথাগুলো ছেলে-মেয়েরা সম্পদের চেয়েও বেশি গ্রহণ করেছিল। এ জন্য দেখ আল্লাহ পাক তাদেরকে অঢেল বরকত দিয়েছেন। তোমরাও যদি এগুলো মেনে চলো তাহলে দুনিয়া এবং আখেরাত দুটোই তোমাদের জন্য প্রশস্ত হয়ে যাবে। খেয়াল রেখ আল্লাহর হক বান্দার হক- এসব কোনো কিছুই অবহেলা করবে না। যথাসাধ্য চেষ্টা করবে হক আদায়ের। আল্লাহও বরকত দিবেন। ইনশাআল্লাহ। দাদুভাইয়ে কথা শুনতে শুনতেই জুমার আজান হয়ে গেল। তিনি বললেন
– যাও সবাই ওজু গোসল করে রেডি হও। আমরা আজ একসাথে মসজিদে যাবো।
দুপুরে খাওয়ার পর শাহবাজ ড্রাইভারকে ফোন দিল।
ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে এলো যথাসময়ে। দাদুভাই বললেন, শাহবাজ!
– জি দাদুভাই?
– গাছের চারাগুলি, মাটি খোঁড়ার যন্ত্রপাতি আর এক গ্যালন পানি গাড়ির পেছনে নাও।
– জি দাদুভাই।
সবাই দ্রুত রেডি হয়ে গাড়িতে বসলো। সাথে কিছু খাদ্য খাবার, পানিও নিয়েছেন শাহানা বেগম। বাড়ি থেকে আমি পায়েস, মোয়া, মুড়ি, বিস্কুট আরও বেশ কিছু ফলফলাদি নিয়ে এলাম। ছুটির দিন বলে রাস্তায় যানজট খুম কম।
গাড়ি চলছে পূর্বাচলের দিকে।
ওয়াজেদ সাহেব হাসান সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মিয়াভাইয়ের উত্তরার প্লটটি যেন কোন দিকে?
– সেটিতো আব্বাজান ঐ দিকে। তিনি আঙুল উঁচু করে দেখিয়ে দিলেন।
– খুব ভালো দুটো কাজ হয়েছে।
– কি?
– এই যে তোমার মিয়াভাইয়ের প্লট আর তোমার প্লট!
– জি আব্বাজান। মিয়াভাইতো পেয়েছিলেন এমপি হিসেবে। কিন্তু আমারই একান্ত আল্লাহর রহমত আর আপনাদের দোয়ার বরকত।
– তা ঠিক। তুমি যেন কত সালে পেয়েছিলে!
– ২০০৮ এ। তখন মিয়াভাইদের সংসদের মেয়াদ শেষ। সঙ্কটের কারণে নির্বাচন হয়নি। দেশে তখন আর্মি শাসন চলছে। সেই সময় পত্রিকায় সার্কুলার দিল। আমি দেখিনি। আমার অফিস অ্যাসিসট্যান্ট পত্রিকা এনে বললো, স্যার আপনিও একটা দরখাস্ত করুন। এই দেখুন আপনার জন্যও কোটা আছে। আমি তাকে বললাম, আমি তো ওসব বুঝিনে! যা করতে হয় তুমি করো।
সত্যি সত্যিই সেই কাগজপত্র রেডি করে জমা দিল। একসময় দেখলাম, আমার নামটিও প্লটপ্রাপ্তদের তালিকায় এসেছে। সেই পেপারটাও সে দেখালো। আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম।
আব্বাজান বললেন, আল্লাহর রহমত এভাবেই আসে।
কথা বলতে বলতে গাড়ি থামলো পূর্বাচল প্লটের সামনে। চারপাশে বড় বড় রাস্তা। রাস্তার সাইডেই প্লট।
আব্বাজান ছড়িটা নিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন। বললেন, এই তাহলে আমাদের প্লট?
– জি আব্বাজান।
– বাহ, চমৎকার জায়গা। দাঁড়াও, দাঁড়াও আমি আগে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে নেই।
আব্বাজান ঘাসের ওপর নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন।
মুনাজাতের সময় তাঁর গন্ড অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায়। তিনি শাহবাজকে বললেন, ড্রাইভারকে চারাগুলো নামাতে বলো।
– জি দাদুভাই।
আব্বাজান এমনভাবে চারাগুলি নিজ হাতে লাগিয়ে দিলেন। যা দেখতে খুবই সুন্দর। একটা কাশি দিয়ে বললেন, দেখো- আমি এমনভাবে এগুলি সাজিয়ে লাগিয়ে দিলাম- যে, ওয়াল করার সময় এমনকি বিল্ডিং করার সময়ও আর কাটার দরকার হবে না। ৫ কাঠার প্লট বলেই এত সুন্দর করে গাছগুলি লাগানো গেল। চারা লাগিয়ে ওয়াজেদ সাহেব বললেন, এগুলোর যত্ন নিও। সন্তানের মত গাছেরও যত্ন নিতে হয় বুঝলে! হাসান সাহেবকে বললেন, এখনো ওয়াল দাওনি কেন? চারপাশের প্লটতো দেখছি সবই ওয়াল দেয়া।
তুমিও কাজ শুরু করো।
জমি রেজিস্ট্রিতে অনেক টাকা চলে গেল তো। এখনো গুছিয়ে উঠতে পারিনি।
– না, তা বললে হবে না। তুমি কালই কাজ শুরুর ব্যবস্থা করো। তা না হলে এটা এবং এখানকার গাছ-গাছালি অরক্ষিত থাকবে। শুরু করে দাও আল্লাহর নামে, ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ!
হাসান সাহেব ভরসা পেলেন কিছুটা। বললেন, ঠিক আছে আব্বাজান, তাই হবে।
– হ্যাঁ, দেরি করো না যেন। কখন কী লাগবে, আমাকে জানাবে।
কাজ শেষ হলে আব্বাজান ও আম্মাসহ সকলেই প্লটের চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন।
সকলের মনেই প্রশান্তির ঢেউ আছড়ে পড়ছে।
হাসান সাহেব বললেন, এবার ফেরা যাক। তা না হলে রাত হয়ে যাবে। কুলসুম বেগম এক মুঠো মাটি হাতে নিয়ে শিশুর মত খেলা করছেন যেন।
প্রত্যেকেই যে যার মত আনন্দ প্রকাশ করছে।
ওয়াজেদ সাহেব বললেন, প্রাণটা জুড়িয়ে গেল বাবা। তোমাদের পাঁচ ভাইয়ের আল্লাহর রহমতে একটা কিছু হলো। একটা নয়, অনেক।
হাসান সাহেব বললেন, হবে না, আব্বাজান? আল্লাহর রহমত আর আপনাদের দোয়া আছে যে! ছোট বেলায় দেখতাম, আপনি তাহাজ্জুদ নামাজ শেষে দোয়া করতে গিয়ে জোরে জারে কাঁদতেন আমাদের জন্য।
আম্মাকে দেখতাম সপ্তাহে দুদিন করে রোজা রাখতে। আর আমাদের পরীক্ষার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আম্মা রোজা রাখতেন। আজকের, আমাদের যা কিছু সবই আপনাদের দোয়ার ফসল।
আব্বাজান আনমনা হয়ে গেলেন। তিনি কি পেছনে ফেলে আসা সেইসব আগুনের পর্বত মাড়ানোর কথা ভাবছেন?….
হাসান সাহেব আব্বাজানের মুখের দিকে আর তাকাতে পারলেন না। হয়তো জোরে কেঁদে উঠবেন। সেটা বুঝলেন ওয়াজেদ সাহেব। তিনি পরিবেশকে হালকা করে দিলেন। বললেন, কইরে আমার ভাইবোন? কই গেলে পাগলি মা। এসো, এসো। তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে বসো।
এর মধ্যেই শেষ হয়েছে হালকা নাশতার পর্ব।
সবাই গাড়িতে উঠে বসলো। গাড়ি ছুটছে এবার বাসার দিকে।

আট.

রাতে খাবার পরে ওয়াজেদ সাহেব হাসানকে ডাকলেন।
একান্তে বাপ-বেটা কথা বলছেন। সেখানে আর কেউ নেই। কুলসুম বেগমও না।
ওয়াজেদ সাহেব বললেন, মেজ আব্বা!
– জি, আব্বাজান।
– একটা বিশেষ বিষয়ে তোমার সাথে কথা বলতে চাই।
হাসান সাহেব চমকে উঠলেন।
কিছুটা ভয়ও পেলেন। কোনো সতর্কতামূলক বা ভুলের সমালোচনা কি না!
ওয়াজেদ সাহেব ছেলেকে আরও কাছে টেনে নিয়ে বললেন, শোনো!-
– জি আব্বাজান।
– তোমার বড় ছেলে, আমার শাহবাজ ভাইয়ের সম্পর্কে তোমাকে ক’টি কথা বলি।
– কেন? সেকি কোনো বেয়াদবি করেছে?
– আরে পাগল, না। তার মত সোনার ছেলে কি কখনো বেয়াদবি করতে পারে?
– তবে?
– তবে ওর দিকে বিশেষ দৃষ্টি রেখো। জানোইতো আমি কতটা দূরদর্শী! স্কুল করলাম। স্কুল থেকে কলেজ। মাদ্রাসা করলাম। সবইতো করেছি মানুষ গড়ার জন্য। তোমার এই ছেলেটার মধ্যে আমি দেখতে পাচ্ছি তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ, বখতিয়ারের স্বভাব। গন্ধটা সম্পূর্ণ আলাদা। হাজার ছেলের চেয়েও আলাদা। তাকে এখন থেকেই সেইভাবে গড়ে ওঠার ব্যাপারে তুমিসহ সকলেই চেষ্টা করবে। তাকে অনুপ্রেরণা দেবে। সাহস দেবে। দোয়া করবে শেষ রাতে তাহাজ্জুদ সালাত শেষে। আমি তো করবোই। ওর জন্য আমাদের দোয়া থাকবে সর্বক্ষণ। আব্বাজান একটু থেমে আবার বললেন, কাছে এসো। আরো, আরও কাছে।
হাসান সাহেব আব্বাজানের বুকের কাছে মাথা নিয়ে সেই শৈশবের শিশুটির মতো জিজ্ঞেস করলেন, বলুন, আব্বাজান!
ওয়াজেদ সাহেব বললেন, শাহাবাজের মধ্যে দেখলাম প্রকৃত মানুষ হওয়ার প্রচেষ্টা তোমার ও তোমার মিয়াভায়ের মত, কিংবা তার চেয়েও হয়তো অনেক বড় হবে শাহবাজ।
তুমি দেখো, ইনশাআল্লাহ, এক শাহবাজ থেকে লক্ষ শাহবাজ জন্ম নেবে আমাদের এই শ্যামল সবুজ বাংলাদেশে। যারা প্রকৃত অর্থে মানুষের কল্যাণ ও মুক্তির জন্য অতন্দ্র প্রহরীর মত কাজ করবে। এক ব্যাকুল সৌরভে সে দেশ, জাতি ও বিশ্বকে কাছে টেনে নিতে পারবে। ওর বুকের সেই প্রশস্ততা আছে। ওর মধ্যে সেই রকম আকুল করা গুণ আছে। আমি ওর সামনের দিনগুলি ও ওর বেড়ে ওঠার চিত্রটি যেন দেখতে পাচ্ছি। তুমি দেখো, তোমার শাহাবাজের মধ্যে আছড়ে পড়বে লাখো শাহবাজ!
– জি, আব্বাজান! দোয়া করবেন।
– যাও রাত হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়ো। ওকে বেড়ে উঠতে দেবে ঠিকই, তবে আমার এই কথাগুলি যেন এখন তাকে বলো না। ইনশাআল্লাহ স্বপ্নের চেয়েও যখন শাহবাজ বড় হবে, সুযোগ পেলে তখন বলো। ও কিন্তু সাধারণ আর দশটা ছেলের মত নয়। আবারও বলছি কথাটি। খেয়াল রেখো।
– জি, আব্বাজান। আপনার কথা আমার মনে থাকবে। আমি মাঝে মাঝেই আপনার কাছে যেতে বলবো।
– হ্যাঁ, তা বলতে পারো।
হাসান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
ওয়াজেদ সাহেবও মুখে পান দিয়ে পাশ ফিরলেন।
তাদের বুকের ভেতর এখন এক স্বপ্নের টইটম্বুর পদ্মপুকুর কেবলই দোল খাচ্ছে।
কেবলই।
তাদের সামনে সত্যিই যেন বখতিয়ার দাঁড়িয়ে আছে-
অপরাজিত শাহে শাহবাজ।
আরে, সেতো একা নয়। বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে যেন এক একজন শাহবাজ খাপ খোলা তলোয়ারের মত দাঁড়িয়ে গেছে!
তাদের বুকে কি পরিমাণ সাহস ও স্বপ্ন!
যে স্বপ্ন ছড়িয়ে পড়ছে এশিয়া মহাদেশ থেকে সাত সাতটি মহাদেশে।
এমনি সাহস ও স্বপ্নের সাথে ঘোড়া দাবড়িয়ে ছুটে যাও দুঃসাহসী শাহবাজ।….
এক শাহাবাজের বক্ষ থেকে লক্ষ শাহবাজ জাগুক!…
শেষের কথাগুলো কে বলে গেল হাসান ও ওয়াজেদ সাহেবের কানে কানে। তাদের হৃদয়ে ঝংকার তুললো কে?
দু’জনই অবাক দৃষ্টিতে এখন তাকিয়ে আছেন সাহস ও স্বপ্নজয়ী শাহাবাজের দিকে।
হ্যাঁ এক দৃষ্টিতে। ক্রমশ!… হ

SHARE

Leave a Reply