Home চিত্র-বিচিত্র রাতের পাহারাদার -নুসাইবা মুমতাহিন

রাতের পাহারাদার -নুসাইবা মুমতাহিন

বন্ধুরা আমরা অনেকেই রাত জাগি। রাত জেগে কেউ কেউ কাব্য রচনা করেন। আবার কেউ কেউ হন রাতের পাহারাদার। তবে কি শুধু মানুষই রাতের পাহারাদার হয়! রাতের অন্যান্য প্রাণিজগৎ কিন্তু মোটেই নীরব নয়। নিশাচর প্রাণী হিসেবে সুখ্যাতি আছে কিছু প্রাণী ও পোকা-মাকড়ের। নিশাচর প্রাণী, সারা রাত জেগে চরাচরে প্রাণিজগতের অস্তিত্ব জানান দেয়। এরকম কিছু নিশাচর প্রাণী নিয়ে লিখছি এবার।

পেঁচা
সারা পৃথিবীজুড়ে ১৭০ ধরনের পেঁচা দেখা যায় যাদের অধিকাংশই রাতের বেলা বের হয় শিকারের জন্য। পেঁচাদের দৈহিক বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ওদের বড় বড় গোল দুটো চোখ। একদম যেন গাড়ির সাদা হেড লাইট। চোখ দুটো পেঁচার এতই বড় যে অক্ষিগোলকের মধ্যেও সেগুলো ঢোকে না। মাথা ঘুরিয়ে এরা প্রায় পুরোপুরি পেছনের দিকে তাকাতে পারে। এ কারণেই এক জায়গায় চুপটি করে বসেই ওরা চারদিকে নজর রাখতে পারে। দিনের আলো এই বড় বড় চোখের পেঁচা সইতে পারে না, এ কারণই বেচারা পেঁচা রাতের পাখি খেতাব পেয়ে গেল। চাকতির মতো ওদের মুখম-লের সুবিধা হলো এর ফলে খুব সূক্ষ্ম শব্দের প্রতিধ্বনিও হয় এদের কানে। পেঁচার শ্রবণশক্তি কিন্তু দুর্দান্ত। অন্ধকারে খসখস নড়াচড়ার শব্দ শুনেই সে বুঝে ফেলতে পারে শিকারের অবস্থান। পেঁচা এক মারাত্মক শিকারি পাখি। বেশির ভাগ পেঁচারই লম্বা ও ধারালো নখর আছে। পাখা দুটো বেশি না দুলিয়েই এরা উড়তে পারে এবং সে কারণেই শব্দ না করে খোলা বাতাসে পাক খেতে পারে অনায়াসে। একবার যখন তার শিকারকে খুঁজে পায় অমনি সে বাঁকানো নখড়ের থাবা নিয়ে নেমে আসে শিকার ধরতে। ওদের খাবারে তেমন কোনো বাছবিচার নেই। খুদে ইঁদুর, শুঁয়োপোকা, ঢোঁড়া সাপ, ব্যাঙ- সবই আছে তাদের খাবারের তালিকায়।

বাদুড়
পা দিয়ে গাছের ডালে আটকে মাথা নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিনের বেলা ঘুমিয়ে থাকে বাদুড়। গাঢ় আঁধারে ইকোলোকেশন ব্যবহার করে এরা যেকোনো জিনিসের অস্তিত্ব টের পায়। লক্ষ্যবস্তুর দিকে তীক্ষ্ম শব্দ ছুড়ে দিয়ে ওরা সেটার অবস্থান চিহ্নিত করতে পারে। তাই অন্ধকারে চলাফেরা করতে মোটেও অসুবিধা হয় না। দিনের আলো বাদুড়ও সহ্য করতে পারে না। তাই এ সময়টা ওরা পুরনো ভাঙা বাড়িতে, বনের ভেতর গাছের ডালে ঝুলে থেকে বিশ্রাম নেয়। রাত হলেই ওরা চলে যায় নাইট ডিউটিতে, মানে খাবার খুঁজতে। এদের খাবার তালিকায় আছে বিভিন্ন ফলমূল যেমন- আম, লিচু, কলা ইত্যাদি। এসব নিরীহ বাদুড় ছাড়াও আরও আছে রক্তচোষা বাদুড় বা ভ্যাম্পায়ার বাদুড়। এই ভ্যাম্পায়ার বাদুড়দের পেট ভরাতে চাই তাজা রক্ত।

মাকড়সা
পৃথিবীতে প্রায় চল্লিশ হাজারেরও বেশি প্রজাতির মাকড়সা আছে। খুদে মাকড়সা থেকে শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকার ওয়েস্টার্ন সামোয়া নামের পাখি ধরে খাওয়া মাকড়সা আছে। ওয়েস্টার্ন সামোয়া পা ছড়িয়ে দাড়ালে বড় সড় একটা ডিনার প্লেটের সমান হতে পারে। এটা সত্যিই যে দিনের বেলাতেও মাকড়সা দেখা যায়, কিন্তু বেশির ভাগ মাকড়সাই অন্ধকার হলে বেরিয়ে পড়তে ভালোবাসে। সাধারণত রাতের বেলাতেই তারা জাল তৈরি করে এবং এর ঠিক মধ্যিখানে গিয়ে বসে থাকে চুপটি করে। কোনো পোকামাকড় সেখান দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় যদি আঠালো জালে আটকা পড়ে অমনি গপ। দিনের বেলা ওরা জালের এক প্রান্তে গিয়ে সামনের পাগুলো গুটিয়ে নিজেকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা করে। কোনো পোকা ওই সময় জালে আটকা পড়লে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে ফলে সিল্কি জালে ঝাঁকুনি ওঠে। আর তাতেই মাকড়সা বুঝে ফেলে শিকার আটকে গেছে। ওদের পাগুলোয় বিশেষ এক তেলের আস্তর থাকে তাই নিজেদের ফাঁদে মাকড়সা কখনো আটকে যায় না।
সব মাকড়সা যে জাল বুনতে পারে তা কিন্তু নয়। উলফ স্পাইডারের মতো কিছু মাকড়সা আছে যারা একবারে চুপটি করে বসে থাকে। একদম নড়াচড়া করে না। শিকার কাছে আসা মাত্রই অতর্কিত আক্রমণে ঘায়েল করে ফেলে। মাকড়সারা খাবারের স্বাদ পা দিয়ে নেয় এবং পুরাতন বাসি খাবারের চেয়ে টাটকা খাবারেই ওদের রুচি বেশি। আমাদের বাসাবাড়ির দেয়ালে সরু পায়ের যে সব মাকড়সা দেখা যায় ওরা তেমন একটা ভয়ঙ্কর না। কারণ ওদের বিষ নেই। ধারণা করা হয়, পৃথিবীতে যত মাকড়সা আছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিষধর হলো ব্রাজিলিয়ান হান্টসম্যান। কিন্তু এখন এর কামড়ে খুব কম মানুষই মারা যায়। কারণটা খুব সোজা, এর ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা।

শেয়াল
সাধারণত শেয়াল দিনে ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকে। রাতের প্রথমভাগেই সাধারণত তারা শিকারে বের হয়। পাখি, মুরগি, হাঁস, ছোট ছোট প্রাণী, কীটপতঙ্গ, ফলমূল ইত্যাদি খায়। বনে জঙ্গল যেমন তাদের দেখা যায় তেমনি লোকালয়েও দেখা যায়।

সজারু
সজারুকেও নিশাচর প্রাণী বলা হয়। সজারুর পিঠে ছোট ছোট কাঁটা আছে। ভয় পেলে নিজেকে বলের মতো গুটিয়ে নেয়। ছোট ছোট কীটপতঙ্গ, শামুক, ব্যাঙ, পাখির ডিম, ব্যাঙের ছাতা, ঘাসের বীজ ইত্যাদি খায়। এরা চোখে ভালো দেখতে পায় না কিন্তু ভালো শুনতে পারে। শিকার ধরার সময় নাক দিয়ে বিশেষ ধরনের শব্দ করে।

মরুভূমির নিশাচর প্রাণী
মরু এলাকায় বসবাসকারী বেশির ভাগ প্রাণীই নিশাচর। সেখানে এসব প্রাণী গর্তে থাকে। দিনের বেলায় এখানে প্রচণ্ড গরম পড়ে। এ সময় মাটির ওপরে থাকার চাইতে নিচে থাকাই আরামদায়ক। এ জন্যই দিনের বেলা প্রাণীরা গর্তে ঘুমিয়ে কাটায়। রাতে চারদিক ঠান্ডা হলে তারা গর্তের বাইরে বেরিয়ে আসে এবং খাবারের সন্ধানে বের হয়।
বুঝলে তো বন্ধুরা দিনের বেলা জেগে থাকা প্রাণীদের মত এই রাত জাগা প্রাণীরাও অনেক বৈচিত্র্যময়। শত্রুদের মোকাবেলার জন্য এদেরও রয়েছ নানা কৌশল। রাত জেগে শিকার করে। আর মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায়। মনে হয় যেন রাতের পাহারাদার।

SHARE

Leave a Reply