Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস কুয়াশা ঘোরের দিন -জাকির আবু জাফর

কুয়াশা ঘোরের দিন -জাকির আবু জাফর

বাড়ির কথা আজ মনেই পড়ছে না আবিরের। সন্ধ্যা নেমে গেছে সেই কখন। চারদিকে অন্ধকার জমে উঠেছে। ঝোপঝাড়ে জোনাকিরা টিপটিপ আলোর বৃষ্টি ঝরায়। ঝিঁঝির ডাকে রাত আরও ঘন হয়ে উঠেছে। কিন্তু এ সবেও আবিরের মন নেই। পাহাড়ের চূড়ায় এক মনে বসে আছে সে। পাহাড়ের নিচ থেকে আবির-আবির- ডাক তার কানে বাজে। অথচ জবাব দিচ্ছে না সে। জবাব দিতে ইচ্ছে করছে না তার। পাহাড় থেকে নামতেও মন চাইছে না। কী করবে সে? পাহাড়ের চূড়ায় কী থেকে যাবে আজ?
হ্যাঁ তাই থাকো। ভেতর থেকে যেনো তারই কোনো অচেনা মন জেগে উঠেছে। বলছে এই আবির আজ পাহাড়েই থেকে যাও। বাড়ি গিয়ে কাজ কী।
আবির অনমনে তার জবাব দেয়- না আম্মু কাঁদবে। আমার টিচার আসবে। পড়ালেখা আছে না!
তার মন আবার বলে- আরে ধ্যাৎ, পড়ালেখা একদিন না করলে কী হয়? আর তোমার আম্মু তোমার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়বে। ব্যস আর কি! এই পাহাড়ের তুমিই রাজা!
হঠাৎ আবিরের মনে হলো কেউ যেনো তার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে কথাগুলো বলছে। এতক্ষণ ভাবছিলো তার মনই তার সাথে কথা বলছিল। ঘাড় ফিরিয়ে দেখে, না তো কেউ তো নেই। ডানে-বাঁয়ে দ্রুত চোখ বোলায়। না কোথাও কেউ নেই। যারা এতক্ষণ তাকে ডাকছিলো ডাকতে ডাকতে তারা বেশ কিছুটা দূরে চলে গেছে। তাহলে কে কথা বললো! আবার ডানে-বাঁয়ে দেখে সে। না কাউকে চোখে পড়ে না। অকস্মাৎ তার শরীর ভয়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। শরীরের সব ক’টি পশম শণের মত খাড়া হয়ে যায়। বুকের ভেতর থেকে ভয়টা গলায় উঠে যেনো আটকে গেছে। কোনোরকম শব্দ তার কণ্ঠ থেকে বের হয় না। তবুও সে চিৎকার করে কাউকে ডাকার চেষ্টা করে। কিন্তু গরগর আওয়াজ ছড়া আর কোনো শব্দই বের হয় না। নিজের বিকৃত শব্দ শুনে তার ভয়টা আরও বেড়ে যায় বহুগুণ। এখন পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়তে পারলেই যেনো সে বাঁচে। মনে-মনে ভাবে- এখন অন্তত দ্রুত তাকে নামতে হবে। নিজেকে নিজে ভর্ৎসনা করে কেনো সে একা বসে আছে এই নির্জন পাহাড়ে। আম্মুর কথা মনে পড়ে তার। সন্ধ্যার আগে ঘরে ফিরে যাবার কথা বারবার বলেছে আম্মু। কিন্তু কখন যে বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা এসে পড়েছে খেয়ালই করেনি সে। এত লোক তাকে ডেকে গেলো কারো ডাকেই সাড়া দিতে তার মন চাইলো না। আবির-আবির চিৎকারে গলা ফেটে যাচ্ছে সবার। অথচ তার কাছে মনে হচ্ছিল কোনো কৌতুকের শব্দ তাকে দোল দিচ্ছে। নিজে নিজেই হেসে কুটিকুটি গেল। আর এখন? এখন ভয়ে নাড়িভুঁড়ি প্যাঁচ লেগে যাবার জোগাড়।
পাহাড়ের চূড়া থেকে দ্রুত নামতে গেলো আবির। কিন্তু একি! তার পা যেনো কিছুতেই নড়ে না। পা ছুঁয়ে দেখতে হাত বাড়ায়। হায় হায়! হাতও যেনো সোজা হয়ে আছে। কিছুতেই ইচ্ছেমতো জাগাতে পারে না।
এ সময় তার কানের কাছে সেই শব্দ বেজে উঠলো আবার। এবার ফিসফিসিয়ে নয়। খানিকটা গরগর আওয়াজে বললো- আজ আর তোমার ঘরে ফেরার কাজ নাই। প্রতিদিনই তো যাও। একদিন না গেলে কী চলে না?
কোন দিক থেকে শব্দ আসছে বুঝতে পারে না আবির। এই যেনো ডানে। আবার হঠাৎ বামে। কিন্তু কোনো দিকে চোখ ফেরাবারও জো নেই। হাত-পায়ের মতো ঘাড়ও পিলারের মতো সোজা হয়ে গেছে।
কানের কাছে শব্দ আরও তীব্র হলো- এই আবির ওই গানটি গাও তো শুনি-
নীল জোনাকি জ্বলে যখন
আমি একা থাকি তখন
চেয়ে চেয়ে দেখি কত তারা জ্বলে-নিভে।
এই গানটি খুব প্রিয় আবিরের। অথচ এখন মনে হচ্ছে প্রতিটি শব্দ ভয়ের চাবুক। সপাং সপাং করে তার পিঠে বসিয়ে দিচ্ছে কেউ। শরীরে সব শক্তি এক করে চিৎকার দিলো সে। নাহ মুখ থেকে গোঁ গোঁ আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দই বের হলো না।
সারা শরীরই এখন ভয়ে পাথর হয়ে গেছে। মনে মনে ভাবে, আজ কি যম এসে সওয়ার হয়েছে তার ওপর? নাকি জিন-ভূত কাবু করেছে তাকে? ভূতের কথা মনে আসতেই নাড়িভুুঁড়ি গলা পর্যন্ত উঠে এলো যেন। কী হবে তবে? আজই কী তার মৃত্যু এসে হাজির? তাহলে তার প্রিয় আম্মু! আম্মুর সাথে কি আর দেখাই হবে না? এই ভেবে গলা ফাটিয়ে ডাকে আম্মু…।

দুই.

সন্ধ্যার সাথে সাথে প্রতিদিন রুটিন করেই যেনো বিদ্যুৎ চলে যায়। আজ সন্ধ্যার আগেই চলে গেল। মোমবাতি ধরিয়ে আবির আসার অপেক্ষা করছে তার মা। আবিরের ছোট বোন মুনিয়া পড়ার টেবিলে বসেনি আবিরের অপেক্ষায়। মুনিয়া এবার তৃতীয় শ্রেণীতে উঠেছে। নতুন বই কিনে আবিরকে বলেছে- ভাইয়া তুমি সপ্তম শ্রেণীতে গেলে কি হয়েছে আমি কিন্তু তৃতীয় শ্রেণীতে উঠে গেছি। বয়সের তুলনায় একটু বেশি পাকামো করে মুনিয়া। কিন্তু ভাইয়া ছাড়া তার কোনো সাথী যেনো নেই। প্রয়োজন ছাড়া মাকেও কাছে ডাকে না। সারাক্ষণ আবিরের পিছে পিছে ঘুরঘুর করে। আর সুযোগ পেলেই চুইংগামের বায়না ধরে। স্কুল থেকে ফেরার পথে আবিরও চুইংগাম ছাড়া ঘরে ফেরে না। তাও স্পাউট ব্র্যান্ড চাই। আবিরও এক দোকান না পেলে অন্য দোকান ঘুরে স্পাউটই নিয়ে আসবে। হাতে পেলেই নেচে নেচে গান ধরে-
ভাইয়া আমার ভালো ভালো
আমি ভাইয়ার আলো আলো।
মুনিয়ার এই আনন্দ নাচে বেশ মজা পায় আবির। ভাই-বোনের কা- দেখে দূর থেকে মা হাসেন। আনন্দে তারও মন ভরে ওঠে। কখনো বলে ওঠে, এই দুষ্টু মেয়ে পড়ে পা ভাঙবে। মায়ের কথায় মুনিয়ার লম্ফঝম্ফ আরও বেড়ে যায়। নতুন করে নেচে ওঠে সে।
মুনিয়ার মন খুব খারাপ। তার প্রিয় ভাইয়া এখনও যে এলো না। বেশ অভিমান জমে উঠেছে তার মনে। রাত হয়ে গেছে এখনও কিসের খেলা খেলছে আবির! মাকে বারবার জিজ্ঞেস করছে, ভাইয়া এখনও খেলছে? দেখো তো সেই কখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে! সন্ধ্যায় কি খেলা যায় আম্মু?
আম্মু হ্যাঁ-না কিছুই বলে না। বারবার শুধু দরজার দিকে তাকায়। আম্মু যে খুব চিন্তা করছে এ কথা মুনিয়াকে বুঝতে দেয় না।
কিন্তু মুনিয়ার ছোট্ট মনে কত প্রশ্ন জাগে। সেই সাথে জাগে ভয়। মাকে জিজ্ঞেস করে- আচ্ছা মা ছেলেধরা কী?
প্রশ্নটা শুনে বুকটা কেঁপে ওঠে ফারহানার। অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকায়। মেয়েটি ছোট। অথচ তার মনে কত কী প্রশ্ন জাগে। মুনিয়া খাটের মাঝখানে একটি বালিশ নিয়ে আনমনে খেলছে। মার কাছ থেকে প্রশ্নের কোনো জবাব আসে না দেখে মুনিয়াও চুপ করে গেল। বিড়বিড় করে বলছে, ভাইয়াটা বড় পাজি হয়ে উঠেছে। রাত হয়ে গেছে তবু ঘরে ফেরে না। অন্য সময় হলে ফারহানা ধমক দিয়ে পড়ার টেবিলে পাঠাত মুনিয়াকে। আজ কিছুই বলে না। তার কানের কাছে মুনিয়ার ক্ষীণ কণ্ঠ বাজে, মা ছেলেধরা কী? মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় ফারহানার। অজানা এক ভয়ও বাসা বাঁধে মনে। কী জানি কী হলো আবিরের? ছেলেটা একদম একরোখা হয়েছে। মনে পড়ে আবিরের বাবার কথা। আবিরের বাবাও এরকম একরোখাই ছিল। তবে মনটা ছিলো খুবই উদার। পরোপকারী মানুষটা কেনো যে অকালে চলে গেলো পৃথিবী থেকে! ফারহানার বুক ফেটে কান্না পায়। এ কান্না দ্বিগুণ হয়ে দেখা দেয় আবিরের অনুপস্থিতিতে।
আজ বারো বছর এই বারবাজার পাহাড়ের কাছাকাছি তাদের বসবাস। কখনো এমন হয়নি আগে। মায়ের হুকুম বরাবরই তামিল করে আবির। শেষ বিকেলে পাহাড়ের চাতালে খেলতে যায়। ঠিক সন্ধ্যার সাথে সাথে হাত-মুখ ধুয়ে পড়ার টেবিলে উপস্থিত। সন্ধ্যার চা-নাস্তা পড়ার টেবিলেই দেয়া হয়। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে ফারহানার সংসার। আবিরের বাবা সরকারি চাকরি করতেন। বড় অংকের চাকরি না হলেও বেশ সুখেই চলতো তাদের সংসার। হঠাৎ কি হলো বছর তিনেক আগে হার্টঅ্যাটাকে মারা গেলেন। সেই থেকে সংসারের সব ভার এসে পড়ে ফারহানার ওপর। কাছাকাছি একটি প্রাইমারি স্কুলে চাকরি নিলেন ফারহানা। শিক্ষক হিসেবে তার বেশ সুনামও ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষকতা আর ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া এই নিয়েই ফারহানার পৃথিবী।
বাইরে অন্ধকার রাত নেমে গেছে। দরজায় দাঁড়িয়ে অস্থির হয়ে পড়ে ফারহানা। হ্যাঁ বেশ অন্ধকার বাইরে। বিদ্যুৎহীন পাড়াটি অন্ধকারে ডুবে আছে। একা বাড়িতেই থাকে ফারহানা। তবে ডানে-বাঁয়ে খানিকটা লাগোয়া বাড়ি রয়েছে। ডানের বাড়িটা সাবিতদের। সাবিত আবিরের ক্লাসমেট। প্রতিদিন না হলেও মাঝে মাঝে সাবিতের সাথে খেলতে যায় আবির। আজও কি একসাথে গেছে? কিভাবে খবর নেবে সে। মুনিয়াকে একা রেখে যাওয়াই যাবে না। আবার ঘরও একদম খালি। বিদ্যুৎ নেই। যে কোনো সময় চোর-ডাকাত পড়তে পারে। গত দু’দিন আগে পাশে এক বাড়ির জায়জিনিস কিছুই বাকি রাখেনি চোরেরা। ঘরে যা ছিলো সবই কুড়িয়ে নিয়ে গেছে। তবুও সাবিতের খোঁজে একবার যেতে হবে তার। মুনিয়াকে হাত ধরে দরজায় তালা ঝুলিয়ে উঠোনে নামল ফারহানা। দুটি শেয়াল ধুপধাপ করে ফারহানাদের পাশ ঘেঁষে যেতেই ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো মুনিয়া। ফারহানা বুকে জড়িয়ে নিলো মেয়েকে। বললো, এ তো শেয়াল। ভয় কিসের? মুখে বললেও নিজের গাটাও কাঁটা দিয়ে উঠল। ফারহানা পা বাড়ায় সাবিতদের বাড়ির দিকে।
এ সময় হঠাৎ মনে হলো বাড়ির সামনের দিক থেকে কয়েকজনের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। হাসনাহেনার ঝোপটার পাশে থমকে দাঁড়ায় ফারহানা। হ্যাঁ, শব্দ তাদের বাড়ির দিকেই এগিয়ে আসছে। কারা এরা? ডাকাতটাকাত নয়তো আবার! ভয়ের ভেতর আরও ভয় জাগিয়ে ওঠে। কয়েকটি কণ্ঠ একসাথে কথা বলার দরুন কিছুই বোঝার উপায় নেই।
ফারহানা ভাবে সে কি ঘরে ফিরে যাবে? নাকি সাবিতদের বাড়ির দিকে। শঙ্কা, ভয় ও দ্বিধায় তার শরীর কেঁপে উঠছে। মেয়েটাকে সাহস দেয়ার জন্য বললো- মা তুমি আমার বুকেই থাকো। ভয় পেয়ো না। আমরা এক্ষুনি ঘরে ফিরে যাব।
মুনিয়া ভয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। মায়ের গলা জড়িয়ে বুকের সাথে সেঁটে আছে। দ্রুত নিশ্বাস ওঠানামা করছে।
ফারহানা কি বুঝে হাসনাহেনার ঝোপের পাশেই দাঁড়িয়ে রইলো। ঝোপটি উঠান থেকে একটু এগিয়ে হাতের ডান পাশে। যেখানে আরও কিছু গাছ একসাথে জেগে আছে। নিম গাছ, মেহেদি গাছ, একটি জামবুরা গাছ ও আতা ফলের গাছ। এ গাছগুলো আবিরের বাবার হাতে লাগানো। এসব ভাবার মতো অবকাশ এখন নেই ফারহানার। সেই শব্দের দিকেই তার খেয়াল। কান পেতে বোঝার চেষ্টা করে। না কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো সে। হ্যাঁ, ঠিক তার ঘরের দিকেই এগিয়ে আসছে শব্দমিছিল।
আজ অন্ধকারও যেনো খুব ঘন হয়ে নেমেছে। বাড়ির গাছগাছালির ছায়া রাতের অন্ধকারকে আরো গাঢ় করে তুলেছে। আজ কি অমাবস্যা রাত! কে জানে। ফারহানা মনে মনে ভাবলো। হয়তো অমাবস্যাও হতে পারে। ভাবতে ভাবতে দেখা গেল চার-পাঁচজন লোক কি যেনো ধরাধরি করে তাদের উঠানে এসে পড়েছে।
ফারহানা গা ঝাড়া দিয়ে নিজেকে সাহসী করে তোলে। হাসনাহেনার ঝোপ থেকে একটু উঠানের দিকে এগিয়ে মেহেদি গাছের আড়ালে এসে দাঁড়ায়। দেখলো জনাপাঁচেক লোক কি যেনো ঘরের সিঁড়ির সামনে রাখলো। কেউ একজন দরজার সামনে এসে আন্টি আন্টি বলে ডাকে।
কণ্ঠটি ফারহানার চেনা বলেই মনে হলো। কিন্তু কার কণ্ঠ মনে পড়ে না। সে কি জবাব দেবে? নাকি আরও খানিকক্ষণ অপেক্ষা করবে। ওরা কারা নিশ্চিত হবে!
এ সময় আবার আন্টি আন্টি ডাক বেজে উঠলো। এবার একটু কথা যোগ হলো, বললো- আন্টি আমি সাবিতের বড় ভাই সাকিব। দরজা খোলেন।
হ্যাঁ, তাই তো। এ তো সাকিবেরই কণ্ঠ। ফারহানা দ্রুত বেরিয়ে আসে মেহেদির ঝোপ ছেড়ে। গলায় জোর শক্তি এনে বললো, হ্যাঁ সাকিব কি হয়েছে বাবা? আমি এখানে।
ফারহানা সাকিবদের দিকে এগিয়ে আসতেই দপ করে জ্বলে উঠলো বিদ্যুৎ। চারদিকে রাত যেনো আলোর সাহসে জেগে উঠলো। ফারহানা এগিয়ে গেলো উঠানে।
যে জিনিসটি ধরাধরি করে আনলো সেটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ওরা পাঁচজন।
মুনিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে এগিয়ে এলো ফারহানা। একপাশ খালি করে দাঁড়ায় ওরা। ফারহানা দেখে মুখে ফেনা তুলে সেন্সলেস অবস্থায় পড়ে আছে তারই বুকের ধন আবির। আবির, বাবা আমার কি হয়েছে তোর, বলে হাউমাউ করে কেঁদে ছেলেকে বুকে তুলে নিলো ফারহানা।
আন্টি ওকে ঘরে নিয়ে যান। আমি ডাক্তার নিয়ে আসি বলে দ্রুত চলে গেলো সাকিব। তার পেছন পেছন ছুটল আরও একজন। বাকিরা আবিরকে ধরে ঘরে তুলতে সাহায্য করলো।
আবিরের মার একটিই প্রশ্ন, বাবা আমার আবিরের কী হয়েছে? কোথায় ছিলো আমার আবির? কেনো ওর এ অবস্থা?
একজন কেশে গলা পরিষ্কার করে বললো- আন্টি আমরা বারবাজার পাহাড়ের চাতালে বসে গল্প করছিলাম। হঠাৎ দেখি পাহাড় থেকে কি যেনো গড়িয়ে পড়ছে। আমরা ভয়ে দ্রুত সরে গেলাম। এক সময় ওটা এসে চাতালে পড়লো। আমরা সাহস করে এগিয়ে এলাম। দেখি একটি ছেলে! তখন উপুড় হয়ে পড়ে আছে। আমাদের মনে হলো ছেলেটি বেঁচে আছে। আমরা লাইটার জ্বালিয়ে মুখ দেখার চেষ্টা করলাম। মুখ দেখেই সাকিব বলে উঠল- এ তো ফারহানা আন্টির ছেলে আবির। আমাদের সাবিতের সাথেই পড়ে ও। তারপর তো এই ঘটনা।
সাকিব ডাক্তার নিয়ে এসে পড়েছে। পরীক্ষা করে ডাক্তার বললেন, প্রচ- ভয় থেকে সেন্স হারিয়েছে। চিন্তার কিছু নেই। ঠিক হয়ে যাবে। তবে ওকে একা রেখে কোথাও যাবেন না। আজ একা থাকতেও দেবেন না। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে চলে গেলেন ডাক্তার।
সবাই এখন আবিরের সেন্স আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

তিন.

তিন দিন পর ক্লাসে এলো আবির। তাকে দেখে সবাই ভূত দেখার মতো চমকায়। সারা স্কুলে চাউর হয়ে গেছে ভূতে পেয়েছে আবিরকে। কেউ বলছে আবিরের সাথেই আছে ভূত। কেউ বলছে মাঝে মাঝে ভূত কোথাও চলে যায়। খানিকক্ষণ বাদে আবার ফিরে আসে। এমনি নানান গুজব স্কুলের প্রতিটি ক্লাসে চলছে। নিজেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে ছাত্ররা। আবার কেউ কেউ সাহস করে শিক্ষকদের জিজ্ঞেসও করলো।
আবির ক্লাসের ফার্স্ট বয়। তার লেখাপড়ায় শিক্ষকেরা দারুণ খুশি। সবার ধারণা আবির ম্যাট্রিকে ভালো ফল করবে। স্কুলের মুখ উজ্জ্বল হবে। সুনাম বাড়বে শিক্ষকদের। আবিরের ক্লাসের ছেলেমেয়েরা কেউ কেউ হিংসার চোখে দেখলেও সবাই তাকে সমীহ করে।
তিন দিন পর আজ ক্লাসে এসে আবিরও খানিকটা অপ্রস্তুত। তার সহপাঠীরা কেউ যেনো তার সাথে আগের মতো ব্যবহার করছে না। সবার দৃষ্টিতে যেনো কৌতূহল। যেনো কী সন্দেহ! সবাই রহস্যময় আচরণ করছে তার সাথে। সাবিত শুধু ব্যতিক্রম। বেশ সহানুভূতির সাথে আবিরকে সঙ্গ দিচ্ছে।
কিন্তু সাবিত অবাক। সত্যিই তো কোথায় যেনো আবিরের কিছু একটা ঘটে গেছে। আবির আর আগের মতো নেই। ক্ষণে ক্ষণে আনমনা হয়ে পড়ে। সবাই যখন ক্লাসের পাঠ নিয়ে ব্যস্ত তখন আবির যেনো অন্য কোথাও হারিয়ে যায়। তখন তার চোখ কেবল ছাদের দিকে নিবিষ্ট থাকে। আবার সবাই নীরব হলেই সরব হয়ে ওঠে আবির। নানা ধরনের কল্পকাহিনী বলে। কেউ শুনলো কি শুনলো না এই নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। আবার হঠাৎ চুপ হয়ে গেলে আর কোনো কথাই বলে না। এভাবে ক্লাস চলছে আবিরের। সবার ধারণা আবিরকে ভূতেই পেয়েছে। নইলে কেউ এমন করে!
একটি দুষ্টু ছেলে আবিরের ক্লাসমেট। নাম শান্তু। সাধারণত বেকবেঞ্চার সে। অতিরিক্ত দুষ্টু হলে যা হয়। টিচার ক্লাসে না থাকলেই চললো। সারা ক্লাস মাথায় তুলে ফেলে। ছেলেটি এসে আবিরকে ক্ষেপানোর চেষ্টা করছে। বললো, এই আবির তুই নাকি ভূতকে সঙ্গী করে নিয়েছিস? এখনও কি আছে তোর সাথে? দেখি তো কোথায় থাকে তোর ভূত? বলেই আবিরের চোখ দেখতে হাত বাড়ালো শান্তু। অমনি কষে এক থাপ্পড় চড়িয়ে দিলো আবির। থাপ্পর খেয়ে শান্তুর মুখ একরকম বাঁকা হয়েই গেলো বুঝি। মাগো বলে চিৎকার জুড়ে দিলো সে।
আবিরের চোখ থেকে আগুন ঝরছে যেনো। শান্তুর চিৎকার শুনে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো সে। আর এক থাপ্পড় দেয়ার জন্য দ্রুত হাত তুললো। অমনি মা গো গেছি গো বলে লাফিয়ে ক্লাস থেকে পালিয়ে গেলো শান্তু। সবাই একরকম ভয়ে অস্থির। কিছুটা হৈচৈ পড়ে গেলো ক্লাসে। মেয়েরা ভয়ে এতটুকু হয়ে গেলো। এ সময় হা-হা-হা-হা অট্টহাসিতে ক্লাসরুম ফাটিয়ে দিচ্ছে আবির। রাগে রক্ত জমে গেছে তার চোখে। এখন আবার অট্টহাসি। কি অদ্ভুত সব আচরণ!
আবিরদের ক্লাসরুমটি স্কুল লাইব্রেরি কক্ষের লাগোয়া। লাইব্রেরিতে বসে স্টাডি করছিলেন ইংলিশ টিচার সালামত সাহেব। হৈচৈ-চিৎকার-অট্টহাসি শুনে তিনি দ্রুত বেরিয়ে এলেন লাইব্রেরি থেকে। আবিরদের ক্লাসে যখন ঢুকলেন তখনও অট্টহাসি থামেনি আবিরের।
সালামত সাহেব ধমক দিয়ে বললেন, কি হলো এটা কি নাটকের মঞ্চ?
আবির হাসি থামিয়ে বললো, না স্যার না। এটা নাটকের মঞ্চ হবে কেন? এটা ক্লাস মঞ্চ! বলেই আবার অট্টহাসি। এবারের হাসি যেনো আরও বিকট। কান ফেটে যাবার জোগাড়।
এই চুপ কর বেয়াদব কোথাকার! বলে ভীষণ রেগে গেলেন সালামত স্যার। সাথে সাথেই চুপ করে গেলো আবির। কিন্তু তার চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরে পড়ছে যেন। আর সে আগুনে পুড়ছে বুঝি সালামত স্যার। তিনি খুব নরম হয়ে বললেন- বাবা তুমি এমন করছ কেন? তুমি তো ক্লাসের ফার্স্টবয়। ক্লাসটা শান্ত রাখবে তুমি। অথচ তুমিই কিনা হট্টোগোল বাধিয়ে দাও।
আবির জ্বলন্ত চোখ তুলে তাকিয়ে আছে সালামত স্যারের দিকে। কিন্তু সালামত স্যার আর কোনভাবে আবিরের দিকে তাকাতে সাহসী হন না। বিড়বিড় করে কি সব বলতে বলতে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যান।
হঠাৎ উড়–ক্কু দৈত্যের মতো এসে সামনে দাঁড়িয়েছে আবির। আরও বেশি জ্বলে উঠলো তার চোখ। একরকম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন সালামত স্যার। থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন তিনি। বুঝতে পারছেন না কি করতে চায় আবির।
আবির ধীরে ধীরে মুখ খুললো। স্যার, স্কুল থেকে বেতন নেন ঠিক ঠিক অথচ ঠিকমতো পড়ালেখা করান না ছেলেমেয়েদের। প্রাইভেট পড়ানোর এত শখ! শুনুন স্যার, স্কুল থেকে বেতন নেন, পড়ালেখাও স্কুলেই করাবেন। বাসার জন্য পড়ালেখা জমা রাখবেন না। যান স্যার। বলেই স্যারের সামনে থেকে সরে এসে বসে পড়লো চেয়ারে। বসেই চোখ দুটি বন্ধ করে দিলো। মুখে বলতে থাকলো গানের কথা- আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে। নইলে মোরা রাজার সঙ্গে মিলবো কি শর্তে। সালামত স্যার মুখ নিচু করে চলে গেলেন লাইব্রেরির দিকে।
ছুটি হবার একটু আগেই আবিরকে নিতে স্কুলে পৌঁছে গেলো ফারহানা। অফিস কক্ষের সামনে দাঁড়াতেই প্রধান শিক্ষক বললেন, ও আপনি এসেছেন? আপনার ছেলেকে নিয়ে তো আর পারা গেলো না। একদিনে এত কাহিনী রচনা করেছে কি বলবো আর। একজন ভদ্রমহিলাকে দেখিয়ে বললেন, ইনি বিচারপ্রার্থী, আপনার ছেলের নামে।
মহিলার পাশে একটি ছেলে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো। ফারহানা জিজ্ঞেস করলেন, কি সমস্যা স্যার?
সমস্যা আর কি। ছেলেটাকে দেখিয়ে বললেন, এই যে আমাদের একজন ছাত্র। আপনার ছেলের ক্লাসেই পড়ে। থাপ্পড় কষে আপনার ছেলে ওর গাল বাঁকা করে দিয়েছে।
ফারহানা ব্যাকুল হয়ে ছেলেটার দিকে এগিয়ে যায়। মনে মনে অবাক হয়, এ কি করে সম্ভব! দরদমাখা হাত মাথায় বুলিয়ে দেয় ছেলেটির। বাবা, আমি মাফ চাই তোমার কাছে। আমি ওকে শাস্তি দেব।
ছেলেটির মা ভীষণ ক্ষেপে উঠলো এ সময়। এসবে হবে না স্যার। আমি এর যথাযথ বিচার চাই। প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজ সাহেবকে লক্ষ্য করে বললো শান্তুর মা।
ঠিক তখনই অফিস কক্ষে প্রবেশ করলেন সালামত স্যার। ফারহানাকে দেখেই চেঁচিয়ে ওঠেন তিনি। আপনার ছেলেকে আমরা আর পড়াতে পারবো না ম্যাডাম। আমাকে যা না অপমান করেছে। আমি এটা কিছুতেই ভুলতে পারবো না। হেড স্যারকে বললেন, আপনি স্যার এর একটা বিহিত করেন। এমন বেয়াদব ছেলে এ স্কুলে দ্বিতীয়টি নেই। ও স্কুলে থাকলে আমি আর এখানে শিক্ষকতা করতে চাই না।
ফারহানার দু’কান দিয়ে যেনো গরম বাতাস বের হচ্ছে। কী শুনছে সে এসব। মনটা দারুণ খারাপ হয়ে গেলো। তবুও নিজেকে সামাল দিয়ে প্রধান শিক্ষককে লক্ষ্য করে বললো, স্যার সিদ্ধান্ত নেবার আগে একবার অন্তত আমাকে সুযোগ দিন। আমি ওকে ঠিক করার দায়িত্ব নিলাম।
এ সময় বেশ হট্টগোল ভেসে আসছে একটি ক্লাসরুম থেকে। অফিস কক্ষ থেকে প্রধান শিক্ষকসহ সবাই বেরিয়ে এলো। দেখলো একটি ক্লাসরুম থেকে ছেলেমেয়েরা দ্রুত বই-খাতা নিয়ে বেরিয়ে আসছে। বাঁচাও বাঁচাও ধরনের শব্দ মনে হচ্ছে। সালামত সাহেব বললেন- স্যার ওটাই ৭ম শ্রেণী। আবিরের ক্লাস। সম্ভবত আবিরের ভয়েই সব ছেলেমেয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
হেড মাস্টার ছুটে চললেন ৭ম শ্রেণী কক্ষের দিকে। সাথে ফারহানা। তার মনে এক অস্বাভাবিক ভয় জেগে উঠছে।
বাড়িতে পৌঁছে একরকম ধাক্কা দিয়েই আবিরকে ঘরে ঢুকিয়ে দিলো ফারহানা। হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়ালো আবির। আম্মি কী হয়েছে? কেনো ধাক্কা দিলে আমাকে?
আবিরের কণ্ঠ শুনে অবাক ফরহানা। ঘুরে দাঁড়ায় সে। আবিরের চোখে চোখ রাখে। এ তো তার চিরচেনা সেই আবির। সেই মায়াভরা কণ্ঠস্বর। সেই অতি ভালোবাসার উচ্চারণ- আম্মি। ফারহানা বুকে জড়িয়ে নেয় ছেলেকে। আবেগে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে ওঠে। বলে, বাপ কী হয়েছে তোর? স্কুলে এত কা- করলি কেনো?
আবিরও অবাক হয়। কই মা আমি কি করলাম!
ডুকরে কেঁদে ওঠে ফারহানা। আবিরের মাথা বুকে চেপে বললো, হ্যাঁ বাপ, তুই কিছুই করিসনি। তুই তো আমার ছেলে তুই কেনো অমন করবি!
আবির মায়ের বন্ধনমুক্ত হয়ে বললো, খুব ক্ষিদা পেয়েছে আম্মি খেতে দাও।
মুনিয়া শাসনের সুরে বলছে, হ্যাঁ আম্মু, তুমি ভাইয়াকে তাড়াতাড়ি খাবার দাও। ভাইয়ার বুঝি ক্ষিদা পায় না!
মেয়ের কথায় হেসে দিলো ফারহানা। আবিরকে হাত-মুখ ধুতে বলে কিচেন রুমে ঢোকে সে। আবিরের নাকে এসে লাগছে তার প্রিয় খাবার গরুর ভুনা খিচুড়ির গন্ধ। খিচুড়ির গন্ধ আবিরের ক্ষুধাকে উসকে দিলো। ঘন ঘন ঢোক গিলছে সে। আর যেনো তর সয় না। তাড়াতাড়ি দেবার হুকুম করে মাকে। আবিরের এই হুকুম ফারহানার আনন্দ বাড়িয়ে তোলে। ফারহানা খিচুড়ি তুলে দিচ্ছে আবিরের পাতে।

চার.

আবির আগের মতো পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী। ভাই-বোনের সম্পর্কও আগের মতো মধুর। নিয়মিত ক্লাস। নিয়ম মেনে চলাফেরা। সন্ধ্যার সাথে সাথে পড়ার টেবিলে বসা। বোনকে লেখাপড়ায় সাহায্য করা সবই আগের মতো। শুধু পরিবর্তন হয়েছে বিকেলের সময়টায়। এ সময় সাধারণত খেলতে যেতো আবির। এখন আর ঘর ছেড়ে কোথাও যায় না। মাঝে মাঝে সাবিত এসে গল্প জমায়। মুনিয়াও মেতে ওঠে ওদের সাথে।
গল্প করতে করতে একদিন দুই বন্ধু ঠিক করলো তারা একটি বাগান করবে। বাগানটা হবে আবিরদের ঘরের দক্ষিণ পাশে খালি জায়গায়। বাগানের সবকিছু জোগান দেবার দায়িত্ব নিলো আবির। সাবিত তাকে শুধু কাজে সাহায্য করবে। কি কি ফুলের গাছ থাকবে, কি কি ফলের গাছ সব ঠিক করে নিলো দু’জনে। পরিকল্পনাটা পাকা করে আবির তার আম্মুকে বিষয়টি বললো।
শুনে খুশিই হলো ফারহানা। বললো, তোমরা দুই বন্ধু মিলে বাগান করবে এটা তো দারুণ আনন্দের খবর। তোমাদের বাগান করার জন্য যা যা দরকার সব আমি করে দিচ্ছি। তোমরা মনের মতো সাজাও তোমাদের বাগান।
তারপর শুরু হয়ে গেলো বাগান তৈরির কাজ। গোলাপ, টগর, শিউলি, বেলি, দোলনচাঁপা, হাসনাহেনা, রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ, গাঁদা, মরিচফুল, জবাসহ প্রায় একশ প্রজাতির ফুলের গাছ লাগানো হলো বাগানে। ফলের গাছ লাগানোর পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাদ পড়ে যায়। শুধু ফুলের বাগান করার সিদ্ধান্ত নিলো তারা। প্রতিদিন খেলার সময়টায় এখন দুই বন্ধু মিলে বাগান পরিচর্যা করে। বেশ হয়ে উঠেছে বাগানও। গোলাপ, জবা, টগর, দোলনচাঁপাসহ ক’প্রজাতির ফুল ইতোমধ্যে বাতাসে দোল খেতে শুরু করেছে। ফুলের দুলুনি দেখে মুগ্ধ হয় আবির। তার যেনো আনন্দ আর ধরে না। সাবিতকে সে আনন্দের কথা মন খুলে বলে।
আবিরদের বাগান পরিচর্যার সময় ফারহানাও মাঝে মাঝে উঁকি-ঝুঁকি দেয়। তার মনেও দারুণ খুশির বাতাস দোলে। বুঝুক না বুঝুক এ আনন্দে চনমনে থাকে মুনিয়াও।
অল্প কিছুদিনের মধ্যে বেশ নাদুসনুদুস হয়ে উঠেছে আবিরের বাগান। অধিকাংশ ফুল গাছে ফুল ফুটে আছে। ফুলের নানা রঙ আবিরকে আবিষ্ট করে রাখে। সারা বিকেলটাই বাগানের পেছনে খরচ করে সে। সাবিতও কম যায় না। দু’জনের সেবা-যত্নে ফুল গাছগুলো তাড়াতাড়িই বেড়ে উঠছে।
গ্রামে চাউর হয়ে গেলো আবিরের বাগানের খবর। প্রতিদিন কেউ না কেউ এসে হাজির হয় বাগান দেখতে। আবিরও বাগান দেখিয়ে দারুণ খুশি। ইতোমধ্যে বাগানে গাছের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে ফুলের সংখ্যাও। এসব দেখে স্কুল থেকে শুরু করে পুরো পাড়ায় আবিরের প্রশংসা শোনা যায়। কেউ কেউ নতুন বাগান করার লক্ষ্যে পরামর্শের জন্য ছুটে আসে আবিরের কাছে। আবির মন খুলে এটা-ওটা পরামর্শ দিয়ে আনন্দ পায়। এভাবে কেটে যাচ্ছে আবিরের দিন।
প্রতিদিনের মতো আজও সাবিত এসে বাগানের পরিচর্যায় লেগে যায়। আবির তখনও এসে পৌঁছায়নি। এ-গাছে পানি, ও-গাছের পুরনো পাতা ছেঁড়া, বাঁকা ফুলটাকে সোজা করে দেয়া- এসব করছিলো সাবিত।
হঠাৎ কে যেনো সাবিত বলে ডেকে উঠলো। ফিরে দেখলো সাবিত। প্রথমটায় ভাবছিলো আবির বুঝি। ঘুম থেকে ওঠার কারণে হয়তো কণ্ঠ খানিকটা অন্যরকম শোনাচ্ছে। কিন্তু না তার ধারণা ভুল। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে শান্তু।
আরে শান্তু কেমন আছ?
ভালো আছি বন্ধু।
কথা বলার ঢঙটা খেয়াল করলো সাবিত। হ্যাঁ, এখনও তার মুখটা ঈষৎ বাঁকা। আবিরের হাতের এক থাপ্পড়ে তার গাল এখনও পুরো সোজা হয়নি।
সাবিত মুখে হাসি টেনে বললো- কী খবর তোমার? কি মনে করে এলে?
কি মনে করে আর আসবো। বাগান দেখতে এলাম। আবিরের বাগানের কথা সবাই সুনাম করে। আমিও সিদ্ধান্ত করেছি একটি বাগান করবো। তাই দেখতে এলাম। আবির নেই ভালোই হয়েছে। আমি দেখে দ্রুত কেটে পড়ি। তুমিও আমাকে একটু সাহায্য করো দোস্ত।
সাবিত হাসি মুখ করে বললো, আরে দোস্ত বলো কি, অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করবো। শুধু কী করতে হবে বলবে। তারপর দেখবা কেমন সাহায্য পাও।
সাবিতের কথায় খুশি হয় শান্তু। আবেগভরা কণ্ঠে বললো, ঠিক আছে দোস্ত আমি তোমাকে সময়মতো খবর দেবো। এখন যাই।
আরে দোস্ত দাঁড়াও। আবির এখনই এসে পড়বে। ওর সাথে দেখা করে যাও। ও খুব খুশি হবে।
না দোস্ত আজ নয়। আমিই ওর সাথে দেখা করব। বলেই দ্রুত পা বাড়ায় শান্তু।
কিন্তু সাবিত থামিয়ে দেয় তাকে। একটি টকটকে লাল গোলাপ ছিঁড়ে হাতে তুলে দেয় শান্তুর। শান্তু অবাক হয়, সেই সাথে আনন্দে ডগমগ হয়ে ওঠে। সাবিতকে একরকম জড়িয়ে ধরে বললো, সত্যিই তুমি আমার অনেক ভালো বন্ধু।
শান্তু চলে যাবার পর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো সাবিত। শান্তুর মুখটা তার চোখ বরাবর ভেসে উঠছে। ভাবছে সেদিন আবিরের হাতে কী ছিলো যে এক থাপ্পড়ে ওর মুখটাই বাঁকা হয়ে গেলে! সেই বাঁকা মুখ নিয়ে আবার আবিরেরই বাগান দেখতে এসে গেলো ছেলেটি। আনমনে বললো আমি নয় তুমিই ভালো।
শান্তু ততক্ষণে গাছের আড়াল হয়ে গেছে। বাগানের দিকে ফিরলো সাবিত। হঠাৎ ঘড়ি দেখে। একেবারে শেষ বিকেল এখন। গাছের পাতায় হলুদ রোদ তার পাখা গুটিয়ে নেবার চেষ্টা করছে। সূর্য তার লালিমা ছড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ আবির এখনও ঘুমায়। বাগান থেকে বেরিয়ে আবিরদের ঘরের সদর দরজায় দাঁড়ালো সে। আবির আবির। আন্টি আবির কি এখনও ঘুমায়?
ফারহানা বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। বললো- আবির তো সেই এক ঘণ্টা আগেই উঠে গেলো ঘুম থেকে। বাগানে আছে নিশ্চয়।

না আন্টি আমি বাগান থেকেই তো এসেছি। আমি এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বাগানে ছিলাম। ও বাগানে যায়নি আজ।
ফারহানা চমকে উঠে ঘর থেকে নেমে এলো। উঠোন পেরিয়ে ঘরের দক্ষিণ আঙিনায় বাগানের ধারে এসে দাঁড়ায়। এদিক-সেদিক দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখলো। না কোথাও নেই আবির। এমন তো হবার কথা নয়। সে তো বাগান ছেড়ে এ সময় কোথাও যায় না।
পাশে দাঁড়িয়ে সাবিতও তার কথায় সায় দিচ্ছে।
বেশ ক’জন দর্শক তখনও বাগান ঘুরে দেখছিলো। খবর নিচ্ছিলো আবির কোথায়।
হঠাৎ কি মনে হলো ফারহানার সাবিতকে বললো- এসো বাবা তুমি আমার সাথে। বলেই দ্রুত ঘরে ঢোকে। ঘুমন্ত মুনিয়াকে কোলে তুলে বেরিয়ে আসে। দরজায় তালা ঝুলিয়ে বললো- চলো বারবাজার পাহাড়টার কাছে যাই।
দ্রুত ধেয়ে চললো ফারহানা। পেছন পেছন একরকম দৌড়ে চললো সাবিত। সাবিত কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না কি হচ্ছে। কিন্তু জিজ্ঞাসাও করছে না। যতটা সম্ভব লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটছে।
ফারহানা যখন বারবাজার পাহাড়ের কাছে পৌঁছালো তখন আর সূর্যের আলো কোথাও নেই। কিন্তু অন্ধকারও নামেনি। পাহাড়ের চাতালে দাঁড়িয়ে যখন ওপরে তাকাল ফারহানা, দেখলো একটি ছেলে পাহাড়ের চূড়ায় আকশমুখী হয়ে বসে আছে। খেয়াল করে দেখতেই পরিষ্কার হয়ে গেলো চূড়ায় বসে আছে আবির।
চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো সাবিত- আন্টি ওই যে আবির। কিন্তু ও ওখানে কেনো আন্টি? ও কি আমাদের দেখতে পাচ্ছে না? অন্ধকার হয়ে আসছে তবু ও নামছে না কেন? কণ্ঠ উত্তেজনায় ভরে উঠছে সাবিতের। জোর গলায় ডাকলো- ওই আবির। আবির সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দেখছ না! তাড়াতাড়ি নেমে এসো।
ফারহানাও কণ্ঠ চেঁচিয়ে ডাকছে। আবির তাড়াতাড়ি আসো। রাত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আবিরের কোনো চেতনাই নেই। যেভাবে আকাশমুখী ছিলো সেভাবেই বসে আছে সে। এত ডাকাডাকিতে সামান্যও টলে না।
সাবিত গায়ের সব শক্তি কণ্ঠে এনে ডাকছে। তবুও খবর হয় না আবিরের। মুনিয়া ঘুম থেকে জেগে ভাইয়া ভাইয়া বলে চিৎকার করে কাঁদছে। না তবুও ফিরে চায় না আবির।
কী করবে ফারহানা এখন? তার মাথায় কিছু যে আসছে না।
সাবিত বললো- আন্টি আমি পাহাড়ে উঠি?
না তোমার উঠতে হবে না। আমিই উঠছি, পেছন দিক থেকে বলে উঠলো কেউ একজন।
ফারহানা-সাবিত দু’জনই একসাথে ফিরে চাইলো। দেখে সাকিব তার আরও দু’জন বন্ধু নিয়ে দাঁড়িয়ে।
ফারহানা ডুকরে করে কেঁদে উঠলো, সাকিব আমার আবিরকে বাঁচাও বাবা।
আন্টি আপনি ভাববেন না। আমরা তিনজনই উঠছি পাহাড়ের চূড়ায়, বললো সাকিব।
হ্যাঁ আন্টি, আপনি একদম চিন্তা করবেন না। সাকিবের আরেক বন্ধুও সান্ত¡না দিচ্ছে ফারহানাকে।
সাকিব তার দু’বন্ধুকে সাথে নিয়ে যতটা সম্ভব দ্রুত উঠতে থাকে পাহাড়ে। কিছুদূর উঠে খানিকটা জিরিয়ে নেয়। আবার ওঠে। এভাবে বেশ ক’বার বিশ্রাম নিয়ে শেষ পর্যন্ত উঠে গেলো চূড়ায়। তখন সন্ধ্যার অন্ধকার প্রায় জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। পাহাড়ের ওপাশে একদল শেয়াল ডেকে উঠলো। রাত পাখিরা বেরিয়ে পড়েছে তখন। জোনাকিরাও তাদের আগুন মিছিল শুরু করে দিয়েছে। দু’চারটি তারাও ফুটে উঠেছে আকাশে।
সাকিবেরা তিনজনই একদিক থেকে সাবধানে চূড়ার ঠিক নিচের অংশে ঘাস ও গুল্ম-লতা ধরে সেঁটে আছে পাহাড়ের সাথে। সাকিবের হাতের নাগালে প্রায় আবির। সাকিব ডাকলো- এই আবির আবির। না আবির কোনো সাড়া দেয় না। তিনজনই ডাকে। তবুও না। দেখে মনে হচ্ছে সে আকাশ দেখছে।
সাকিব যেখানে ঘাস-গুল্ম ধরে পাহাড়ের গায়ে সেঁটে আছে সেখান থেকে আরও হাত খানিক দূরে বসে আছে আবির। সাকিবের ধারণা কোনো কারণে আবিরের কানে শব্দ পৌঁছায় না। সাকিব তার দুই বন্ধুকে সাবধান থাকতে বলে নিজে আরও এক হাত ওপরে উঠে গেলো। উঠে যেখানে পা ঠেকা দিয়েছে হঠাৎ এক পায়ের মাটি ফসকে আবার আগের জায়গায় চলে গেলো। সে মনে মনে অবাক। এমন খাড়া জায়গায় আবির কি করে উঠে বসে আছে? আবার পজিশন নিয়ে ইঞ্চি ইঞ্চি করে ওপরের দিকে উঠতে থাকে সে। এক সময় উঠে এলো আবিরকে টেনে নামানোর মত জায়গায়। দু’পা ভালো করে পাহাড়ের গায়ে ঠেসে হাত বাড়ালো আবিরের দিকে। আবিরের ডান হাত ধরে টান দিলো সাকিব। অকস্মাৎ তার মুখের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে গেলো আবির। আবিরের ধাক্কায় সাকিবের দুই পায়ের ঠেস দেয়া মাটি ছিটকে সরে গেলো। অমনি পিছলা জায়গায় আছাড় খেয়ে পড়ার মতো অবিরাম নামতে থাকে নিচের দিকে।
সাকিবের মাথায় জেলি ফিশের মতো চেপে আছে অচেতন আবির। তার ভারে কোনোভাবে টাল সামলানোর সুযোগ পাচ্ছে না সাকিব। চিৎকার করে দুই বন্ধুর সাহায্য চাইলো। ঘটনাটা এমনই আকস্মিক যে ওরা দু’জন বুঝে ওঠার আগেই নিচের দিকে পিছলাতে শুরু করলো সাকিব। সাকিবের চিৎকার শুনে ফারহানা ভয়ে-আতঙ্কে বিহ্বল হয়ে পড়লো। বারবার আল্লাহর নাম জপ করছে। আল্লাহর সাহায্য চাইছে। আবিরকে ফিরে পাবার আকুতি জানাচ্ছে।
সাকিবের পা ছিলে যাচ্ছে টের পাচ্ছে সে। আবিরকে ছেড়ে দিলে সে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু ছেড়ে দিলে হয়তো আবির আর জিন্দা নাও থাকতে পারে। তবে এ অবস্থায় তার জীবনও দারুণ রিস্কি। পাহাড়ের নিচ পর্যন্ত গড়িয়ে গেলে সেও বাঁচবে কিনা সন্দেহ। তবুও আবিরকে ছাড়বে না- এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো সাকিব।
পিছলিয়ে ছুটছে তো ছুটছে। কোনোরকম কোথাও দাঁড়ানোর সামান্যতম সুযোগ খুঁজছে সে। একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে টাল সামলাতে পারলেই পরেরটা সামাল দেয়া যেত। কিন্তু না। এ পাহাড়টা বোধ হয় তেল মেখে নিয়েছে। পাহাড়ের গায়ে কোথাও কর্কশ জায়গা নেই। একরকম আশা ছেড়ে দিয়েও আবিরকে শক্ত করে ধরে রাখলো সাকিব।
পাহাড়ের মাঝামাঝি এসে হঠাৎ কি যেনো পায়ের সাথে ঠেকল।
দুই পা একসাথে এসে ঠেকলে পা আর পিছলায় না। একরকম ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে গেলো সাকিব। কিন্তু আবিরের ধাক্কা এসে লাগে তার ঘাড়ে। ফলে ভীষণ ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে সে। মনে তবু এইটুকু সান্ত¡না, একবার থামতে পেরেছে। বাঁচার একটা আশা জেগে উঠেছে মনে। পায়ের সাথে কি ঠেকলো অনুমান করার চেষ্টা করে সাকিব। দেখে প্রাচীন কোনো গাছের গোড়ায় এসে ঠেকেছে সে। হয়তো বন্য কোনো গাছ জন্ম নিয়েছে পাহাড়ের গায়ে। আর কেউ গাছটা কেটে নিয়ে গেছে। ভাগ্যিস গাছের গোড়াটা তুলে নিয়ে যায়নি। যে কারণে তার রক্ষা।
ততক্ষণে সাকিবের দুই বন্ধু তার পাশে এসে পড়েছে। দ্রুত আবিরকে ধরতে বললো সাকিব। ওরা দু’জন আবিরকে দু’দিক থেকে ঠেলে কিছুটা ওপরের দিকে তুলে নিলো। শ্বাস নিলো সাকিব। বললো, আল্লাহ জীবন রেখেছে বলে এখনও বেঁচে আছি।
আবিরের আম্মার কান্না ভেসে উঠছে পাহাড়ের গায়ে। নীরব রাতে এমন কান্না গায়ে কাঁটা ধরিয়ে দেয় সাকিবদের। সাকিব চিৎকার করে বললো- আন্টি আমরা আবিরকে নিয়ে নামছি। আপনি কাঁদবেন না।
তারা তিনজন বুদ্ধি করে কিভাবে নেমে আসবে পাহাড়ের বাকি অংশ। উজায়ের একটু শক্তিধর। তাকে সাকিব বললো- তুই দোস্ত আবিরকে ঘাড়ে নে। আমরা দু’জন দু’দিক থেকে ধরবো। নামতে হবে খুব ধীরে। সাবধানে। খবরদার পা পিছলে গেলে আর রক্ষা নেই।
উজায়ের একটু নিচের দিকে নেমে ঘাড়ে নিলো আবিরকে। দু’পাশ থেকে সাকিব ও সুমন ধরলো। তিনজন যতটা সম্ভব সমান গার্ড নিয়ে ইঞ্চি ইঞ্চি করে নামছে। অক্লান্ত পরিশ্রম এবং ধৈর্যের সাথে সাহস করে নেমে এলো তারা।
আবিরকে নিচে রাখতেই জড়িয়ে ধরলো ফারহানা। ঠিক তখনই সেন্স এসে গেলো আবিরের। মাকে জড়িয়ে ধরে বললো- আম্মু আমরা কোথায়? এখানে কী করো? চলো বাসায় যাই।
সাকিব উজায়ের সুমন সাবিত সবাই ভাষাহীন তাকিয়ে থাকে আবিরের দিকে।

পাঁচ.

সবার ধারণা আবিরের সাথে জিন আছে। এই জিন ভয়াবহ। অনেক শক্তিধর, সেই সাথে নানারকম কথা চাউর হয়ে গেছে আবিরের নামে। কেউ বলে আবির অসম্ভব শক্তির অধিকারী। যা ইচ্ছে হয় তাই করে দেয়া তার পক্ষে সম্ভব। কেউ বলে কোনো অন্যায়কারীকে দু’চক্ষে দেখতে পারে না আবির। আবার কারো কারো ধারণা চোখ দেখে অনেক কিছু বলে দিতে পারে সে। ফুঁ দিলে ক্লান্তি চলে যায়। পড়ালেখায় খারাপ যারা তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে তারা ভালো ছাত্র হয়ে ওঠে। এ রকম নানান আজগুবি সব কথা পাড়ায় লোকের মুখে মুখে।
আবির এর কিছুই জানে না। আবিরের মাও না। কিন্তু আবিরের মা ওকে আর একা কোথাও যেতে দেয় না। এমনকি বাগানেও না। সব সময় মা সাথে করে থেকে কাজ করে। বিকেলবেলায় আবির আর কোথাও খেলাধুলা কিংবা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতেও যায় না। ঘর আর বাগান এই হলো তার পৃথিবী। বাগানে সাবিত প্রতিদিনই সাহায্য করছে আবিরকে। আবিরের মাও একইভাবে বাগানে আবিরের সাহায্যকারী হয়ে উঠলেন।
একটা নতুন বিষয় ফারহানা লক্ষ করলো, প্রতিদিন বিকেল হলেই পাড়ার লোকেরা তো বটেই আরও দূরের লোকেরাও ভিড় জমায়। আবিরের সাথে একটু কথা বলতে ছেলেমেয়েরা উদগ্রীব। বাবা-মা সাথে করে নিয়ে আসে কাউকে। এসে বায়না ধরে ছেলেমেয়েদের মাথায় যেনো একটু হাত বুলিয়ে দেয় আবির।
কিন্তু আবির এর কোনো অর্থ খুঁজে পায় না। সে ভাবে তার হাতে কী আছে? মাথায় হাত বোলাতে হবে কেন? কেনো বুড়োবুড়িরা তাকে এসব করতে অনুরোধ করে? হাত বুলালে কী হয়? ধীরে ধীরে এসব যেনো বেড়েই চলেছে।
দু’দিন আগে একটি ছেলেকে নিয়ে এলো তার বাবা। শেষ বিকেলে আবির-সাবিত গোলাপ গাছে পানি দিচ্ছিল। লোকটি এসেই একরকম কাঁচুমাচু করে আবিরের সামনে এসে হাত কচলায়। বলে, বাবা আমার ছেলেটা পড়ালেখায় খুব পিছিয়ে। ব্রেন একদম ডাল। একমাত্র ছেলে আমার। ও পড়াশোনা না করলে আমার মানসম্মান কিছুই থাকবে না। আমার ধন-সম্পদ সবই এই ছেলের জন্য। কিন্তু ছেলে আমার একদম পড়াশোনায় ভালো না। তুমি একটু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দাও। তুমি যা চাইবে তাই আমি দেবো বাবা। আবির অবাক চোখে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকে। সে ভাবে এই ছেলেটি লেখাপড়ায় খারাপ। কিন্তু মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে কী হবে? ভাবতে ভাবতে নিজের আঙুল নিজে খুঁটছে আবির।
লোকটি কাকুতিমিনতি করে বলছেন, বাবা আবির একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দাও। আবির কিছুই না বুঝে ডান হাতটা ছেলেটির মাথায় রাখে। বোকা বোকা চেহারার ছেলেটি হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে। তার চিৎকারে ভয় পেয়ে গেলো আবির। দ্রুত হাত সরিয়ে নেয়। আবির হাত সরিয়ে নিলে ছেলেটি পাগলের মতো দৌড়ে পালায়।
লোকটি কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না কেনো ছেলেটি এভাবে পালিয়ে যাচ্ছে। আবিরও না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাবিত বললো- কী হলো চাচা আপনার ছেলেটি পালিয়ে যাচ্ছে!
কোনো কথাই বলে না লোকটি। একটুক্ষণ আবিরের দিকে চেয়ে থেকে বললো- আসি। বলেই বেশ লম্বা কদম ফেলে হেঁটে যাচ্ছে সে। আবির-সাবিত দু’জনেই তাকিয়ে আছে লোকটির দিকে। আবির হাসে। কেনো লোকেরা এমন করছে তার সাথে।
এ সময় আবিরের মা এসে খানিকটা রেগে গেলো। তোমাকে না করেছি কারো মাথায় গায়ে হাত বুলাবে না। কাউকে ফুঁ দেবে না!
কাঁচুমাচু হয়ে আবির বললো- আমি তো হাত বুলাতে চাইনি আম্মু। ও লোকটাই তো আমাকে বাধ্য করেছে।
হ্যাঁ আন্টি ওই লোকটি নাছোড়বান্দা। আবিরকে বাধ্য করেছে, বললো সাবিত।
ফারহানা খানিকটা শাসনের সুরে বললেন- না কারো সাথে তুমি এসব করবে না। এ আমার হুকুম। বলেই আবার ঘরের দিকে ফিরে গেলেন।
আবির-সাবিত দু’বন্ধু বাগানের বাকি কাজ শেষ করার দিকে মনোযোগ দিলো। নানারকম কথা হয় দু’জনের মধ্যে। লেখাপড়ার কথা, স্কুলের কথা, সহপাঠীদের কথা। আরও কত রকম গান, সিনেমা, নায়ক-নায়িকা নিয়ে তারা কথা বলে।
পানি দিতে দিতে সাবিত বললো- তুই তো দরবেশ হয়ে গেলি রে দোস্ত!
ধুর বোকা, আমি দরবেশ হবো কী করে? দরবেশ হওয়া কী সহজ কাজ! দেখিস না দরবেশরা কত রকম ভালো কাজ করে। নামাজ-রোজা করে। অন্যের সেবা করে।
তুইও করবি। মানুষের সেবা করা তো ভালো কাজ। আর ভালো কাজ করা ভালো।
আবির ফুল গাছে পানি ছিটানো বন্ধ করে দাঁড়ায়। খানিকটা সাবিতের দিকে এগিয়ে বললো- আচ্ছা সাবিত লোকেরা আমার সাথে এমন শুরু করলো কেন? এমন করলে আমি কিন্তু এ পাড়া ছেড়ে চলে যাব।
সাবিত পানি দিতে দিতে কথা শুনছিলো। শেষ কথাটি তার কানে যেতে সে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে বললো- এ তুই কী বললি আবির? এ পাড়া ছেড়ে তুই কোন পাড়ায় যাবি? খবরদার এমন কথা তুই কক্ষনো মুখে আনবি না। আন্টি তোর জন্য কী কষ্ট করছে দেখিস না! স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে রীতিমত তোকে পাহারা দিচ্ছে। তুই কাল থেকে স্কুলে চল আবার।
না আমি আর ওই স্কুলে যাব না, আবিরের সাফ জবাব।
কেন যাবি না?
সবাই যেনো আমার সাথে কেমন আচরণ করে। কেমন করে তাকায়। কেমন করে কথা বলে। আমি হেঁটে যাওয়ার সময় ইশারা করে। আবার অনেকে অযথা আমাকে জ্বালায়।
ওসব তুই কিচ্ছু মনে করিস না। কে তোকে জ্বালাবে আমি দেখবো। তুই আমার সাথেই কাল স্কুলে যাবি। কেউ কিছু বললে একদম আস্ত রাখব না, কথা বলতে বলতে আবার পানি দিচ্ছিলো সাবিত। শেষ কথাটি বলেই আবিরের দিকে চোখ তুললো। দেখলো আবির কেমন যেনো টলছে। তার চোখ আকাশের দিকে খোলা। হাত থেকে পানির ছিপি পড়ে গেছে। মুখে খানিকটা ফেনা ধরে গেছে।
আন্টি ও আন্টি, দেখেন আবির কেমন করছে, বলে লাফিয়ে এসে বুকের সাথে চেপে ধরলো আবিরকে। ততক্ষণে আবির সেন্স হারিয়েছে। আবিরকে কোনোভাবেই খাড়া রাখতে পারেনি সাবিত। টাল সামলাতে না পেরে দু’জনেই পড়ে গেলো গোলাপ ঝাড়ের পাশে।
সাবিতের চিৎকার শুনে দৌড়ে এলো ফারহানা। কী হলো আবিরের? এ দুশ্চিন্তা তাকে পাগল করে তুললো।
চোখের পানি ছেড়ে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলেন আবিরকে। পিছে সাবিত। সেও কাঁদছে। আবিরের প্রতি এক অন্যরকম ভালোবাসা কাতর করে তোলে তাকে। সেই দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে দু’জন বন্ধু। একসাথে খেলাধুলা। একসাথে স্কুলে যাওয়া। এমনকি স্কুলে যাবার আগে গোসলটাও দু’বন্ধু একসাথে করে। নতুন জামা-কাপড় কিনলে প্রথম একজন আরেক জনকে না দেখিয়ে পরবেই না। এভাবে ওরা দু’জন বেশ ভালো বন্ধু হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। কিন্তু কোথায় যেনো একটু ছন্দপতন হয়ে গেলো। হঠাৎ আবিরের কী হলো কিছুই বুঝতে পারে না সাবিত। পাড়ার লোকেরা যে সব বলে জিন-ভূতের কথা এসবে অবাক হয় সে। তার প্রশ্ন আবিরের সাথে কেনো জিন থাকবে? জিন কিংবা ভূত থাকে খারাপ ছেলেদের সাথে। আবির তো ভালো ছেলে। তবে কেনো তার সাথে জিন থাকবে!
এসব প্রশ্নের কোনো জবাব পায় না সাবিত। এক রাতে খেতে বসে মাকে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা মা জিন কি মানুষের সাথে থাকতে পারে?
মা ধমক দিয়ে বললো- রাতের বেলা এসব জিন-ভূতের কথা থাক। জিন দিয়ে তোমার কাজ কি?
মায়ের এমন জবাব তার পছন্দ হয়নি। কিন্তু মুখে কিছু বললো না। নিচের দিকে ফিরে পাতের ভাত কোনোরকম আধচিবিয়ে পানির সাহায্য নিয়ে গিলে উঠে গেল। গিয়েই খাটের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো। আবার ভাবলো তার ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করবে। ভাইয়া তো আবিরকে দু’দু’বার বারবাজার পাহাড় থেকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু সাকিবকে জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি। কেনো যেনো সাকিবের সাথে তার সম্পর্কটা ও রকম নয়। হয়তো বয়সের ব্যবধানের কারণে হয়ে থাকবে। সাবিত-সাকিবের থেকে আট বছরের ছোট। সাকিব ও সাবিতের মাঝখানে ওদের একটি বোন ছিলো। আকস্মিক কী এক জ্বরে পড়ে তিন বছর বয়সে বোনটা মারা গেলো। আফসোস করে সাবিত। তার বোনটা যদি বেঁচে থাকতো তবে নিশ্চয় সে জিন সম্পর্কিত সমস্যার একটা সমাধান পেয়ে যেত। ইত্যকার নানান কথা উঁকি দিচ্ছে সাবিতের মনে। আবিরের মাথার কাছে বসে এসব ভাবছে সে। এখন তার চোখ ফেটে কান্না আসছে। কিন্তু সে ভেতরে ভেতরে সিদ্ধান্ত নেয় আর কাঁদবে না এবং প্রতিজ্ঞা করে আবিরকে সুস্থ করে তুলবে।
ফারহানা আবিরের মাথায় পানি দিচ্ছে। খুব চিকন নালে পানি পড়ছে আবিরের কপালে। পানির প্রবাহে তার কপাল থেকে চুলগুলো সরে গেছে। বেশ বড় কপাল লালচে ফর্সা। পানিতে ভিজে কপালটা আরও সুন্দর হয়ে উঠেছে।
ফারহানা ভাবে আবিরের কপালটা তার বাবার মতোই হয়েছে। তার বাবারও প্রশস্ত কপাল ছিলো। কিন্তু এত বড় কপালে এত কম আয়ু কেনো লেখা ছিলো জানে না ফারহানা। আজ যদি আবিরের বাবা থাকতো হয়তো এত সমস্যায় তাকে পড়তে হতো না। বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চায় ফারহানার। কিন্তু কাঁদবে না সে। জীবনকে জয় করার এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা আছে তার।
মুনিয়া মায়ের পিঠে গড়াগড়ি দিচ্ছে। আবার মাঝে মাঝে ভাইয়ার জন্য কান্নাও করছে। সাবিতকে বলছে- আচ্ছা সাবিত ভাইয়া, আবির ভাইয়া কেনো বারবার বেহুঁশ হয়?
সাবিত কী জবাব দেবে মুনিয়াকে ভেবে পায় না। মুনিয়াও জবাবের জন্য অপেক্ষা করে না। অন্য আর এক কথায় চলে যায়।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। সাবিতের মা ডাকছে ওকে। ডাকতে ডাকতে এসে পড়লো আবিরদের ঘরে। এসে দেখে এই কা-। বেশ আফসোস করলেন আবিরের জন্য। আবিরের আম্মুকে বললেন- আপনি ভালো কোনো ডাক্তার দেখান। এভাবে ছেলেটার বিরাট ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
ক্ষতির কথা শুনে ফারহানা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বললেন- আমার ছেলেটার জন্য দোয়া করবেন বোন।

ছয়.

রাত তিনটা। চাঁদটা ডুবে গেছে বেশ খানিকক্ষণ আগে। তবুও অন্ধকার খানিকটা ফিকে হয়ে আছে। হেমন্তের শেষ চলছে এখন। আর ক’দিন বাদেই শীত এসে পড়বে। হেমন্তের শিশির ঝরছে শেষ রাতে। শিশির ছোঁয়া শীতল বাতাস জানালা গলে প্রবেশ করছে ঘরে। বাতাসে হাসনাহেনার গন্ধ। ফারহানা বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়। কেনো যেনো তার চোখ থেকে উধাও হয়ে গেছে ঘুম। রাত এগারোটায় আবিরের সেন্স ফিরে এলো। খাওয়া শেষ করতে বেজে গেছে বারোটা। শোয়ার পর সামান্য একটু ঘুম হলো।
কি এক দুঃস্বপ্ন দেখে ভেঙে গেলো ঘুম। সেই যে ঘুম পালালো আর চোখের ধারে কাছেও নেই।
লোহার নেট লাগানো জানালাটা মাঝে মাঝে খুলেই ঘুমায় ফারহানা। আজ বন্ধ ছিল। ঘুম ভেঙে যাবার পর এপাশ ওপাশ করে এক সময় জানালাটা খুলে দিলো। জানালা খুলতেই একঝাঁক শীতল বাতাস এসে গা জুড়িয়ে দিলো তার। এক পাশে আবির অন্য পাশে মুনিয়া গভীর ঘুমে জড়িয়ে আছে। একবার দু’জনকে দেখে নিয়ে জানালায় আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো ফারহানা। হেমন্তের মেঘহীন আকাশে এত তারা ফোটে এটা জানা ছিলো না ফারহানার। ছোটবেলায় সন্ধ্যা রাতে বড় আপু আর ছোট বোনের সাথে উঠানে বসে তারা গুনতো। গুনতে গুনতে তারার কী শেষ হয়! তবুও নিজের জয় ঘোষণার জন্য বলে উঠতো- আকাশের সব তারা এখন আমার হাতের মুঠোয়। বড় আপু বলতো- হায়রে আমার প-িত রে। আকাশের তারা গুনে শেষ করে দিয়েছে। এটা শুনলে তারারাও ভেঙচি কাটবে!
ফারহানা আরও উচ্ছ্বাস নিয়ে বলতো- দেখো আপু টিটকারি করবে না। আকাশে নয় কোটি নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয়শ’ নিরানব্বইটি তারা আছে। বিশ্বাস না করলে গুনে দেখো।
আরও জোরে ভেঙচি কেটে বড় আপু বলতো- মহাপ-িত মশাই আপনাকে তো দেখছি সংবর্ধনা দিতে হবে। তবে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কারা থাকবে জানিস? গরু, ছাগল, কুত্তা, বিলাই আর থাকবে আমাদের দরবেশ মজিবর। এই মজিবর এক আজগুবি ক্যারেক্টার। উঠতে-বসতে মুখে ছিলো- হক মাওলা … হক। নিশি রাতেও তার একই উচ্চারণ ছিলো মুখে। কখন যে লোকটা ঘুমাতো আল্লাহই জানেন। হঠাৎ এক ভোর বেলা এসে কাচারিঘরে উঠলো লোকটি। আব্বাও যে কী পেলো তার মধ্যে কে জানে। রেখেই দিলো আজীবন। লোকটিও সুন্দর আব্বার সাথেই যত কথা বলত। আর কারো কাছে একটুও মুখ খুলত না। সারাক্ষণ আধবোজা চোখ। মুখে আল্লাহ আল্লাহ জিকির। আর থেকে থেকে চিৎকার দিত- হক মাওলা হক।
আব্বা মারা যাবার পর লোকটা যে কোথায় উধাও হয়ে গেলো তার কোনো হদিস পাওয়া গেলো না।
কত কথা ভাবছে ফারহানা। অঘুমো চোখে এখন আকাশের অসংখ্য তারা জ্বলছে। আকাশের তারার মতোই স্মৃতিগুলো জ্বলছে তার মনে। যে বয়সে তারা দুষ্টুমি করেছে আবির তো এখন সে বয়সেই পড়েছে। অথচ ছেলেটার কী হলো? কেনো এমন হচ্ছে বারবার? ভাবতে ভাবতে পাশ ফিরলো ফারহানা। এখন তার দৃষ্টি আকাশ থেকে নিম গাছটির ওপর এসে পড়েছে। টুপটাপ শিশির ঝরে পড়ছে নিমপাতা থেকে। সেই অচেনা পাখিটা আজও নিমডালে থেকে থেকে ডাকছে। পাখিটার ডাক বড় অদ্ভুত শোনায়। চিঁ হি চুঁ করে কেমন জানি ডাকে। মনে ভয় ধরে ওঠে। দু’বার ডেকে আবার চুপ করে থাকে। দশ-পনের মিনিট পর হঠাৎ ডেকে ওঠে- চিঁ হি চুঁ।
কিন্তু আজ পাখির ডাকে কোনো ভয় জাগে না ফারহানার। সে নিমগাছটির ডালে পাখিটি খোঁজে। ফিকে অন্ধকারেও যদি পাখিটিকে দেখা যায়! বুঝতে পারবে কেমন পাখিটা। কেনো সে এই নিমডালে বসে ডাকে প্রতি রাত। অবশ্য বৃষ্টি হলে পাখিটার কণ্ঠ আর শোনা যায় না।
ফারহানা শোয়া অবস্থায়ই পাখিটাকে দেখার চেষ্টা করছে। জানালা থেকে নিমগাছটা খুব বেশি দূরে নয়। তবে লাগোয়াও নয়। এই নিমগাছটি আবিরের বাবার খুব প্রিয় ছিলো। দুপুরবেলা যে দিনই বাড়ি আসত এই গাছের নিচে বসে শরীরটা জুড়িয়ে নিত। এখন আবিরও তাই করে। স্কুল থেকে এসে জামা-জুতো খুলেই চলে যায় নিমতলায়। সেখানে বসে চুপচাপ কি যেনো ভাবে। যতক্ষণ না খাবার টেবিলে ডাক পড়বে ততক্ষণ চুপটি করে বসে থাকবে গাছের নিচে।
ফারহানা মাথাটা বালিশ থেকে কিছুটা আলগা করে খুঁজছে পাখিটাকে। অনেকক্ষণ ধরে পাখিটা আর ডাকছে না। তাহলে পাখিটা কি অন্য কোথাও উড়ে গেলো? গেলে কোথায় যাবে? কেউ তো পাখিটাকে কোনো বাধা দেয়নি। তাহলে কেনো যাবে পাখিটা? আমি কি পাগল হয়ে গেলাম? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে ফারহানা। এই নিশি রাতে একটি অচেনা পাখি নিয়ে কেনো ও মেতে আছে! ধ্যুৎ পাখি এই গাছে থাকলে কি আর না থাকলেইবা কি? আলগা মাথাটা আবার বালিশে রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করে ফারহানা।
হঠাৎ মনে হলো কেউ যেনো হেঁটে যাচ্ছে জানালার পাশ দিয়ে। আচমকা চোখ খুলে বাইরে তাকায় সে। না তেমন কিছু চোখে পড়ে না। কিন্তু পরিষ্কার কানে বাজলো কারো পায়ের শব্দ।
এদিক-সেদিক দেখে আবার নিমগাছটায় চোখ ফেরাল। না পাখিটাও নেই। যে ডালটা খানিকটা নিচের দিকে নেমে এসেছে সে ডালেই পাখিটা ডাকে। আজ পাখিটার কি হলো কে জানে। ভাবছে ফারহানা। এ সময় ধুপ করে একটি শব্দ হলো। শব্দটি ঠিক কোন দিকে হলো শোয়া থেকে অনুমান করতে পারলো না সে। বালিশ থেকে খানিকটা মাথা তুলে বোঝার চেষ্টা করে। ক’সেকেন্ড। আবার শব্দটি হলো। ফারহানা স্পষ্ট শুনলো ঘরের ভেতরেই হলো শব্দটি। মনের অজান্তেই সে বলে উঠলো- কে? না আর কোনো শব্দ নেই।
শরীরটা ভারী হয়ে আসে ফারহানার। কিন্তু সে নিজেকে সাহসী করে তোলার চেষ্টা করে। হাতের কাছে সুইচ। চাপলেই লাইট জ্বলে উঠবে। কিন্তু সে সুইচেও চাপ দিবে না। আরও কোনো শব্দের জন্য অপেক্ষা করে সে। না তেমন শব্দ আর কানে আসে না। ভাবে লাইট জ্বেলে ঘরটা একবার দেখে নেবে। আবার ভাবে না থাক। আবার যদি শব্দ শোনে তবেই জ্বালবে লাইট।
এ সময় নিমগাছটায় বাদুর উড়ে যাবার মতো একটি শব্দ হলো। সাথে সাথে সেদিকে চোখ তোলে ফারহানা। নিমগাছটার মাঝের ডালটার ওপর চোখ পড়তেই অবাক হলো সে। বিড়ালের চোখের মতো জ্বলছে দুটি চোখ।
একটুক্ষণ।
মনে হলো চোখ দুটি যেনো ফারহানার দিকে এগিয়ে আসছে। ফারহানার গোটা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। শরীরের পশমগুলো দাঁড়িয়ে যায়। সে চোখ ফেরাতে চাইলো। পারলো না। খেয়াল করে দেখে, না চোখ নয়। ধীরে ধীরে দুটি আলোর রশ্মি তার দিকে এগিয়ে আসছে। ভয়ের হিম স্রোত আরও বেড়ে উঠছে ফারহানার দেহে। সুইচ টেপার কথা তার মনেই হচ্ছে না।
হ্যাঁ, আলোর ক্ষীণ দুটি ধারা আরও এগিয়ে আসছে। জানালার নেটে এসে গেছে। নেট গলে আলোর রেখা দুটি পড়লো গিয়ে আবিরের মুখে। আলোর রেখা পড়তেই খানিকটা কেঁপে উঠলো আবির। তারপরই হঠাৎ লাফিয়ে উঠে বসলো খাটে।
দু’হাত বাড়িয়ে দেয় ফারহানা। কী হয়েছে বাবা?
একরকম ঝাঁকি দিয়ে ফারহানার হাত দুটি ফেলে দেয় আবির। ফারহানার মনে হলো আবির অসম্ভব শক্তিধর এক ছেলে। কিন্তু আবিরের এত শক্তি কখন হলো? অবাক হয় ফারহানা।
গোঁ গোঁ করে খাট থেকে নেমে যায় আবির। বলছে, হ্যাঁ আমি আসছি বার পাহাড়ের চূড়ায়।
শুনে ফারহানার গায়ের পশম তীব্র বেগে খাড়া হয়ে গেল। সুইচ টিপ দেয় সে। ঝলমল করে উঠলো ঘরের ভেতরটা।
ফারহানাও খাট থেকে নেমে আসে নিচে। আবিরকে জড়িয়ে ধরে বললো- কী বাবা কী হয়েছে তোর?
আগের মতোই ঝাঁকুনি দিয়ে মাকে ঠেলে দেয় আবির। মুখে সেই একই কথা, আমি বার পাহাড়ের চূড়ায় আসছি।
দরজার দিকে এগিয়ে যায় আবির। ফারহানা বুঝে ফেলে উদ্দেশ্য। দৌড়ে দরজার সামনে দাঁড়ালো। আবিরের চোখে চোখ রাখে ফারহানা। চমকে ওঠে সে। না এ চোখ তো তার আবিরের চোখ নয়। কেমন যেনো নির্মম। যেনো ভয়ের বারুদ।
দরজা খোলার জন্য আবির ধস্তাধস্তি করে মায়ের সাথে। কিন্তু একবারও ফারহানাকে মা বলে সম্বোধন করেনি। ভয়-বেদনা ও দুশ্চিন্তায় ফারহানার ভেতরটা ফেটে যাবার জোগাড়।
ফারহানা বেশ শক্ত হয়। গা ঝাড়া দিয়ে সাহস সঞ্চয় করে।
রক্ষা করতে হবে আবিরকে। ভয় পেলে চলবে না। সাহসই এখন বড় পুঁজি।
আবিরের দু’হাত শক্ত করে ধরে বললো- কী হয়েছে তোর? এমন করিস কেন? একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ছেলেটাকে স্থির করার চেষ্টা করলো। এ সময় আবার আবিরের চোখে চোখ পড়ল। ফারহানা দেখলো আবিরের দু’চোখ থেকেই একটু আগে দেখা সেই আলোর রেখা সুচের মতো নেমে আসছে। যা সে দেখেছিলো নিমডাল থেকে নেমে আসতে।
ফারহানার মনে হলো তার কলিজা কেউ চেপে ধরেছে। ভয়ের কাঁটা ফুটছে সারাদেহে। এক হিম শীতল আতঙ্ক ফারহানার গোটা দেহে ছড়িয়ে পড়ছে। দরজার গোড়ায় ঢলে পড়লো সে। পৃথিবীর কিছুই তার অনুভূতিতে নেই আর।

সাত.

ফারহানার ঘুম ভাঙলো সকাল আটটায়। আড়মোড়া দিয়ে খাটে বসলো। আবির-মুনিয়া তখনও ঘুমাচ্ছে খুব আয়েশি ভঙ্গিতে। খাটে কী চমৎকার হেমন্তের রোদ এসে শুয়ে আছে। বাইরটা আরও চমৎকার। চোখ কচলে সাবধানে নেমে এলো ফারহানা। হঠাৎ তার মনে পড়লো কাল রাতের কাহিনী। মনে পড়লো নিমডাল থেকে ছুটে আসা আলোর রেখার কথা। মনে পড়লো আবিরের বার পাহাড়ে যেতে ধস্তাধস্তি। তারপর আবিরের চোখ থেকে সেই সুচ আলো। এবং তার দরজার গোড়ায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাওয়া। তবে সে খাটে কখন এলো? কিভাবে এলো? পুরো বিষয়টা কি তাহলে স্বপ্ন? না স্বপ্ন বলেও তো মনে হয় না। ওই তো তার মনে পড়ছে নিশিরাতে আকাশের তারার কথা। সেই ডেকে ওঠা অচেনা পাখিটার ডাক। বারবার পাখিটাকে খোঁজার কথা। সবই তো সে জাগনা থেকেই দেখেছে। তাহলে সাবিতদের কেউ এসে… – দরজার দিকে তাকায় সে। না দরজায় বেশ ভালো করে খিল আঁটা। যেভাবে সন্ধ্যারাতে দরজার মুখে খিল এঁটে দিয়েছে এখনও তাই আছে।
আবার নিজেকে নিজে সন্দেহ করে ফারহানা। হয়তো সবই তার স্বপ্ন বা ঘুমঘোরের দুঃস্বপ্ন। কিন্তু একটা বিষয় তাকে আবার তাড়িত করে, সে এত বেলা পর্যন্ত কেনো ঘুমিয়েছে! সে কখন ভোরবেলা ঘুম ভাঙে তার। ডালিম ডালের দোয়েল পাখিটাও তখন জাগে না। ঘুম থেকে উঠে উঠানে খানিকটা পায়চারি করে। তারপর চাপা কলে ঠা-া পানিতে অজু করে। ফজরের নামাজ পড়ে। তারপর কিচেনে প্রবেশ করে। আজ কেনো এ ছন্দপতন হলো ভাবে ফারহানা।
দরজার সিটকিনি খুলে বেরিয়ে এলো সে হেমন্তের গাঢ় নীল আকাশের নিচে। কোথাও মেঘ নেই। খলবল করে হাসছে সোনালি রোদ। এমন মেঘহীন রোদেলা আকাশ ফারহানার দারুণ প্রিয়। আকাশে তাকিয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নিলো সে। বুকটা একটু হালকা করার চেষ্টা করলো। বাগানে তাকিয়ে দেখলো নানা ধরনের ফুল ফুটে আছে। দিনে দিনে ফুলের গাছগুলো কত বড় হয়ে গেছে। বাগানের আয়তনও বেড়েছে। এর সবটাই আবিরের কৃতিত্ব। প্রতিটি গাছের সাথে আবিরের হাত লেগে আছে। আবিরের এই সাফল্যে আনন্দ আর ধরে না ফারহানার। দু’একটা ফোটা ফুলের কাছে নাক নিয়ে ঘ্রাণ নেবার চেষ্ট করলো। আহ্, ফুলের ভেতর কী মায়াময় সৌরভ দিয়েছেন স্রষ্টা!
রাতের স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন কিংবা সত্যকাহিনী সবই ভুলে যায় ফারহানা। মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে উঠেছে। ফুরফুরে মন নিয়ে নাস্তা বানালে ভালই জমবে। কি নাস্তা বানাবে? খোলা পিঠা নাকি রুটি? অবশ্য খোলাপিঠা আবিরের বেশ পছন্দ। মুনিয়াও আগ্রহী খোলার পিঠার প্রতি। তার নিজেরও অপছন্দ নয়।
রান্নাঘরে প্রবেশ করে ফারহানা। এটা-ওটা প্রস্তুত করে। গুনগুন করে একটা গান তার মনের ভেতর বাজে। গানটির কথা নয় সুরই ঘুরেফিরে আসছে। কী যেনো গানটা? কথা মনে পড়ে না ফারহানার। কিন্তু সুরটা মনের ভেতর ঘুরঘুর করছে।
আবির … আবির। কারো ডাকে ফারহানার গানের সুর থেমে যায়। কে এই সাত সকালে। রান্নাঘর থেকে উঠানে নেমে এলো ফারহানা। দেখে একজন লোক। ঘরের মাঝ দরোজার সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ডাকছে আবিরকে। লোকটাকে দেখে খানিকটা অবাক হলো ফারহানা। এ তো ইস্রাফিল মিয়া। আবিরের স্কুলের দপ্তরি। ঘন্টা বাজানোই লোকটার কাজ। বিশ বছর ধরে ওই স্কুলে একই কাজ নিয়ে পড়ে আছে লোকটি। শান্ত-শিষ্ট মানুষ। ভদ্র ব্যবহার। বড়-ছোট সকলকেই দেখা হলে আগে সালাম করে। তারপর মুখটা নিচু করে নিজের কাজে চলে যায়।
সাত সকালে ইস্রাফিল মিয়া এখানে কেন? ফারহানা এগিয়ে যায়। ফারহানাকে দেখেই সালাম দিলো ইস্রাফিল। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে। ফারহানা জানে কিছু জিজ্ঞেস না করলে মুখ খুলবে না সে।
মনে খানিকটা উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী খবর নিয়ে এসেছেন ইস্রাফিল মিয়া?
নিচের দিক থেকে মুখ তোলে ইস্রাফিল। বুক পকেট থেকে একটি চিঠি তুলে ধরলো ফারহানার দিকে।
চিঠিটি চোখের সামনে খুলে ধরে ফারহানা। কম্পিউটার কম্পোজড চিঠি। অল্প ক’টি লাইন। “আবির অষ্টম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেছে। এবং গোটা বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। নতুন রেকর্ড করেছে সে। এর আগে এত নম্বর নিয়ে কেউ বৃত্তি লাভ করেনি।” শেষে বি.দ্র. দিয়ে হাতে লেখা একটি লাইন “আজ যেনো আবির স্কুলে আসে।” নিচে স্বাক্ষর প্রধান শিক্ষক।
ফারহানা তিন বার পড়লেন চিঠিটি। আনন্দে তার দু’টি চোখ অশ্রুতে ভরে গেলো। তার বুকে যেনো আকাশ নেমে এসেছে আজ। বহুদিন এত ভালোলাগার মতো সময় আর আসেনি।
ইস্রাফিলকে বসতে বললো ফারহানা।
না আজ আমি আর বসতাম না। আসি বলে একরকম লম্বা পা ফেলে চলে গেলো ইস্রাফিল।
ফারহানা দ্রুত ঘরে উঠে আসে। ভাই-বোন তখনও আরামে ঘুমাচ্ছে। আবিরকে ডাকতে গিয়েও থেমে গেলো সে। হঠাৎ রাতের কথা মনে পড়ে তার। আবিরের চোখ থেকে যদি সেই আলো বেরিয়ে আসে আবার! একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো ফারহানা। ঘুমন্ত আবিরকে মন ভরে দেখে সে। কী সুন্দর করে ঘুমায় ছেলেটি। একদম ছোট শিশুদের মতো। মুখটা ফুটে আছে নিষ্পাপ পদ্মের মতো। এত সুন্দর তার ছেলেটি! এর আগে যেনো টেরই পায়নি সে। আবিরকে নিয়েই তার যত গর্ব। লেখাপড়ায় ভালো। ব্যবহার ভালো। শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করা, বড়দের সম্মান করা এবং হাসি-খুশি মুখ নিয়ে সবার সাথে ব্যবহার করা। এ সবই আবিরকে সবার প্রিয় করে তুলেছে।
হেমন্তের একটুকরা সোনালি রোদ এসে পড়েছে আবিরের প্রশান্ত কপালে। এলোমেলো ক’টি চুলও শুয়ে আছে রোদের সাথে। যেনো মায়ায় ভরে আছে মুখটা। ফারহানা উপুড় হয়ে আলতো করে ছেলের কপালে চুমো খায়।
দরজা থেকে তখন শব্দ ভেসে আসে চিঠি- চিঠি …।
খোলা দরজার দিকে এগিয়ে আসে ফারহানা। পোস্ট অফিসের সেই পরিচিত ডাকপিয়ন। একটি লম্বা খাম ফারহানার হাতে তুলে দিয়ে চলে গেলো। ফারহানা খামটি উল্টিয়ে প্রাপকের ঠিকানায় চোখ রাখে। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা-
প্রতি
আবির হাসান
সৈয়দ বাড়ি
বারবাজার
খামের এক কোনায় লেখা শুধু রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহারযোগ্য। বিষয়টা কী? দুরুদুরু বুকে খামটা খুললো ফারহানা। খামের পেট থেকে বেরিয়ে আসে একটি চিঠি। আবিরকে লক্ষ্য করেই লেখা। বেশ ক’টি বাক্য আছে তাতে। যার মর্মকথা, আবির যে বাগান গড়ে তুলেছে তার জন্য সরকার তাকে পুরস্কৃত করবে।
তাৎক্ষণিক বিষয়টি দারুণ আলোড়ন তুললো ফারহানার মনে। ছেলের জন্য এই প্রথম যেনো অসম্ভব গর্ববোধ করলো। দারুণ ভালোলাগা কাজ করছে তার মনে। এখন মনে হচ্ছে, পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। অনেক গুরত্বপূর্ণ। আবিরকে আরও এগিয়ে দিতে হবে। আরও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে ওর দিকে। তার আবির একদিন অনেক বড় হবে। অনেক বড়। এমন বড় হবে যেনো আবিরকে নিয়ে গোটা দেশ গর্ব করতে পারে। দেশের জন্য আবিরও যেনো সম্পদ হয়ে বেড়ে ওঠে সেই চেষ্টাই করবে সে।
এক বুক স্বপ্ন নিয়ে খোলা চিঠিটা হাতে ধরেই ফারহানা ছুটে যায় আবিরের খাটের দিকে। যেখানে আবির হেমন্তের রোদ মেখে ঘুুুমিয়ে আছে।

নয়.

মধ্যরাত। হাসপাতালের একটি কেবিনে শুয়ে আছে ফারহানা। তার শরীর ভীষণ দুর্বল। মন তার থেকেও বেশি। আবিরের শোকে তার সারাদেহ যেনো অবশ হয়ে আছে। ঘুম নেই চোখের পাতায়। সব আতঙ্ক আবিরকে ঘিরে। কত রকমের দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা ভেসে ওঠে মনে তার শেষ নেই। সন্ধ্যায় তার জ্ঞান ফিরে এসেছে। চোখ খুলেই দেখলো তার আদরের মুনিয়া তারই শিথানের পাশে কাত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। গালে জেগে আছে কান্নার দাগ। মুখটা শুকিয়ে যেনো খানিকটা ছোট হয়ে গেছে। হাত বাড়িয়ে মেয়েকে বুকে টেনে নিলো। ছোট্ট গালে আদর করে শুইয়ে দিলো পাশে। রাতের খাবারের সময় অনেক ডাকাডাকির পর চোখ খুললো। নার্স আদর করে তার মুখে খাবার তুলে দিলো। অল্প ক’টি ভাত খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে মুনিয়া। কিন্তু ফারহানার চোখে ঘুম নেই। কত রকম দুশ্চিন্তা তার মনে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। কিভাবে ঘুমাবে সে। অথচ ডাক্তার বলেছে যেভাবেই হোক ঘুমাতে হবে তাকে। ঘুমানোর চেষ্টাও সে করছে। কিন্তু ঘুম তার চোখে ধরা দিতে চাইলো না। নানারকম ভাবনার জালে আটকে গেলো তার মন। চোখ ফেটে বেরিয়ে আসে কান্নার স্রোত। কতক্ষণ কেঁদেছে সে জানে না। চোখ ভরা অশ্রু নিয়েই এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো। আর ঘুম মানেই স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ। সে দেখছে- শর্ষেফুল ফোটা এক বিশাল মাঠে এসে দাঁড়িয়েছে। চারদিকে যেনো হলুদ সমুদ্র। রোদের রঙও হলুদ হয়ে উঠেছে। এমনকি আকাশের নীল রঙও যেনো হলুদের সাথে মিশে কাঁচা সোনার মতো জ্বলছে। ঝিরিঝিরি বাতাস এসে আলতো বুলিয়ে দিচ্ছে শরীর। দারুণ ভালো লাগছে তার। দু’হাতে দু’সন্তান- আবির আর মুনিয়া। ওরা আনন্দে উল্লাস করছে। আবির তার হাত থেকে বেরিয়ে গেলো। আবিরের দেখাদেখি মুনিয়াও ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে। ওরা ভাই বোন গোটা মাঠে নেচে-গেয়ে বেড়াচ্ছে। দৌড়ে দু’জন অনেক দূরে চলে যায়। আবার দৌড় দিয়ে ছুটে আসে তার দিকে। আবার চলে যায় দূরে। আবার ফিরে আসে। এভাবে যাওয়া-আসার আনন্দটা দারুণ। ফারহানা নিজেও বেশ মজা পাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ দেখলো দু’জন যেতে যেতে অনেক দূর চলে গেলো। এক সময় আর তাদের দেখাই যাচ্ছে না। আবির-মুনিয়া বলে চিৎকার করে ডাকছে সে। ওরা কোনো জবাবও দেয় না। দুশ্চিন্তায় কান্না এসে যাচ্ছে তার। এ সময় আম্মু আম্মু বলে শব্দ বেজে উঠলো। শব্দটা শুনতে পাচ্ছে ওপর থেকে। দ্রুত আকাশে চোখ তোলে ফারহানা। দেখে একখ- হলুদ মেঘ ধীরে উড়ছে। তার ওপর বসে ডাকছে আবির-মুনিয়া। ভীষণ আনন্দিত ওরা। ফারহানা অবাক। কিন্তু তার দারুণ আনন্দ জাগছে। তারও ইচ্ছে হচ্ছে মেঘের ওপর উঠতে। এই মেঘ এই মেঘ বলে ডাকলো ক’বার। কিন্তু মেঘ যেনো শুনলোই না। আবির-মুনিয়াকে নিয়েই উড়ে যাচ্ছে দক্ষিণে। যেতে যেতে বহুদূর আকাশে চলে গেলো। আবার ভয় জেগে উঠলো মনে। চিৎকার করে ডাকছে আবির-মুনিয়া নেমে এসো। সন্ধ্যা হয়ে গেলো। দেখো অন্ধকার ঘিরে আসছে চারদিকে।
আবির-মুনিয়া কেউ তার কথা শোনে না। মেঘও না। আবার কান্না। আবার অশ্রু। হঠাৎ দেখে শর্ষেক্ষেত আর মেঘের মধ্যপথ ধরে উড়ে আসছে মুনিয়া। কিন্তু আবির নেই। মুনিয়াকে বুকে জড়িয়ে আবির বলে চিৎকার দিয়ে ডাকে। ডাকতে ডাকতে অকস্মাৎ ঘুম ভেঙে গেলো তার। জেগে দেখে বুকে জড়িয়ে আছে মুনিয়া। আর কেবিনের খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে নার্স। নার্সের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আবির। আবিরের একটি হাত ধরে আছে নার্স। বিস্মিত ফারহানা। আবির বাপ আমার। কোথায় ছিলি তুই! বলেই শোয়া থেকে উঠে গেলো ফারহানা। খাট থেকে নামার আগেই আম্মু বলে ফারহানার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো আবির। আবিরকে বুকে ধরে ভাবছে ফারহানা। একটু আগে দেখা শর্ষের মাঠ, মেঘ, স্বপ্ন নাকি এখনকার ঘটনা স্বপ্ন! নিজেকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারে না সে। ভাবনা যাই থাক আবিরকে আদরে আদরে ভরিয়ে তুলছে সে। দৃশ্য দেখে নার্সও অভিভূত। আনন্দ গলায় বললো- এবার খুশি মনে ঘুমান। ইচ্ছে করলে লাইট অফ করেই ঘুমাতে পারেন। আর ভয় নেই। আপনার আবির এসে গেছে।
নার্স চলে গেছে। ফারহানা উঠে দরজার সিটকিনি লাগিয়ে দিলো। এখন যেনো তার আর ভয় নেই। গোটা পৃথিবী এতক্ষণ যেনো শূন্য ছিলো। এখন যেনো সবকিছু পূর্ণতার কানায় কানায় ভরে উঠেছে। গোটা দুনিয়াটা বুঝি আবিরের সঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে তার পাশে।
আবিরকে জিজ্ঞেস করলো ফারহানা, কোথায় ছিলি বাপ?
খানিকটা গম্ভীর হয়ে ওঠে আবিরের মুখ। মায়ের চোখ থেকে মেঝের দিকে চোখ নামিয়ে নিলো সে।
কি হলো বাপ? তোর কি শরীর খারাপ? জিজ্ঞেস করলো ফারহানা। কোনো কথা নেই আবিরের মুখে। নিচের দিকে ফিরে আছে। হাত বাড়িয়ে কাছে টানতে চাইলো ফারহানা। কিছুটা শক্ত হয়েই রইলো সে। একরকম জোর খাটিয়ে কাছে নিলো ফারহানা। বললো- ঠিক আছে তোর কিচ্ছু বলতে হবে না। আয় ঘুমাবি।
একরকম সুবোধ বালকের মতো মা’র বুকে মুখ লুকিয়ে শুয়ে পড়লো আবির। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লো সে। শুধু ঘুম নামে না ফারহানার চোখে। না আসাই ভালো। ঘুমালেই তো দুনিয়ার আজগুবি সব স্বপ্ন জ্বলে উঠে তার ঘুমের রাজ্যে। শুয়ে শুয়ে এটা সেটা কত কি ভাবনা জাগে মনে। কত রকম স্মৃতিকথা। কত ঘটনা-কাহিনী সব ভিড় করে তার মনে। কিন্তু সব সরে গিয়ে সেখানে আবিরই দাঁড়িয়ে যায়। সুখের স্মৃতিগুলোও কেমন বেদনা কাতর হয়ে ওঠে।
এ সময় মায়ের বুক থেকে মাথা সরিয়ে পাশ ফিরিয়ে শোয় আবির। ফারহানা পাশ ফেরে না তবুও। আবিরকে বুকে জড়িয়ে পড়ে থাকে। যেনো পাশ ফিরলেই তার বুকটা খালি হয়ে যাবে। এসব ভাবতে ভাবতে তার দু’চোখে ঘুম এসে হানা দেয়। আবার চলে যায় স্বপ্নরাজ্যে। তার মনের কল্পনা, ভয় সব স্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে তার কাছে। ঘুম কখনো হালকা কখনো গভীর। আবার কখনো অকস্মাৎ জেগে ওঠা। এভাবে রাত গড়িয়ে যাচ্ছে সকালের দিকে।
শেষ রাতে এসে এক বিদঘুটে স্বপ্ন দেখলো ফারহানা। দেখে এক বিরাট কক্ষে সে শুয়ে আছে আবিরকে নিয়ে। ওপরে ছাদটি আরও বিশাল। কক্ষে আলো-আঁধারির মতো জেগে আছে রাত। শুয়ে গল্প করছে তারা দু’জন। ফারহানা নিজের ছেলেবেলার কাহিনী বলছে আবিরকে। আবির খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে মায়ের গল্প। শুনতে শুনতে হঠাৎ শোয়া থেকে উঠে গেলো আবির। কি হলো আবির? জিজ্ঞেস করলো ফারহানা।
কিছু হয়নি। চোখ কচলে জবাব দিলো আবির।
তবে বসলে যে?
এমনি বসছি।
কিছু লাগবে?
না। কিচ্ছু লাগবে না। আবিরের কণ্ঠ অচেনা মনে হচ্ছে ফারহানার কাছে।
কিছু খাবে? ক্ষুধা লেগেছে?
না বলছি না। আমার কিছু লাগবে না।
শোয়া থেকে উঠে বসলো ফারহানা। ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে আদর করতে চায়। কিন্তু আবির দু’হাত দিয়ে ঠেলে নিজেকে আলাদা করে নেয়। সেই সাথে একটু দূরে সরে বসলো। আর অনবরত চোখ কচলায়।
আবার জিজ্ঞেস করলো ফারহানা- চোখে কিছু পড়েছে? দেখি।
না-। আমাকে তুমি ধরবে না।
অবাক হয়ে যায় ফারহানা। খুব আদরমাখা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো- কি হয়েছে বাপ? আমি কি করেছি?
আবির কথা বলে না। খানিক বাদে চোখ থেকে হাত নামিয়ে মায়ের দিকে তাকায়। ফারহানা আবিরের চোখ দেখে ভয়ে কম্পমান। সে দেখে আবিরের চোখ দুটি বিশাল আগুনের গোলা। মনে হচ্ছে মুহূর্তে জ্বালিয়ে দেবে ফারহানাকে। ফারহানা চিৎকার দিতে চায় কিন্তু তার কণ্ঠ রুদ্ধ। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে আবিরের চোখের দিকে। হঠাৎ দেখে ওই চোখে আবিরের মতো আরও দু’জন সাঁতার কাটছে। আগুনের গোলার ভেতর কিভাবে সাঁতার কাটছে ওরা। আবার একজন আবির কেনো তিনজন হয়ে গেলো! কিচ্ছু মাথায় ধরে না। ভয়ে খাট ছেড়ে পালাতে যায় ফারহানা। দৌড়ে অনেক দূরে চলে এলো। দেখে ছাদের গা ঘেঁষে উড়ছে আবির। দেখে আবার অন্যদিকে দৌড়ায়। কিছুদূর গেলেই দেখে বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসছে আবির। আবার অন্য দিকে চলে। যেতে যেতে যেখানে গিয়ে থামলো দেখে সেখানেই আগুনের কু-লীর মতো চোখ জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আবির।
গলা ফাটিয়ে চিৎকার দেয় ফারহানা। কিন্তু কোথাও কারো সাড়া নেই। শুধু আবির তারই ছেলে এক ভয়ঙ্কর হাসির তামাসা করে। সেই হাসির শব্দ যেনো ফারহানার নিঃশ্বাসকে চেপে ধরেছে। মনে হচ্ছে এখনই মারা যাবে সে। দম নেবার জন্য শরীরের সব শক্তি জোগাড় করে চেষ্টা করলো। তবুও তার দম যেনো আটকা পড়ে গেছে আবিরের হাসির শব্দের সাথে। আবার আবির থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করলো। এবার হাত-পা কিছুই চলছে না। সারা শরীর যেনো সেঁটে আছে মেঝের সাথে। ভয়াবহ কষ্ট হচ্ছে তার। বাঁচার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে সে। মুখে এক ধরনের গোঙানির শব্দ বেজে উঠলো। সেই শব্দেই ঘুম ভেঙে গেলো তার। অবাক হয়ে দেখে নিজেকে! না সে মরেনি। দুঃস্বপ্নই দেখছিলো এতক্ষণ। শোয়া থেকে উঠে লাইট অন করলো। দেখে শিশুর মতো ভাঁজ হয়ে ঘুমুচ্ছে আবির। তার দেহের যে অংশ ফারহানার দেহের সাথে ছিলো ভিজে চুপসে গেছে। ফারহানা নিজের দিকে খেয়াল করে, সারা শরীর দরদর ঘামছে। মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলো তার একাংশ ভেজা। তোয়ালে দিয়ে দু’জনের শরীর মুছে দিল। নিজে ঢুকে গেলো বাথরুমে। তোয়ালে ভিজিয়ে সারা শরীর মুছে নিল। মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে বেরিয়ে এলো। এখন একটুখানি আরাম বোধ হচ্ছে। খাটের পাশ দাঁড়িয়ে বারবার আবিরকে দেখছিল। দেখছিল আবিরের চোখ। একটু আগে দেখা ভয়ঙ্কর সে চোখের দৃশ্য কিছুতেই সরছে না তার চোখ থেকে। অবুঝ শিশুর মতো ঘুমিয়ে থাকা আবিরকে দেখে দারুণ মায়া লাগছে ফারহানার। ঘুমন্ত ছেলের মুখে আদর করে সে। তখন দূরে কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসে ভোরের আজানের ধ্বনি। জানালার পাশে এসে দাঁড়ালো ফারহানা। জানালা খুলতেই বকুল ফুলের ঘ্রাণ মিশ্রিত একঝাঁক ভোরের হিমেল বাতাস এসে প্রবেশ করলো কেবিনে। দারুণ ভালো লাগছে ফারহানার। বকুল ফুলের গন্ধে ভোরের বাতাস বেশ মিষ্টি হয়ে উঠেছে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলো সে। জানালার গ্রিল ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। চারদিক ফর্সা হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। মা’র কথা খুব মনে পড়ছে ফারহানার। ছোটবেলায় তার মা তাকে ঘুম থেকে এ সময়টায় ডেকে তুলতো। ভোরে ঘুম থেকে জাগতে খুব কষ্ট হতো তার। কিন্তু মায়ের সোহাগমাখা ডাকে কষ্ট ঠেলে উঠে পড়তো সে। অমনি বলতেন দেখ দেখ কেমন আরামদায়ক বাতাস। জানালার পাশে বাতাবি লেবু গাছটির ফুল ঝরে থাকতো। তার পাশেই ছিলো হাসনাহেনার ঝোপ এবং শেফালি ফুলের গাছ। শেফালি ঝরে সাদা হয়ে থাকতো। মা বলতেন, যা না ফারু কিছু ফুল কুড়িয়ে নে। মা তাকে আদর করে ফারু ডাকতো।
আজ কোথায় তার মা কোথায় সে! কত ভাবনা এসে জড়ো হচ্ছে ফারহানার মনে। হঠাৎ কারো স্পর্শে জানালা থেকে চোখ ফেরালো ফারহানা। দেখলো আবির। প্রায় তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। ফারহানা জিজ্ঞেস করলো- এতো তাড়াতাড়ি উঠলি যে?
আর ঘুমুতে ইচ্ছে করছে না আম্মু।
কেনো? তুই তো রাতে বেশি ঘুমাসনি।
যা ঘুমিয়েছি তাতেই চলবে।
এখনও তো তেমন সকাল হয়নি!
সকাল না হলে তুমি উঠলে কেন?
আমার ঘুম ছুটে গেছে তাই উঠে পড়লাম। তাছাড়া আমার তো খানিকটা বয়স হয়েছে।
আমারও বয়স হয়েছে আম্মু। আমি কি আর ছোট্ট বাবুটি আছি!
আবিরের কথা শুনে অবাক হলো ফারহানা। কী বলে ছেলেটি! এখনও কী তার বয়স। এতে সে অনেক বড় হয়েছে ভাবছে। মুখে কোনো কথা না বলে চেয়ে আছে ছেলের দিকে।
আবির খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে বললো- অমন করে কি দেখছ আম্মু?
লুকিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফারহানা বললো- আমার নয়নমণি আবিরকে দেখছি। দেখছি কত বড় হয়েছে আমার আবির।
মা’র কথায় কিছুটা লজ্জা পেয়েছে সে। নিচের দিক ফিরে হাতের নখ খুঁটছে।
একটুক্ষণ চুপ থেকে বললো- চলো আম্মু বাসায় যাই।
সাথে সাথেই ফারহানা বললো- হ্যাঁ একটু পরেই আমরা চলে যাবো।

দশ.

ফারহানা আবির ও মুনিয়াকে নিয়ে যখন হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলো তখন সকালের রোদ পাতায়-ঘাসে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘাসের মাথায় জমে উঠেছে শিশির বিন্দু। রোদের ঝিলিক পড়লে শিশির বিন্দুগুলো মুক্তো হয়ে জ্বলছে। পাতায় চিকচিক করছে রোদের পালক।
হাসপাতালের রাস্তাটি এসে যে রাস্তার সাথে উঠেছে সে রাস্তা ধরেই যেতে হবে ফারহানাদের। পিচঢালা রাস্তা। খুব চওড়া রাস্তা এটি নয়। পাশাপাশি দুটি কার চলার মতো প্রশস্ত। এ রাস্তার দু’ধারে দারুণ সব গাছ লাগানো। বিশেষ করে কড়াই গাছের সারি রাস্তাটাকে ছায়ার শীতলতায় ঘনিষ্ঠ করে রেখেছে। রাস্তার দু’পাশে বিস্তীর্ণ ধানের মাঠ। এমন ধানের মাঠ ফারহানার খুব পছন্দ। ছোটবেলায় বাড়ির পাশের ধানের জমিতে লুকোচুরি খেলেছে বান্ধবীদের সাথে। ফারহানা ভাবে আজ তাকে কেনো যেনো কৈশোর পেয়ে বসেছে। ফিরে ফিরে কিশোরকালই তার সামনে এসে দাঁড়ায়। মুনিয়াকে হাতে ধরে হাঁটছে সে। সামনে সামনে চলছে আবির। ফারহানা যেমন নিজের ভেতর সেঁধে আছে আবিরও তেমনি যেনো নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত।
মুনিয়া বারবার ভাইয়া ভাইয়া ডেকে যাচ্ছে। আবিরের মোটেই খেয়াল নেই মুনিয়ার দিকে। আনমনে হাঁটছে তো হাঁটছেই। এবং ক্রমাগত হাঁটার গতি বাড়িয়ে চলছে।
ফারহানা বিষয়টি খেয়াল করলো। তার মনে হলো আবির ভীষণ দ্রুত হাঁটছে। পেছন ফিরে একবারও দেখছে না।
ফারহানাও হাঁটার গতি কিছুটা বাড়িয়েছে। কিন্তু মুনিয়া তাল মেলাতে পারছে না। হাসপাতাল থেকে ফারহানার বাসা খুব দূরে নয়। মাত্র দশ মিনিটের পথ। এ সামান্য জায়গাটুকু হেঁটে যাবে বলে রিকশা ডাকেনি সে। সামনেই বাঁক নিয়েছে রাস্তাটি। বাঁয়ে ফারহানাদের বাসা। ডানে বার পাহাড়ের দিকে চলে গেছে রাস্তাটি।
বাঁকে গিয়েই সমস্যাটা ঘটেছে। আবির বাঁয়ে বাসার রাস্তা ছেড়ে ছুটে চললো ডানের রাস্তায়। ফারহানা দ্রুত হাঁটছে। সেই সাথে ডেকে বলছে- বাঁয়ে যাও আবির, বাঁয়ে।
আবির তার আম্মুর কথা শুনলো কি শুনলো না বোঝাই গেলো না। অতি দ্রুত পা ফেলে চলে যাচ্ছে বার পাহাড়ের দিকে।
মুনিয়াকে ধরে একরকম দৌড়ের ভঙ্গিতে ছুটছে ফারহানা। মুখে ডাকছে আবির… আবির…। মুনিয়াও ডাকছে- ভাইয়া… ভাইয়া…।
এসব দিকে খেয়ালই নেই আবিরের। তার টার্গেট রহস্যময় সেই পাহাড়ের দিকে।
ফারহানা নিজেকে নিজে ভর্ৎসনা করে- কেনো রিকশা না নিয়ে হাঁটতে গেলো। রিকশায় বসলে তো তার আয়ত্তে থাকতো আবির।
বাঁক পেরিয়ে ফারহানা মুনিয়াকে নিয়ে ছুটছে আবিরের পিছু পিছু। পাহাড়িয়া পথ বলে এই সাতসকালে রাস্তায় কোনো মানুষজন নেই। ফলে কারো সাহায্য নেয়ার মতো অবস্থাও নেই। কিছুদূর দ্রুত হেঁটে হাঁফিয়ে উঠেছে ফারহানা। আবির ততক্ষণে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সামনেই বার পাহাড়ের কালো দেহ। কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে প্রায়। পাহাড়ের ওপাশে সূর্য উঠলেও এপাশে বেশ আলোহীন কুয়াশার আস্তরণ। আলিজালি দেখা যাচ্ছে আবিরকে। দৌড়াচ্ছে সে। ডানে-বাঁয়ে কোনো খেয়াল নেই তার। পাহাড়ের দিকে মুখ তুলে রুদ্ধশ্বাসে ছুটছে তো ছুটছে। মুনিয়াকে নিয়ে ছুটছে ফারহানাও।
পাহাড়ের পাদদেশে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে আবির। কিছু সময়ের ব্যবধানে কাছাকাছি এসে পড়লো ফারহানা। মুখে তার নানা রকম আদরমাখা অনুরোধ- আবির বাপ আমার, তুই দাঁড়া। সামনে যাস না আর। তুই না বাড়ি যাবি। চল আমরা বাড়ি যাব। এই দেখ তোর প্রিয় বোন মুনিয়া। তোর জন্য কেমন কান্না করছে। বলতে বলতে আবিরের কাছাকাছি এসে গেলো। কিন্তু আবির কোনো কথার জবাব কিংবা সাড়া দিচ্ছে না। নিচের দিকে ফিরে আছে সে।
ফারহানা ঠিক আবিরের পাশে এসে দাঁড়ালো। হাত বাড়ালো আবিরের দিকে। আবির নিচের দিক থেকে মাথা তুলে ফিক করে হেসে দিলো। হেসে হেসে বললো- ও আম্মু তুমি এসে গেছ তাহলে! এই বলে ফারহানার হাত থেকে একরকম ছোঁ মেরে মুনিয়াকে তুলে নিলো ঘাড়ে। নিয়েই ভোঁ দৌড় সেই পাহাড়ের দিকে। দৌড়েই পাহাড়ে উঠে যাচ্ছে আবির।
কি ঘটতে যাচ্ছে আঁচ করতে না পেরে হতবাক হয়ে গেলো ফারহানা। মনে হচ্ছে কেউ তার কলিজা চেপে ধরেছে। হাহাকার করে উঠেছে তার মন। তাকিয়ে দেখছে তার কলিজার ধন আবির মুনিয়াকে কাঁধে নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে পাহাড়ে। আম্মু… আম্মু… বলে চিৎকার দিচ্ছে মুনিয়া। সেদিকে কোনো খেয়াল নেই আবিরের। ফারহানার মুখেও কোনো ভাষা নেই। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে পাহাড়ের গোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তে সব বুদ্ধি যেনো লোপ পেয়ে গেছে ফারহানার। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া তার যেনো আর কিছুই করার নেই।
হঠাৎ ফারহানার খেয়াল হলো- আবির মুনিয়াকে একরকম পুতুলের মতো ধরে দৌড়ে উঠছে পাহাড়ের চূড়ার দিকে। বিস্মিত ফারহানা। এমন খাড়া পাহাড়ে কিছুই না ধরে ছেলেটি কিভাবে উঠছে! তা ছাড়া সে তো একা নয়। তার হাতে ধরা মুনিয়া। সে ভাবছে সত্যিই কি তার ছেলেকে জিন কাবু করে ফেলেছে? এখন সে তার নিজ চোখে যা দেখছে তা কি সে অবিশ্বাস করবে? এটা কি তাহলে জিনের পাহাড়? ভয়ে-বিস্ময়ে শরীর পাথর হয়ে যাচ্ছে ফারহানার। কণ্ঠে সর্বোচ্চ শব্দ তুলে ডাকছে আবিরকে। কিন্তু তার কণ্ঠ থেকে যেনো কোনো শব্দই বের হচ্ছে না। পাহাড়ের দিকে চেয়ে আছে সে। চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে আবির। ছোট পাখির মতো মনে হচ্ছে তাদের ভাই-বোনকে। যে পথ বেয়ে এখানে এসেছে ফারহানা সে পথের দিকে তাকালো সে। না এখনও কোনো মানুষ উঠে আসেনি এ পথে। আবার দেখলো পাহাড়ের দিকে। দেখলো একদম চূড়ায় বসে আছে আবির। তার হাতে ধরা মুনিয়া। আকাশের দিকে চেয়ে আছে আবির।
এখন কি করা উচিত কিছুই বুঝতে পারে না ফারহানা। সে কি ফিরে যাবে হাসপাতালে, কাউকে ডেকে আনবে? কিন্তু এখানে যদি অন্য কিছু ঘটে যায়! দু’চোখে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরছিলো তার। কাঁদতে কাঁদতে চোখ শূন্য হয়ে পড়েছে। এখন আর কোনো পানিই গলে না চোখ থেকে। অসহায় ফারহানা চারদিক দেখে। এতটুকু সাহায্যের সম্ভাবনা যদি উঁকি দেয়! কিন্তু কোথাও কেউ নেই। কেবল সামনে পাহাড় সারি। পেছনে খানিকটা সমতল ভূমি। আর ওপরে বিস্তীর্ণ আকাশ। কুয়াশায় ভিজে ভিজে ঝরছে যেনো রোদের পাপড়ি।
ফারহানা এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে পাহাড়ের চূড়ার দিকে। হ্যাঁ দেখা যাচ্ছে আবিরকে। আগের মতো আকাশের দিকে মুখ করে নেই। কিন্তু কোন দিকে ফিরে আছে তাও বোঝা যাচ্ছে না। আবির বাপ আমার নেমে আয়… এ রকম অনুনয় করে ডাকছে আর কাঁদছে। গোটা পৃথিবীটা শূন্য মনে হচ্ছে ফারহানার। এ মাটি, আকাশ, জীবন-জগৎ সবই শূন্য। এমন শূন্যতায় দাঁড়িয়ে সে কি করবে? হঠাৎ মনে হলো আকাশ থেকে কেউ বুঝি নামছে। চকিতে আকাশে চোখ তোলে। দেখলো একঝাঁক পাহাড়ি পাখি ঝাঁ করে উড়ে গেলো অন্য পাহাড়ের দিকে।
ফারহানা ভাবছে তার যদি দুটি ডানা থাকতো পাখির মতো! ওড়ার মতো শক্তি থাকত! পাখির ডানা পৃথিবীর সবচেয়ে দামি মনে হচ্ছে তার কাছে। ভাবতে ভাবতে দেখলো খানিকটা দূরে ক’টি শেয়াল সমতল ভূমি থেকে পাহাড়ের দিকে ঢুকে যাচ্ছে। সম্ভবত রাতভর আহার করে এখন ঘুমুতে যাচ্ছে। পাহাড়ে ঢোকার সময় শেয়ালগুলো ঘাড় ফিরিয়ে ফারহানাকে একবার দেখে নিলো। যেনো ভাবছে এ অসময়ে একটি রমণী কেনো এখানে? কোনো মানুষ তো এখানে থাকে না। শেয়াল ছিলো ফারহানার ভয়ের বস্তু। শেয়ালের চোখ দেখে তার দেহ কেঁপে উঠত। অথচ আজ তার কোনো ভয়-ডর নেই। এসবের অনুভূতিই যেনো লোপ পেয়েছে। একটিই ভাবনা তার, আবির আর মুনিয়া। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
ধীরে ধীরে ফারহানার স্বাভাবিকতা লোপ পাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে সে পাগল হয়ে যাবে। কিংবা গত দিনের মতো সেন্স হারিয়ে ঢলে পড়বে পাহাড়ের গোড়ায়। তবু মনকে শক্ত করে ফারহানা। দু’হাত প্রসারিত করে আকাশের দিকে। শরীরের সমস্ত শক্তি জোগাড় করে প্রার্থনা করে- হে আকাশ ও জমিনের প্রভু, হে পাহাড়ের অধিপতি, আমার আবির-মুুনিয়াকে ফিরিয়ে দাও।
ফারহানার প্রার্থনার শব্দ পাহাড়ে-পাহাড়ে বেজে ওঠে। মনে হয় যেনো পাহাড়ও তার সাথে প্রার্থনায় যোগ দিয়েছে। কিন্তু সেদিকে ফারহানার খবর নেই। সে তার মতো বলে যাচ্ছে খোদার কাছে। বলতে বলতে হঠাৎ তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। মাথা চক্কর দিচ্ছে। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না সে। ঢলে পড়লো পাহাড়ের কোলে। তবে সেন্স হারায়নি সে। ভয়াবহ মানসিক উত্তেজনায় তার স্বাভাবিকতা লোপ পেয়েছে। সবকিছু এখন ছায়া ছায়া, আলো-আঁধারির মতো মনে হচ্ছে। চোখে প্রচ- ঘুমের রেশ জেগে উঠলে যা হয়। তেমনিই জগৎটাকে তার ঘুমের জাদু বলে মনে হচ্ছে। অবচেতনের মতো পড়ে রইলো ফারহানা।
এভাবে কতক্ষণ পড়েছিলো জানে না সে। হঠাৎ তার মনে হলো বহুদূর থেকে ক্ষীণ কণ্ঠে কেউ তাকে ডাকছে- আম্মু…। বহুদূর থেকে বাতাসে ভেসে আসা মিহি সুর- আ-ম্মু…। মনে হচ্ছে কণ্ঠটি মুনিয়ার। আবার মনে হয় বুঝি আবিরের। কিন্তু সে চোখ খুলতে পারছে না। তাহলে কি সে স্বপ্ন দেখছে? কিন্তু না সে তো ঘুমায়নি। আম্মু… আবার শব্দ। এই তো সে শুনতে পাচ্ছে। আগের থেকে কিছুটা নিকটে শব্দটি বাজছে। আবার আম্মু…। হ্যাঁ আরও কাছের শব্দ। এই শব্দ তো তার মুনিয়ার। তাহলে সে কেনো জবাব দিচ্ছে না! ঠিক তখনই আরও নিকট থেকে শব্দটি বেজে উঠল- আম্মু…। এবার ঠিক ঠিক মনে হলো এ শব্দ তার আবিরের। আবির-মুনিয়া। মুনিয়া-আবির। মুনিয়া মুনিয়া। আবির আবির। শব্দগুলো ক্রমাগত বেজে চললো। ওই তো আবির-মুনিয়া দু’জনই তাকে ডাকছে। ওদের ডাক পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলছে। তবে কেনো সে এখানে পড়ে আছে? কেনো সে আম্মু ডাক শুনে জবাব দিচ্ছে না? ফারহানা নিজেকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে। চোখ খুলতে চায়। কিন্তু চোখে কে যেনো ঘুমের আঠা লাগিয়ে রেখেছে। জিহ্বা যেনো সেঁটে আছে তালুর সাথে। কিছুতেই কথা বলতে পারছে না। চোখ খুলতেও পারে না।
এদিকে আম্মু ডাক আরও ঘন হয়ে বাজতে থাকলো। সেই সাথে কান্নার শব্দও শুনছে ফারহানা। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে এ কান্না তার মুনিয়ার। কিন্তু সে দেখতে পাচ্ছে না। কোথায় মুনিয়া? কোথায় তার আবির?
আরও নিকট থেকে কান্না জড়িত আ-ম্মু… শব্দ ভেসে আসছে। নিজেকে এবার শক্ত করে ফারহানা। একরকম গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে বসলো সে। কান্নার শব্দের উৎসের দিকে তাকায় সে। দেখলো এক সৌম-শান্ত বৃদ্ধ। মাথায় সাদা বাবরি চুল। দীর্ঘ সাদা দাড়ি। পোশাকও একদম সাদা। বৃদ্ধের ডান হাতে মুনিয়া। বাম হাতে আবির। ধীর পায়ে ফারহানার দিকে এগিয়ে আসছে।
প্রথমটায় অবাক হলো ফারহানা। কে এই বৃদ্ধ! কিভাবে পেলো আবির-মুনিয়াকে? মুহূর্ত খানিক। তারপরই ভুলে যায় সব জিজ্ঞাসা। পাগলের মতো ছুটে গেলো আবির-মুনিয়ার দিকে। আদরে আদরে ভরে তুললো তার হাহাকার করা মন। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়ালো বৃদ্ধের মুখোমুখি। নতচোখে বিনম্র কণ্ঠে বললো- আপনি কে বাবা আমি জানি না। কিন্তু আপনি আমার প্রাণ ফিরিয়ে দিলেন। আবির-মুনিয়াকে দেখিয়ে বললো- এরা দু’জন আমার প্রাণ। এদের ভেতরই আমি বেঁচে আছি।
ফারহানার কথা শুনে মুচকি হাসলেন বৃদ্ধ। তার হাসির ঔজ্জ্বল্যে যেনো বিজলি খেলে গেলো।
বাবা আপনি…। ফারহানা কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলেই বাধা দিলো বৃদ্ধ- না। কোনো জিজ্ঞাসা নয়। আমি যা বলছি তার বেশি জানতে চেয়ো না। এ পাহাড়েই আমি থাকি। আজ দশ বছর। পাহাড় ছেড়ে কোথাও যাই না। যে এই বার পাহাড়ের প্রেমে পড়ে তার আর রক্ষা নেই। তোমার ছেলেকে তুমি সামলাও। ও যেনো আর কোনোদিন এ পাহাড়ে না আসে। শেষ বারের মতো তোমার হাতে দিয়ে গেলাম ওকে। আবার যদি ও আসে তবে তাকে আর ফিরে পাবে না।
আমি ওকে কিভাবে ফিরিয়ে রাখব বাবা?
সে ভাবনা তোমার মা। তবে মায়ের কর্তব্য পালন করেই তাকে ফেরাবে। তুমি আদর্শ মা হলে তোমার সন্তানও আদর্শ হবে। শুধু খেয়াল রাখবে তোমার সন্তান যেনো কখনো মিথ্যে কথা না বলে।
আমাকে আর কিছু…।
না আর কিছু নয়। একটিই কথা, এ পাহাড়ে ও যেনো আর না আসে। মনে রাখবে। এ পাহাড়ের মায়ায় যে পড়ে তার আর ফেরা হয় না। এ এক রহস্য পাহাড়।

SHARE

Leave a Reply