Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস মেরাজ ফকিরের কেরামতি -মহিউদ্দিন আকবর

মেরাজ ফকিরের কেরামতি -মহিউদ্দিন আকবর

এক গ্রামে খুবই গরিব এক রাখাল তরুণ ছিলো। তার মা-বাবা কেউই ছিলো না বেঁচে। তাই সে থাকতো তার বড় ভাইয়ের কাছে। আর সারাদিন মাঠে মাঠে গরু চরিয়ে বেড়াতো। এই রাখাল ছেলের নামটি ছিলো মেরাজ। কখনোই সে বড় ভাই অথবা ভাবী সাহেবার অবাধ্য হতো না। তবুও তার ভাবী তাকে তেমন পছন্দ করতো না। তাই রোজই তাকে কম কম খাবার দিতো। আর থাকতে দিতো গোয়াল ঘরের পাশে একটা ভাঙা ঘরে। সেখানে তাকে চাটাই বিছিয়েই শুতে হতো। ছোট্ট ময়লা চিটচিটে একটা বালিশ আর ছারপোকা বোঝাই একটা ছেঁড়াকাঁথা ছিলো তার সম্বল। সব মিলে তার ছিলো দুটো লুঙ্গি, একটা ফতুয়া, একটা গেঞ্জি আর একটা গামছা। তাতে তার কোন দুঃখ ছিলো না। ওর দুঃখ কেবল ভাবীর আচরণে। তবুও মুখ ফুটে কোন প্রতিবাদই করতো না। ভাবী উপরন্তু গায়ে পড়ে বড় ভাইয়ের কাছে মেরাজের নামে উল্টাপাল্টা অভিযোগ জানাতো। বড় ভাই সত্যিকথা জানতে না পেরে মেরাজকে তাই বকুনিও লাগাতো। তাতেও মেরাজ প্রতিবাদ জানাতো না।
কিন্তু একদিন হলো কী! গরমের কষ্টে টিকতে না পেরে মেরাজ ঘর ছেড়ে, পাশের বাড়ির শানবাঁধানো ঘাটে চুপচাপ বসে বসে আকাশের তারা দেখতে লেগে গেলো। অমনি সময় ওদের বাড়ির দিকে দু’জন লোককে একটা ধামা নিয়ে এগিয়ে যেতে দেখলো। ওই লোকেরা যাতে ওকে দেখতে না পায় সে জন্য মেরাজ তাড়াতাড়ি টুপ করে লুকিয়ে রইলো একটা মোটা আমগাছের আড়ালে। ওখানে লুকিয়ে লুকিয়ে ও দেখতে লাগলো লোক দুটোর কাজকর্ম। লোকেরা এদিক ওদিক তাকিয়ে আস্তে করে টোকা দিলো পেছনের দরোজায়। অমনি নিঃশব্দে দরোজা খুলে বেরিয়ে এলো মেরাজের ভাবী।
তারপর একটা বালতিতে ভরে ধান এনে এনে লোক দুটোর ধামাটা ভরে দিলো। আর লোক দুটো খুশি হয়ে ভাবীর হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে ধান ভর্তি ধামা নিয়ে সন্তর্পণে পালিয়ে গেলো। মেরাজের তখন বুক ধড়ফড় করছে। ও কিছুই করতে পারলো না। তাই দৌড়ে এসে আবার টুপ করে শুয়ে পড়লো নিজের ঘরে।
ওদিকে হয়েছে কী! পরদিন সকালে উঠে ওর বড়ভাই তো ভীষণ হৈ-হল্লা লাগিয়ে দিলো। ঘরের ফসলের গোলার আশপাশে ধান ছড়ানো দেখে, ধান চুরি গেছে ভেবে মেরাজের সাথে সেকি রাগারাগি! রাগে কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে মেরাজের চুলের মুঠি ধরে বললো- বলি কেবলতো সারাদিন কয়টা গরু চরিয়ে বেড়াস আর বাড়িতে এসে পেট পুরে ভাত গিলিস। তাহলে রাতে আবার অতো মরার ঘুম ঘুমানো লাগে কেন, অ্যাঁ? আমার মতো তো আর হাড়ভাঙা খাটা-খাটুনি করিস না। রাতে একটু কান খাড়া রাখতেও পারিস না? এই তোর নাকে তেল দিয়ে আরামের ঘুমের জন্যই আজ কতগুলো ধান চোরে নিয়ে গেলো। এর আগেও পাট নিয়েছে চোরে। তখন অবশ্য তোর গায়ে ভীষণ জ্বর ছিলো বলে তোকে ফুলের টোকাটি পর্যন্ত দেইনি। আজকে মেরে তোর হাড়-হাড্ডি সব ভেঙেই ফেলবো।
বড়ভাইয়ের হাঁকডাক শুনে মেরাজের মুখ ফসকে সত্যি কথাটা প্রায় বেরিয়েই আসছিলো। কিন্তু ভাবীর অসম্মান হবে বলে মেরাজ মাথা নিচু করে চুপ হয়ে রইলো। অমনি ঠাস করে একটা চড় কষে মেরে বড়ভাই জানিয়ে দিলো- আজও বেশি শাসন করলাম না। ফের যদি অমনটি হবে তো তোর মরার ঘুম ছুটিয়ে দেবো। কথাগুলো বলে বড়ভাই রাগে গজগজ করতে করতে হালের বলদ আর লাঙ্গল নিয়ে বেরিয়েই যাচ্ছিলো, কিন্তু ভাবী একটু ভেঙচি কেটে তাকে আরো চটিয়ে দিলো। ভাবী বললো- সে বার পাট চুরি গেলো বলে তুমি আমার ভাইকে কতো হম্বিতম্বি করলে। আমার ভাই তো তখন বেড়াতে এসেছিলো। তোমার বাড়ি-ঘর তো পাহারা দিতে আসেনি আর তোমার সম্পত্তিতে ভাগও বসাতে আসেনি। অথচ তোমার নবাবজাদা ভাই তো আবার সম্পত্তির ভাগীদার!
আর যায় কোথায়! বড়ভাই লাঙ্গল রেখে মেরাজকে ফের দু’টি থাপ্পড় লাগিয়ে বললো- আব্বা মারা যাবার সময় তোর ভার আমার ওপর দিয়ে গেছে বলে এই চুরি যাওয়া সম্পদের ভারও যে আমাকে বইতে হবে সে আমি পারবো না। এখন থেকে যখন যা চুরি যাবে, সব তোর ভাগ থেকে যাবে। ও সবের হিসাব তুই পাবি না। বড় হলে বিয়ে শাদি করিয়ে যখন আলাদা সংসার বানিয়ে দেবো, তখন এই সব চুরি যাওয়া সম্পদের হিসাব তোর হিসাব থেকে কেটে নেবো।
এবারও মেরাজ কোন প্রতিবাদ করে না। কেবল মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ভাবীকে হাতে নাতে ধরিয়ে দিতে হবে। নইলে শুধু শুধু মুখে কিছু বলে তাকে চোর বানাতে গেলে তাতো প্রমাণ করা কঠিন হবে। অযথা বলতে গিয়ে তাকে কেবল অপমানই করা হবে। আবার এজন্য উল্টো মারও খেতে হতে পারে। তা ছাড়া ভাবী বেচারি ওর সাথে শত্রুতা করলেও মেরাজ তো তাকে সম্মান করে। তাই কৌশলে বরং তাকে একা একা শায়েস্তা করতে পারলেই ভালো হয়। তাতে অন্য লোকেরা তাকে অপমান করতে পারবে না। আবার আমাকেও ভাবী সম্মান বা সমাদর না করুক, অন্তত মনে মনে ভয় তো পাবে। আম্মা তো সব সময় বলতেন, মন্দ লোকেরা আসলে ভেতরে ভেতরে খুবই দুর্বল হয়। সৎ সাহস একেবারেই থাকে না।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে নিজের গালে হাত বুলাতে বুলাতে মেরাজ চলে যায় গোয়াল ঘরের দিকে।

দুই.

মেরাজ অনেক ভেবেচিন্তে ভাবীকে শায়েস্তা করার দারুণ একটা বুদ্ধি বের করে ফেলে। তাই হঠাৎই একদিন কাউকে কিছু না বলে রাতের বেলা উধাও হয়ে যায়। অনেক খুঁজেও মেরাজকে না পেয়ে বড়ভাই খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ে। সে ভাবে, ধান চুরি হবার জন্য মেরাজকে মেরেছি বলেই ভাইটি আজ অভিমান করে ঘর ছেড়েছে। এ জন্য আমিই দায়ী।
কিন্তু তার বউ তাকে বুঝায়, আসলে মেরাজটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। হয় তো চোরদের সাথে মিশে মেরাজই সেদিন ধান চুরি করেছে। তাই এখন তার ভাগ বুঝে নিতে আর অন্যান্য গ্রামে চুরি করতেই সে বাড়ি ছেড়েছে। দেখবে, কবে আবার এই বাড়িতে হানা দিয়ে বসে। কিন্তু না। পরদিন হঠাৎই বাড়ির পশ্চিম পাশের ছাড়া ভিটায় মেরাজকে পাওয়া গেলো। মেরাজ অই ভিটার বিরাট বটগাছের উঁচু একটা মোটা ডালে চিৎপটাং হয়ে ঘুমিয়ে আছে। ওকে দেখে গ্রামের লোকের চোখ তো চড়কগাছ! সাতসকালেই সাতগ্রামের লোকজন সব জড়ো হয়েছে ছাড়া ভিটার সেই বটগাছটার তলে। কয়েকজন সাহসী যুবক মিলে গাছে উঠে, মেরাজের ঘুম ভাঙিয়ে ওকে নামিয়ে আনে গাছতলাতে। আর গাছতলাতে নামিয়ে আনতেই মেরাজ বড় বড় চোখ করে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিল্লিয়ে ওঠে- হক মাওলা! তোরা কারা আমার মোরাকাবা ভেঙে দিলি, অ্যাঁ? আমি আরেকটু হলে তৃতীয় আসমানে পৌঁছে যেতাম। গুনাহগার! তোরা সব গুনাহগার!!
মেরাজের কথায় সবাই ভয় পেয়ে যায়। ওর ওপরে জিনের আছর হয়েছে মনে করে কেউ কেউ ভয়ে ভয়ে কেটেও পড়ে। মেরাজ এটা বুঝতে পেরে আবারো চিৎকার দেয়- হক মাওলা! আমি চোখ বন্ধ করলেই কামরূপ আর কামাক্ষা নগরী ঘুরে আসতে পারি। এবার মক্কা-মদিনা ঘুরে এলাম বলে একটু দেরি হয়ে গেলো। তাই তোদের চোখে ধরা পড়ে গেলাম।
যাক ধরা যখন পড়েই গেলাম, এখন থেকে গ্রামেই থাকবো। তবে সাবধান! তোরা আমাকে বেশি বেশি প্রশ্ন করিস না। তাহলে গ্রামের সব তাগড়া জোয়ান বন্ধুদের নিয়ে আমি হাওয়ায় মিশে যাবো। কারণ আমি হলাম জিনের বাদশার খাস লোক। জিনেরাও আমাকে সম্মান করে। আমি এখন আর তোদের মেরাজ মিয়া নেই। আমি এখন মেরাজ ফকির! মানে তোদের ফকির বাবা!! তবে তোদের মতোই সাধারণ মানুষ। এখন আমাকে জ্বালাতন করিস না। আমার খুব খিদে পেয়েছে। আমাকে তোরা বাড়িতে নিয়ে চল। আমি আমার বাড়িতে গিয়ে বড়ভাইকে সালাম করবো। ভাবীকে সালাম করবো। ভাবীর হাতে রান্না করা মুরগির ঝোল আর কইমাছ ভাজা দিয়ে মজা করে ভাত খাবো।
মেরাজের বড়ভাই লোকদের মাঝেই ছিলো। সে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো- এই যে আমি এখানেই। আমি তোকে নিয়ে যেতে এসেছি ভাই। চল, চল, বাড়িতে যাই। তোর যা যা খেতে মন চায় সবই তোর ভাবী রান্না করে খাওয়াবে।
এবার মেরাজ তার বড়ভাইয়ের দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আবারো ‘হক মাওলা’ বলে চিৎকার করে ওঠে। তারপর বলে, তুই মেরাজের বড়ভাই? তোর মতো ভাই থাকতে মেরাজ ভাঙা ঘরে থাকে কেন? ওর ঘরে একটা চৌকি নাই কেন? ওর কাঁথা বালিশ চিটচিটে ময়লা আর ছারপোকায় ভরা কেন? তোর এতো পয়সা কড়ি থাকতে মেরাজ তোদের গরুর রাখাল কেন? একটা রাখাল ছেলে রাখলেই তো পারিস। হক মাওলা…! হক মাওলা…!!
কথাগুলো বলেই মেরাজ জ্ঞান হারিয়ে ফেলার ভান করে, মাটিতে পড়ে যায়। অমনি সবাই মিলে ধরাধরি করে ওকে বাড়িতে নিয়ে আসে। আর বাড়িতে এনে বিছানায় শোয়াতেই ‘হক মাওলা’ বলে এক চিৎকার দিয়ে মেরাজ ফকির সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তারপর বিড়বিড় করে কিসব বলে নিয়ে কান ঝালা-পালা করা চিৎকার দিয়ে বলে- আজকের দিনটাই তোদের সময়। সন্ধ্যার অন্ধকার নামার আগেই মেরাজের ঘরটা নতুন করে তুলবি। রাত হয়ে গেলে তোদের আর তুলতে হবে না। জিনেরা এই গ্রামের সব ঘর মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে শুধুমাত্র মেরাজের ঘর বানিয়ে দিয়ে চলে যাবে। তখন আর কান্নাকাটি করে লাভ হবে না। হক মাওলা…!
সন্ধ্যার আগে ঘর তুলতে না পারলে গ্রামের সব ঘর ধুলায় মিশে যাবার ভয়ে সবাই ছুটলো বাঁশ কাটতে। কেউ কেউ ছুটে গিয়ে লম্বা এবং সোজা সোজা দেখে বেশ কয়েকটা গর্জন কাঠের গাছই কেটে নিয়ে এলো। আর সারাদিন ধরে চললো মেরাজের পুরনো ঘরটা ভেঙে নতুন ঘর তোলার আয়োজন।
ওদিকে মেরাজের ভাবী মোরগ জবাই করে, কইমাছ ভেজে, পায়েশ রেঁধে মেরাজকে খাওয়ালো বেশ যত্ন করে। সাথে একটা লম্বা করে সালামও জানালো।
দেখতে দেখতে সন্ধ্যার আগেই মেরাজের জন্য খুব সুন্দর একটা নতুন ঘর উঠলো। আর সে ঘরের মাঝে এলো নতুন চৌকি, নতুন কাঁথা-বালিশ। মেরাজ সেই বিছানায় গিয়ে দরবেশ-ফকিরের মতো আসন গেড়ে বসলো। তারপর বড় বড় চোখ করে সাবার দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললো- এখন আবার ওনারা আসবেন। তাই ধ্যানে বসবো। কেউ আর এখানে থাকতে পারবি না। সারা রাত ওদের সাথে আমার আলাপ আছে। কেউ আবার পালিয়ে উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করিস না। তাহলে পুরো গ্রামে ঝড় উঠবে। সব লন্ডভন্ড হয়ে যাবে। আর যারা চালাকি করে আমাকে দেখার চেষ্টা করবে তাদের দুটো চোখই অন্ধ করে দিবে জিনেরা। তখন কিন্তু কেউ আমাকে দোষ দিতে পারবি না। আমি তো তোদের গ্রামের ছেলে। আমি কাউকে কোন ক্ষতি না করলে কী হবে। ওরা কিন্তু খুব রাগী। আমি কোন বাধাই দিতে পারবো না। যা এখন সবাই যার যার বাড়িতে চলে যা। সবাই নিজের স্বার্থেই আজ রাতে যে যার ঘরে চুপচাপ ঘুমিয়ে থাকবি। হক মাওলা…!
মেরাজের কথা শেষ হতেই গ্রামের লোকজন তাড়াতাড়ি যে যার বাড়িতে চলে যায়। কেউ কেউ দৌড়িয়ে ছুটে যায় নিজের বাড়ির দিকে। একচোখ খোলা রেখে মেরাজ এই দৃশ্য দেখে মুচকি হেসে চুপ করে আসন গেড়ে বসে থাকে।
রাতে বড়ভাই আর ভাবী বেশ যত্ন করে মেরাজকে নিজেদের সাথে ডেকে নিয়ে একসাথে রাতের খাবার খায়। তবে খেতে বসে ইচ্ছে করেই মেরাজ ডানদিকের এবং বামদিকের জানালা দিয়ে দু’টি ভাজা মাছ ছুঁড়ে দেয় বাইরের অন্ধকারে। আর মুখে মুখে বলে, খাও বন্ধুরা! সবাই মিলে ভাগ করে খাও। আর আল্লাহর শুকরিয়া জানিয়ে আমার ভাই এবং ভাবীর জন্য দোয়া করো।
বেশ মজামজা করে খাওয়া শেষ করে মেরাজ ফকির। তারপর তার ভাবীর দিকে কেমন একটু কটমট করে তাকিয়েই চিৎকার দেয়- হক মাওলা…। সখিনা বেগম! আপনার জন্য শুভ সংবাদ আছে। কালকে একা একা বলবো। আজ আল্লাহ হাফিজ। আমার ঘরে যাই, ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।

তিন.

গ্রামের সবার ধারণা মেরাজকে সাংঘাতিক জিনের দলে ভর করেছে। ওর থেকে যতটা দূরে থাকা যায় ততই ভালো। তাই ভুলেও কেউ আর ওদের বাড়ির দিকে আসে না। এদিকে মেরাজের ভাবীও ওকে একটু একটু ভয় পেতে শুরু করেছে। কিন্তু তার প্রতি মেরাজের সুন্দর আচরণে ওর কাছে যেতে তেমন ভয় পায় না। তা ছাড়া সেদিন রাতে খাবার শেষে মেরাজ তাকে যে শুভসংবাদ দেবে বলে আশা দিয়েছিলো, পরের দিন সেই শুভ সংবাদটি দিয়ে সে তার ভাবীকে একেবারেই বশ করে ফেলেছে। মেরাজ যা বলছে, ভাবী তাই শুনে যাচ্ছে বিনা প্রতিবাদে।
কারণ, সেদিন সকালে যখন বড়ভাই চাষাবাদের কাজে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে, ঠিক তখনি মেরাজ মোটাগলায় হক মাওলা বলে চিল্লিয়ে উঠে ভাবীকে তার ঘরে ডেকে নিয়ে গেছে। তারপর একটা বড় পান আর কিছু ধান আনতে বলেছে।
ভাবী মেরাজের কথা মত ধান আর পান নিয়ে মেরাজের ঘরে যেতেই মেরাজ তাকে দিয়ে জায়নামাজ আনিয়ে তাতে আসন গেড়ে বসে। কিছুটা সময় ধরে ধান আর পান নিয়ে বিড়বিড়িয়ে কী সব পাঠ করে। তারপর তাতে ফুঁ দিয়ে শেষে পানের ওপর ধানগুলো ছিটিয়ে দেয়।
এবার কড়ে আঙুলের চাপ দিয়ে একটা একটা করে ধান পান থেকে সরিয়ে জায়নামাজে রাখতে রাখতে ভাবীকে বলে- সখিনা বেগম! এই বাড়িতে আর কোন দিন চোর আসতে পারবে না। তবে সবচেয়ে শুভ সংবাদটা হলো যে, গত শনিবার রাতে তোমাদের ঘরের ভেতর থেকে যে ধান চুরি হয়েছে, তা এখন আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। চোর ছিলো দুইজন। সাথে ছিলো একটা ধামা। এই যে দেখো একটা ধান আমার কড়ে আঙুলকে ঠিক তোমার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
এই বলে কড়ে আঙুল দিয়ে একটা ধান পান থেকে ঠেলতে ঠেলতে সোজা সে তার ভাবীর দিকে দেয়। আর বলে, চোরেরা পুরোপুরি চোর নয়। কারণ তারা একজন মেয়ে লোককে টাকা দিচ্ছে আর সেই মেয়ে মানুষটি বালতিতে করে ধান এনে ওদের ধামা ভরে দিচ্ছে। এই যে, এই দেখো পানের মধ্য শিরাটা পূর্ব দিকের পুকুর পাড়ের রাস্তা বরাবর মুখ করে আছে। চোরেরা ওই পথে এসে আবার ওই পথেই চলে গেলো। আর চোরদের আসল সাথী মেয়ে মানুষটা তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ না করে কেবল চাপিয়ে রাখলো। যাতে সবাই মনে করে, শুধু চোরেরাই ধান চুরির এই পাপের কাজটা করেছে। আসলে মেয়ে মানুষটা খুবই চালাক।
মেরাজের কথা শুনে ভাবী ভাবলো, হয়তো তখন মেরাজ জেগে জেগে ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে সব দেখেছে। কিন্তু পুকুরঘাট তো এ বাড়ির নয়। ওটাতো তালুকদার বাড়ির পুকুরঘাট। তা মেরাজের ঘর থেকে দেখতে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। তাহলে মেরাজ কি ওদের পিছু পিছু গিয়েছিলো? হায়! আল্লাহ!!
মেরাজ ভাবীকে ভাবতে দেখে তার চিন্তার জাল ছিন্নভিন্ন করে দিতে আবার বলতে শুরু করে- ইস্ আমি যদি সেদিন একটু সজাগ থাকতাম অথবা কোন সাড়া শব্দ পেতাম, তাহলে চোরদের হাতে নাতে ধরে এমন পিটুনি দিতাম যে, ওরা বাবার নাম পর্যন্ত ভুলেই যেতো। যাক সে কথা, এই দেখো পানের ওপর সেই মহিলার নামটা ভেসে উঠেছে। নামটার প্রথম বর্ণ দন্তস-স। বলবো নামটা?
ভূত দেখার মতো খানিকটা চমকে ওঠে সখিনা বেগম! সে তোতলাতে তোতলাতে বলে- তুমি জানো মেরাজ মিয়া? সত্যি তুমি বলতে পারবে তার নাম?
মেরাজ ওর ভাবীর দিকে তাকিয়ে হাঁক মেরে বলে- হক মাওলা! শুধু তার নামই জানি না। সে চুরি করে ধান বিক্রির টাকাটা কোথায় রেখেছে তাও জানি। তবে ওই টাকাটা সে এমনিতেই বের করে দিবে, যখন তার নামটা ধামাঅলা চোরদের মুখ দিয়ে বলাবো। আর আমি বলবো বড়ভাইয়ের কানে কানে। বড়ভাই তখন ওই চোর মহিলাকে আচ্ছা করে কচন দিলেই মহিলা হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে যাবে, চোরের সাথে যুক্তি করে ধান বিক্রি করার কী মজা। বুঝতে পারছো তো আমি কার নাম দেখতে পাচ্ছি? নামটা হলো, সখিনা। সখিনা বেগম। সাথে তার বাবার নামও আছে। নামটা হলো গোলাম হোসেন মিয়া। তারা দুই ভাই এবং দুইবোন।…
কি সখিনা বেগম! এখন কেমন মনে হচ্ছে? ভালোয় ভালোয় চুরি করে ধান বিক্রি করা টাকাগুলো এখানে এনে ফেলে দাও তো দেখি। নইলে জিনকে বলেই তোমার লুকানো স্থান থেকে আমিই না হয় টাকাটা আনার ব্যবস্থা করছি।
এবার রীতিমত ঘাবড়ে যায় মেরাজের ভাবী। সে মেরাজের হাত চেপে ধরে বলে- দোহাই লাগে তোমার জিনকে টাকা আনতে বলো না। ওখানে আমার বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া কিছু টাকাও আছে। আর আমার নামটাও তোমার ভাইকে বলো না। আমি স্বীকার করছি সব অন্যায়ের কথা। আমি আর চুরি করবো না। ওই ধামাঅলা চোরেরা আসলে আমার চাচাতো ভাই। ওদের কথাও কাউকে বলো না। এই তোমার সামনে কান মলছি, নাক মলছি। অমন অন্যায় আর করবো না।
মেরাজ এবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলার ভান করে চিৎপটাং হয়ে পড়ে যায় বিছানার ওপর। সাথে সাথে ওর ভাবী ছুটে যায় নিজের ঘরে। আর দ্রুত হাতে আগের জায়গা থেকে অন্য জায়গায় লুকিয়ে ফেলে ধান বিক্রির টাকা। তারপর এক গ্লাস পানি নিয়ে ছুটে এসে দেখে মেরাজের তখনো জ্ঞান ফেরেনি। তাই সে মেরাজের চোখে মুখে পানির ঝাপটা দেয়। মেরাজও জ্ঞান ফেরার ভান করে চোখ মেলে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে, তুমি কি সর্বনাশ করেছো ভাবী। এখন তো তুমি জিনদের হাতেই মরবে। ওরা দু’জন তোমার দু’পাশে রাম দা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা তোমাকে ছাড়া-ভিটায় নিয়ে জবাই করে দেবে। এখন উপায়? আগে তো বলেছি টাকাগুলো আমাকে এনে দাও। কিন্তু তুমি চালাকি করে টাকাগুলো আরেক জায়গায় লুকিয়ে রেখে এসেছো। কাজটা কিন্তু ঠিক করোনি। তাই ওনারা খুব ক্ষেপে আছেন। এখন বাঁচতে হলে অই টাকাগুলো ওনাদেরকেই দিয়ে দিতে হবে।
সখিনা বেগম মনে মনে ভেবে পায় না, অজ্ঞান অবস্থায় মেরাজ জানলো কেমন করে তার চালাকির কথা! নিশ্চয় জিনেরা তার পিছু পিছু ভেতরের ঘরে গিয়েছিলো। ওরাই ওকে সব বলেছে। জিনের হাত থেকে সত্যি তাহলে রেহাই পাওয়া যাবে না!
সখিনা বেগমকে ভাবতে দেখে মেরাজ রহস্য করে বলে- অত ভেবে আর লাভ নেই। জলদি গিয়ে টাকাগুলো এনে দাও। দেখি ওদের হাতে পায়ে ধরে তোমাকে এবারের মত বাঁচাতে পারি কি না। তুমি যে আমার বড়বোনের মত। আর বড়বোন মায়ের তুল্য। তোমাকে ওরা মেরে ফেললে আমি ভাবী বলে আর ডাকবো কাকে? যাও তো ভাবী জলদি করো।
সখিনা বেগম বুঝতে পারলো। এবার আর রক্ষা নেই। তাই সে দ্রুত ঘর থেকে টাকাগুলো নিয়ে এসে বললো- আমি আর চালাকি করবো না। আর কখনো মিথ্যা কথাও বলবো না। তুমি তোমার জিনদের বলো, ওরা যেন আমাকে দয়া করে জবাই না করে। আমি বাঁচতে চাই। আমি বাঁচতে চাই মেরাজ। আর এসব কথা তুমি কোনদিন তোমার বড়ভাইকেও বলবে না। তুমি আমাকে দয়া করো ভাই…।
মেরাজ বুঝতে পারে এবার ভাবী আচ্ছা মত জব্দ হয়েছে। তাই সে ভাবীর এনে দেয়া টাকাগুলো মুঠোর মাঝে ধরে পাগলের মত ছুটে যায় ছাড়া-ভিটার দিকে। যেন জিনদেরকেই টাকাটা পৌঁছে দিতে যাচ্ছে। তবে মেরাজ ফকির সেখানে পৌঁছে টাকাগুলো একটা বড় গাছের কোটরে লুকিয়ে রাখে। তারপর একদৌড়ে বাড়িতে ছুটে এসে অজ্ঞান হওয়ার ভান করে লুটিয়ে পড়ে উঠানের ওপর। আর মনে মনে ভাবতে থাকে, ভাবীকে উচিত ওষুধে ধরেছে। বেচারি বুঝতেই পারেনি যে, এসবই আমার চালাকি। ভাবীও যেমন বুনো ওল, তেমনি আমিও বাঘা তেঁতুল। এখন থেকে এভাবে বুদ্ধি খাটিয়েই আমাকে চলতে হবে।
মেরাজ যে ভান করে উঠানে পড়ে আছে তা বুঝতে না পেরে ওর ভাবী আবারো পানির ঝাপটা মেরে ওকে সুস্থ করে তোলে। তারপর ওর মন জুগিয়ে চলতে মজার মজার রান্না করে খেতে দেয়। মেরাজও সুযোগ পেয়ে মজা করে খেয়ে নেয় সব মজার মজার খাবার। এভাবেই মিরাজের দিনগুলো বেশ কাটছিলো।
ওদিকে ওর ভাবী মেরাজকে সত্যি সত্যি মহা দরবেশ-ফকির মনে করে গোপনে তার চাচাতো ভাইদের কাছে খবর পাঠিয়েছে আর কখনো চুরি না করার জন্য। তাহলে মেরাজ সব জিনের মাধ্যমে জেনে ফেলবে আর লোকজনকে সব বলে দেবে। তখন লোকেরা পিটিয়ে সবার বাপের নাম তো ভুলিয়েই ছাড়বে, আবার জমিদার বাড়িতে খবর পাঠিয়ে কোতয়ালের হাতেও তুলে দেবে। তখন আর উপায় থাকবে না। হয় তো সারা জীবন জেল খাটতে হবে অথবা গর্দান যাবে। কারণ সে নিজের চোখে দেখছে যে, মেরাজ পানের পিঠে ধান ছিঁটিয়ে সব কিছু বলে দিতে পারে।

চার.

এদিকে হয়েছে কী! মেরাজের গ্রামের লোকেরা মেরাজকে জিনে ভর করেছে বলে ভয়ে ভয়ে ওদের বাড়িতে কেউ আসে না। কিন্তু মেরাজের ভাবী এবং তার চাচাতো ভাইদের প্রচারের ফলে আশপাশের গ্রামের লোকেরাও মেরাজকে সত্যি সত্যি ফকির বাবা বলে মানতে শুরু করেছে। চোর ডাকাতেরাও সাবধান হয়ে গেছে। সবার ধারণা জন্মেছে, চুরি-ডাকাতি করলে পানের পিঠে ধান ছিঁটিয়ে মেরাজ ফকির চোর-ডাকাতের নাম-ঠিকানা সব বলে দেবে। তখন আর উপায় থাকবে না। চুরি-ডাকাতির মাল তো ফিরিয়ে দিতেই হবে, আবার জমিদারের কোতয়ালের হাতে জানটাও চলে যাবে। তাই জমিদারের চৌদ্দ গ্রামের মাঝে চুরি ডাকাতি একেবারেই বন্ধ। দু’চার ঘর চোর-ডাকাত যাও আছে, তারা অন্য জমিদারের এলাকায় ঢুকে চুরি-ডাকাতি করে খায়। তবে মেরাজদের আশপাশের গ্রামের লোকেরা প্রায়ই নানান রকম নজরানা নিয়ে মেরাজের কাছে আসে তাদের সমস্যার কথা বলার জন্য।
কিন্তু মেরাজ তো আসলে কোন ফকিরও নয়, আর কোন জিনও মেরাজের বন্ধু নেই। ওতো কেবল তার ভাবীকে শায়েস্তা করার জন্যই ভান ধরে আছে। তাই লোকজনের কাছ থেকে সহজে কোন নজরানা নিতে চায় না। আর জোর করে তারা কেউ কিছু দিলেও মেরাজ তাদের সমস্যার কথা শুনে সবাইকে এ কথা বুঝিয়ে বিদায় করার চেষ্টা করে যে, আমি আসলে চুরি-ডাকাতির বিষয় ছাড়া মাথা ঘামাই না।
তাছাড়া সব ব্যাপারে মাথা ঘামাতে জিনদের নিষেধ আছে। তোমাদের টুক-টাক সমস্যা নিয়ে অন্যসব ফকিরদের কাছে যাও। তারাই তোমাদের সব সমস্যার সমাধান দিয়ে দিবেন।
মেরাজের এই পরামর্শের কারণে অন্যান্য গ্রামের বুড়ো ফকিররা বেশ খুশি। তারা তাই মেরাজের কেরামতির যাচাই-বাছাই করতে আসে না। মেরাজও সেই সুযোগে রাখালগিরি ছেড়ে তার বড়ভাইয়ের সাথে কৃষি কাজ করে এবং খেয়ে দেয়ে ঘুরে বেড়ায়। লেখাপড়া বেশি না করলেও কৃষি কাজ সে ভালোই বোঝে।
একদিন পাট ক্ষেতে আগাছা ছেঁটে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎই দেখতে পেলো আবছা অন্ধকারে কয়েকজন মানুষ। তারা একটা গরুকে টানতে টানতে মেরাজ যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছে সেদিকেই ধেয়ে আসছে। দৃশ্যটা দেখে মেরাজের কেমন সন্দেহ হয়। ও তাড়াতাড়ি একটা গাছের ওপর উঠে ডালের পাতার আড়ালে লুকিয়ে চুপ করে বসে থাকে। দেখতে দেখতে লোকগুলো গরুটাকে সেই গাছতলা দিয়ে নিয়ে যাবার সময় বলতে থাকে- এবার বুঝবে মজা কালাই বেপারী। আজ রাতেই গরুটা জবাই দিয়ে সাবাড় করে ফেলতে হবে। বেটা আলেপ মিয়ার ছাগল ধরে খোঁয়াড়ে দিয়েছে। আর আমরা বেপারীর গরু খেয়ে তার শোধ নেবো। হাঃ হাঃ হাঃ….।
লোকদের মাঝে একজন বললো- শোন তালেব আলী। গরুর মাথার খুলি আর শিং নিয়ে তুই ফেলে দিয়ে আসবি ধোপার বাগে। সানু এবং ধনু যাবি চামড়া নিয়ে। হারান ঋষির কাছে সেটা বিক্রি করে দিবি। তারপর আমরা গরুর গোশত ভাগ করে পাঠিয়ে দেবো যার যার শ্বশুর বাড়িতে। যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে, আমরা গরু জবাই করেছি। এমনকি আমাদের বাড়ির লোকেরাও জানবে না।
মাঝখান থেকে আলেপ মিয়ার কাছ থেকে নেয়া পাঁচশ টাকা আমরা পাঁচজন ভাগ করে নেবো। আবার গরুর চামড়া বিক্রির টাকারও ভাগ পাবো। তবে চামড়া বিক্রির টাকার অর্ধেক কিন্তু আলেপ মিয়ার। তার টাকাটা পৌঁছে দিবি হাসু। কি পারবি না?
হাসু জবাব দেয়- পারবো না মানে। তুই যে কি বলিস না মদন। এটা কোন কঠিন কাজ হলো? আমি হলাম গিয়ে করিতকর্মা! কাজে কোন ফাঁকি নেই।
আরেকজন বলে- বেশি কথা না বলে তাড়াতাড়ি চল ইলু কসাইয়ের বাড়িতে যাই। ওদের বাড়িটা আজ একদমই খালি। ওর বউ বেটি সব বেড়াতে গেছে ওর শ্বশুর বাড়িতে। ফিরবে আগামীকাল বিকেলে। এটাই তো আমাদের জন্য মহাসুযোগ।
এমনি আরো কথা বলতে বলতে পাঁচজন মিলে গরু নিয়ে চলে যায় ইলু মিয়ার বাড়ির দিকে। মেরাজও গাছ থেকে নেমে চলে আসে বাড়িতে। কিন্তু বড়ভাই বা ভাবীকে এর কোন কথাই বলে না। হাত পা ধুয়ে খেয়ে দেয়ে নিজের ঘরে চলে আসে। আর শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকে- মানুষ কতো হিংসুটে। একজন আরেকজনের ছাগলকে খোঁয়াড়ে দিয়েছে বলে, সে লোকদের টাকা দিয়ে হাত করে গরু মেরে প্রতিশোধ নিচ্ছে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ, কী নিকৃষ্ট পাপের কাজরে বাবা!
মেরাজ মনে মনে বলে- ওরা কি মানুষ? না, না। এ অন্যায় মেনে নেয়া যায় না। কিন্তু ওরা কোন গ্রামের লোক তাতো আমার জানা নেই। চেনা জানা না থাকলে এসব কথা কাউকে বলেও পাত্তা পাওয়া যাবে না। এককথায় সবাই বলবে, তুমি চিল্লিয়ে লোক ডাকোনি কেন? বাধা দাওনি কেন?
কেউ আবার টিপ্পনী কেটে বলবে- তুমি না ফকিরবাবা! তাহলে তোমার জিনদের ডেকে ওদের আচ্ছা করে পিটুনি দিলে না কেন? তোমার এতো কেরামতি! তাহলে পানের পিঠে ধান ছিঁটিয়ে বলে দাও ওরা কোন গ্রামের লোক। যাক বাবা অতো সব ভেবে লাভ নেই। আবার কাউকে বলতে গিয়ে শেষে ভাবীর কাছে নিজের মান-সম্মান ডুবিয়েও ফায়দা নেই। তার চেয়ে বোবা সেজে চুপচাপ থেকে যাই। আমার তো জানাই আছে যে, বোবার কোনো শত্রু নেই।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে এক সময় টুপ করে ঘুমিয়ে যায় মেরাজ। পরদিন ঘুম থেকে উঠে বড়ভাইয়ের সাথে জমি-জিরাত করতে চলে যায়। কাজ-কর্মে মন লাগায়। তবে ভাবীকে সে বশে রাখতে বাড়িতে এসেই হাঁক মারে- হক মাওলা…। আবার গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলেও সারা বাড়ি কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠে-হক মাওলা…।
এভাবেই মেরাজ ফকিরের দিনগুলো বেশ কাটছিলো। হঠাৎ পাঁচ দিনের দিন জমিদারের কোতয়ালের লোক এসে বললো- ফকির মেরাজ মিয়া। তুমি নাকি বেশ বড় ফকিরবাবা হয়ে গেছো? তাই তোমাকে আমাদের কোতয়াল সাহেব স্মরণ করেছেন। একটা মামলার ফয়সালা করা যাচ্ছে না প্রমাণের অভাবে। কোন রকম বিচারও করা যাচ্ছে না। গুপ্তচরেরাও কোন সংবাদ সংগ্রহ করতে পারছে না। এখন তোমাকে পানের পিঠে ধান ছড়িয়ে বলতে হবে আসল দোষী কে? যদি তোমার ফকিরি কেরামতি দিয়ে সমস্যার সমাধান দিতে না পারো তাহলে তোমারই গর্দান যাবে। এটাই কোতয়ালের আদেশ।
কোতয়ালের পাইক পেয়াদাদের কথা শুনে বুদ্ধিমান মেরাজ মনে মনে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেও ওদেরকে কিছুই বুঝতে দেয় না। তাই সে হাসি মুখে বলে- এ আর এমন কী কঠিন কাজ। তোমরা যাও। আমি একটু ধ্যান-সাধনা করে কিছুক্ষণ পরে আসছি। তবে তোমরা যাওয়ার পথে কেউ পিছনের দিকে তাকাবে না। তাহলে আর উপায় নেই। সবারই চোখ অন্ধ হয়ে যাবে। হক মাওলা!…
মেরাজ বড় বড় চোখ করে কথাগুলো এমন ভাবে বলে আর ‘হক মাওলা’ বলতে গিয়ে এমন জোরে চিৎকার করে যে, পাইক পেয়াদাদের পিলে চমকে ওঠে। তাই ওরা আর অপেক্ষা না করে জলদি জলদি কেটে পড়ে। অমনি মেরাজ পড়ে যায় মহা ভাবনায়। ও মনে মনে ভাবে, ভাবীকে কৌশলে কুপোকাত করতে আমি ফকির হবার ভান ধরেছি মাত্র। আসলে আমি তো ফকির সাধক নই। আমি তো পানের পিঠে ধান ছিঁটিয়ে আসলেই কিছু বলতে পারি না। ওসব তো আমার অভিনয় মাত্র। এখন কী উপায় হবে! হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে সাহায্য করো। তা না হলে এবার কোতয়ালের হাতে গর্দান যাবে। এখন একমাত্র তুমিই আমার জীবন রক্ষা করতে পারো। ইয়া রাহমানুর রাহিম! ‘আল্লাহুম্মা খাইরুন হাফিজা হুয়া আরহামার রাহিমিন’।
মেরাজ আর ভাবতে পারে না। ওর সব রাগ পড়ে গিয়ে ভাবীর ওপর। অই ভাবীর জন্যই তো তাকে ভুয়া ফকির সাজতে হয়েছে। তবে দেখা যাক এখন কী হয়। এ চিন্তা মাথায় নিয়ে মেরাজ বড়ভাই ও ভাবীকে সালাম করে অত্যন্ত করুণ মুখে তাদের কাছ থেকে বিদায় নেয়। তারপর কাঁপা কাঁপা বুকে নিঃশ্বাস টানতে টানতে ছুটে চলে জমিদার বাড়ির দিকে। কোতয়ালের দরবারে পৌঁছে জোরেশোরে হাঁক মারে- হক মাওলা! বলুন কোতয়াল সাহেব আমাকে কেন ডেকেছেন? যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন, আমার সময় কম। আমাকে আবার সাধনায় বসতে হবে।
মেরাজের কথা শুনে কোতয়ালের মেজাজ খারাপ হলেও সে শান্তভাবে বলে- তুমি নাকি ফকিরি হাসিল করেছো। একেবারে দরবেশ হয়ে গেছো! এবার দেখবো তুমি কত বড় ফকির। যদি আমাদের সমস্যার সহজ সমাধান দিতে পারো তাহলে তোমাকে জমিদারের গুণীজন সভার সদস্য বানানো হবে। আর যদি তুমি ভন্ড ফকির বলে প্রমাণিত হও, মানে আমাদের সমস্যার সমাধান করতে না পারো, তাহলে তোমার গর্দান কেটে চৌরাস্তার মাথায় ঝুলিয়ে রাখা হবে।
কোতয়ালের মুখে গর্দান কেটে নেয়ার কথা শুনে মেরাজ ভেতরে ভেতরে ভয়ে কেঁপে উঠলেও কোতয়ালের দরবার কাঁপিয়ে ‘হক মাওলা’ বলে চিৎকার করে ওঠে। তারপর দু’চোখ বন্ধ করে বলে, ওসব গর্দান-ফর্দানের কথা বাদ দিন মেহেরবান। আমাকে কী করতে হবে তাই মেহেরবানি করে আগে বলে ফেলুন।
এবারও মেরাজের কথায় কোতয়ালের মেজাজ খারাপ হয়ে যেতে চায়। কিন্তু তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন- হ্যাঁ, ঠিক আছে এবার দেখবো তোমার বাহাদুরি।
শোন তবে সমস্যার কথা। প্রায় এক সপ্তাহ আগের ঘটনা। হাউসদী গ্রামের আলেপ মিয়ার ছাগল কালাই বেপারীর ধান ক্ষেত নষ্ট করেছিলো। তাই কালাই বেপারী আলেপ মিয়ার ছাগল ধরে খোঁয়াড়ে পাঠায়। আমরা আলেপ মিয়ার পাঁচশ টাকা জরিমানা আদায় করে তার ছাগলটা ছেড়ে দেই। পরের দিনই কালাই বেপারীর গরু হারিয়ে যায়। অনেক খুঁজেও গরুটা পাওয়া যায়নি। তাই কালাই মিয়া বিচার দিয়েছে যে, নিশ্চয় আলেপ মিয়া গরুটা চুরি করে দূরের কোন গ্রামে অথবা অন্য কোন জমিদারের পরগনায় বিক্রি করে দিয়েছে। কিন্তু সে কোন প্রমাণ দিতে পারেনি। আবার এ ব্যাপারে আমাদের গোয়েন্দারা অনেক খোঁজ-খবর নিয়েও কোন গোপন খবর উদ্ধার করতে পারেনি। তাই ইনসাফ মত এ মামলার রায় দেয়া যাচ্ছে না। এবার তোমাকে বের করতে হবে আসল খবর। যদি বলতে পারো তাহলে পুরস্কার তো পাবেই, সাথে সাথে তোমাকে মান্যবর জমিদার বাহাদুরের দরবারে গুণীজনের মর্যাদা দেয়া হবে। তুমি হবে জমিদারের রত্ন সভার সদস্য। আর যদি সমাধান দিতে না পারো, তাহলে তো আগেই বলেছি, তোমার ঘাড় থেকে গর্দান কেটে নেয়া হবে।
এতক্ষণ মেরাজ আসল সমস্যার কথাটা জানতে পেরে মনে মনে আল্লাহকে শুকরিয়া জানায়। তারপর দীর্ঘ সময় দু’চোখ বন্ধ রেখে হঠাৎ বলে ওঠে- এ আর এমন কী কঠিন কাজ। তবে আমাকে সাড়ে তেত্রিশ ঘণ্টা সময় দিতে হবে। আর সে সাথে দিতে হবে একটা বড় রুইমাছ, সাতটা পান, একমুঠো ধান, একটা নতুন হারিকেন এবং এক হেরিকন কেরোসিন তেল। পাশাপাশি আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় যাতে কোনো লোক আগামী সাড়ে তেত্রিশ ঘণ্টায় প্রবেশ না করতে পারে তার ব্যবস্থা নিতে হবে। তবেই আমি এ সমস্যার সমাধান দিতে রাজি আছি। যদি হুজুর আমার এই শর্তে রাজি থাকেন তাহলে বলুন। আমি কাজটা শুরু করি।
কোতয়াল বললেন- তোমার সব আবেদন মঞ্জুর করা হলো। তবে তুমি এই দরবারে প্রকাশ্য বিচার সভায় বসে সমস্যার সমাধান দিতে বাধ্য থাকবে।
মেরাজ এবার পুরো দরবার কাঁপিয়ে ‘হক মাওলা’ উচ্চারণ করে বললো- অবশ্যই সব তথ্য এই দরবারে প্রকাশ করবো। সাড়ে তেত্রিশ ঘণ্টা পর পালকি দিয়ে আমাকে এখানে আনতে হবে এবং এখানে একটা সবুজ কার্পেট বিছিয়ে আমার জন্য ধ্যান সাধনায় আসনে বসার ব্যবস্থা করতে হবে। আর সেই আসন বসানোর আগেই এই দরবারে সাতটি মোমবাতি জ্বালিয়ে আগর বাতি ও গোলাপ জলের ঘ্রাণ ছড়াতে হবে। তা না হলে দরবারে উপস্থিত কাউকে যদি ওনারা আছাড় মেরে ভবলীলা সাঙ্গ করে দেয়, তখন আমাকে দায়ী করা চলবে না।
মেরাজের কথায় কোতয়াল একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেও অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন- ওনারা! ওনারা আবার কারা? তুমি কাদের কথা বলছো?
মেরাজ বড় বড় চোখ করে ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে সবাইকে সাবধান করে দিয়ে চাপা কণ্ঠে বললো- ওনাদের নাম মুখে আনা নিষেধ, ভুল করে বলে ফেললেও বিপদ। আর যারা শুনতে পাবে তারা চিরদিনের জন্য ধ্যান্দা হয়ে যাবে। জীবনে আর কোন দিনও কোন শব্দ শুনতে পাবে না।
মেরাজের কথা শুনে কোতয়াল রীতিমত ভয় পেয়ে গিয়ে বলে- থাক থাক ওনাদের নাম শুনে আমাদের কোনো কাজ নেই। তার চেয়ে তোমার যা যা প্রয়োজন আমরা সে সব কিছুর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। এক্ষনি সবকিছু পেয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ! তুমি মনে রেখো, যদি তুমি সত্য কথা বলতে না পারো তাহলে কিন্তু তোমার গর্দান থাকবে না। খুব ভেবেচিন্তে সাধনায় বসবে। আগেই সাবধান করে দিচ্ছি, পরে কোন আপত্তি কিন্তু শোনা হবে না। যতোই আবেদন নিবেদন করো না কেন, তোমাকে মোটেও ছেড়ে দেয়া হবে না। এটা কেবল আমার কথাই নয়, খোদ জমিদার বাহাদুর এই আদেশখানা দিয়ে রেখেছেন। তাই সাবধান!
মেরাজ কোতয়ালের পিলে চমকে দিয়ে চিৎকার করে বললো- হক মাওলা…। আগে তো আমার সাধনার আসনের ব্যবস্থা করুন। তারপর গর্দান যাবার কথা ভাববো।
কোতয়াল বললেন- নিঃসন্দেহে তাই হবে।
অমনি কোতয়ালের লোকেরা হাসিমুখে একটা নতুন হারিকেন, এক হেরিকন কেরোসিন তেল, সাতটা পান, এক মুঠো ধান এবং একটা বড় রুইমাছ এনে দিয়ে খুবই সম্মানের সাথে সালাম জানিয়ে মেরাজ ফকিরকে বিদায় করলো।

পাঁচ.

মেরাজ বাড়িতে পৌঁছে সব কিছু নিজের ঘরে রাখলেও রুইমাছটা তুলে দিলো তার ভাবীর হাতে। ভাবী তো মহাখুশি। তাই সে মাছটা কেটে, রেঁধে, ভেজে বেশ মজা করে তার স্বামী এবং দেবর মেরাজকে নিয়ে খাওয়া-দাওয়া করলো। অনেক দিন পর এতোবড় রুইমাছ খেতে পেয়ে মেরাজের বড়ভাইও খুব খুশি। সে গর্ব করে তার বউকে বললো- দেখছো এবার? আমার ভাই না হলে এমন স্বাদের রুইমাছ কখনো খেতে পারতে? অথচ তুমি তো সব সময় ওর পেছনে লেগেই থাকতে।
স্বামীর কথায় মেরাজের ভাবী লজ্জা পেয়ে বলে- আসলে আমি সব সময় ভুল করে এসেছি। মেরাজ আমাকে সত্যি ভালোবাসে। সে যে আমার ছোট ভাইয়ের মতো।
সুযোগ পেয়ে মেরাজও মনের কথাটি বলে দেয়। ও বলে উঠে-আমি ভাবী সাহেবাকে মায়ের মতো ভালোবাসি বলেই তার সম্মানের দিকে তাকিয়ে তার অনেক অন্যায়-অপরাধের কথা আমি কাউকে বলি না। এই যেমন…।
এ পর্যন্ত বলেই মেরাজ থেমে যায়। কিন্তু ততক্ষণে তার ভাবীর বুক ধুকপুক করতে শুরু করেছে। এই বুঝি মেরাজ ধান, পাট চুরি করে বিক্রয়ের কথাটি বলে দিলো।
মেরাজের ভাই বেশ উৎসাহ নিয়ে জানতে চায়- তোর ভাবী এমন কী কী অন্যায় করেছে? যা আমি জানি না! সোজাসুজি বলে ফেল তো ভাই।
বড়ভাইয়ের কথাটা শুনে ভাবী ভয়ে আতঙ্কে বড় বড় চোখ করে অসহায়ের মতো মেরাজের দিকে দৃষ্টি মেলে দেয়। মেরাজ তাই ভাবীকে বাঁচাতে কথার মোড় পাল্টিয়ে বলে- হক মাওলা! ওসব কথা এখন থাক। আমাকে কোতয়াল ডেকেছে। তার সমস্যার সমাধান করতে এখন এলেম-কালাম সাধন করতে হবে। এখন বেশি কথা বললে ওনারা রাগ করবেন। আমি আমার ঘরে যাই। কোতয়ালের দেয়া পানগুলি শুকিয়ে যাচ্ছে। শেষে আবার তাজা পান জোগাড় করতে বাজারে গিয়ে সময় নষ্ট হবে। ওদিকে আবার মাত্র সাড়ে তেত্রিশ ঘন্টা সময় নিয়েছি কোতয়ালের কাছ থেকে।
কথাগুলো শেষ করে মেরাজ উঠে চলে যায় নিজের ঘরে। একটু বিশ্রাম নিয়ে জায়নামাজে পান সাজিয়ে তার ওপর ধান ছড়িয়ে ধ্যানের ভান করে বসে থাকে। একটু পরেই ওর ভাবী এসে, চুপ করে মাথায় কাপড় টেনে, ওর সামনে বসে পড়ে। তারপর ভয়ে ভয়ে বলে- ভাই মেরাজ, তুমি আজ দয়া করে আমাকে রক্ষা করতে আমার প্রতি যে দরদ দেখিয়েছো সেজন্য আমি খুবই আনন্দিত এবং কৃতজ্ঞ। তুমি আমার প্রতি আরো দরদ দেখাবে ভাই। কখনোই তোমার ভাইয়ের কাছে বা অন্য কারো কাছে আমার অপরাধের কথা বলবে না। আমিও তোমার সাথে অতীতের মতো আর খারাপ আচরণ করবো না। অতীতে আমি তোমাকে বুঝতে না পেরে তোমার সাথে যে সব অন্যায় আচরণ করেছি, সেজন্য সত্যিই আমি অনুতপ্ত। আসলে তুমি যে আমাকে তোমার মায়ের মত সম্মান করো, সে আমি বুঝতেই পারিনি। এই তোমাকে কথা দিলাম, এখন থেকে তোমাকে কেবল ছোট ভাই-ই নয় আমার সন্তানের মতোই স্নেহ করবো। আমাকে এ পর্যন্ত আল্লাহ কোন সন্তান দেননি। এখন থেকে ভাববো তুমিই আমার একমাত্র সন্তান। তুমি একটু ধ্যান ভেঙে দেখো আমি আজ সত্যিই লজ্জিত, সত্যিই অনুতপ্ত। অতীতে যা করেছি সবই আমার ভুল হয়েছে। ওই রকমের ভুল আর আমি করতে চাই না…।
মেরাজ জানতো যে, ভাবী আজ এ ঘরে আসবেই আসবে। তাই ধ্যানের ভান করে ও ভাবীর সব কথা দু’চোখ বন্ধ করে শুনে যাচ্ছিলো। এবার ‘হক মাওলা’ বলে চোখ খুলে গম্ভীর কণ্ঠে বলে- হুম্! বুঝতে পেরেছি সখিনা বেগম। তুমি এখন মায়াকান্নার ছলনা দিয়ে মেরাজকে ভোলাতে এসেছো। আবার সুযোগ পেলেই ওর নামে তোমার স্বামীর কাছে এক বস্তা বদনাম বলে মেরাজকে বকুনি শুনাবে। আর নিজে অপকর্ম করে তার দোষ সব মেরাজের ঘাড়ে চাপিয়ে ওর বড়ভাইয়ের হাতে ওকে মার খাওয়াবে। না, না ও সব চালাকি তোমার আর চলবে না। এখন থেকে আমরা আছি মেরাজের সাথে। ফের যদি ওর কোন বদনাম বলবে অথবা ওর সাথে কোন রকম হিংসা করবে, তাহলে আমরা তোমায় আস্ত রাখবো না। মাথায় তুলে এক আছাড়ে হাড় হাড্ডি সব গুঁড়ো করে দেবো। আর না হলে উড়িয়ে নিয়ে বিলের মাঝে একহাঁটু পরিমাণ কাদায় পুঁতে রাখবো। আর তোমার অন্যায় দেখে মেরাজও যদি প্রতিবাদ না করে তাহলে ওর ঘাড়টাকে মটকে দিয়ে আমরা চলে যাবো। তখন বুঝবে মজা। তোমাকে সম্মান করে ভাবী বলার আর কেউ থাকবে না।
মেরাজের মুখে এসব কথা শুনে ভাবী ভাবতে থাকে, এসব কথা নিশ্চয়ই জিনেরা মেরাজের মুখ দিয়ে বলাচ্ছে। তাই সখিনা বেগম আরো ঘাবড়ে যায়। এবার সে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে- না, না, আমি আর কোন অন্যায় কাজ করবো না। তাছাড়া মেরাজেরও কোন অনিষ্ট হোক সেটা আমি আর চাই না। মেরাজ যে আমার সন্তানের মত আদরের ধন। ওকে আপনারা মারবেন না।
এবার মেরাজ ‘হক মাওলা’ বলে উঠে দাঁড়ায়। তারপর বলে- এসব কথা মনে থাকে যেন সখিনা বেগম। আমরা কিন্তু অদৃশ্যে থেকে সবই দেখবো। তোমার কথার কোন নড়চড় হলে আর কিন্তু রক্ষা নেই…।
কথাগুলো বলতে না বলতেই জ্ঞান হারিয়ে ফিট পড়ার ভান করে মেরাজ দরাম করে মাটিতে পড়ে যায়। সখিনা বেগম তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে এক গ্লাস পানি এনে মেরাজের মুখে পানির ঝাপটা মারতে থাকে। একটু পর মেরাজ জ্ঞান ফেরার অভিনয় করে আস্তে আস্তে উঠে বসে চোখ কচলাতে কচলাতে বলে- কী ব্যাপার ভাবী সাহেবা! তুমি আমাকে পানি ছিঁটিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছো কেন?
সখিনা বেগম স্নেহমাখা কণ্ঠে বলে- সে অনেক কথা। তুমি হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলে। তাই পানির ঝাপটা দিচ্ছিলাম। এখন তোমার কেমন লাগছে?
মেরাজ মুচকি হেসে বলে- আসলে তুমি আমার খুব ভালো ভাবী। আমার জন্য তোমার মনে অনেক মায়া। আমি কক্ষনো তোমার সম্মান খাটো হতে দেবো না। কাউকে তোমার কোন অন্যায়ের কথা বলবো না। তুমি যে আমার মায়ের মত।
মেরাজের কথায় সখিনা বেগমের অন্তর গলে যায়। সে খুশি হয়ে বলে- ক’দিন পরে তোমার জন্য একটা লাল টুকটুকে বউ এনে দেবো। বউটাকে আমি পুত্রবধূর মত আদর করবো। আমরা সবাই মিলে মিশে সুখের সংসার সাজাবো। তুমি দেখে নিও, আমাদের মিলমিশ দেখে গ্রামের লোকেরা পর্যন্ত হিংসা করবে।
মেরাজ এবার লজ্জিত হওয়ার ভান করে বলে- থাক থাক এতো সকালে আমার জন্য বউ আনতে হবে না। আমি ভাবছি আমার বয়স অন্তত পঁচিশ বছর না হলে বিয়েই করবো না। তুমি তো জানো ভাবী, আমাদের প্রিয় নবীজি (সা) পঁচিশ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন। তাই আমিও তাঁর উম্মত হিসেবে আগে বউ আনবো না।
মেরাজের কথায় ভাবী খুশি হয়ে বলে- বেশ তো ভালো কথা। আমিও তাই মেনে নিলাম। তবে পঁচিশ বছর পুরো হলে কিন্তু একটা লাল টুকটুকে বউ আনবোই।
মেরাজ দু’হাত জোড় করে বলে- এবার তাহলে আমাকে একটু কোতয়ালের মামলাটার কথা ভাবতে দাও। আর তুমি গিয়ে বিশ্রাম নাও। ইস্ সারাটা দিন রান্না বাড়া নিয়ে কতো খাটুনি খেটেছো। যাও, যাও, ঘরে যাও। বিশ্রাম নাও গিয়ে।
মেরাজের কথাগুলো এবার যেন মধুর মতো মনে হলো সখিনা বেগমের কাছে। সে খুশিতে আটখানা হয়ে প্রায় নাচতে নাচতে ঘরের দিকে চললো। আর যাবার সময় বেশ দরদমাখা কণ্ঠে বলে গেলো, আল্লাহ তোমায় অনেক অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখুন। তুমি যে আমাদের নয়নের আলো।
মেরাজ মনে মনে বললো- ওষুধে বেশ কাজ হয়েছে তাহলে।

ছয়.

জমিদারের কোতয়ালের কাচারি প্রাঙ্গণ লোকে লোকারণ্য। কেন না, মেরাজ ফকির আজ পানের ওপর ধান ছড়িয়ে বলে দেবে যে, কালাই বেপারীর গরু চুরির রহস্যটা কী? বিভিন্ন গ্রামের লোকের সাথে কাচারিতে এসেছে কালাই বেপারী, তার শত্রু আলেপ মিয়া আর তার শিষ্য সাগরেদরা। কাচারি ঘরে আতর-গোলাপ ছিটিয়ে, আগরবাতি জ্বালিয়ে সুগন্ধিতে ভরে তোলা হয়েছে। আর মেরাজ ফকিরের ধ্যানে বসার জন্য সবুজ মখমলের কার্পেট বিছিয়ে তার ওপরে বিছানো হয়েছে একটা খুব সুন্দর জায়নামাজ। তার সিজদার স্থানে সাজানো হয়েছে রুপার তৈরি বড় আকারের পানদানি। পানদানিতে রাখা হয়েছে একটা পান এবং এক মুঠো ধান।
একটু পরেই চার বেহারার পালকি দিয়ে মেরাজ ফকিরকে নিয়ে আসা হলো। মেরাজকে দেখেই সবার মাঝে গুঞ্জন উঠলো- ‘আজকে দেখা যাবে মেরাজ ফকিরের কেরামতি’।
কেউ একজন বললো- ‘রহস্যের সমাধান করতে না পারলে আবার জানটাও যে যাবে। তখন চিরকালের মতো ছুটে যাবে তার কেরামতি’।
এ কথা কানে যেতেই মেরাজ সবার কান ঝালাপালা করে প্রচন্ড জোরে ‘হক মাওলা’ বলে চিৎকার দিয়ে, প্রায় লাফ মেরে পালকি থেকে নেমে এলো নামাজের বিছানায়। তারপর কটমটে দৃষ্টি মেলে একবার চারদিকটা দেখে নিয়ে চোখ বন্ধ করলো। আর চোখ বন্ধ রেখেই ধীরে ধীরে আসন গেড়ে বসে পড়লো।
ততক্ষণে সবার গুঞ্জন থেমে গেছে। কেউ কেউ রীতিমত ভয়ও পেয়ে গেছে। দেখে শুনে মনে হচ্ছে, এখানে একটি মানুষও নেই। কিছুক্ষণ চুপচাপ ধ্যানের ভান করে থেকে হঠাৎ ডান চোখটা খুলে কোতয়াল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললো- হবে, আজই সমস্যার সমাধান হবে, মেহেরবান! আপনি দয়া করে এখানে উপস্থিত সব মানুষকে সৈন্য সামন্ত দিয়ে ঘেরাও করে ফেলুন। যেন একটি লোকও পালাতে না পারে। এখানেই আছে কালাই বেপারীর গরুচোর এবং তার সঙ্গী সাথীরা।
মেরাজের কথায় সাথে সাথে কোতয়ালের হাতের ইশারায় খোলা তলোয়ার ও বল্লম হাতে সিপাইরা ঘিরে ফেললো পুরো এলাকা। তারপরই শুরু হলো মেরাজের কেরামতির খেলা। সে মনে মনে কী সব পাঠ করে গুনে গুনে সাতটা ধান পানের ওপর ছড়িয়ে দিলো। তারপর হঠাৎ একটা ধান টোকা মেরে পানের বাইরে ফেলে দিয়ে বলতে শুরু করলো- হক মাওলা… হক! হক মাওলা… হক!! বলরে মেরাজ বল। যাইতে হবে ধোপার বাগ, পাইবে খুঁজে কালাই বেপারীর গরুর মাথার খুলি। সঙ্গে পাবে শিং। তবে একটু দূরে। ফেলেছে তা তালেব আলী। ঝাঁকড়া মাথার চুল। নাকটা যে তার থ্যাদা বোঁচা একটুও নেই ভুল। গরু ছিলো গোয়ালে। সানু, ধনু, তালেব মিলে নিয়ে গেলো দড়ি ধরে ইলু কসাইয়ের বাড়িতে। ছিলো বাড়ি ফাঁকা।
করলো ইলু গরু জবাই। সবাই মিলে গোশত করে ভাগ। পাঠিয়ে দিলো যার যার শ্বশুর বাড়ি গোশত ভরে ব্যাগে। এই ফাঁকেতে সানু, ধনু, গরুর চামড়া নিয়ে গেলো হারান ঋষির বাড়ি। চামড়া বেচে সেই টাকাও করলো তারা ভাগ। তার ওপরে পাঁচশ টাকা ছিলো তাদের হাতে। এই টাকাটা দিয়ে ছিলো আলেপ মিয়া ওদের। চামড়া বেচে তাইতো টাকার অর্ধেক পায় আলেপ। এই টাকাটা হাসু পৌঁছায় আলেপ মিয়ার হাতে। এসব কিছুর দলের নেতা ছিলো মদন মিয়া। এই ঘটনার পালের গোদা আলেপ মিয়া সাঁই। মেরাজ তুমি আসামি ধরো এবার আমরা চলে যাই।…
এইটুকু বলেই ‘হক মাওলা’ বলে এক চিৎকার দিয়ে মেরাজ জ্ঞান হারাবার ভান করে ফিট হয়ে পড়ে যায় নামাজের বিছানায়। আর সাথে সাথে ধর পাকড় শুরু হয়ে যায় কালাই বেপারীর গরু চোর এবং তার গরু চুরির ষড়যন্ত্রকারী আলেপ মিয়াকে। ধরা পড়ে গিয়ে অপরাধীরা তাদের সব অপরাধ স্বীকার করতে বাধ্য হলো। অমনি কোতয়ালের কাচারি জুড়ে গ্রামবাসীরা চিৎকার করে উঠলো- মেরাজ ফকির জিন্দাবাদ। মেরাজ ফকির জিন্দাবাদ…।
সাথে সাথে কোতয়ালের আদেশে অপরাধীদেরকে পাঠানো হলো হাজতবাসে। আর কালাই বেপারীকে আলেপ মিয়ার কাছ থেকে জরিমানা আদায় করে একটা সুন্দর গরু কিনে দেয়া হবে বলে ওয়াদা দিয়ে বিদায় করা হলো। তারপর বেশ সম্মানের সাথে মেরাজকে নিয়ে যাওয়া হলো জমিদার বাহাদুর বাহার আলী খানের দরবারে। কোতয়াল মেরাজ সম্পর্কে জমিদারকে সব খুলে বললেন। সব শুনেটুনে তো জমিদার খুব খুশি। তিনি নিজের গলা থেকে একটা পান্না-মতির মালা খুলে মেরাজকে পুরস্কার দিয়ে বললেন- সাবাস মেরাজ ফকির। আজ থেকে তুমি আমার রত্ন সভার সদস্য। তোমার আসন কাল থেকে হবে রত্ন সভায়। যাও কোতয়াল সাহেবের সাথে যাও। তিনি রত্ন সভায় সবার সাথে তোমাকে পরিচয় করিয়ে দেবেন। আর তোমাকে দেয়া হবে অনেক অনেক পুরস্কার। অনেক অনেক ধন-রত্ন।
জমিদারের আচরণে মেরাজ খুবই আনন্দিত হলেও মনে মনে বেশ ঘাবড়ে যায়। ও মনে মনে বলে- এতো দিন তো আমি বুদ্ধি খাটিয়ে, চালাকি করে আর নিজের দেখা ঘটনাকে পুঁজি করে কাকতালীয়ভাবে সেই ঘটনার কথা বলে, কেরামতি হিসেবে চালিয়ে দিয়েছি। কিন্তু গুণীজনদের সাথে দরবারে বসে থেকে তো দুনিয়ার কোন খোঁজ খবরই পাওয়া যাবে না। তখন আমার সব অভিনয় ধরা পড়ে যাবে। তাতে মান সম্মান তো যাবেই, জানটাও চলে যেতে পারে। এখন উপায়?
হঠাৎই মেরাজের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায়। সে জমিদারকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলে-হুজুর মেহেরবান! আপনার রতœসভায় সদস্য হতে পেরে আমি খুবই গৌরব বোধ করছি। কিন্তু রতœসভায় আমার আসন করে দেবেন না। তাহলে ওনারা খুবই রেগে যাবেন। আর রেগে গিয়ে আমার গলা টিপে মেরেও ফেলতে পারেন। তখন তো আপনারই ক্ষতি।
জমিদার অবাক হয়ে বলেন- ওনারা আবার কারা?
– জমিদার বাহাদুর! আপনি মেহেরবান!! ওনাদের নাম আমার মুখে আনা নিষেধ। আর যারা ওনাদের নাম শুনবেন তারা চিরদিনের জন্য বধির মানে ধ্যান্দা হয়ে যাবেন। এমনকি আপনিও যদি শোনেন…।
-ওরে বাবা! এতো সাংঘাতিক কথা। থাক থাক ওনাদের নাম শুনে আমার কোন কাজ নেই। তার চেয়ে বলো, তুমি কেমন করে রত্ন সভার সদস্য হিসেবে কাজ চালাতে চাও?
– যদি সাহস দেন মেহেরবান! তাহলে নির্ভয়ে বলতে পারি।
– বেশ, বেশ। নির্ভয়ে বলো।
– কোতয়াল সাহেবের কাচারির মতো আমার বাড়ির পাশেই একটা ছোট কাচারি বানিয়ে দিন। সেখানে বসেই আপনার সব হুকুম পালন করবো। দরকার হলে বিশেষ বিশেষ কাজে আপনার দরবারেও হাজির হবো।
– শাবাশ, জোয়ান শাবাশ! তোমার ইচ্ছাই পূরণ করা হবে।
জমিদারের কথায় খুশি হয়ে কোতয়ালের কাছ থেকে মেরাজ তার অন্যান্য পুরস্কার বুঝে নিয়ে ফিরে আসে নিজের বাড়িতে। আর বাড়িতে এসেই ওর সব পুরস্কার তুলে দেয় বড়ভাই এবং ভাবীর হাতে। মেরাজের পুরস্কার দেখে তারা তো তাজ্জব। ভাই ভাবীর কাছে মেরাজের কদর আরো বেড়ে গেলো। গ্রামের লোকজনও এখন মেরাজকে নিয়ে গর্ব করে। ওরা মেরাজকে আগের চেয়ে সম্মানও করে অনেক অনেক বেশি। সবাই-ই মেরাজের একটু বন্ধুত্ব পেতে ছুটে আসে ওদের বাড়িতে। তবে মনে মনে ভয়ও করে। সবাই মনে করে কোন রকম বেয়াদবি হলে মেরাজের জিনেরা আবার কাকে কখন আছাড় মেরে বসবে। তাই কেউই তার সাথে কখনো তামাশা কিংবা উপহাস করে না।

সাত.

দেখতে দেখতে জমিদারের পাইক পেয়াদাদের তত্ত্বাবধানে মেরাজদের বাড়ির পাশে তৈরি হয়ে যায় রতœসভার একটি ছোট্ট কাচারিঘর। মেরাজ সেখানে বসেই এখন ধ্যান সাধনা করে। লোকজনকে ভালো কাজের পরামর্শ দেয়। বিনিময়ে বেশ কিছু উপহার উপঢৌকনও পায়। আবার মাস ফুরালে জমিদারের দরবার থেকে বেতনও পায়। এতে বেশ ভালোই চলছিল। হঠাৎ একদিন স্বয়ং জমিদার বাহাদুর মেরাজকে ডেকে পাঠালেন। জমিদারের দরবারে পৌঁছতেই জমিদার তাকে বললেন- শোন হে মেরাজ ফকির। এবার তোমাকে বলতে হবে আমার একমাত্র কন্যা সিফাত বানুর নেকলেস চুরির কথা। ওর বড় সখের একটা নেকলেস ছিলো। নেকলেসটায় ছিলো হীরকের কারুকাজ। কিন্তু ওর গত জন্মদিনের অনুষ্ঠানের পর থেকেই সেই নেকলেসটাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুরো জমিদার বাড়ি তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে। এমনকি দাসী-বাঁদিদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কিন্তু নেকলেসটার কোন সন্ধান করা যায়নি। এখন তুমি বলে দাও নেকলেসটা চুরি করেছে কে?
বিবরণ শুনে তো মেরাজের মাথা ঘুরে যাবার অবস্থা। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বুদ্ধি খাটিয়ে বললো- মেহেরবান! আমি তো চট করে কোন ব্যাপারে কোনো কথা বলি না। আমাকে ধ্যান সাধনা করতে হয়। তারপর পানের ওপর ধান ছড়িয়ে ওনাদের কাছ থেকে জেনে নিয়ে তবেই সঠিক খবরটা বলতে পারি। তাই আমাকে অন্তত তিন দিন সময় যে দিতেই হবে।
জমিদার মেরাজের কথায় কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবলেন। তারপর বললেন- ঠিক আছে তোমাকে তিন দিন সময়ই দেয়া হলো। যদি সঠিক খবর বলতে না পারো তাহলে কিন্তু তোমার ধড় থেকে গর্দান কেটে নেয়া হবে।
– আপনার আদেশ শিরধার্য। তবে মেহেরবান! আমার একটা আর্জি আছে। যদি অভয় দান করেন তাহলে সাহস করে বলতে পারি।
– নির্ভয়ে বলে যাও।
– মেহেরবান! আমাকে তিন দিন তন্ত্র সাধনের জন্য একটা বড় রুইমাছ, তিন সের পোলাউয়ের চাল, একসের ঘি, সাতটি পান এবং এক মুঠো ধান দিতে হবে। এসব না হলে তো ওনারা খুশি হবেন না। আমার ধ্যান সাধনাও সফল হবে না।
– বেশ, বেশ। সব কিছুই মঞ্জুর করা হলো। এক্ষনি মালখানায় গিয়ে জমিদারি খাজাঞ্চির কাছ থেকে সব কিছু বুঝে নিয়ে যাও।
এ কথা বলেই জমিদার বাহাদুর তিনটি হাত তালি বাজালেন। অমনি খাজাঞ্চি এসে সালাম দিয়ে দাঁড়ালো। জমিদার তাকে আদেশ করলেন- মেরাজ ফকিরের চাহিদা পূরণ করা হোক।
খাজাঞ্চি সাথে সাথে ‘জি আজ্ঞা হুজুর’ বলে মেরাজকে সাথে নিয়ে খাজাঞ্চিখানার দিকে ছুটলো। খাজাঞ্চিখানা থেকে মেরাজ তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বুঝে নিয়ে সোজা চলে এলো বাড়িতে। কিন্তু চিন্তা ভাবনায় তার মন খুবই অস্থির। সে মনে মনে ভাবলো, আমি তো আসলে ধ্যান সাধনা কিছুই জানি না। অথচ জমিদার কন্যার হারানো মূল্যবান নেকলেস চোরের সন্ধান করতে হবে। না, না। এটা অসম্ভব কাজ। কিন্তু কাজটা না করতে পারলে গর্দান চলে যাবে। হায় হায়! এখন আমি কী করবো? আসলে এজন্য দায়ী আমার ভাবী। সে আমার সাথে খারাপ আচরণ না করলে আমাকে মিছেমিছি ফকির সাজতে হতো না আর আজকের এই বিপদেও পড়তে হতো না। এখন বাঁচার উপায় কী? বাপরে বাপ! গর্দান চলে যাওয়ার চেয়ে পালিয়ে যাওয়াই ভালো। এখন তো হাতে বেশ টাকা পয়সা আছে। দূরে কোথাও পালিয়ে গিয়ে বণিক সেজে থাকতে হবে। তাহলে আর জমিদারের কোতয়ালের হাতে গর্দানটা দিতে হবে না। যাক এখনো তিন দিন হাতে আছে। সব গোছ গাছ করে রাখতে হবে। আপাতত দু’দিন বাড়িতেই থাকি, তৃতীয় দিনের সূর্য ওঠার আগেই ভোর রাতে পালাতে হবে। যাতে কেউ জানতেই না পারে।
এমনি অনেক চিন্তা-ভাবনা শেষে মেরাজ ছুটে যায় পুরনো সেই ছাড়াভিটায়। সেখান থেকে গাছের কোটরে লুকিয়ে রাখা টাকাগুলো উদ্ধার করে নিয়ে আসে। তারপর নিজের হাতে থাকা টাকার সাথে মিলিয়ে রেখে দেয় সযতনে। মনে মনে ঠিক করে নেয় নিজেদের এলাকা ছেড়ে তিন নদী পেরিয়ে সোজা চলে যাবে জমিদার শাহবাজ খানের রাজ্যে। সেখানে তার এক মামা থাকে, প্রথমে তার বাড়িতেই উঠবে। তারপর দেখে শুনে একটা ব্যবসা-বাণিজ্য আরম্ভ করে রাতারাতি বণিক হয়ে যাবে।
এমনি ভাবনা-চিন্তা আর প্রস্তুতি নিতে নিতে পেরিয়ে যায় দুই দিন। আজ রাতেই পালাবে মেরাজ। কিন্তু তার এ কথা কাকপক্ষিটিও জানে না। এমন কি বড়ভাই বা ভাবীকেও কিচ্ছুটি বলেনি। রাতের খাবার খেয়ে সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিয়ে টুপ করে শুয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে ভোররাতে উঠেই নীরবে পালাতে হবে। অমনি সময় তার ঘরের পেছনের দরজায় তিনটা টোকা পড়ে। মেরাজ অবাক হয়ে ভাবে এতো রাতে ভাবী আবার কী জন্য এলো। সে কী তাহলে পালিয়ে যাবার পরিকল্পনার কথা জেনে ফেললো! কিন্তু ভাবী তো পেছনের দরজায় টোকা দেয়ার মানুষ নয়। সে তো সামনের দরজায় এসেই টোকা দিতে পারে। তাহলে কে ওখানে? নাকি আবার কোতয়ালের লোক! তাহলে তো সর্বনাশ! আবারো তিনটা টোকা পড়ে। মেরাজ একটু সাহস সঞ্চয় করে জানতে চায়- কে ওখানে?
-ফকিরবাবা, আমি কমলা রানী। আমি বড় বিপদে পড়ে এসেছি ফকিরবাবা। আমাকে রক্ষা করুন। দয়া করে দরজাটা খুলুন।
– কোথাকার কমলা রানী? কোথায় বাড়ি, কোথায় ঘর?
– আজ্ঞে আমি জমিদারের নফরানী। থাকি জমিদার বাড়ি। আমার স্বামী হরিচরণ দাসও জমিদারের নফর। আপনি আমাদেরকে বাঁচান ফকিরবাবা। আমরা শুনেছি পরশু জমিদারের দরবারে আপনি জমিদার কন্যার নেকলেস চোরের নাম প্রকাশ করবেন। তাই তো ছুটে এলাম বাবা। দয়া করে দরজাটা একটু খুলুন।
বুদ্ধিমান মেরাজ যা বোঝার বুঝে ফেললো। তাই আস্তে করে ‘হক মাওলা’ বলে দরজা খুলে দেয়। সাথে সাথে ঘরে প্রবেশ করে মেরাজের পা জড়িয়ে ধরে এক মহিলা আর একজন পুরুষ মানুষ। মেরাজ সহজেই বুঝতে পারে এরা একজন বাঁদী কমলা রানী আরেকজন চাকর হরিচরণ দাস। ওরা কাতরকণ্ঠে বললো-ফকিরবাবা দয়া করুন! আমরা অনেক কষ্টে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আপনার কাছে এসেছি। দয়া করে আমাদের নাম প্রকাশ করবেন না। তাহলে আমাদের গর্দান যাবে। আপনি আমাদেরকে রক্ষা করুন বাবা। আমরা আপনার জন্য অনেক নজরানা এনেছি।
মেরাজ ওদেরকে পায়ের কাছ থেকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলে- এজন্যই আমি অপেক্ষা করছিলাম যে, তোমরা আমার কাছে আসবে। তাই তো জমিদার বাহাদুরের কাছ থেকে তিন দিন সময় নিয়েছি। নইলে সেই দিনই তোমাদের নাম দরবারে বলে দিয়ে গর্দান নেয়ার ব্যবস্থা করতে পারতাম। কিন্তু আমি চাইনি যে, তোমাদের গর্দান চলে যাক। কারণ, আমি আবার মানুষ হত্যা পছন্দ করি না। জেল জরিমানা হতে পারে কিন্তু মৃত্যুদণ্ড চাই না। তাই দয়াপরবশ হয়ে তিন দিন সময় নিয়েছি। যাতে তোমরা গোপনে আমার সাথে দেখা করতে পারো। এবার নেকলেসটার কথা বলো। সেটা কোথায় রেখেছো?
মেরাজের কথায় ভরসা পেয়ে, নফরানী কমলা রানী একটা ছোট কালো কাপড়ের পুঁটলার ভেতর থেকে, হীরার কারুকাজ করা জমিদার কন্যার নেকলেসটা বের করে মেরাজের হাতে তুলে দেয়। আবছা অন্ধকারে হীরার আলো ঠিকরে পড়ে তার ঘরে। এমন মূল্যবান নেকলেস হাতে নিতে পেরে মেরাজের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। সে তাড়াতাড়ি নেকলেসটা পুঁটলায় পুরে নিয়ে কমলা রানীর হাতে তুলে দিয়ে বলে-ওরে পাপিষ্ঠ! এমন পাপ কাজ করতে তোমাদের বুক কাঁপলো না? নাও এখন এই মহামূল্যবান নেকলেস তোমাদের কাছেই রাখো। আর আমি যা বলি তা খেয়াল করে শোন। তোমরা আজ রাত পোহাবার আগেই অতি গোপনে এটাকে জমিদারের হাম্মামখানার কূপের ভেতর ফেলে দিয়ে তবেই ঘুমোতে যাবে।
মেরাজের কথায় কমলা রানী আঁতকে উঠে বলে- তাহলে তো নির্ঘাত সর্বনাশ হয়ে যাবে। কারণ আজই হাম্মামখানার কূপের সব পানি তুলে নিয়ে কূপের মাঝে তল্লাশি করা হয়েছে।
এবার মেরাজ একটু চিন্তায় পড়ে যায়। তবে ওদেরকে কিছু বুঝতে না দিয়ে দু’চোখ বন্ধ করে বলে- আচ্ছা জন্মদিনের উৎসবের সময় জমিদার কন্যা ঝালর অলা যে পাথরের কারুকাজ খচিত ওড়না পরে ছিলো, সেট কি এর মাঝে আরো দু’একবার ব্যবহার করেছে?
– না, ফকিরবাবা। সে আর অই ওড়নাটা পরেনি।
– ওটা এখন কোথায় আছে তার খোঁজ নিতে পারবে?
– পারবো মানে, একশ বার পারবো। আমি যে জমিদার কন্যার খাস নফরানী। তার শয়নকক্ষে একমাত্র আমারই প্রবেশের হুকুম আছে। আপনি চাইলে সেই ওড়নাটা আপনার হাতে এনে দিতে পারি। এইতো যাবো আর আসবো।
– থাক, ওটা আনার দরকার নেই। ওড়নাটা এখন কোথায় আছে। তাই শুধু বলো।
– আমার জানা মতে, ওড়নাটা প্রায় অগোছালোভাবে জমিদার কন্যার সাজন কক্ষে দেরাজের মাঝে রাখা আছে।
– তুমি কি এর মাঝে কখনো সাজন কক্ষে ঢুকেছো?
– না, জন্মদিনের পর আর জমিদার কন্যা অমন করে সাজেনওনি। তাই আমারও সাজঘরে ডাক পড়েনি।
– বেশ। তাহলে যেভাবেই হোক আজ রাতেই নেকলেসটা ওর সেই ওড়নার ঝালরের সাথে পেঁচিয়ে রেখে দেবে। সাবধান! খেয়াল রাখবে যেন কাকপক্ষিটিও টের না পায়। দরকার হলে হরিচরণ পাহারায় থাকবে আর তুমি কাজটা সারবে। তারপর তোমরা অন্তত কালকের দিনটা সাজ ঘরটি চোখে চোখে রাখবে। যেন অই ঘরে কেউ ঢুকতে না পারে। তবে তোমরাও সেখানে আর যাবে না। দূর থেকেই নজরদারি করবে। তারপর যা করার আমি করবো। এখন বলো জমিদারের দরবার থেকে সাজঘরটা কোন দিকে?
– উত্তর দিকে। জমিদার গিন্নির শয়নকক্ষের সাথে।
– বেশ। সাজঘরের ভেতরে দেয়ালের রঙ কী?
– তিনদিকে সবুজ আর দরজার দিকের দেয়ালটা একটু হালকা সবুজ।
– বেশ। সাজ ঘরের ওয়ারড্রবের কয়টা দেরাজ?
– চারটা দেরাজ। তবে সবার ওপরের দেরাজে অই ওড়নাটা আছে।
– বেশ। বেশ। ওড়নার ঝালরে নেকলেসটা পেঁচানোর পর ওড়নাটা তিনটা কাপড়ের নিচে রাখবে। ব্যাস তোমাদের কাজ শেষ। এবার যাও তোমরা, খুবই সাবধানে কাজে লেগে পড় গিয়ে। আবারও বলছি, তোমাদের কাজ কারবার কেউ যেন দেখে ফেলতে না পারে, তাই খুবই সাবধানে কাজটা সারবে।
মেরাজের কথায় ওরা খুশি হয়ে নিঃশব্দে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। মেরাজ ঘরের কপাট লাগিয়ে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে।
আট.

জমিদারের দরবার কক্ষে সভাসদবর্গ, কোতয়াল, পাইক, পেয়াদা, চাকর-নফর-নফরানীরা নিঃশব্দে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। দরবারের ঠিক মাঝখানে সবুজ মখমলের কার্পেটে জায়নামাজ বিছিয়ে পান এবং ধান নিয়ে ধ্যানে বসেছে রত্ন সভার সদস্য মেরাজ ফকির। জমিদার বাহাদুর সিংহাসনে বসে চুপচাপ গোঁফে তা দিচ্ছেন। হঠাৎ মেরাজ ফকির ধ্যান ভেঙে ‘হক মাওলা’ বলে পান থেকে একটা ধান টোকা মেরে ফেলে দিয়ে মুখ খুললো- মেহেরবান জমিদার বাহাদুর! আপনার কন্যার নেকলেসতো চুরি যায়নি হুজুর। নেকলেস তো তার কাছেই আছে।
জমিদার অবাক হয়ে বললেন- তার মানে! তুমি কি বলতে চাও?
জমিদারের কথায় মেরাজ গলার স্বর পাল্টে প্রায় চাপা চিৎকার করে বলে- মেরাজ ফকির ঠিক কথাই বলেছে। বিশ্বাস না হয় আপনার কন্যাকে দরবারে হাজির করুন। নইলে তার খুব ক্ষতি হয়ে যাবে। শেষে মেরাজ ফকিরকে কোন দোষ দিতে পারবেন না। হক মাওলা…! হক মাওলা…!!
মেরাজের কথার ধরন আর ওর হঠাৎ বদলে যাওয়া চেহারা দেখে জমিদারও কেমন ভয় পেয়ে যান। তাই তাড়াতাড়ি তার কন্যাকে দরবারে ডেকে আনেন। মেরাজ ফকির এবার জমিদার কন্যাকে বলে- জমিদার কন্যা সিফাত সুলতানা বানু! মেরাজ ফকির আপনার কাছে যা যা জানতে চাইবে, তা ঠিক ঠিক বলবেন তো?
– জি! ঠিক ঠিক বলবো।
– সত্য বই মিথ্যা বলবেন নাতো?
– না, মোটেও মিথ্যা বলবো না। যা বলবো সত্য বলবো।
– হুম্। এই দরবার কক্ষ থেকে ঠিক উত্তর দিকে আপনার মায়ের শয়নকক্ষের পাশে আপনার সাজঘর আছে কি না?
– জি, আছে।
– সাজঘরের ভেতরে তিন দিকের দেয়াল সবুজ রঙের কিন্তু দরজার দিকের দেয়ালের রঙ হালকা সবুজ। কথাটা ঠিক কি না?
– জি, ঠিক কথা।
– সেই সাজঘরে আপনার চারটি দেরাজ অলা একটা ওয়ারড্রব আছে। ঠিক কি না?
– জি, ঠিক কথা।
– সেই দেরাজগুলোর মাঝে সবার ওপরের দেরাজে তিনটা কাপড়ের নিচে রাখা আছে আপনার জন্মদিনের কারুকাজ করা একটা ওড়না। সেটা শুধুমাত্র জন্মদিনেই পরেছিলেন। ঠিক কি না?
– জি, ঠিক কথা। তবে তা তিনটা কাপড়ের নিচে কিনা তা মনে নেই।
– তাহলে তো আপনার নেকলেস হারাতেই পারে না। কারণ আপনি জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষে ঘুমের ঘোরে আনমনে অই ওড়নাটা খুলে দেরাজে রেখে দিয়েছেন। সে সময় ওড়নার ঝালরে পেঁচিয়ে, আপনার গলা থেকে নেকলেসটা খুলে ওড়নার সাথে চলে যায়। আপনি অবশ্য সেটা টেরই পাননি। সকালে ঘুম থেকে উঠে গলায় নেকলেস না দেখে ভেবেছেন ওটা চুরি হয়েছে। আসলে তা কিন্তু নয়। তবে চাকর-নফর-নফরানী এমনকি আপনার খাস নফরানীকেও আপনি সন্দেহ করেছেন এবং জিজ্ঞাসাবাদ করে গর্দান নেয়ার ভয় দেখিয়েছেন। এ কথা ঠিক কি না?
– জি, তা অবশ্য ঠিক। তবে জমিদার মহলের অন্যদেরকেও আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।
-সে তো করবেনই। তবে সবচেয়ে বেশি সন্দেহ যার ওপর তার নামের প্রথম বর্ণ কি ‘ক’? ভেবে দেখুন তো।
– হ্যাঁ, আমি কমলা রানীকেই বেশি সন্দেহ করছি। তাই ওকে আর সাজঘরে যেতে দেইনি। এমনকি আমার শয়নঘরেও না।
– বেশ। বেশ। কিন্তু মেরাজ ফকির জানতে পেরেছে, এজন্য কমলা কেন, কোন নফরানীই দায়ী নয়। দয়া করে গিয়ে দেখুন আপনার নেকলেস সেই ওড়নার ঝালরের সাথেই জড়িয়ে আছে।
এটুকু বলেই সকলের কান ঝালাপালা করা চিৎকার দিয়ে ‘হক মাওলা’ উচ্চারণ করে মেরাজ ফকির। তারপর অজ্ঞান হওয়ার ভান করে জায়নামাজে লুটিয়ে পড়ে। জমিদারের হুকুমে কোতয়ালকে সাথে নিয়ে জমিদার কন্যা ছুটে যায় সাজঘরে।
এ দিকে মেরাজ ফকিরকে ধরাধরি করে পাইক পেয়াদারা তার মুখে পানির ঝাপটা দিতে থাকে। একটু পরেই সিফাত বানু আর কোতয়াল দরবারে ছুটে আসে ওড়নাটা নিয়ে। তখনো ওড়নার ঝালরে নেকলেসটা জড়ানো। জমিদার নিজ হাতে ঝালর থেকে খুব সাবধানে নেকলেসটা ছাড়িয়ে সিফাত বানুর গলায় পরিয়ে দেন। এ দৃশ্য দেখে সবাই আনন্দে উল্লাস করতে থাকে। সেই ফাঁকে মেরাজ জ্ঞান ফেরার ভান করে ধীরে ধীরে উঠে বসে। অবাক চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে- একি আমার মুখমণ্ডল ভেজা কেন? কে আমাকে পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দিলো?
জমিদার তার আসন ছেড়ে নেমে এসে মেরাজকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন- তুমি জ্ঞান হারিয়ে ফিট হয়ে পড়েছিলে। তাই পানির ঝাপটা দিয়ে তোমাকে সুস্থ করা হয়েছে। আর আনন্দের খবর হলো, তোমার কথা মতো খোঁজ নিয়ে ঠিক ঠিক মতো নেকলেসটা পাওয়া গেছে। বল, তুমি কি ইনাম চাও?
মেরাজ বুদ্ধি খাটিয়ে বলে, আমি কোনো ইনাম চাই না মেহেরবান! সবার কাছে শুধু একটা ভয়ানক খবর দিতে চাই।
জমিদার আঁতকে উঠে জানতে চান- ভয়ানক খবর! সেটা আবার কী? বলো, বলো। জলদি বলো। আমার যে আর অপেক্ষা করতে মন চাইছে না।
মেরাজ এবার চিৎকার করে ‘হক মাওলা’ বলে সবার দৃষ্টি কেড়ে নিয়ে জানায়- আমি এই নেকলেসের সন্ধানে ধ্যান করতে গিয়ে দৈবাত জানতে পেরেছি, আগামী পূর্ণিমার রাতের পর থেকে আপনার জমিদারি এলাকায় যে লোকই কোন কিছু চুরি করবে অথবা অনিষ্ট করবে অমনি সে পাথর হয়ে যাবে। এই কঠিন অভিশাপ থেকে কেউই রেহাই পাবে না। সে হোক নর অথবা নারী। এমনকি আপনি বা আমিও চুরি করলে বা কারো অনিষ্ট করলে পাথর হয়ে যাবো।
মেরাজের কথা শুনে পুরো দরবার জুড়ে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। অমনি মেরাজ আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ‘হক মাওলা’ বলে আবারো পানের ওপর থেকে টোকা মেরে একটা ধান সরিয়ে দিয়ে বললো- তবে যারা চোর-ডাকাত আছে তারা যদি তওবা করে চুরি ডাকাতি ছেড়ে দিয়ে ভালো হয়ে যায় আর মন্দ লোকেরা মন্দ কাজ ছেড়ে দিয়ে ভালো কাজে মন দেয়, তাহলে এই অভিশাপ থেকে আমরা বেঁচে থাকতে পারবো। হুজুর মেহেরবান! আপনি দয়া করে এই সংবাদটা রাজ্যজুড়ে জানিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করুন। তা না হলে আগামী পূর্ণিমার পর থেকে চুরি-ডাকাতি বা অপরের অনিষ্ট করে কেউ যদি পাথর হয়ে যায়, তাহলে তার জন্য আমাকে বা ওনাদেরকে কেউ কিন্তু দোষ দিতে পারবেন না।
জমিদার শঙ্কিত হয়ে চাপা কণ্ঠে জানতে চান- ওনারা আবার কারা?
মেরাজ গম্ভীর কণ্ঠে বলে- মেহেরবান! আমি তো আগেই বলেছি ওনাদের নাম মুখে আনতে নেই। তাতে খুবই বিপদ। আর যারা ওনাদের নাম শুনবে তারা তো চির বধির হয়ে যাবে। এমনকি বোবাও হয়ে যেতে পারে।
জমিদার তার ভুল বুঝতে পেরে নিজেই নিজেকে বলেন- আবার সেই ভুল। যত্তসব! ঠিক আছে আর জানতে চাইবো না।
তারপর জমিদারের আদেশে সারা রাজ্যে জানিয়ে দেয়া হলো মেরাজ ফকিরের সেই ভয়ানক খবরটা। ‘যারা চুরি-ডাকাতি বা অন্যায় করবে তারা পাথর হয়ে যাবে’। খবরটা প্রচারের সাথে সাথে সেদিন থেকেই রাজ্যের সব লোক তওবা পড়ে ভালো মানুষ হয়ে গেলো। ফলে চুরি-ডাকাতি, হিংসা এবং মন্দকাজ আর থাকলো না। মেরাজকেও আর অই সব সমস্যার সমাধানের জন্য মাথা ঘামাতে হলো না।
রাজ্যের সব মানুষ সুখ-শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো।

SHARE

Leave a Reply