Home গল্প রম্যগল্প পুঁজি ছাড়া ব্যবসা -মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

পুঁজি ছাড়া ব্যবসা -মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

ব্যবসার জন্য প্রয়োজন দু’টি জিনিস, পুঁজি ও অভিজ্ঞতা। অনেকের পুঁজি আছে, অভিজ্ঞতা নেই। অনেকের অভিজ্ঞতা আছে কিন্তু পুঁজি নেই। এরকম দু’ব্যক্তি পার্টনারশিপ ব্যবসায় নামলে বিপদ আছে। অনেক সময় দেখা যায় বছর শেষে পুঁজিওয়ালার অভিজ্ঞতা হয়েছে কিন্তু পুঁজি চলে গেছে অভিজ্ঞ পার্টনারের হাতে। পুঁজি ছাড়াই ঢাকা এসেছে ফরিদ ও আরিফ। কাজ না পেলে ব্যবসা করবে, এই আশায়।

বিনা পুঁজিতে লাভজনক ব্যবসা ভিক্ষা করা। দশজনের কাছে হাত পাতলে একজনের কাছ থেকে কিছু না কিছু পাওয়া যাবেই। দু’চারজন গালাগালি করলেও ক্ষতি নেই। দু’টাকার নোট বা কয়েন বর্তমান বাজারে কোন কাজে লাগে না কিন্তু দান করলে সোয়াব হয়। দু’টাকা পাঁচ টাকা দিয়ে সোয়াব কামানোর সুযোগসন্ধানীর অভাব নেই। ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়ার চেয়ে গাড়ি ভাড়া কম। বাড়ির জন্য জমি কিনতে হয়। গাড়ির জন্য রাস্তা কিনতে হয় না। মেসে সিট ভাড়া তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। বাড্ডা থেকে ফার্মগেট বাস ভাড়া মাত্র দশ টাকা। যানজটের কারণে তিন ঘণ্টা বসে থাকা যায়। বসে বসে ঘুমানোও যায়। ফরিদ বিশ টাকা বাস ভাড়া দিয়ে আপ-ডাউন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা ঘুমাতে পারে প্রতিদিন। মাসে মাত্র ছয়শত টাকা। কম টাকায় খাওয়ার জন্য ঢাকায় আছে হোটেল ছালাদিয়া, হোটেল ইতালিয়া, হোটেল রোডেশিয়া। বড় বড় তিন তারা পাঁচ তারা ও চাইনিজের উচ্ছিষ্ট বিক্রি হয় এসব হোটেলে। মুরগির চামড়া, গলা, ডানা, পা, গিলা ও কলিজার বিশেষ মেনু খেতে খারাপ লাগে না।
ফরিদ ভিক্ষা না করে কাজ করে খায়। “নবীর শিক্ষা করো না ভিক্ষা মেহেনত কর সবে”। নবীর শিক্ষা কাজে লাগিয়েছে সে। মাঝে মাঝে আরিফের সাথে দেখা হলে ফরিদ জিজ্ঞেস করে।
– কেমন আছ-টাছ, কী কর-টর দিন-টিন কেমন চলে-টলে? এসব দ্বৈতশব্দ ডিকশেনারিতে না থাকলেও মানুষের মুখে মুখে চালু আছে। আরিফ জবাব দেয় :
– আল্লাহর রহমতে তোমাগো দোয়ায় ভালাই আছি। বিনা পুঁজিতে লজিংয়ে খাই, মেসে ঘুমাই, মসজিদে টয়লেট করি।
– মসজিদে কী কর?
– মসজিদের বাথরুমে কাম সারি। সিটি করপোরেশনের পাবলিক টয়লেটে ফি লাগে। ছোট কাজ দুই টাকা, বড় কাজ পাঁচ টাকা। এত মসজিদ থাকতে টাকা খরচ করে কোন পাগলে?
– আমি ঠিক উল্টা। আমি ভিক্ষা করি। বাসে ঘুমাই। মিনারেলের খালি বোতলে জেনারেল ওয়াটার ভরে রেললাইনে ছোট বড় সব কাম সারি।
– তোমার বাবারও লাজ-শরম কম আছিল। তুমি একদম বেশরম। আল্লায় হেফাজত করুক।
– পুরুষ মাইনসের আবার লাজ-শরম?
– তুমি যেই রকম পুরুষ, তোমার কাজ-কাম, লাজ-শরমও সেই রকমই।
– প্রাইমারি স্কুলে পড়ছিলাম, পুরুষ তিন প্রকার। উত্তম পুরুষ, মধ্যম পুরুষ ও নাম পুরুষ। আমি অইলাম ঐ নাম পুরুষ। মানে নামেই পুরুষ। কামে নাই। তাই বইল্যা তোমার মতন কা-পুরুষ না। মাইগ্যা খাই না।
– পাগলে কি না কয়, ছাগলে কি না খায়?
– চোর চোট্টার চাইতে পাগল- ছাগল অনেক ভালা। পাগলে আবোল-তাবোল কইলেও মিছা কতা কয় না। ছাগল সব খাইলেও ঘুষ খায় না। আমরাই ভদ্রলোক। পুঁজি ছাড়া ব্যবসা করি। একজন কাম করি, একজন ভিক্ষা করি। চুরি চোট্টামি করি না, কাউরে ঠকাই না।
– ছোটকালে পোলাপানগো একটা ধাঁধা শোনাইতাম। এক ছাগলের তিন মাথা, ছাগলে খায় লতা পাতা। এর জবাব মাটির চুলা। এখন সেই মাটির চুলাও নাই লতাপাতা দিয়া কেউ রান্ধেও না।
– সেই ছাগলের খাওনও এখন মাইনসে খায়। ক্ষেত নিড়াইনা পাটপাতা, মালঞ্চা, হেলেঞ্চা, ঢেঁকি, কলমি, থানকুনি এখন ঢাকায় টাকা দিয়েও পাওয়া যায় না।
গ্রাম থেকে এক ব্যাগ এসব আগাছা নিয়ে ঢাকায় এসেছিল ফরিদ। মতিঝিলের অফিস পাড়ায় ফুটপাথে সাজিয়ে বসতেই বিক্রি হয়ে যায় সব। বিনা পুঁজিতেই লাভ পাঁচশত টাকা। কাজে লেগেছে চাপার অভিজ্ঞতা।
– ফরমালিন প্রিজারভেটিভ ছাড়া টাটকা শাক। খাইয়া মজা পাইবেন। রোগ-বালাই মাফ পাইবেন।
মাঝে মাঝে গ্রাম থেকে নিয়ে আসে এলেবেড়া, ওলট কমল, চিরতা, কালমেঘ, বাসক, তেলাকুচা, নিমের ডাল, অর্জুনের ছাল। শহরে এসব ঔষধি গাছ তাজা পাওয়া যায় না। শুকনা লতা-পাতা ভিজিয়ে পানি খায় ঔষধ হিসেবে। তরতাজা এসব বনাজি বিক্রি হয় হটকেকের মত চাপার জোরে :
– আমার কাছে দেখতে পাচ্ছেন কিছু জঙ্গলের লতাপাতা। জঙ্গল হলো মানবের জন্য মঙ্গল। এসব চিনলে জড়ি, না চিনলে চুলা গুঁতানোর খড়ি। এসব দিয়েই ঔষধ কোম্পানি ঔষধ বানায়। কোম্পানির ঔষধ না খাইয়া ডাইরেক্ট আল্লাহর নেয়ামত খান।
বিনা পুঁজির এ ব্যবসায় ফরিদ মিয়া হয়ে যায় ফরিদ সাব।
স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়ে লোকসানের ঝুঁকি নাই, ভ্যাট নাই, ট্যাক্স নাই।
কিছু জিনিস দশ টাকা কেজি কিনে প্রতি পিস দশ টাকা বিক্রি করা যায়। ফরিদের লেকচারও বেশ কাজে লাগে:
– বরফ-কোল্ড ড্রিংক মুখে ঠাণ্ডা লাগলেও খাইলে শরীর গরম লাগে। শসা-খিরাই-গাজর খান। মন-প্রাণ একেবারে ঠাণ্ডা আর তাজা। কাইট্টা ছিল্যা লবণ লাগাইয়া দিছি। চাইয়া যান, খাইয়া যান, ঘরের জন্য লইয়া যান।
সিজন বুঝে আনারস, পেয়ারা, জাম্বুরা, আমড়া, কামরাঙ্গা ও বরই বেচে এভাবেই লাভবান হয় ফরিদ।
বাসে ঘুমানোর বদ অভ্যাস ত্যাগ করে বাসা ভাড়া নেয়। তবে বিনা ভাড়ায় বাসে চড়ে স্বল্প পুঁজিতে ব্যবসা করে মাঝে মাঝে। লোকাল বাসে প্রতিবন্ধী ও হকারদের ভাড়া লাগে না।
আরিফ মাঝে মাঝে প্রতিবন্ধী সেজে ভিক্ষা কাম ব্যবসা করে। সিটে বসা যাত্রীদের কোলে লজেন্স বা বাদামের প্যাকেট ছুড়ে দিয়ে বলে :
– ভিক্ষা না দিয়ে একটা লজেন্স, এক প্যাকেট বাদাম নিয়ে যান। খান আর সোয়াব কামান।
ফরিদও চটকদার লেকচার দিয়ে বাসে চড়ে বিক্রি করে ভিক্স কফ লজেন্স, ডোল কোম্পানির চুলকানির মলম, মাথা ব্যথার টাইগার বাম, কান চুলকানোর কটন স্টিক, টুথ ব্রাশ ও টুথ পাউডার। সস্তা দামের বিপদের বন্ধু, ঘরের ডাক্তার। ফরিদকে দেখলে দ্রুত সরে পড়ে আরিফ। দুই বন্ধুতে দূরত্ব তৈরি হয়। অথচ কেউ কারো শত্রু নয়। একজন নবীর শিক্ষা মেনে খেটে খায়, আর একজন নবীর শিক্ষা অমান্য করে মেগে খায়।
এক সাথে ঢাকায় এসেও আরিফ ফরিদের মত সাহেব না হয়ে হয়েছে আরু ফহির।

SHARE

Leave a Reply