Home গল্প বিশ্বাস -হেলাল আনওয়ার

বিশ্বাস -হেলাল আনওয়ার

সময়টা ভালো যাচ্ছে না বুনো গাজীর। তার জীবনে সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনায় সে একেবারে ভেঙে পড়েছে। তার স্ত্রী-বিয়োগ মানে- মারা যাওয়ার কারণে তার হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
এই মহল্লার সবচেয়ে দামি-মানী না হলেও বুনো গাজী সবার চেয়ে ধনী। সম্পদের সাথে তার মনের তেমন মিল নেই। অর্থাৎ অর্থের প্রাচুর্যতা থাকলেও মনের দীনতা যেন তাকে আগলে রাখে। সম্পদের প্রতি অসীম মায়া। দুনিয়ায় সম্পদ ছাড়া আপন বলতে বুনো গাজীর তেমন আর কেউ নেই। এ নিয়ে এলাকার লোকজন বিভিন্ন মন্তব্যও করে থাকে। তবু বুনো গাজীর তাতে কিছু যায় আসে না।
সন্তানগুলোও বাবার মতো। এ জন্য বুনো গাজীর মনে অনেক আনন্দ। অনেক সুখ। সম্পদের অহংকারে কাউকে মানুষ বলে ভাবতো না। অনেক সময় মুখের পরে মানুষকে যা তা বলে ফেলতো। অভাবী মানুষেরা কিছু চাইলে বলতো- তোরা কি আমায় ফকির করে দিবি? কাজ করতে পারিস নে? লোকের দ্বারে চাতি লজ্জা করে না?
স্ত্রী জামেলাও ছিলো স্বামীর অনুগত। তাই সে গর্ব করে বলতো -এটা ভাগ্যবানের বাড়ি। সবাই আয় বোঝে তো ব্যয় বোঝেন না।
এত সুখ নিয়ে বুনো গাজীর দিনগুলো বেশ খোশ হালেই পার হচ্ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন নদীর ভাঙনের মতো বুনো গাজীর সুখের কপাল ভেঙে গেল। এলোমেলো হয়ে গেল তার জীবনের সবকিছু। আর এর মূল কারণ- তার অনুগত স্ত্রী জামেলা।
জামেলা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লো। বুনো গাজী যথারীতি ঝাড়ফুঁক আর লতাপাতার চিকিৎসা দিল। কিন্তু তাতে কোনো সুফল এলো না। অগত্যা ছেলেদের ডেকে বললো- তোমাদের মাকে একটু কবিরাজ দেখাও। কারণ, ঐ পরিবারে কোনোদিন ডাক্তার ডাকা হয় না, তার বদলে কবিরাজ দেখানো হয়। তাতে টাকা বেঁচে যায়। ছেলেরা বাবার কথা মতো পাশের গ্রাম থেকে রাশ কবিরাজকে ডেকে আনল। রাশ কবিরাজ হলো গরিবের বন্ধু। রাশ তার উপনাম। আসল নাম ছলিমুদ্দীন কবিরাজ। একবার কবিরাজি করতে গিয়ে একসের চালের ভাত কেবল কচু শাক দিয়ে খেয়েছিল। অর্থাৎ একরাশ ভাত। সেই থেকে রাশ কবিরাজ বলে পরিচিতি লাভ করে।
যাহোক, যথাসময়ে রাশ কবিরাজ এলো বুনোগাজীর বাড়ি। জামেলাকে দেখে চোখের পাতা ওপরে উঠিয়ে বলে- ভাই, তোমার বউয়ের পেছনে বেশ টাকা খরচ হবে।
ঔষধ বানাতে হবে।
– বুনো গাজী বলে, কত টাকা?
– তা শ’ দুয়ের মতো।
– হ্যাঁ?
বুনো গাজীর মন খারাপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ ভেবে নিলো। তারপর বললো- তোমার সাথে পরে আলাপ করবানে।
রাশ কবিরাজ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালো তার দিকে। তারপর কবিরাজি ঝোলাটা বোগলে চেপে ধরে বলে- ভাই তালি চললাম।
রাশ কবিরাজ বুনোকে পেছন ফেলে সামনে পা বাড়ালো। তখন সে কবিরাজের দিকে ভ্রু কুঁচকে উপহাসের সাথে আপন মনে বলতে থাকে এ্যাঁ-আমার সাথে চালাকি?
কবিরাজি করবি তা আমার বেশ জানা- অত সস্তা না। আমার থেকে ফাঁকি মেরে নেয়া। অন্যসময় কেউ অসুস্থ হলে ডাক্তার না জুটলেও কবিরাজ জুটতো। কিন্তু জামেলার ভাগ্যে তাও জুটলো না। ফলে, অসুখ আরো বেড়ে গেল। তার স্বাস্থ্যেরও অবনতি হলো। তবু এই হীন মানসিকতার একজন সদস্যও খরচের ভয়ে ডাক্তার দেখালো না।
দুই.
অমাবস্যার রাত।
গাঢ় অন্ধকারে চার পাশ আচ্ছন্ন।
জামেলা কাতরাতে থাকে। অসম্ভব যন্ত্রণায় তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসে। বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে থাকে। তার কন্ঠস্বরেও নেমে আসে আড়ষ্টতা। আধো বোলে বুনো গাজীকে ডাক দেয়-
– কই শুনতে পাচ্ছো?
বুনো গাজী গভীর ঘুমের ভেতর। জামেলার নিচু ও রুগ্নস্বর তার কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। জামেলা দেহের সমস্ত শক্তি কণ্ঠে এনে ডাক দেয়!
– কি হলো-একটু শোন-?
বুনো গাজী চোখ বন্ধ করেই বলে-আরে-ঝামেলা করো কেন? ঘুমিয়ে পড়তো?
– আমার যে মোটে ঘুম আসছে না।
– চোখ বন্ধ করে চুপ করে থাকো। তাহলে ঘুম আসপ্যানে।
জামেলার কষ্ট হয়। আর কোনো কথা বলতে পারে না।
কথা বলার মতো শক্তিও তার শরীরে নেই। খাদ্যহীনে-পথ্যহীনে দুর্বল দেহখানা যেন জামেলার ব্যক্তি সত্তাকে উপেক্ষা করছে।
এক সময় জামেলা তার শরীর আর স্বাস্থ্য নিয়ে গর্ব করতো। অহংকার করে বলতো-আমার কোনো রোগ বালাই নেই। সারা বছরেও আমার পেছনে একটা পয়সাও খরচ হয় না। কোনো ডাক্তার কবিরাজ লাগে না। আরো কতো কথা।
বুনো গাজীকে সে আবারো ডাক দেয়।
Ñ আমার একটু পানি দাও না!
বুনো পাশের কলস থেকে একমালা পানি জামেলার দিকে এগিয়ে দেয়। ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় অস্থির জামেলা পানিটুকু ঢক ঢক করে খেয়ে নিলো।
বুনো গাজী রাগে বিড় বিড় করতে থাকে।
জামেলা বুঝতে পারে। জিজ্ঞেস করে- কিছু বলছো?
– না, আর কী বলবো?
– আসলে আমি খুব ঝামেলা করছি না?
– ঝামেলা আর কী? তোর সাথে সাথে আমারও কবরে যেতে হব্যানে। জামেলা ভীষণ কষ্ট পায় বুনো গাজীর কথায়। তবু তো কিছুই করার নেই তার। ক্ষীণ সুরে বলে- এখন ঘুমিয়ে পড়।
ঘুমিয়ে আর লাভ কী? তোর সাথে রাতটুকু কাটাই দিই! তারপর হালচাষ বন্ধ হয়ে যাক। এ পুরি পাল্লারা মুখে তুলো পুরে দিন কাটায় দিক। আর কী…
আসলে বুনো গাজীর এখন আর হালচাষ না করলেও চলে। গোলা ভরা ধান। পুকুর ভরা মাছ। অভাব বলতে বুনো গাজীর সংসারে নেই। তারপরও কাজ না করে সে থাকতে পারে না। কাজ করা তার নেশা আর পেশা। কাজ তার চাই। বুনো গাজীর অভাব অর্থাৎ সম্পদের অভাব না থাকলেও মনের অভাব তাকে জাপটে ধরে। প্রতিদিন সকালে হুকো সেজে নেশা মিটিয়ে বুনোগাজী চলে মাঠের দিকে। হাল চাষ করে। তারপর সময় হলে পান্তাভাত আর ঝালপুড়া নিয়ে মাঠে পৌঁছে দেয়। বুনো গাজী আলের পরে পা দুটো লম্বা করে গামলাটা ওপরে রাখে। এরপর খেতে শুরু করে। খাওয়া শেষ হলে গাঁটি থেকে তামাক পোড়ার মাজন আঙুলের মাথায় নিয়ে মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। অতঃপর লাঙলের তাড়া ধরে পাচুনী দিয়ে বলদের পাছায় গুঁতো মারে। আর তাতেই বলদ বুঝে যায়।
জামেলা বুনো গাজীকে বলে- কাজতো তুমি সারা জীবন করলে! আমিওতো কোনোদিন এ সংসারে বসে থাকিনি। যার জন্য জমি জিরাতও কম করনি! আল্লাহ দিলে তোমার অভাবও নেই। কিন্তু আমার জন্য তুমি একটু ঔষুধও আনতে পারলে না?
– আরে কস কি? জানিস, সেদিন ওকে পঞ্চাশ টাকা দিতে হলো। আবার কচ্ছিস ঔষধ জুটলো না?
জামেলা বলে- সকালে মিয়াভাই এসে বললো- ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাতি। আমার অসুখ নাকি খুব মারাত্মক!
– ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব তা টাকা পাবো কনে? তোর মিয়া ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু নিয়ে আয়তো দেখি?
– সে কি? মিয়া ভাইয়ের কাছ থেকে আনবো কেন?
– তাহলে এতো টাকা পাব কনে?
– তুমি কি ভুলে গেলে বাবার বাড়ির দশ বিঘা জমি তোমার সংসারে এনেছি? তাতে হয়নি? এখন আবার কচ্ছো মিয়া ভাইয়ের কাছ থেকে আনতে!
জামেলার মন আরও খারাপ হয়ে যায়। সারা জীবন এই সংসারের জন্য কিই না করেছি!
কিন্তু কিইবা পেলাম? শুধু বলদের মতো এ সংসারে কাজ করেছি। সম্পদ বানিয়েছি। জীবনকে যেনতেনভাবে পার করে দিয়েছি। আর সম্পদ জমিয়েছি। কিন্তু এগুলো কাদের জন্য করেছি? সন্তানদের সুখের জন্য? আমাদের জন্য তাহলে কী করলাম?
সকালে বুনোগাজী যথারীতি লাঙল আর বলদ নিয়ে মাঠে চলে-। জামেলা ছেলেদের ডাক দেয়। বলে- এভাবে বিনা চিকিৎসায় আমাকে তোমরা আর কত ভোগাবে?
– কেন আব্বা তোমার ঔষধ এনে দিতে পারে তো?
– তোদের আব্বার কথা বাদ দে।
– কেন মা?
– তোদের আব্বা এসব বোঝে না।
– তাহলে আমরা কিইবা করতে পারি বলো?
– আমি তাহলে মরে যাব?
ছেলেদের কথা শুনে জামেলার ভীষণ কান্না পায়। তার দু’চোখে বেদনার ঝড় ওঠে। এই জীবনে তাহলে টাকার চেয়ে সম্পদের চেয়ে আপন আর কেউ নেই? অর্থ লিপ্সায় বাবা, মা, এমনকি আপনজনকেও পর করে দেয়? যাদের জন্য জীবনকে কোরবানি করেছি তারা আজ অবহেলা করছে?
জামেলার বোবা বেদনা পুরনো স্মৃতিকে বিষময় করে তোলে। সম্পদ আর অর্থের প্রাচুর্যতার মাঝে যে প্রকৃত সুখ নেই তা সে হাড়ে হাড়ে অনুভব করে।
জীবন যন্ত্রণায় জামেলার পরাজিত মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়। যে জীবন কেবল স্বপ্নের মোহে কেটে যায় সে জীবন সুখের খেয়া হারিয়ে ফেলে। জীবন কেবল অর্থহীন ব্যর্থ নয় অর্থলিপ্সার কারণেই সুখ থেকে বঞ্চিত হয়। হাড্ডিসার জামেলার জীবন তেমনই এক সংসারে কালো ইতিহাসের এক খণ্ডচিত্র।

তিন.
ইদানীং বুনোগাজী প্রায়ই মন খারাপ করে থাকে। বাড়ির পাশে ছোট্ট পুকুর। পুকুর ধারে আমগাছ। তার ছায়ায় বসে বসে পুকুরের মাছ দেখে। মনে মনে ভাবে বাহ, এরা কত সুখী! অথচ-
পাড়ার অনেক মানুষ এখন বুনোগাজীকে এড়িয়ে চলে। তার স্ত্রীর বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বরণ করাটা কেউ পছন্দ করেনি। তাছাড়া তার অর্থলিপ্সা মানুষের মনে ঘৃণার ভাব সৃষ্টি করেছে।
ছেলেদের সবার বিয়ে শাদি দিয়ে বুনোগাজী ভারমুক্ত হতে চেয়েছিলো। ভেবেছিলো বৌমাদের সেবা নিয়ে বাকি দিনগুলো পরম সুখে কাটিয়ে দেবে। কিন্তু তা আর হলো না। বৌমারাও এখন আর তার নিকটে আসতে চায় না। আর ছেলেরা তো তার নিজের মতো। সারাদিনও খোঁজ নেয়ার সুযোগ নেই তাদের।
এখন তার কেবল জামেলার কথা মনে পড়ে। ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে করে বুনো গাজী খুব কষ্ট পায়। তাছাড়া বয়সের বোঝা যেমন বুনোগাজীকে অসহায় করে তোলে তেমনি বুড়োর বোঝা অন্যের জন্য বড় ঝামেলা হয়ে যায়। তা থেকে বুনোগাজীও মুক্ত নয়।
যে বৃদ্ধের স্ত্রী আগে মারা যায় সেই কেবল বুঝতে পারে তার যন্ত্রণা কতো বড়। বিপদের লাল ঘোড়া দুর্বল শরীর কেমন অথর্ব করে দেয়। বুনোগাজী এখন হাড়ে হাড়ে টের পায়। আগে সে ভাবতো এসব কিচ্ছু না।
কিন্তু সে জীবনকে বুঝতে পারছে।
বুনোগাজী এখন আর আগের মতো মাঠে যেতে পারে না। হালচাষের মতো তার গায়ে জোর নেই। ছেলে বউদের সব আলাদা করে দিয়ে নিজেকে ভার মুক্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু তা আর হলো না। জমিজমা সবকিছু ভাগাভাগি করে দিয়ে এখন আর নিজের বলে কিছু নেই। এমনকি যাদের জন্য সারা জীবন এত কষ্ট করে সম্পদ বানিয়েছে তারা ভালো আচরণটুকুও করে না তার সাথে।
ছেলেরা অনেক সময় তার মুখের পরে অনেক বড় বড় কথা বলে যায়। বলে- তার কারণে নাকি তাদের মা মারা গেছে। সে নাকি চিকিৎসাও করেনি। এসব কথার কোনো প্রতিবাদ বুনোগাজী করে না। মনে মনে ভাবে, যার জন্য করি চুরি, সেই বলে চোর! ক’দিন আগে তাকে একছেলে বলে ফেললো, তুমি মার জন্য দু’টাকা খরচ করে ডাক্তার দেখাওনি। ঔষধ খাওয়াওনি। বলতে টাকা পাবে কোথায়? এখন তোমার বেলায়তো আমাদের টাকার অভাব থাকবে। ছেলেদের কথা শুনে বুনোগাজী খুব কষ্ট পায়। ভারাক্রান্ত হয়ে কেবল নিজেকে চিনতে পারে না। যে বাতাস বয়ে যায় সে বাতাসের ফিরে আসা স্বাভাবিক। ক’দিন আগেও যার দাপটে- সংসার চলতো। সবাই তাকে মান্য করে চলতো আজ সে একেবারে নিঃস্ব। ভেতর বাহির বলতে বুনো গাজীর এখন আর কিছু নেই। সে ভাবতে থাকে। ভাবছে আর ভাবছে। তার সারা জীবনের অর্জন যেন দমকা হাওয়ায় সব উড়ে গেল। জীবন, যৌবন, সম্পদ, সন্তান আর অহংকার সব কিছু দপ করে নেমে এলো মাটিতে। ধুলার সাথে তা মিশে কেবল একাকার হয়ে গেল। এখন তার নিজস্ব বলতে আছে কেবল হতাশা, অপমান, আর দুঃসহ জীবনের ছায়াচিত্র। যার ভাগীদার একমাত্র সেই।
এসব ভাবতে ভাবতে বুনোগাজী আনমনা হয়ে যায়। বাকহীন অবলা পশুর মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তার মুখে কোনো ভাষা নেই। অর্থ লিপ্সার আগুন নিভে গেছে। এখন সে নিঃসঙ্গতার এক অথৈ সমুদ্রে পাক খেতে থাকে।
হঠাৎ একফালি কালো মেঘ তার মাথার ওপরে স্থির হয়ে যায়। তারপর বৃষ্টি। প্রচণ্ড বৃষ্টি। সেই সাথে ঝড়। সেভাবে এই মেঘ যেন জামেলার ভারাক্রান্ত মনের শোক আর কষ্ট। আর ঝড় কেবল অতীত স্মৃতির পুঞ্জীভূত বেদনা এবং বৃষ্টি এ যেন জামেলার শোকাহত চোখের পানি!
তাহলে মানুষ আপন পেটের জন্য এতো কিছু করে কেন? কেন এত সম্পদ আহরণের বাসনা? সে বুঝতে পারে এই পুঞ্জীভূত সম্পদের মাঝেই কেবল পুঞ্জীভূত ব্যথা, বেদনা আর সকল বঞ্চনা। সে অস্ফুটে বলে- জামেলা, আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমার প্রতি চরম অবিচার করেছি। চেয়ে দেখ, আমার ঘুম ভেঙে গেছে। এখন আর আমি আগের মতো নেই।
এক পা দু’পা করে বুনোগাজী এগিয়ে যায় গোরস্তানের দিকে। যেখানে জামেলা ঘুমিয়ে আছে। নীরবে নিভৃতে। এটুকু আসতে বুনোগাজীর খুব কষ্ট হয়। হাঁফ লেগে যাচ্ছে। তবু এই কথাগুলো জামেলাকে শোনানোর দরকার বলে মনে করে সে।
গোরস্তানের পাশ দিয়ে উঁচু কাঁচা রাস্তা। বুনোগাজী রাস্তায় দাঁড়িয়ে জামেলার কবরের দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকে। হাউ মাউ করে ডুকরে কেঁদে ওঠে। একেবারে শিশুর মতো। জামেলা জামেলা বলে চিৎকার করতে থাকে। প্রায় পাগলের মতো বলতে থাকে- জামেলা, তুমি আমাকে মাফ করে দাও। তার দু’চোখের পানিতে ভিজে যায় মুখমণ্ডল। একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে- আমার ভুল হয়ে গেছে জামেলা। আসলে মানুষের জন্য নিজের বলে যা তা কেবল তোমার মতো সাড়ে তিন হাত জায়গা। মানুষের জন্য এর বেশি আপন কিছু আছে বলে আমি এখন আর বিশ্বাস করি না।

SHARE

Leave a Reply