Home দেশ-মহাদেশ পর্বতময় দেশ আলবেনিয়া -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

পর্বতময় দেশ আলবেনিয়া -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

আলবেনিয়া দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি দেশ। পুরো নাম আলবেনিয়া প্রজাতন্ত্র। আলবেনীয় ভাষায় ইশকিপেরি বা ইশকিপেরিয়া। আলবেনিয়ার আয়তন ২৮ হাজার ৭৪৮ বর্গ কিলোমিটার (১১ হাজার ১০০ বর্গমাইল এবং মোট জনসংখ্যা ৩০ লাখ ৪৭ হাজার ৯৮৭। আলবেনিয়ার উপকূল রেখা ৩৬২ কিলোমিটার। দুই সাগরের পাশে অবস্থিত এই দেশটির ৭০ শতাংশ ভূমিই অসমতল ও দুর্গম। দেশটির সর্বোচ্চ স্থান দিবারের কোরাব সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৭৫৩ মিটার ওপরে অবস্থিত।
আলবেনিয়ার সরকারি ভাষা আলবেনিয়ান। আলবেনিয়ায় ৯৫ শতাংশ লোক আলবেনীয় ভাষার কোন উপভাষায় (তোস্ক বা ঘেগ) কথা বলে থাকে। আলবেনিয়ার বাকি জনগণ সবচেয়ে বেশি যে ভাষায় কথা বলে, তা হল গ্রিক। এ ছাড়া মেসিডোনীয় ভাষা ও সার্বো-ক্রোটীয় ভাষায়ও স্বল্পসংখ্যক লোক কথা বলে। যাদের মাতৃভাষা আলবেনীয়, তারা মূলত দু’টি উপভাষার একটিতে কথা বলে। এগুলি হলো উত্তরের ঘেগ আলবেনীয় এবং দক্ষিণের তোস্ক আলবেনীয়। তোস্ক আলবেনীয় উপভাষার ওপর ভিত্তি করেই আদর্শ আলবেনীয় ভাষা গঠিত হয়েছে। আলবেনিয়ার বাইরে মেসিডোনিয়া ও কসোভোয়ও আলবেনীয় ভাষার প্রচলন আছে। ১৯৯০-এর দশকে যুগোস্লাভিয়ার যুদ্ধের সময় প্রায় ৫ লক্ষ আলবেনীয়ভাষী কসোভোবাসী আলবেনিয়ায় উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নেয়। আলবেনিয়ার গণমাধ্যমের ভাষা আলবেনীয়। তবে রেডিও তিরানা আটটি ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। এ ছাড়া অনেক আলবেনীয় স্যাটেলাইটের সাহায্যে ইতালীয় ও গ্রিক টিভির অনুষ্ঠান দেখে থাকে।
সরকারিভাবে আলবেনিয়ার জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুকের দেয়া তথ্য মতে, দেশটিতে ৭০ শতাংশ মুসলিম, ২০ শতাংশ অর্থোডক্স এবং ১০ শতাংশ রোমান ক্যাথলিক মানুষ রয়েছে। ১১ শতকের সময়ের প্রথম যে ইতিহাস পাওয়া যায় তখন এ আলবেনিয়া পুরোটাই খ্রিষ্টান অধ্যুষিত ছিল। কিন্তু পরে তুর্কি সাম্রাজ্যের অধীনে আসার পর দেশটিতে ধীরে ধীরে মুসলমানদের সংখ্যা খ্রিষ্টানদের ছাড়িয়ে যায়। ১৯১২ সালে তুর্কি সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দেশটিতে বিভিন্ন মতাদর্শের শাসন বিশেষ করে কমিউনিস্ট শাসন চলায় সেক্যুলার আদর্শ অনেকের মধ্যে প্রভাব ফেলে। ফলে মুসলিম বা খ্রিষ্টান থাকার পরও অনেকে কমিউনিস্ট আদর্শ লালন করে। দেশটিতে সব ধর্ম পালনেরই সমান স্বাধীনতা রয়েছে। দেশটির পুরো অংশতেই মুসলমানদের ব্যাপক বিচরণ থাকলেও রোমান ক্যাথলিকরা তাদের জন্য দেশটির উত্তরাঞ্চল এবং অর্থোডক্স খ্রিষ্টানরা নিজেদের জন্য দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বেছে নিয়েছে।
আলবেনিয়া তুর্কি সাম্রাজ্যের অধীনে থাকার সময় দেশটিতে শিক্ষার হার ছিল ৮৫ শতাংশ। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টুকুতে দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এ দেশের শাসকরা আবার দেশটির শিক্ষার হার বাড়াতে ব্যাপক উদ্যোগ নেন। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ১২ থেকে ৪০ বয়সসীমার মধ্যে থাকা সবাইকেই শিক্ষিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এর ফলে দেশটিতে বর্তমানে শিক্ষার হার ৯৮.৭ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষদের শিক্ষার হার ৯৯.২ শতাংশ এবং নারীদের শিক্ষার হার ৯৮.৩ শতাংশ। দেশটির প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে তিরানার ইউনিভার্সিটি অব আলবেনিয়া। ১৯৫৭ সালের অক্টোবরে এটি যাত্রা শুরু করে।
আলবেনিয়া ইতিহাসে বহুবার পূর্বের ইতালীয় শক্তি ও পশ্চিমের বলকান শক্তির কাছে হাতবদল হয়েছে। ১৫শ শতকে আলবেনিয়া গ্রিসের অধীনে চলে যায় এবং ১৯১২ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৪৪ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত আলবেনিয়া একটি সাম্যবাদী রাষ্ট্র ছিল। ১৯৯১ সালে দেশটি গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতি ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে রূপান্তর শুরু করে।
আলবেনিয়া একটি একক পার্লামেন্ট সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র। তিরানা আলবেনিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। এ ছাড়াও তিরানা দেশটির সবচেয়ে জনবহুল নগরী এবং প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। আলবেনিয়ার অন্যান্য বড় নগরীগুলোর মধ্যে রয়েছে ডারেস, ভেøারে, সারানডি, ইশকোডার, বেরাত, কোরসে, জিরোকাস্তার ও ফিয়ার।
আলবেনিয়া বলকান উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। দেশটি পশ্চিম দিক থেকে আড্র্রিয়াটিক এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে আইওনিয়ান সাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত। আলবেনিয়ার সীমান্তে রয়েছে উত্তর-পশ্চিমে মন্টেনেগ্রো, উত্তরপূর্বে কসোভো, পূর্বে মেসিডোনিয়া প্রজাতন্ত্র এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে গ্রিস। দেশটির বেশিরভাগ পর্বতময়। পর্বতগুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তরে আলবেনীয় আলপস, পূর্বে কোরাব পর্বতমালা, দক্ষিণে সেরাওনিয়ান পর্বমালা এবং মধ্যভাগে স্কান্ডারবেগ পর্বতমালা। পশ্চিমে এড্রিয়াটিক সাগর এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে আইওনিয়ান সাগরের সাথে ছুঁয়ে থাকা উপকূল রেখা আলবেনীয় রিভিয়েরা গঠন করেছে। প্রায় গ্রীষ্মমন্ডলীয় আবহাওয়ার এই সবুজ উপকূলীয় অঞ্চলটি পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। এড্রিয়াটিককে আইওনিয়ানের সাথে সংযোগকারী ওটরানটো প্রণালীর অপর প্রান্তে ইতালি থেকে আলবেনীয় রিভেরার দূরত্ব ৭২ কিলোমিটারেরও (৪৫ মাইল) কম।
প্রাচীনকালের নির্ভরযোগ্য তথ্যাদি থেকে জানা যায়, আলবেনিয়ায় অতীতে বিভিন্ন ইলিরিয়ান, থ্রাসিয়ান ও গ্রিক উপজাতির বসবাস ছিল। এ ছাড়া ইলিরিয়ান উপকূলে বেশ কয়েকটি গ্রিক উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে রোমান সা¤্রাজ্য এই অঞ্চলকে কুক্ষিগত করে এবং এটি রোমান প্রদেশ ডালমাটিয়া, মেসিডোনিয়া ও ইলিরিকামের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। ১১৯০ খ্রিষ্টাব্দে একীভূত আরবার ক্ষুদ্ররাজ্যের আবির্ভাব ঘটে। বাইজানটাইন সা¤্রাজ্যের মধ্যে ক্রুজের শাসক প্রোগন এটি প্রতিষ্ঠা করেন। ত্রয়দশ শতাব্দীর শেষের দিকে আনজাউয়ের চার্লস বাইজানটাইনদের কাছ থেকে আলবেনীয় অঞ্চল দখল করেন এবং ডারেস থেকে উপকূল বরাবর দক্ষিণে বুট্রিন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় মধ্যযুগীয় আলবেনীয় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি উসমানীয়রা এটি দখল করে নেয়।
বলকান যুদ্ধে উসমানীয়দের পরাজয়ের পর ১৯১২ সালে আধুনিক জাতি রাষ্ট্র আলবেনিয়ার আবির্ভাব ঘটে। ইতালি ১৯৩৯ সালে আধুনিক আলবেনিয়া রাজ্যে আগ্রাসন চালায় এবং বৃহত্তর আলবেনিয়া গঠন করে। ১৯৪৩ সালে আলবেনিয়া নাৎসি জার্মান আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়। নাৎসি জার্মানির পরাজয়ের পর আলবেনিয়া কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত হয়। আনোয়ার হোজ্জা ও লেবার পার্টির নেতৃত্বে গণ সমাজতান্ত্রিক আলবেনিয়া প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯১ সালের বিপ্লবের প্রেক্ষপটে সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ভেঙে দেয়া হয় এবং চতুর্থ আলবেনিয়া প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।
আলবেনিয়া উচ্চ-মধ্য আয়ের অর্থনীতিসহ একটি গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নশীল দেশ। আলবেনিয়া জাতিসংঘ, বিশ^ব্যাংক, ইউনেস্কো, ন্যাটো, ডব্লিউটিও, সিওই, ওএসসিই ও ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য।
আলবেনিয়ার রাজনীতি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় পরিচালিত হয়। প্রধানমন্ত্রী সরকার ও একটি বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান। নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের হাতে এবং আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সরকার ও আইনসভা উভয়ের হাতে ন্যস্ত। আলবেনিয়ার আইনসভার নাম কুভেনডি আই রিপাবলিকস সে ইশকিপেরাইজ। ১৯৯১ সাল থেকে দেশটিতে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রচলিত। তবে আলবেনিয়া ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং আলবেনিয়া সোসালিস্ট পার্টি নামে দুইটি দল আলবেনিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে। আলবেনিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইলির মেতা এবং প্রধানমন্ত্রী ইদি রামা। আলবেনিয়ার প্রশাসনিক এলাকা ১২টি কাউন্টিতে বিভক্ত এবং কাউন্টিগুলো আবার ৩৬টি জেলায় বিভক্ত। কাউন্টিগুলো হলো ইশকোডার, কুকেস, লেঝে, ডিবার, ডুরেস, তিরেন, ইলবাসান, কোরসে, ফিয়ার, বেরাত, ভেøারে ও জিরোগাস্টার।
আলবেনিয়ার এক-তৃতীয়াংশের বেশি অংশজুড়ে আছে বনজঙ্গল। আর এর আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। এই পুরো অংশটিই বেশ ঘন বনে আচ্ছাদিত। আলবেনিয়ায় তিন হাজারের অধিক প্রজাতির গাছ পাওয়া গেছে। এগুলোর অনেকগুলোই ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। মধ্যসাগরীয় শান্ত জলবায়ুই এখানে বিরাজ করে থাকে। আলবেনিয়ায় শীতকাল তুলনামূলক উষ্ণ এবং রৌদ্রময়। আর গ্রীষ্মকাল সাধারণত অধিকতর শুষ্ক থাকে। দেশটির অন্যান্য অংশের আবহাওয়া ঋতুর ওপর নির্ভরশীল হলেও এক হাজার ৫০০ মিটার ওপরের এলাকাগুলোতে শীতকালসহ বেশির ভাগ সময়েই তীব্র শীত অনুভূত হয়, অবিরাম তুষারপাতও দেখা যায় সেখানে। দেশের নিম্নাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে দুপুরে তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গেলেও রাতে সবসময়ই শীতল থাকে।
আলবেনিয়ায় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি রয়েছে। তবে এখানে দৈনিক তেল উৎপাদনের হার বেশ কম। মাত্র ছয় হাজার ৪২৫ ব্যারেল। প্রাকৃতিক গ্যাসের যে মজুদের খবর পাওয়া গেছে তাতে দেশের জনগণের চাহিদা আপাতত মিটে যাওয়ার কথা। এর বাইরে দেশটিতে কয়লা, বক্সাইট, কপার এবং লোহার খনি রয়েছে। আলবেনিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে কৃষিরও। এ খাতে দেশটির ৫৮ শতাংশ লোক নিয়োজিত আর তা জিডিপিতে অবদান রাখছে ২১ শতাংশ। আলবেনিয়ার গম, ভুট্টা, তামাক, ডুমুর এবং জলপাইয়ের উৎপাদন মোটামুটি আলোচনায় আসার মতো। আলবেনিয়ার মুদ্রার নাম লেক।
দেশটির সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থা খুব একটা ভালো নয়। সড়ক, রেল ও বিমান সব দিক দিয়েই যোগাযোগব্যবস্থায় ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে অনেকটাই পিছিয়ে আছে তারা। তবে সম্প্রতি দেশটির সরকার কসভো, মেসিডোনিয়া, বুলগেরিয়া, ক্রোশিয়া ও গ্রিসের সাথে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে মনোযোগ দিয়েছে। এ প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে আলবেনিয়ার ৭৫৯ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক তৈরি হবে। এরই পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরীণ সড়ক উন্নয়নেরও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

SHARE

Leave a Reply